শাড়িতে রঙ ও তুলির ছোপ

শিল্পীর তুলির ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে একেকটি ক্যানভাস। সেই তুলির ছোঁয়া এখন জায়গা করে নিয়েছে নারীর প্রিয় পোশাক শাড়িতে। শাড়িতেই ফুটে উঠছে শিল্পীর তুলির রঙের ছটা। অথচ শাড়িতে হাতের কাজ বলতে একটা সময় শুধু সুই-সুতার নকশাকেই বোঝানো হতো। আর এখন শুধু সঁইয়ের খোঁচায় সুতার রঙে বোনা ফুল, পাখি অথবা বাহারি নকশা নয়, কাপড়ের সৌন্দর্যবর্ধন করতে শিল্পীর রঙতুলির জনপ্রিয়তাও কম নয়। রঙ আর তুলির স্পর্শে বর্ণিল হয়ে উঠছে নারীর শাড়ি। যারা ছবি আঁকেন তাদের কম-বেশি সবাই নিজের পোশাক ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করতে ভালোবাসেন। তবে এই পোশাক অলংকরণের মাধ্যমটি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব চিত্রশিল্পীকে নিয়ে কাজ করছেন ফ্যাশন ডিজাইনার ফাইজা আহমেদ। বনানীর একটি ছোট্ট দোকান থেকে যাত্রা হয় ফাইজার প্রতিষ্ঠান মানাসের। তারপর নিজের কাজ দিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন দেশ ও দেশের বাইরে।

মানাসের যাত্রা শুরু নিয়ে ফাইজা আহমেদ বলেন, মানুষ এখন অনেক ট্রেন্ডি। সবাই চায় একটু ভিন্নভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে। এই কনসেপ্ট থেকেই মানাসের শুরু। মানাস শব্দের অর্থ হলো ‘মাইন্ড পাওয়ার’। ট্রেন্ডি হওয়ার জন্য মানাসের যাত্রা হয়নি, মানাস এসেছিল ট্র্যাডিশনকে ধরে রাখতে। অনেকটা ¯্রােতের বিপরীতে পথচলার মতো চ্যালেঞ্জ নিয়ে মানাসের যাত্রা হয়। প্রচুর ব্যবসা করব এমনটা আশা করিনি। আইডিয়া ছিল আইকন শিল্পী ও লেখকদের আঁকা ও লেখা নিয়ে কাজ করব। সবকিছুই তাদের পরিবারের থেকে অনুমতি নিয়েই করব এবং মানাস সেটাই করছে।

মানাসের শাড়িগুলো বাজারের অন্যদের থেকে একদমই আলাদা। এখানে মডার্ন আর্ট, ইলাস্ট্রেশন থেকে শুরু করে জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান ও বিদেশি বিখ্যাত শিল্পীদের শিল্পকর্ম নিয়ে কাজ হচ্ছে। দারুণ দক্ষতার সঙ্গে শাড়িতে ফুটিয়ে তোলা সেসব শিল্পকর্মকে। এ প্রসঙ্গে ফাইজা আহমেদ বলেন, লিজেন্ড আর্টিস্টদের আমরা ভুলে যাচ্ছি। যেমন জয়নুল আবেদিন দুর্ভিক্ষের ছবি এঁকে সারাবিশ্বে পরিচিতি পেয়েছিলেন, কিন্তু আমরা এখন তাকে মনে করতে পারি না। কামরুল হাসানের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। বইয়ের পাতায় পড়ে যতটুকু জানা যায়, তারপর তাদের কথা আমরা মনেই রাখছি না। এ ধরনের ভ্রান্তির জায়গা থেকে মানুষকে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে বের করে আনতে আমরা ফ্যাশনে শিল্পের চর্চা করছি। আমার লক্ষ্য মানুষকে শিল্পের দিকে, সাহিত্যের দিকে আকৃষ্ট করা। সাহিত্যও আজকাল উৎসবমুখী হয়ে গেছে। মানুষ রবীন্দ্রনাথ পড়ছে না, জীবনানন্দ পড়ছে না। কিন্তু পহেলা বৈশাখ এলেই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে মাতামাতি হচ্ছে। আমি এখন থেকে মানুষ বের আনার চেষ্টা থেকেই মানাস নিয়ে কাজ শুরু করি। আমরা শাড়িতে রবীন্দ্রনাথের কবিতার চারটা লাইন দিয়ে দিচ্ছি। তাহলে অন্তত মানুষ শাড়ি পরার মাধ্যমে হলেও রবীন্দ্রনাথকে পড়বে, রবীন্দ্রনাথকে জানবে। আবার একশ্রেণির তরুণরা বাইরের বিখ্যাত শিল্পীদের ছবি দেয়া টি-শার্ট পরছে। তারা হলো ট্রেন্ডি, শাড়ি পরা ভুলে গেছে বা যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে মানাসের শাড়িতে বাইরের শিল্পীদের শিল্পকর্ম বা তাদের পোর্ট্রেট ব্যবহার করা হয়েছে। এর কারণ ওই প্রজন্মকে আকৃষ্ট করা, তাদের শাড়ি পরা শেখানো, আমাদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখা। এখানে কিন্তু আমরা সফল। মানাস কিন্তু একটা প্রজন্মকে শাড়ি পরা শিখিয়েছে। এটা আমাদের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য ছিল না। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক পরিবর্তন।

মানাসের এ ধরনের ভাবনাকে বা কাজকে মানুষ কতটুকু গ্রহণ করেছে এমন প্রশ্নের জবাবে ফাইজা আহমেদ বলেন, এখানে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়বে না। তবে আমি এখন পর্যন্ত আমার কাজ নিয়ে খুশি। একটা জায়গায় আমার লিমিটেশন আছে, সেটা হচ্ছে প্রচার-প্রচারণা। এমনকি আমি কোনো সাইনবোর্ডওয়ালা ব্র্যান্ড ম্যানেজ করছি না, স্টুডিওর মতো ছোট্ট একটি কক্ষে মানাসের আউটলেট। আমার কিছু নির্দিষ্ট ক্রেতা রয়েছে এবং একটা প্রজন্ম রয়েছে যারা শুধুই মানাস পরেন। সবকিছু বিবেচনা করলে ব্যবসায়িক দিক থেকে আমি সফল ও সন্তুষ্ট। তবে আমার অসন্তুষ্টি অন্য জায়গায়; আমি সততার সঙ্গে কাজ শুরু করি, কিন্তু অনেক অনলাইন বুটিক আমার আইডিয়া কপি করছে। এমনকি অনেক বড় বড় ফ্যাশন হাউজও একই কাজ করছে। এসব দেখে নিজের কাছে খুব খারাপ লাগে। এটা আমার জন্য এক ধরনের বিড়ম্বনা।

শাড়িতে শিল্পীর ক্যানভাস হোক বা কবিতার কবিতা হোক তা ফুটিয়ে মানাস দেশীয় ফ্যাব্রিক ব্যবহার করে থাকে। এগুলো সবই আনা হয় সরাসরি টাঙ্গাইল, পঞ্চগড় ও সিরাজগঞ্জের তাঁতিদের কাছ থেকে। মাধ্যম হিসেবে তারা ব্যবহার করছে স্ক্রিনপ্রিন্ট। তবে নকশিকাঁথার ধাঁচে কিছু কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান মানাসের কর্ণধার ফাইজা আহমেদ।

জানতে চেয়েছিলাম এ ধরনের শাড়ির মূল ক্রেতা কারা, জবাবে মানাসের কর্ণধার বলেন, পেশাজীবী নারীরাই আমার মূল ক্রেতা। গৃহিণীদের আমি সেভাবে এখনো আসতে বা কিনতে দেখিনি। তবে একেবারেই যে কিনছে না তা-ও কিন্তু নয়। বড় বড় করপোরেট পার্সনরা মানাস খুঁজে বের করেছে এবং পরছে। যাদের আমি চিনতামই না, তারা সবসময় আমাকে উৎসাহ দেন। যেমন- রুবানা হক, রুবাবাদৌলা, সোনিয়া বশীর। তারা কিন্তু মানাসের নিয়মিত গ্রাহক। আমি তাদের চিনতাম না, মানাস দিয়েই তাদের সঙ্গে আমার পরিচয়।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ফাইজা আহমেদ বলেন, আপাতত আউটলেট বাড়ানোর কোনো প্ল্যান নেই। কিন্তু দেশের বাইরে মানাসের প্রচুর ক্লায়েন্ট আছে। সেটা নিয়ে বড় পরিকল্পনা রয়েছে। আমার ইচ্ছা ২০২০ সালে কলকাতা, দিল্লি, ক্যালিফোর্নিয়া ও সিডনিতে মানাসের শাড়ি যাবে। ওখানে ঠিক আউটলেট হবে না, হয়তো অন্য কোনো ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করব। এই প্ল্যানটা মোটামুটি ফাইনাল হয়ে আছে। আর ব্যবসায়িক কোনো পরিকল্পনা নেই। কাজ করতে থাকি, দেখি কতদূর যাওয়া যায়। তবে আরো অনেক লিজেন্ডের শিল্পকর্ম যুক্ত করার প্ল্যান আছে। সবগুলোই তাদের পরিবার থেকে অনুমতি নিয়ে করব। এটা নিয়েও কথা হচ্ছে, এগিয়েছি অনেকটা, এই আমার প্ল্যান।

মানাসের একটা লক্ষ্য ছিল তরুণ প্রজন্মকে টি-শার্ট থেকে শাড়ি পরানো, ট্রেন্ড থেকে ট্র্যাডিশনের দিকে আনা- সেটা আপনি করতে পেরেছেন? ‘আমার পয়েন্ট থেকে বলব তরুণীরা এটাকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। আমি তাদের এতটুকু বোঝাতে পেরেছি, তারা একটা ভ্রান্ত ধারণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ট্রেন্ডি হতে গেলে ট্রাডিশন ভুলে যেতে হবে এই ধারণা এখন অনেকের কমে গেছে। আসলে আমাদের সমস্যাটা অন্য জায়গায়, আমরা অন্য দেশের কালচার রপ্ত করতে গিয়ে নিজেদের কালচারের কথা ভুলে যায়। এখান থেকেই এই প্রজন্মকে বের করতে হবে। আর এজন্য সবাইকে কাজ করতে হবে। সবাইকে সচেতন হতে হবে। তবে আমার জায়গায় আমি সফল। আমি যা করতে চেয়েছিলাম, তা করতে পেরেছি।’

শাড়িতে এখন অনেক নিরীক্ষা হচ্ছে, শাড়িকে ওয়েস্টার্ন করা হচ্ছে, শাড়ির ধরন বদলে যাচ্ছে, ট্র্যাডিশন বাদ দিয়ে সবাই ট্রেন্ডির দিকে ঝুঁকছে- এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একজন ডিজাইনার হিসেবে আমি এটাকে শাড়ি বলি না। এটা শাড়ির কোনো একটা রকম বা শাড়ির পরিবর্তন। এসব কাজের মাধ্যমে শাড়িতে কিছু যোগ-বিয়োগ করে সহজে পরিধেয় করা হচ্ছে। কিন্তু সেলাইবিহীন বারো হাত শাড়ি শরীরে পেঁচিয়ে পরে যে মজা তা কিন্তু এসব শাড়িতে থাকে না। তাই আমি মনে করি যত বিবর্তনই আসুক না কেন শাড়ি শাড়ির জায়গাতেই থাকবে। তবে এখানকার ডিজাইনারদের বিপক্ষে আমি বলছি না। তারা যেটা করছে, সেটাও অনেক ভালো কাজ। কারণ যারা একেবারেই শাড়ি পরতে পারে না, তাদের মাধ্যমে তারা শাড়ি পরছে। এটা অবশ্যই একটি ইতিবাচক বিষয়। কিন্তু তাই বলে শাড়িকে বিকৃত করা যাবে না। আমি আবার সেটাকে সমর্থন করি না। সব মিলিয়ে একজন নারী হিসেবে আমি সবসময় ট্র্যাডিশনাল শাড়ির দলে। 

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup