সাক্ষাৎকার : চিত্রকলা সম্ভব ও সম্ভাবনা

প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী, রনবী নামে যার খ্যাতি আকাশছোঁয়া। ঐতিহাসিক ‘টোকাই’ কার্টুনের স্রষ্টা। দুর্জয় রহমান শিল্পরসিক ও চিত্রসংগ্রাহক যার সংগ্রহে রয়েছে সমকালীন দেশি-বিদেশি চিত্রশিল্পীদের ভিন্নমাত্রার ও এন্ডিওয়্যার কাজ এবং অভিনেতা, চিত্রশিল্পী ও লেখক আফজাল হোসেন বসেছিলেন এক জমজমাট আড্ডায়। সঙ্গে ছিলেন আনন্দধারার সম্পাদক রাফি হোসেন। সেই আড্ডায় উঠে এসেছিল সমসাময়িক চিত্রকলা, চিত্রকলার আন্তর্জাতিক সংযোগসহ রনবীর ‘টোকাই’ সৃষ্টির প্রকৃত ইতিহাস। সেই আড্ডার অংশবিশেষ আনন্দধারার পাঠকদের জন্য।

রাফি হোসেন : আজকে আমাদের সঙ্গে বর্ষীয়ান তিনজন মানুষ উপস্থিত রয়েছেন। যাদের পরিচয় করে দেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, সবাই তাদের চেনেন তারা হলেন শ্রদ্ধেয় রফিকুন নবী স্যার, দুর্জয় রহমান, তিনি একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি, চিত্র সংগ্রাহক, তিনি নিজেকে একজন শিল্পরসিক হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। আর রয়েছেন আফজাল হোসেন। সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। আমি একটা বিষয় নিয়ে ভীষণভাবে শঙ্কিত, সেটা হলো আমাদের সংস্কৃতি। আমাদের টেলিভিশন কেউ দেখে না, আমাদের গান কেউ শোনে না। আমাদের সিনেমারও খুব খারাপ অবস্থা অনেকদিন থেকেই। আবার এখন শোনা যায় মঞ্চ নাটকেও দর্শক আসছেই না। যারা মঞ্চ নাটকের প্রধান গ্রুপ তাদের কাছ থেকে আমি বিষয়টা জানতে পেরেছি। চিত্রশিল্পীরা বলছিল তাদের বেচাকেনা কমে গেছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে আপনাদের মতামত ও কথাবার্তা শুনতে চাই। রফিকুন নবী স্যারের কাছে জানতে চাই চিত্রকলায় আপনাদের সময়ের অবস্থান এবং বর্তমান সময়ের অবস্থান সম্পর্কে?

রফিকুন নবী : বিষয়টা ঠিক ওইভাবে ভাবলে হবে না। একেকটা যুগ আসে একেকটা সময় এবং একেকটা মুহূর্ত আসে আর্ট কালচারের। এগুলো মানসিক বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যাপার। অভিনয়, সাহিত্য, শিল্প এসব বিষয় যে সবসময় একই রকম থাকবে সেটা কিন্তু না। টেলিভিশনের কথা উঠল যখন আমি জানি না এখন মানুষ টেলিভিশন দেখছে কিনা।

রাফি হোসেন : আপনি কি টেলিভিশন দেখেন?

রফিকুন নবী : খুব কম। আমাদের বয়সের মানুষেরা সবকিছু তো আমরা দেখি না। বাছাই করে দেখি। আগে যেমন বাছাই করে নাটক দেখতাম, এখন আর সেভাবে দেখা হয় না।

রাফি হোসেন : খুব করে কেউ বললে তখন দেখেন?

রফিকুন নবী : হ্যাঁ। বলতে হয় না তারপরও বলছি, যেমন আফজাল আছে সুবর্ণা আছে। মানে যারা সময় ধরে উঠে এসেছে তারা থাকলে তখন মনে হয় ভালো হবে। তখন নাটক দেখতে বসি। খারাপের মধ্যেও যে ভালো কিছু বেরিয়ে আসে না তেমনটাও না। তবে এখন যা দেখি আঞ্চলিক ভাষা দিয়ে যে কাজগুলো হচ্ছে, আমার মনে হয় না সেটার খুব প্রয়োজন ছিল। দুই-একটা চরিত্র থাকতে পারে। এক সময় আমি টেলিভিশন রিভিউ করতাম, সেই অভিজ্ঞতা থেকে যদি বলি তাহলে হয়তো তরুণরা বলবে আমার বয়সের জন্য আমি এসব বলছি। কিন্তু সেটা না, কারণ ব্যান্ড সংগীত আমার ভালো লাগে যদি সেটা ভালো হয়। চিত্রকলাও ভালো লাগবে যদি সেটা ভালো হয়, নিজের রুচির সঙ্গে যদি মিশে যায়, তাহলে ভালো লাগবে। অর্থাৎ কথাটা হচ্ছে যদি ভালো হয়। সেই অর্থে বলছি আঞ্চলিক ভাষার বিষয়টা বাংলাদেশে হয় কি প্রতি ১০ মাইল পরপর একটা ভাষা পরিবর্তন হয়ে যায়। সবগুলো নিয়ে যদি কাজ হয় তাহলে তো হবে না। পশ্চিমবঙ্গে ওরা শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে বলে আমরা আমাদের আঞ্চলিক ভাষাকে সামনে নিয়ে আসব এই রকম যদি ভাবনা থাকে তাহলে হবে না। আমাদের বাংলা বাংলাই। আঞ্চলিক যেটা বলি সেটাও বাংলা কিন্তু এটাকে ধরে ধরে মজা করা হচ্ছে। হাস্যরসাত্মক একটা ব্যাপারে আঞ্চলিক ভাষাটাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। যা-ই হোক, এখন চিত্রকলায় আসি। আমার তো মনে হয় এখন এটা খুব বেগবান হয়েছে। বাংলাদেশে চিত্রকলা শুরুই হয়েছিল বড় শিল্পীদের হাত ধরে। জয়নুল আবেদিন থেকে শুরু করে কামরুল হাসান, এসএম সুলতান, আব্দুর রাজ্জাক, কাইয়ুম চৌধুরী- এদের মতো শিল্পীদের হাত ধরে বাংলাদেশের চিত্রকলার যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরাও ভালো কাজ করছে। তারা অনেক পরিশ্রম করছে। বইপত্র না পাওয়া পর্যন্ত আমরা কিছু জানতে পারতাম না। কিন্তু বর্তমানে তারা প্রযুক্তির মাধ্যমে হাতের মুঠোয় সব পেয়ে যাচ্ছে। এখন সবাই একে অপরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছে। এভাবে তারা দেশের বাইরের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় এবং অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছে। এই বিষয়গুলো এখন সহজ হয়ে গেছে, কাছে চলে এসেছে। তাই আমার মনে হয় আগের থেকে এখন সবার কাজের প্রতি ব্যস্ততা বেড়েছে। আমরা নিজেদের যতই আধুনিক মনে করি, তারপরও আমাদের ভেতর একটা প্রচ্ছন্ন রক্ষণশীল বিষয় থাকে।

রাফি হোসেন : আমার একটা জিনিস মনে হয় যে রাস্তাটা খুলে গেল এইটা যেহেতু নতুন তাই সমসাময়িক স্থাপনের যে বিষয় এই বিষয়টা না জেনে পরীক্ষামূলকভাবে তারা করছে বলে মনে হয় না? এই বিষয়ে দুর্জয় রহমানের কাছে জানতে চাই?

দুর্জয় রহমান : সমকালীন চিত্রকলা নিয়ে বাংলাদেশে যে কাজগুলো হচ্ছে, না জেনে হচ্ছে এই বিষয়ের সঙ্গে একমত না। আমি মনে করি, কাউকে তো কোনো একটা জায়গা থেকে কিছু একটা শিখতে হবে। কোনো কিছুকে অবলম্বন বা বাহন হিসেবে ব্যবহার করতে চাইলে এখানে খারাপ কিছু দেখি না। চর্চার মাধ্যমে সবকিছু করা সম্ভব। হয়তো সে আজকে জানে না কালকে জানবে এভাবেই তো একটা কিছুর শুরু হয়। তাই প্রথমে আমাদের সমকালীন চিত্রকলার সংজ্ঞা ভালোভাবে বোঝা উচিত। কে চিহ্নিত করে সমকালীন চিত্র, নতুন কিছু শিল্প হলেই কি সেটা সমকালীন হয়, পুরনো হলেই কি সেটা হয় না? যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে পিকাসোর সমসাময়িক চিত্র নিয়ে একটা দীর্ঘ যাত্রা হয়েছিল। আমি বাহন হিসেবে দেখা বলতে কোনো কিছুকে না বোধক হিসেবে দেখি না। কিন্তু নিজেকে চিনতে হবে যে সমসাময়িক চিত্র নিয়ে কাজ করছি, তা থেকে আমি কোন জায়গায় যেতে চাচ্ছি। এটার মধ্যে আমাকে কী টানছে বা অন্যরা করছে বলেই আমি করব সেটা কিন্তু না। আমার কি পছন্দ সে হিসেবে আমি সেটাই করব। চিত্রকলাতে আমাদের যেটা আঞ্চলিক, সেটা ফোকলোর। তো একজন ফোকলোর নিয়ে কাজ করছে বা একটা ট্র্যাডিশনাল নিয়ে কাজ করছে দেখেই সে কি সেকালের হয়ে গেল? আর আমি একটা আধুনিক কাজ করছি কল্পবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করছি বলেই আধুনিক হয়ে গেলাম? আসলে এই বিষয়গুলো আমাদের সঠিকভাবে বোঝার জন্য সংজ্ঞাগুলো ভালোভাবে বোঝা প্রয়োজন। যারা চারুকলা থেকে পড়ে বের হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তাদের সামনে এসে বলা উচিত যে সবারই নিজের চর্চার ওপর সম্মান রাখা উচিত। চিত্রকলা নিয়ে যে ভুল ধারণা রয়েছে সেটা দূর হওয়া উচিত।

রাফি হোসেন : আফজাল ভাই আপনার কী মনে হয়?

আফজাল হোসেন : বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সবচেয়ে যে মাধ্যমটার উজ্জ্বল একটা স্থান তৈরি হয়েছে, সেটা চিত্রকলা। পৃথিবীর আয়তন বৃদ্ধি পায়নি কিন্তু মানুষের জানার আগ্রহটা বেড়েছে এবং সারা পৃথিবীর মানুষের মধ্যেই এই জানার আগ্রহ রয়েছে। যার ফলে যেকোনো সৃজনশীল মাধ্যমের বিরাট পরিবর্তন হয়েছে। সেই পরিবর্তনটা আমাদের দেশেও হয়েছে এটাই স্বাভাবিক। বুঝে না বুঝে করার আগে বিষয়টা আমাদের আকর্ষণ করছে কিনা এবং আমরা সেটার অনুশীলন করছি কিনা সেটা আগে বোঝার বিষয়। যখন আকর্ষণ করা শুরু হবে যখন অনুশীলন করা শুরু হবে ভেতরের যে মানুষটা তার আয়তন বাড়বে। সেই প্রক্রিয়াটা দেখতে পাই যেহেতু এই বিষয়টায় আমার আগ্রহ আছে তাই আমি যখনই বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সুযোগ পাই, তখন আমার মূল আগ্রহ থাকে সেদেশের চিত্রকলা দেখা।

রাফি হোসেন : আন্তর্জাতিক মানের মাঝি আর্ট রেসিডেন্সি নামের একটা প্রকল্প দুর্জয় রহমান করছেন যেটা ভেনিসে হলো। আমাদের দেশের ছয়জন, বিদেশি পাঁচজন শিল্পী  সেখানে ছিল। মাঝি নিয়ে আপনি যদি বলেন।

দুর্জয় রহমান : চিত্রকলার যে অনুশীলন এবং আন্তর্জাতিক মানের দিক থেকে আমরা অনেকের থেকে ওপরে আছি। ভাবলাম বাংলাদেশ থেকে যদি আমি একটা কাজ ইউরোপে করতে চাই, তাহলে কীভাবে করা যায়। এখন হঠাৎ করে বাংলাদেশের কয়েকজন শিল্পীর চিত্রকলা করার চাইতে যদি অন্য যে দেশে করব, সেখানকার শিল্পীদের সঙ্গে একত্রে কাজটা করা হয় আমার মনে হয় সেটা অনেক বেশি ভালো হবে। এই চিন্তাধারা থেকেই মাঝি প্রকল্পটি শুরু করলাম। এটা বিভিন্ন দেশেই হবে। এবার  ভেনিসে হয়েছে কারণ ভেনিস চিত্রকলার জন্য নামকরা জায়গা। তাই আমার কাছে মনে হলো ভেনিসই সবদিক থেকে সর্বোত্তম জায়গা। বাংলাদেশ থেকে যে ছয়জন শিল্পী অংশগ্রহণ করেছেন তাদের সঙ্গে স্থানীয় শিল্পীরাও অংশগ্রহণ করেছেন। আমি মনে করি আমরা যে শুধু তাদের শিল্পের প্রভাবটা পেলাম সেটা কিন্তু না। তারাও আমাদের প্রভাবটা পেয়েছে। এই বিষয়টা হচ্ছে সংস্কৃতির আদান-প্রদান ঘটানো। যারা এখানে অংশগ্রহণ করেছেন তাদের জন্য এইটা একটা বড় পাওয়া।

রাফি হোসেন : আফজাল ভাই যেমন বলল বিদেশে গেলে তার ইচ্ছে হয় জাদুঘরগুলো ঘুরে ঘুরে দেখার। আমার আক্ষেপ হয় আমাদের মাস্টারপেইন্ট যদি সেখানে থাকত। আপনি যেহেতু একটা কাজ শুরু করেছেন অনেক ভেবেচিন্তেই করেছেন। আপনার কি কখনো মনে হয় যে আমাদের জয়নুল আবেদিন, এসএম সুলতান, রফিকুন নবী স্যার এদের কাজগুলো এখানে থাকতে পারত? সেটা করা কি আদৌ সম্ভব, সেটা করার জন্য কী কী করণীয়?

দুর্জয় রহমান : আপনি যাদের নাম বললেন তাদের কাজ যদি আমরা আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতে চাই, তাহলে সেটা কিন্তু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া করা সম্ভব না। জয়নুল আবেদিন, এসএম সুলতান, কামরুল হাসান- এর কাজগুলো সরকারি সংগ্রহেই আছে। আমাদের একটা জাতীয় আইন আছে পুরাকীর্তি আইন, সেটার একটু পরিবর্তন হওয়া দরকার। কারণ যখন আমরা জাদুঘরে যাই, তখন দেখি কোনো একটা সভ্যতার কাজ কোনো একটা দেশ থেকে এসেছে। তাদের যারা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আছে, তারা নিজেরা এসে সেগুলো প্রদর্শন করছে। আমাদের দেশে এটার একটা আইনগত দুর্বলতা আছে। এ বিষয়টা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। মাস্টারপেইন্টার যারা আছেন, তাদের চিত্র সবাইকে দেখানো উচিত এবং বোঝানো দরকার যে এত আগেও আমাদের চিত্রগুলো কত উন্নত ছিল। কিন্তু আমরা তো সেগুলো দেখাতে পারছি না। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আমরা সেগুলো কোথাও নিয়ে যেতে পারছি না। আবার কোনো ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও যদি এগুলো প্রদর্শনীর জন্য নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলেও সরকার সহায়তা করবে কিনা এই বিষয়েও তো নিশ্চিত না।

রাফি হোসেন : আফজাল হোসেন আপনার কী মতামত?

আফজাল হোসেন : যিনি চিত্রকলা বোঝেন না, তার পক্ষেও তাদের চিত্রকলা বোঝা কিন্তু খুব একটা কঠিন বিষয় ছিল না। তারা যে মাপের চিত্রশিল্পী ছিলেন, তাদের যে যোগ্যতা ছিল সেটা বিশ্বের কাছে সেভাবে উপস্থাপিত হয়নি। আপনি যে বিষয়গুলো বললেন অন্যরা দেশ ভ্রমণে নিয়ে যেতে পারে, আমরা পারি না। এই বিষয়টা আমার কাছে খুব বিদঘুটে মনে হয়। কারণ যে বিষয়গুলো নিয়ে দেশ গৌরব করে, সে বিষয়গুলো আমরা মানুষের কাছে নিয়ে যেতে পারি না। স্যারকে বিব্রত করব না নিশ্চয়ই, স্যার আছে তাই গৌরবের সঙ্গেই বলছি, যাদের চিত্রকলার প্রতি সাধারণ জ্ঞান রয়েছে তারা সবাই মোটামুটিভাবে জানি যে, স্যার যেসব মাধ্যমে কাজ করেন- ক্রিয়েটিভ, প্রিন্ট, ড্রইং তার নিজের যে নিজস্বতা রয়েছে তা বিস্ময়কর। কিন্তু সেটা আমাদের দেশের গুটিকয়েক মানুষ জানে। এবং স্যার যেহেতু একটা বিশেষ জনপ্রিয় মাধ্যমে কাজ করেছেন কার্টুন, তাই তার পরিচিতির আয়তনটা একটু বড়। আমরা জানি বেঙ্গল নিজের উদ্যোগে এই বিষয়টাকে মানুষের কাছাকাছি অনেক এগিয়ে নিয়ে গেছে। একটা বিষয় হচ্ছে এই দায়িত্বটা শুধু শিল্পীর বা যিনি শিল্প ভালোবাসেন তার না। শিল্প চর্চায় আমাদের যে নিবেদনটা আছে সেটা কি আমরা ওইভাবে উপস্থাপন করছি? একজন শিল্পীর সম্পর্কে আমরা কতটুকু লিখতে পারি। এই কাজগুলো যদি না করি, তাহলে কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমরা এগুলো সামনে আনতেই পারব না। স্যারের খুব ভালো একজন বন্ধু শাহাদত চৌধুরী তিনি পাঠক তৈরি করেছিলেন।

রাফি হোসেন : শাহাদত চৌধুরী এমন একজন মানুষ সময়ের আগেই তিনি অনেক কিছু ভাবতেন, আমি এখনো তেমন মানুষ দেখি না।

আফজাল হোসেন : কিন্তু আমরা তাকে খুব বেশি মনে রাখিনি তার জন্মদিবস মৃত্যু দিবস সেগুলো মনে রাখি না। কার্টুন বিষয়টাকে তিনিই জনপ্রিয় করেছিলেন।

রফিকুন নবী : শাহাদত সম্পর্কে বলি। আমার ছোটবেলার বন্ধু ছিল। আমার এক-দুই বছরের ছোটই হবে। এক সঙ্গেই পড়তাম কিন্তু একবার অসুস্থতার কারণে সে একটু পিছিয়ে পড়েছিল। আবার আমার ছাত্র হয়ে গেল চারুকলায়। যাই হোক ও ছোটবেলা থেকেই অনেক মেধাবী। ছোটগল্পও লিখত। তারপর আর্ট কলেজ থেকে বের হওয়ার পর সাংবাদিকতায় চলে এলো। বড় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একজন। সবকিছু মিলিয়ে ও একটা অন্যরকম মানুষ। দেশে আজকে ফ্যাশন শো হচ্ছে, লাইফ স্টাইল হচ্ছে, রান্নাবান্না নিয়ে হচ্ছে, সবকিছুর শুরুটা হলো ওর হাত দিয়ে। সবকিছু ভেবে ও মনে করত যে আমাদের আরো কয়েক ধাপ এগোতে হবে।

রাফি হোসেন : স্যার যদি টোকাইয়ের বিষয়ে কিছু বলতেন?

রফিকুন নবী : সেদিকেই যাচ্ছি, শুরু করেছিলাম রাজনীতি ও মিছিলের কার্টুন দিয়ে। স্বাধীনতার পর ভাবলাম কার্টুনের আর হয়তো দরকার নেই। পাকিস্তান আমলে কার্টুন আঁকা কঠিন ছিল। মর্নিং নিউজে রাজনৈতিক কার্টুন ছাপানো হতো। সবই ছিল ইন্ডিয়া বনাম পাকিস্তান, পাকিস্তান বনাম ইন্ডিয়া। ঊনসত্তরে আমরা আন্দোলনে যোগ দিই এবং আমি আর শাহাদত বসে ঠিক করলাম আমরা রাজনৈতিক ছড়া সংকলন করব। আমরা তখন বিভিন্ন জায়গা থেকে ছড়া সংগ্রহ করলাম। যিনি কোনোদিন ছড়া লেখেননি, তিনিও আমাদের জন্য ছড়া লিখলেন। যেমন সর্দার জয়েনউদ্দিন শামসুর রহমান আল মাহমুদ এই রকম যারা লিখতেন আমরা তাদের কাছে গিয়ে হাজির হতাম এবং তাদের কাছ থেকে রাজনৈতিক ছড়াগুলো সংগ্রহ করে সংকলন করলাম। এটার নাম ছিল ঊনসত্তরে ছড়া। তারপর সেখানে আমরা কার্বন ড্রইং ব্যবহার করে চিত্র তৈরি করলাম। আমরা তখন তো আর অফসেটে যেতে পারি না, কারণ অফসেট তখন নতুন এসেছে। শেষে দেখা গেল কিছু পৃষ্ঠা বাকি থেকে গেছে, তখন সেগুলো পূরণ করার জন্য আমরা নিজেরা বসে ছড়া লিখলাম। পরবর্তী তে আমি ছড়াতে মনোযোগ দিয়ে ফেললাম আমার বেশকিছু ছড়ার বই আছে।

দি এক্সপ্রেস নামে একটা পত্রিকা বের হতো জহির রায়হান যার সম্পাদক ছিলেন, সেইটাতে আমি কার্টুন আঁকতাম। কামাল হোসেনের ফোরাম নামে একটা পত্রিকা বের হতো, সেটাতে কভারপেজের কার্টুন আঁকতাম। জয়নুল আবেদিন স্যার বেছে বেছে কাজগুলো আমাকে দিতেন। একদিকে জয়নুল আবেদিন, একদিকে শাহাদত আর আমার নিজের ইচ্ছা সব মিলিয়ে ঢুকেই পড়লাম। তারপর বিদেশে যখন চলে গেলাম, তখন ভাবলাম আর কার্টুন করব না। বিদেশে গিয়ে উড আর্ট শিখলাম।

রাফি হোসেন : কত সাল ছিল?

রফিকুন নবী : ১৯৭৩-১৯৭৬-এর মধ্যে। তখন দেশের অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। ওই সময় আমি এথেন্সে কাঠ খোদাই করছি। দেশে আসার পর ভাবলাম এই কাজ আর করব না। দেশে একটা রাজনৈতিক অস্থির অবস্থা, কে কী করছে কোনো ঠিক নেই। এটার মধ্যে কার্টুন করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু শাহাদত নাছোড়বান্দা। সে বলল তুমি কার্টুন কর রাজনৈতিক কার্টুন করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আমি পুরো ষাটের দশক রাজনৈতিক কার্টুন করার মধ্য দিয়ে এসেছি। এখন হঠাৎ করে ব্যঙ্গ রসাত্মক কার্টুন করলে তো হবে না। এর মধ্যে থেকে বের হওয়া কঠিন। শাহাদত বলল, তারপরও চেষ্টা কর হালকা রস দিয়ে শুরু করো। তখন আমার মনে হলো একটা বাচ্চা তাকে চরিত্র করে সেমিস্ট্রির মতো করা যায় কিনা। তখন ভাবলাম করে দেখি কী হয়। সপ্তাহে একটা করে আমাকে কার্টুন দিতে হবে। তারপর টোকাই নাম দিয়ে একটা চরিত্র আমি তৈরি করলাম যে ছোট মুখে বড় কথা বলবে। একটা বাচ্চা চরিত্র দিয়ে আমি টোকাই শিরোনামে ওকে দাঁড় করালাম। এটা করার দুই-তিন সপ্তাহ পর অনেক চিঠিপত্র আসা শুরু হলো। সেটা আমাকে খুব উৎসাহিত করল। এই হলো টোকাইয়ের গল্প শাহাদত চৌধুরীর গল্প।

রাফি হোসেন : স্যার আপনার কি কখনো এগুলো নিয়ে অ্যনিমেটেড সিরিজ করার কথা মনে হয় না?

রফিকুন নবী : অনেকে এসেছে আমার কাছে। কিন্তু এত সময় আমি দিতে পারব না।

রাফি হোসেন : আমরা দেখি একজন আঁকে, অন্যজন লেখে। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে সেটা ভিন্ন- আপনি আঁকেন ও লেখেন। এই বিষয়টা আপনি কীভাবে আয়ত্ত করলেন?

রফিকুন নবী : এটা তো আর পরিকল্পনা করে হয় না। হয়তো এটা স্বভাব থেকে আসে।

দুর্জয় রহমান : আপনি যখন কার্টুন করা শুরু করলেন তখন রফিকুন নবী থেকে কীভাবে রনবী হয়ে গেলেন?

রফিকুন নবী : এটা এমন কোনো কঠিন ঘটনা নয়। পাকিস্তান আমলে যখন রাজনীতি তুঙ্গে, ছয় দফা, এগারো দফা এই রকম আন্দেলন চলছিল। তখন আমি যেসব রাজনৈতিক কার্টুন করতাম, সেখানে রফিকুন নবীকে লুকিয়ে রাখার জন্য ছদ্মনাম হিসেবে রনবী ব্যবহার করতাম। ইংরেজিতে সব জায়গাতে আর নবী লিখি, এটা বাংলায় রনবী। কিন্তু আসলে এটা আমার স্বাক্ষর।

আফজাল হোসেন : শাহাদত চৌধুরী একটা  দেশকে, দেশের মানুষকে কীভাবে একটা চমৎকার জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায় তা নিয়ে কাজ করেছেন। স্যারের কাছ থেকে যতটুকু জানতে পারলাম, কার্টুন এই দেশে তেমন জনপ্রিয় ছিল না। সত্তরের দশকে দৈনিক বাংলা নামের বাংলা কাগজে কমিক্স ছাপা হতো। সেটার লেখা ছিল শাহাদত চৌধুরীর, ছবি ছিল নবী স্যারের। এটা কিন্তু অনেক কঠিন একটা কাজ ছিল ছবিতে ছবিতে বলা। পেশাদার মানুষ ছাড়া এটা করা অসম্ভব। এটা যদি সত্তরের দশকে করা যেতে পারে তাহলে আমরা তো এখন ২০১৯-এ আছি। টোকাইকে একটা বিশেষ জায়গায় পৌঁছে দেয়ার একটা প্রচেষ্টা শাহাদত চৌধুরীর ছিল। রাজনীতি, ফ্যাশন, রান্নাবান্না, সবকিছু উপস্থাপন করায় তার একটা বড় অবদান ছিল।

রফিকুন নবী : আবার সুন্দরী প্রতিযোগিতায় সুন্দরীদের কাছে আমাদের অবদান আছে। পরবর্তী সময়ে যতজন নাটক-সিনেমায় এসেছে, তাদের পেছনে কিন্তু আমার আর শাহাদতের অবদান ছিল। ওইখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আমরা নিতাম। আমরা সবাই একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিতাম, বাদল থাকত, নায়লা থাকত। তারপর সবাই আমাকে বলত তুমি বলে দাও।

আফজাল হোসেন : আমি একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমাদের সময় যেসব প্রতিযোগী নির্বাচিত হতো তাদের ছবি ঝুলিয়ে দেয়া হতো। এক প্রতিযোগিতায় নবী স্যারও আছেন, আমিও আছি। এখন স্যারের ছাত্র হলেও আমি কাজ করি বিজ্ঞাপনে। দুটো ছবির পাশে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। এখন স্যার বর্ণনা করছেন তার দৃষ্টি দিয়ে আর আমি আমার। স্যার ভাবছেন চোখ, নাক, কান। আর আমি ভাবছি একে দিয়ে তো মডেলিং হবে না।

রফিকুন নবী : পরবর্তী সময়ে বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতায় আমাদের মেয়েরা যাবে। সেখানেও বিচারক হিসেবে আমাদের ডাক পড়ত। যেদিক থেকে যখন ডাক পড়ত আমি চলে যেতাম। কারণ এগুলো অনেক অভিজ্ঞতা দেয়।

রাফি হোসেন : আফজাল ভাই আপনি নতুন, পুরনো অনেক প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া আপনি নিজেও একজন অভিনেতা ও চিত্রশিল্পী।

আফজাল হোসেন : বাংলাদেশের যারা সেরা চিত্রকর, তারা স্যারদের শিক্ষক ছিলেন। এখন যদি প্রশ্ন করা হয় কেন তারা ছবি আঁকতে গিয়েছিলেন। তাহলে উত্তর হলো ব্যক্তিগত ইচ্ছা এবং ব্যক্তিগত স্বপ্ন। কেউ তখনো ভাবেনি এটা আমার রুটি-রুজির ব্যাপার হবে। জয়নুল আবেদিন কি বিক্রির জন্য ছবি আঁকতেন? স্যারের কথা বলি চল্লিশ বছর কোনো প্রাপ্তি ছাড়াই তিনি এঁকে গেছেন। তারপর তার প্রাপ্তি পেয়েছেন। এই যে চল্লিশ বছরের সাধনা। এই সাধনা ছাড়া আমরা এখন সবকিছু আশা করছি। নবী স্যার হয়তো কখনো ছবি বিক্রি করার কথা ভাবেননি। কেউ হয়তো কেনেনি কিন্তু তার আশপাশে যে মানুষগুলো ছিল তারা ছবি নিয়ে বলত সেটা নিয়ে বিশ্লেষণ করত। এটা অনুপ্রেরণা। আমি যে কাজটা করছি সেটা কোনো না কোনোভাবে আমাকে অনুপ্রেরণা দিচ্ছে আরেকটি ছবি আঁকার জন্য।

রফিকুন নবী : একটা বিষয় আমরা খেয়াল করি না। আমাদের যে আর্ট কলেজ আছে, সেখান থেকে ছাত্ররা পাস করে যে শুধু শিল্পী হয়েই বের হচ্ছে তা নয় কিন্তু। পাশাপাশি অন্য অনেক রুচিশীল মানুষ তৈরি হচ্ছে।

আফজাল হোসেন : শিল্পের মাধ্যমে আমাদের রুচির নির্মাণ হচ্ছে। শাহাদত ভাই একদিন আমাকে বলছে শোনো আর্ট কলেজে পড়লেই যে শুধু শিল্পী হতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই। এমনো অনেক কাজ আছে যেগুলো করলে শিল্পীর কাজ হয়। স্যার যেমন বলছিলেন আর্ট কলেজ থেকে বের হওয়ার পর একজন মানুষের যে রুচিটা নির্মাণ হয়, সেটা কোনো না কোনোভাবে সমাজের কাছে পৌঁছায়।

রাফি হোসেন : সমাজেরও একটা রুচি নির্মাণে ভূমিকা রাখে।

আফজাল হোসেন : কিন্তু সমাজের কাছে পৌঁছাতে হলেও কোনো মাধ্যমের দরকার। আমরা এখন ভিউ দেখি। এটা দেখার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে যে দেখার জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ। একজন খুব ভালো অভিনয় শিল্পী এক ঈদে চল্লিশটা নাটকে অভিনয় করছে। এটা যোগ্যতার বিষয় নয়। আমরা কী বলছি এটা যোগ্যতার বিষয়? যে পাঁচটা নাটক করছে সে যখন এ সংবাদ জানতে পারছে তখন সে মনে করছে এটা কোনো যোগ্যতাই না। আমরা নর্দমায় পাঠানোর জন্য যে ব্যবস্থা করে রেখেছি, গড়ার জন্য আমাদের সে ব্যবস্থা নেই।

রাফি হোসেন : প্রথমেই আমরা ভাষার একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। কথায় কথায় আরো সংকটের কথা বেরিয়ে এলো। সব মিলিয়ে যে একটা সংকটময় অবস্থা এত সংকটের মধ্যেও কি আশার আলো আছে এবং সেটা কীভাবে?

আফজাল হোসেন : অবশ্যই আছে। সবকিছুর যদি আমরা সারাংশ ধরি, তাহলে ভালো কাজও হচ্ছে। মন্দ যে কাজগুলো হচ্ছে সেগুলো প্রধান হয়ে ওঠা উচিত নয় আবার যে কাজগুলো ভালো হচ্ছে সেগুলো প্রধান হয়ে ওঠা উচিত। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের এই বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।

রাফি হোসেন : এই বিষয়টা চিত্রঅঙ্কনের ক্ষেত্রেও যেমন, নাটক-সিনেমায় অভিনয়ের ক্ষেত্রেও তেমন।

আফজাল হোসেন : চিত্রকলার প্রদর্শন হলে যারা চিত্রকলায় আগ্রহী শুধু তারাই দেখতে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের কি দায়িত্ববোধ নেই?  এই দূরত্ববোধ কেন তৈরি হবে? হয়েছে একটা কারণেই। যে বোঝে না তাকে একটা জায়গা দেয়া প্রয়োজন। আমি ছবি প্রদর্শনের সময় দেখেছি। একটা পরিদর্শনে যদি সাতটা ছবি থাকে, তাহলে যে বোঝে না সে কিন্তু সব ছবির সামনে দাঁড়ান না।

রফিকুন নবী : এটা দুর্জয় ভালো বলতে পারবে। কারণ ওকে এসব নিয়ে কাজ করতে হয়।

দুর্জয় রহমান : আফজাল ভাই খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলেছেন যে, যারা শিল্প বোঝে না, তাদের শিল্প বোঝানোর জন্য আমরা কি অনুপ্রাণিত করছি। অনুপ্রাণিত করছি না বলেই কিন্তু একটা সংকট তৈরি হচ্ছে। আমি বলব আমাদের বাংলাদেশের যে সমালোচনা করা হয়, তা অনেক সময় অনেককে নিরুৎসাহিত করে ফেলে। কিন্তু বিভিন্ন দেশে দেখি যদি মানসম্মত কাজ না হয়, তাহলে তারা সমালোচনা না করে ভাবে। আরো একটু দেখি যদি ভালো কিছু করে। তারপর একদিন তারা বলে। আগে সময় দেয়। কিন্তু আমরা শুরুতেই জিনিসটাকে দাবিয়ে দিচ্ছি। আমি হাসতে হাসতে অনেককেই বলি গাড়ির মেকানিক কিন্তু গাড়ির ইঞ্জিন বোঝে কিন্তু ও কি সবচেয়ে দামি গাড়ি চালায়? আবার যে সবচেয়ে দামি গাড়ি চালায় সে কি ইঞ্জিন বোঝে? তো চিত্রকলাটাও একটা যাত্রা। স্যার যেমন চল্লিশ বছর কাজ করার পর যে অবস্থায় আছে। আমাদেরকে এগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে। আমি অনেক সময় অনেক শিল্পীকে বলি, তুমি এখন উদীয়মান একজন শিল্পী, তুমি কাজ করে যাও কে দেখল কে দেখল না সেটা নিয়ে ভাবার দরকার নেই। তোমার কাজের মান যদি ভালো হয়, তাহলে একদিন নিশ্চয়ই ফল পাবে। কিন্তু তার মূল্যায়ন হওয়ার আগেই তাকে নিরুৎসাহিত করে পিছিয়ে দিচ্ছি।

রাফি হোসেন : সেটাও আছে আবার আমার মনে হয় এখনকার ছেলে-মেয়েদের ধৈর্যও একটু কম।

আফজাল হোসেন : স্যাররা যেমন জীবনের অর্ধেক সময় এভাবে পার করে দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানেরগুলো ভাবছে এভাবে এত সময় পার করলে তো আমি শেষ। তাই তারা ভুল পথে হাঁটছে এবং অনেকে তাদের এই পথে হাঁটার জন্য উৎসাহিত করছে।

রফিকুন নবী : পরম্পরা বলে একটা কথা আছে। সেটা কিন্তু কোনো না কোনোভাবে মেনে চলা উচিত। জয়নুল আবেদিনরা যা করেছেন, আমরা তা করব না। আমরা নভুনভাবে শুরু করব। এইটা করলে কিন্তু হবে না। আগে ব্যাকরণ শেখো তারপর সেটা ভোলার চেষ্টা কর। আগে গড়তে শিখতে হবে, তারপর ভাঙার চিন্তা করতে হবে। কামরুল হাসান বলি, জয়নুল আবেদিন বলি, উনাদের কোনো খুঁত ছিল না। দুর্জয় পিকাসোর যে সমসাময়িকের কথা বলল  তো সেটা শুরুই হয়েছিল রেনেসাঁ থেকে। তখন থেকে শুরু না হলে আমরা হতাম না। জয়নুল আবেদিন না হলে আমরাও হতাম না। ধাপগুলো পেরোতে হবে। লাফিয়ে চললে হবে না। শুধু যে শিল্পীরা শিল্প নিয়ে ভাববে সেটা না। সাধারণ মানুষের মধ্যেও নিজস্ব একটা বোধ আছে, রুচি ও চিন্তাভাবনা আছে। একজন যদি আঁকতে না পারে কিন্তু তার ভেতরে রসবোধ আছে, সে চর্চা করছে। এটা ভালো দিক। একজন জাপানির সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল, তখন আমি তার কাছে জানতে চাইলাম ছবির প্রদর্শনী শেষ হয়ে গেল আর লাভ কী? সে বলল যেটা দেখলাম সেটা এখন মাথার মধ্যে রাখাটাই লাভ। সে আমাকে বলল, তুমি একজন শিল্পী মানুষ, তোমর চিন্তাভাবনা সব সৃজনশীল। হঠাৎ করে তুমি একটা মরুভূমির মাঝে পড়ে গেলে কোন দিকে যাবে, কী করবে কিছুই জানো না। মরূদ্যানও নেই, তোমার কাছে রঙ নেই, তুলি নেই। শুধু মাথাটা অছে। সেই সময় হঠাৎ তোমার মনে হলো একটা কষ্টের মধ্যে আছো। কী করবে, কোন দিকে যাবে কিছুই বুঝতে পারছ না। কিন্তু আঁকার অনুভূতিটা তোমার মধ্যে কাজ করছে। কিছুই নেই তাই বলে তুমি কি বসে থাকবে? ওইখানে যা আছে তাই নিয়ে তুমি নিজে নিজে কিছু একটা করে ফেললে। ওখানে কেউ দেখল না তুমি কিছু একটা করলে কিন্তু তুমি নিজে সেটা নিয়ে পরিতৃপ্ত। এই কথাগুলো সে মজা করে আমাকে বলেছিল।

দুর্জয় রহমান : এক আলোচনায় একজন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন তোমাদের দেশে আর্টের কীভাবে উন্নতি হচ্ছে এবং এর ইতিহাসটা কী? তখন আমি তাকে কামরুল হাসানের ১৯৬৭ সালের একটা কাজ দেখালাম এবং তাকে পিকাসোর একটা ছবি অনলাইন থেকে বের করে দেখালাম। এখন বলো কামরুল হাসান কি পিকাসোকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন নাকি পিকাসো কামরুল হাসানকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন? আসলে কে কীভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছে আমরা সেটা জানি না। তো এসব না ভেবে আমাদের সবকিছু সহজভাবে নেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আমরা এখন একটা সন্ধিক্ষণে আছি। বিশ্বায়নের এই সময়ে আমরাও যদি মোড়টা ঘোরাতে পারি, তাহলে আমরাও এগিয়ে যাব।

আফজাল হোসেন : আমি খুব গর্ববোধ করি ভবিষ্যতে চিত্রশিল্পীরা হয়তো আরো অনেকদূর পৌঁছিয়ে দেবে। যে কাজগুলো আমরা লক্ষ্য করেছি, সে কাজগুলোয় খুবই নিজস্বতা রয়েছে। এমন না যে অমুকের সঙ্গে তমুকের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় সেগুলো শুধু আমাদের দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

রাফি হোসেন : এখানে দুর্জয় সাহেব রয়েছেন। তিনি যেহেতু শিল্পকে তুলে ধরার একটা প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। আমি তার কাছে আশা করব স্যারেরা যতদিন বেঁচে আছেন, তাদের সঠিক ভাবে যেন তুলে ধরা হয়।

আফজাল হোসেন : শুধু শিল্পীর শিল্পকে নয়, একজন শিল্পীকেও যথাযথভাবে তুলে ধরতে হবে।

রাফি হোসেন : স্যার আপনি যদি শেষে কিছু বলতে চান?

রফিকুন নবী : আমার খুব ভালো লাগল আলোচনা। দুর্জয় তার ক্ষেত্র থেকে যে বক্তব্য রাখল সেটা এক রকম। আমি আর আফজাল একরকম একই পিঁড়িতে বসা।

রাফি হোসেন : স্যার আপনি শুধু অভিনয় করেননি নাকি সেটাও করেছেন?

রফিকুন নবী : আভিনয় করিনি। কিন্তু মাস্টারি করতে যাওয়াটাও অভিনয়ের চেয়ে কম কোথায়। আমি যখন বাসায় থাকি তখন একটা মানুষ। বাজারে যাই একটা মানুষ। যখন ছবি আঁকি তখন একটা মানুষ। যখন ক্লাস নিতে যাই তখন সম্পূর্ণ একটা ভিন্ন মানুষ।

রাফি হোসেন : আমরা ছবি আঁকি বা অভিনয় করি- তার মধ্যে শিল্পবোধ থাকতে হবে। জানতে হবে কোথায় থামতে হবে।

রফিকুন নবী : হ্যাঁ, নিজ নিজ ক্ষেত্র শিল্পবোধটা থাকা জরুরি। কিন্তু মাত্রাটা যেন রুচির বাইরে চলে না যায়। আগে সেটা জানতে হবে যে কোথায় থামতে হবে। কিন্তু এখন এত বেশি দরজা খুলে গেছে যে বিশৃঙ্খলা হয়ে যাচ্ছে। শিল্প নিয়ে যত বিষয় রয়েছে, তার অনেক দরজা- কে কোনটা দিয়ে বের হবে সেটা তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত।

রাফি হোসেন : আজকে আমাকে এখানেই শেষ করতে হচ্ছে। আমার মনে হয় আজকের আলোচনা থেকে অনেক কিছু পরিস্কার হলো। 

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup