শিল্পের সঙ্গে খাবারের পার্থক্য খুঁজে পাই না : খালেদ মাহমুদ

রাজধানী ঢাকার উত্তরায় ১৩নং সেক্টরের ২নং রোডে অজো আইডিয়া স্পেস। পাঠকের হয়তো মনে আছে, অজো একসময় ধানমণ্ডিতে ছিল। নতুন অজোতে নিরিবিলি পরিবেশে সুস্বাদু খাবারগুলো চেখে দেখতে দেখতে কথা হয় অজোর উদ্যোক্তা খালেদ মাহমুদের সঙ্গে। তিনি একই সঙ্গে এমআইবি স্পিরিটের (মেড ইন বাংলাদেশ) উদ্যোক্তা এবং হেড অফিস কমিউনিকেশনের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র ছিলেন। তার সঙ্গে কথা হয় অজো নিয়ে। অবধারিতভাবেই এখানে চলে আসে একজন মানুষ এবং শিল্পী হিসেবে তার জীবনদর্শন। খালেদ একজন সচেতন ও আশাবাদী মানুষ। তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতাটুকু সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরছি পাঠকদের জন্য।

আনন্দধারা : অজো শুরু করার পেছনে চিন্তাটা কী ছিল?

খালেদ মাহমুদ : নগরায়ণের ফলে এখন বেশিরভাগ মানুষ শহরে চলে আসছে। সুস্থ জীবনযাপনের জন্য মানুষের সাহায্য দরকার। আর গ্রামের মানুষের তুলনায় শহরের মানুষের এই সাহায্য আজ বেশি প্রয়োজন। নয় বছর আগে অজো যখন শুরু হয়, তখন চিন্তাটা ছিল একটা পরিবর্তনের, একটা সমাধানের।

আনন্দধারা : একটু ব্যাখ্যা করতে পারেন?

খালেদ মাহমুদ : গ্রামীণ অবকাঠামো একটি টেকসই অবকাঠামো। শহরের অবকাঠামো তা নয়। শহরের মানুষ অনেক অসহায়। শহরে থাকতে হলে তাই মানুষকে নিজের শহরের দায়িত্ব নিতে হবে। যারা খায় তাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। শুধু উত্তরায় কয়েক লাখ মানুষ আছে। যদি তারা সবাই ওয়ান টাইম প্লেট, গ্লাস, কাপ ব্যবহার করে, তাহলে এত বর্জ্য কোথায় যাবে? এই পরিমাণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। বর্জ্য থেকে আসে রোগবালাই, পরিবেশগত বিপর্যয়।

আগে গ্রামীণ জীবনে এত বর্জ্য উৎপন্ন হতো না। মাছের কাঁটা বিড়ালে খেত। মাটির প্লেট-গ্লাস ব্যবহার হতো। একটা ইকোসিস্টেম ছিল। কিন্তু শহরের কোনো সাসটেইনেবল ইকোসিস্টেম নেই। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমরা একটা অস্বাস্থ্যকর শহর ও সভ্যতা তৈরি করে যাচ্ছি। এর জন্য দায়ী আমাদের অজ্ঞতা আর বাজে অভ্যাস। আমরা সবকিছুর দায় সরকার বা আল্লাহর ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমাই। অথচ পলিথিন ও চিপসের প্যাকেটটা আমরাই ড্রেনে ফেলি। এটা একধরনের হিপোক্রেসি। এই কাজগুলো আমরা সবাই করে চলেছি। সবাই মিলে একটা পাপ করলেই কিন্তু তা সঠিক হয়ে যায় না। কাপড় ধোয়ার ডিটারজেন্ট, ফেসওয়াশ এসবে মাইক্রো প্লাস্টিক কণা ব্যবহৃত হয়। ফলে ক্যান্সারের মতো বিষ ছড়িয়ে পড়ছে পানিতে ও মাটিতে। সবশেষে এগুলো জমা হচ্ছে আমাদের শরীরে। আমাদের আগের প্রজন্মগুলো কিন্তু এত প্লাস্টিক ব্যবহার করত না। এই সমস্যা আমাদের প্রজন্মের। অথচ এগুলো নিয়ে কেউ কথা বলেন না।

আমাদের নাটকের এখন যে এসথেটিক্স, খাবারেরও একই এসথেটিক্স। আপনি আগে থেকেই জানেন ঘটনাটা কী হবে। খাবারেও আমরা সস্তা, সুস্বাদু, চটকদার জিনিসের দিকে ঝুঁকছি। টেকসই জিনিস, আইডিয়া বাদ দিয়ে ‘সুগার কোটিং’-এর দিকে আকৃষ্ট হচ্ছি। ব্যাপারটা অনেকটা সস্তা প্রেমের মতো। আমাদের চোখ ও জিহ্বা এখন সস্তা জিনিসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

আনন্দধারা : এর সমাধান কীভাবে হতে পারে?

খালেদ মাহমুদ : আপনাকে জানতে হবে, আপনি আসলে কী খাচ্ছেন, কী পরছেন, এগুলো কোথা থেকে আসছে। আপনি যখন খাওয়ার জন্য হাঁ করেন, তখন একই সঙ্গে দায়িত্বশীল হন। স্ট্র আর টিস্যু পেপার ছাড়াও আমরা একসময় ভালোই ছিলাম। প্লাস্টিক হচ্ছে তেলের বাইপ্রডাক্ট। এর দাম প্রয়োজনের থেকে সস্তা হওয়ার কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এক টাকায় যে এখন একটা গ্লাস পাওয়া যায়, এটাই সমস্যা। আগে মানুষ ছালার ব্যাগ ব্যবহার করত, এখন মাসে ৫০টি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। ছালার ব্যাগ সঙ্গে থাকলে ‘কুল’ দেখায় না। আমাদের অভ্যাস বদলাতে হবে। আমরা যদি দায়িত্বশীল আচরণ না করি, তার ফলও আমাদের ভোগ করতে হবে।

আনন্দধারা : অজোর মাধ্যমে কীভাবে এখানে অবদান রাখতে চান?

খালেদ মাহমুদ : অজো হচ্ছে ঘুরে দাঁড়ানোর একটা ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। সরকার আর আল্লাহর ওপরে ছেড়ে না দিয়ে নিজেরা কিছু করার চেষ্টা। দড়ির ব্যাগ ব্যবহার করে আমরা অনেক গাছ সেভ করছি। আমাদের বাঁশের স্ট্র কক্সবাজারের উখিয়া থেকে বানিয়ে আনা। অজোতে ব্যবহৃত প্রায় সব কাঠ রেলওয়ে স্লিপার বা শিপ ব্রেক ইয়ার্ডের বাতিল কাঠ। এগুলো নিয়ে আমরা অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। কাগজের ওয়ান টাইম গ্লাসের বদলে আমরা মাটি দিয়ে তৈরি গ্লাস ব্যবহার করি। কুষ্টিয়া থেকে কুমোরদের হাতে-পায়ে ধরে এগুলো বানিয়ে আনতে হয়। কেউ বানাতে চায় না। কিন্তু এর ব্যাপক চাহিদা আছে। কাজেই এ ধরনের সমাধানে ব্যবসারও অনেক সুযোগ আছে। কিন্তু বুদ্ধিমান মানুষ নেই। সরকার গ্যাস, বিদ্যুৎ দিয়েছে, ইন্টারনেট দিয়েছে। এসব সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। নিজেদেরও উদ্যোগ নিতে হবে। সচেতন এবং সভ্য মানুষ হিসেবে এই লেখার প্রতিটি পাঠকের দায়িত্ব রয়েছে।

আমাদের কৃষিভিত্তিক ব্যবস্থা খুব দ্রুত শিল্পভিত্তিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। সব ক্ষমতা করপোরেশনের হাতে চলে গেছে। প্রকৃতির জায়গায় চলে আসছে চটকদার যান্ত্রিক মুগ্ধতা। ফলে তৈরি হচ্ছে কার্বন ফুটপ্রিন্ট। আমি একেবারে কৃষিভিত্তিক ব্যবস্থায় ফেরত যাওয়ার কথা বলছি না। তবে একেবারে ইন্ডাস্ট্রিতে গা ভাসিয়ে দিতে চাইনি। অজোতে আমরা চেয়েছি সৃষ্টিশীলতা আর উদ্ভাবনী চিন্তা কাজে লাগিয়ে কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাতে। এয়ারকন্ডিশন বাদ দেয়া হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা বাদ দিয়েছি। প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে খরচও কম হয়। ফলে খাবারের দাম নিয়ে ক্রেতা সন্তুষ্ট থাকেন।

আনন্দধারা : আপনার শিল্পীসত্তা এক্ষেত্রে আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?

খালেদ মাহমুদ : শিল্পের সঙ্গে খাবারের পার্থক্য আমি খুঁজে পাই না। রান্নার প্রক্রিয়া ও পেইন্টিংয়ের প্রক্রিয়া প্রায় একরকম। মেটাফোরিকভাবে চিন্তা করলে রান্নার স্বাদ এবং পেইন্টিংয়ের ভিজ্যুয়াল স্বাদ একইরকম। একজন চিত্রশিল্পী আর একজন রন্ধনশিল্পীর মাঝে একই ধরনের গুণাবলি থাকে।

একজন প্রকৃত শিল্পীর মধ্যে একটা সচেতনতা কাজ করে। তিনি এটা এড়িয়ে যেতে পারেন না। আমার ভেতরে একটা কলকাঠি কাজ করে, যা আমাকে এভাবে ভাবতে বাধ্য করে। শিল্পীরা যে মাধ্যমেই কাজ করুন না কেন তারা এই বার্তাগুলো সমাজের বাকি অংশে পৌঁছে দিতে চান। তবে আমি যে শুধু শিল্পী হওয়ার কারণেই এই দায়িত্ব নিতে চেয়েছি, তা নয়। শিল্পের মানবিক দিকটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পকে একটা গণ্ডির মধ্যে আটকে ফেললে তার সৌন্দর্যটা কমে যায়। আলাদা করে শিল্পকে মহিমান্বিত করার দরকার নেই। গুহাচিত্র যারা এঁকেছিল, তারা তো আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেনি। ইনস্টিটিউট থেকে পাস করলেই শুধু সে শিল্পী- এটা খুব ঔপনিবেশিক আইডিয়া। শিল্প সবার মধ্যেই থাকে। শিল্প মানে প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগ। এই যোগাযোগটা খুঁজে নিতে হবে।

 শিল্প আসলে মানুষের মতো। ‘মানুষ’শব্দটা অনেক বড়। মানুষ মহাসমুদ্রের মতো ব্যাপক। শিল্পও তেমনি। একটা টেকসই আইডিয়ার সঙ্গে যখন শিল্পের নান্দনিকতা যুক্ত হয়, তখন তা পরিপূর্ণ ও কার্যকরী হয়ে ওঠে। অনেক ভালো আইডিয়া নান্দনিকতার অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে।

আনন্দধারা : পরিবেশগত এবং শৈল্পিক দিক ছাড়া অজো আইডিয়া স্পেসকে আপনি আর কীভাবে দেখতে চান?

খালেদ মাহমুদ : অজোকে আমরা একটা কমিউনিটি স্পেস হিসেবেও গড়ে তুলতে চেয়েছি। কলকাতার কফি হাউজ দ্বারা আমি অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। কফি হাউজ একটা কমিউনিটি স্পেস হিসেবে কাজ করেছে। পাবলিক স্পেস একটা শহরের শ্বাস-প্রশ্বাস হিসেবে কাজ করে। পাবলিক স্পেস তৈরিকে আমাদের আরো উৎসাহিত করতে হবে। পাঠশালা, ছবি মেলা, বেঙ্গল বই বা অজো সবাই আসলে এই চেষ্টাটা করছে। সংলাপ, মিথস্ক্রিয়া, অনেক ধরনের নতুন চিন্তা যেন তৈরি হওয়ার পরিসর পায়।

বাংলাদেশ এমন একটা দেশ, যেখানে সবকিছু করা সম্ভব। আমি যা যা করতে চেয়েছি, করতে পেরেছি। এই দেশে, এই মাটিতে সবকিছু তাড়াতাড়ি বেড়ে ওঠে। এখানে যা হতে চাইবেন, হতে পারবেন। গত ১২ বছরে আমাদের মতো জিডিপির প্রবৃদ্ধি খুব কম দেশের আছে। আমাদের তরুণ মানবসম্পদ আছে। সমতল, উর্বর জমি আছে, পানি আছে প্রচুর। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও আমাদের এই প্রবৃদ্ধি থেমে থাকেনি। বাংলাদেশ থেমে থাকেনি। আমরা অনেক সৌভাগ্যবান।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup