কাজী গিয়াসউদ্দিন : শিল্পের অসামান্য স্রষ্টা

আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান শিল্পী কাজী গিয়াসউদ্দিন। শিল্প সৃজনের ক্ষেত্রে প্রকৃতির সংগীত তার অবিরাম অনুপ্রেরণার উৎস। শিল্পী তার চিত্রকর্মগুলোতে প্রকৃতির অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যের সমন্বয় সাধন করেছেন- যেখানে তার ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ পেয়েছে। তার সৃজনশৈলীটি অসাধারণ, অভ্যন্তরীণভাবে রঙ চিত্রজমিনে প্রসারিত হয়ে প্রায়োগিকভাবে অনুরণিত হয়। জলরঙ যেখানে কাব্যের অনুভবকে নাড়া দেয়, সেখানে তেলরঙ কোনো মহাকাব্য বা বিশাল উপন্যাসের বিশালত্বকে বর্ণনা করে। কাজী গিয়াসউদ্দিন দুটি মিডিয়ায় পারদর্শী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ প্রমুখের কবিতাগুলোর অংশ তার চিত্রকর্মে ক্যালিগ্রাফি আকারে সংযুক্ত করেন।

শিল্পী কাজী গিয়াসউদ্দিন বাংলাদেশ থেকে প্রথম মনবুশো স্কলারশিপ পেয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের (বর্তমানে চারুকলা অনুষদ) অংকন ও চিত্রায়ণ বিভাগের একজন শিক্ষক থাকাকালীন পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য তিনি জাপানে গিয়েছিলেন। জাপানে একজন আর্ট শিক্ষকও ছিলেন। সত্যিকারের পেশাদার শিল্পী, যিনি পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে শিল্প সাধনায় নিমগ্ন। এখনো তিনি দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করেন।

জলরঙ তার প্রিয় মিডিয়া। অনেক আকর্ষণীয় তেলরঙের স্রষ্টাও তিনি। সমসাময়িক এই মাস্টার আর্টিস্ট বিখ্যাত টোকিও অপেরা সিটি আর্ট গ্যালারিতে প্রদর্শনীর জন্য বেশ কয়েকটি বিশাল আকৃতির তেলরঙের ছবি অংকনে ব্যস্ত ছিলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে কাজী গিয়াসউদ্দিন বলেন, ‘শিল্প কোনো ব্যবসা নয়, আমি কেন আঁকব? একটি অভ্যন্তরীণ আকাঙ্ক্ষা অনুভব থেকেই আমি ছবি আঁকি। আপনি যদি প্রকৃতি অনুভব করতে না পারেন এবং এর বিশাল সৌন্দর্য বুঝতে না পারেন, তবে কখনোই আপনি শিল্পী হতে পারবেন না। বর্তমান সময়ের শিল্পীরা এই চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। যখন আমি প্রথম বর্ষের (অনার্স) ছাত্র ছিলাম, তখন আমি প্রায়ই শিল্পী মনিরুল ইসলাম, মাহবুব এবং আমাদের শিক্ষক রফিকুন নবী ও মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে আউটডোরে কাজ করতে যেতাম।’

তিনি আরো বলেন, ‘নিছক প্রকৃতি অনুলিপি সৃষ্টি নয়। আমি পল ক্লির কথায় অনুপ্রাণিত হয়েছি, তিনি বলেছিলেন, কেউ একজন ভালো চিত্রশিল্পী হবেন, স্রষ্টা নন। টার্নারের বাস্তবসম্মত জলরঙগুলো কল্পিত, তবে আমি পল ক্লির বিমূর্ত কাজ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছি। শিল্পী মনিরুল ইসলামের জলরঙের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। তার শিল্পকর্মগুলো প্রদর্শনীর মাধ্যমে জলরঙের মাহাত্ম্য প্রকাশ পাবে এবং এতে করে তরুণ শিল্পীরা উপকৃত হবেন।

কাজী গিয়াসউদ্দিন প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং প্রকৃতির রূপগুলো পর্যবেক্ষণ করে গঠনমূলক শিল্প সৃষ্টি করেন। তার জলরঙগুলো একই সঙ্গে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিশেলে তৈরি। তিনি প্রকৃতি থেকে ফরম গ্রহণ করেন, কিন্তু নিজের মতো করে তৈরি করেন। তার কাজের মধ্যে কম্পোজিশন আর যা স্বতন্ত্র তাহলো রঙের কৌশল। বর্তমানে তিনি তার পঞ্চম শিল্পগ্রন্থ প্রকাশনার জন্য ফরমগুলো বিনির্মাণ করছেন এবং ক্যানভাসে ন্যূনতম রঙ ছড়িয়ে ছবি আঁকেন।

বাস্তবধর্মী শিল্প ছাড়াও তার কাজে জ্যামিতিক রূপ রয়েছে। রয়েছে চিত্রকর্মের মধ্যে চিত্রকর্ম, আলো এবং ছায়ার সূক্ষ্ম খেলা, পৃথিবীর মেরু দর্শন, পরাবাস্তববাদ এবং পরম বিমূর্ততা। তিনি শুকনো পদ্ধতিতে তার প্রতিটি জলরঙ সম্পন্ন করেন। গভীরতা তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণভাবে কাগজকে সাদা রাখার সঙ্গে সঙ্গে রঙের স্তর প্রয়োগ করেন। তেলরঙের ক্ষেত্রে তার অংকনশৈলী প্রশান্ত সৌন্দর্যের রশ্মির মতো জ্বলজ্বল করে।

‘আমি আমার নিজের আনন্দের জন্য আঁকি। অর্কেস্ট্রা তৈরি করতে আমি চিত্রের পর চিত্র একসঙ্গে রাখতে চাই। কখনো কখনো মেঘলা আকাশে উজ্জ্বল সূর্যের আলো জ্বলে। মধ্যাহ্নের রোদ নদীতীরের প্রকৃতিকে সবুজ করে তোলে। সন্ধ্যার সময় এটি আরো বেগুনি বা গাঢ় সবুজ হয়ে যায়। এই চিত্রগুলো যদি পরাবাস্তববাদী হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে আমার চিত্রগুলোও পরাবাস্তববাদের পথে রয়েছে।

বিশ্বশিল্পের ক্ষেত্রে তার অসামান্য কৃতিত্বের জন্য তার চারটি শিল্পবিষয়ক বইয়ের প্রকাশনা রয়েছে। তার পঞ্চম বইটি শিগগিরই প্রকাশিত হচ্ছে। তার প্রথম প্রকাশনা ‘Spirit of Bengal’ (মাতৃভূমির মূর্ত কবিতার বহিঃপ্রকাশ)। প্রকৃতি, ঐতিহ্য, কবিতা, ছন্দ, মেয়েলি অনুগ্রহ এবং আরো কিছুকে শোভিত করার একটি শ্রমসাধ্য প্রচেষ্টাই গ্রন্থে পাওয়া যায়। জাপানের এনএইচকে পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত ‘Sound of Nature’ তার দ্বিতীয় গ্রন্থ। তৃতীয়টিও জাপানে প্রকাশিত হয়েছিল। চতুর্থ বইটি বেঙ্গল ফাউন্ডেশন এবং স্কিরা যৌথভাবে প্রকাশ করেছে। শিরোনাম, ‘Kayi Ghiyasuddin : Contemporary Master of Bangladesh’ বইটি তাকে আন্তর্জাতিক প্রশংসা ও খ্যাতি দিয়েছিল। অনেক শিল্পরসিক, সমালোচক এবং সংগঠন তার কাজের প্রশংসা করে তাকে চিঠি লিখেছিল।

বইটির সম্পাদক Rosa Maria Falvo  উল্লেখ করেছেন, ‘সুন্দরভাবে চিত্রিত, এটি বাংলাদেশের সমসাময়িক শিল্পীদের নিয়ে সিরিজের প্রথম খণ্ড। এই সৃজনশীল যাত্রায় কাজী গিয়াসউদ্দিন প্রকৃতি থেকে তার অনুপ্রেরণা নিয়ে আঁকেন তার আকাক্সিক্ষত শান্তি ও মেলবন্ধন। প্রচুর পরিমাণে টেক্সচারযুক্ত ক্যানভাস তৈরি করে তার অনন্য রঙ চাপানো, যেখানে প্রসারিত প্রয়োগের সঙ্গে অনুরণিত হয়। তার প্রথমদিককার ও বর্তমান কাজগুলো প্রস্তাবিত স্বপ্নের মতো চিন্তাধারায় বিকশিত হয়েছে। যেন একটি সংজ্ঞাবহ অর্কেস্ট্রা বহমান। গিয়াসউদ্দিন দুটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও নান্দনিক শিল্প সৃজন করেছেন।

এই বইটিতে বাংলাদেশে তিন দশকব্যাপী শিল্পীর ব্যক্তিগত অন্তর্দৃষ্টির আলোকপাত করে ২০০টিরও বেশি চিত্রের প্রদর্শন হয়েছে এবং এটি দক্ষিণ এশিয়ার সমসাময়িক শিল্পের আগ্রহী যে কাউকে আকৃষ্ট করবে; বিশেষত সংগ্রাহক, কিউরেটর, একাডেমিক ও শিল্পীরা। তার অসংখ্য একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫টি জাপানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তার শিল্পকর্ম অনেক শিল্প জাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে। এশিয়ান আর্ট মিউজিয়াম তার বেশিরভাগ কাজ সংগ্রহ করেছে।

কাজী গিয়াসউদ্দিন তার চিত্রকর্মগুলোর মাধ্যমে অন্যের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে চান।

তার ছবিগুলো দেখে মনে হবে দীর্ঘ আত্মা অনুসন্ধান শেষে তাকে একটি কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে, যেটা কেউ তার পুনঃপুন নিরীক্ষার দ্বারাই অর্জন করতে পারে।

শিল্প উপস্থাপনার ক্ষেত্রে পরিপক্বতার প্রমাণ মেলে তার বেঙ্গল শিল্পালয়ে এ বছরের প্রথমার্ধে শেষ হওয়া ‘The Work of Creation’ শিরোনামের একক চিত্র প্রদর্শনীতে, যেখানে তিনি বিশাল আকৃতির তেলরঙ চিত্রকর্মের পাশাপাশি তার ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে আঁকা জলরঙগুলো প্রদর্শন করেছিলেন।

শিল্পের প্রতি অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। জাপান ও ঢাকাভিত্তিক এই শিল্পী গত বছরের ২৭ জুন জাপান সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক ‘Order of the Rising Sun’ (Gold and Silver Rays)-এ ভূষিত হয়েছেন। টোকিও ইউনিভার্সিটি অব আর্টস অ্যান্ড মিউজিক থেকে তিনিই প্রথম পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

 

  লেখক : জাহাঙ্গীর আলম

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup