ভূত জয়া, পরি জয়া

মাথার ওপরে গনগনে রোদ। পায়ের তলায় তপ্ত মাটি। আমরা এসেছি বর্ধমানের এক গ্রামে, রুক্ষ লাল মাটির বীরভূম পেছনে ফেলে। দুপুরও বিকেলের দিকে খানিকটা কাত হয়ে পড়েছে। তবু গরমের হলকা পিছু ছাড়েনি। গায়ে ছেঁকা দিচ্ছে। দূর থেকেই চোখে পড়ল লোকেশনের ব্যস্ততা। প্রবল তাপে দৃশ্যপট আবছা, ধোঁয়া ধোঁয়া। ওই ঘোলাটে চাঞ্চল্যের মধ্যেও সব ছাপিয়ে চোখে পড়ে, লালপদ্মের মতো মস্ত কী একটা ফুটে আছে। কাছে গেলে বুঝি, ওই লালপদ্মটা আসলে জয়া, আমাদের জয়া আহসান। তপ্ত হাওয়ায় দূর থেকে যা লাল দেখাচ্ছিল, তা আসলে গোলাপি। এই নির্দয় গরমে জয়ার গায়ে সিনথেটিকের গোলাপি ফ্রক। তিনি কিনা এ ছবিতে ভূত অথবা পরি। কিংবা বলা যায়, দুটোই।

ভূতপরি ছবির এই লোকেশন পড়েছে শ্মশানে। দাহ করার হলুদ চাতাল। তার সামনে অমসৃণ মাটির রাস্তা। রাস্তার এক পাশে কাশফুলের উঁকিঝুঁকি। অন্য পাশে ধনুকের মতো বেঁকে উঠে যাওয়া তালগাছ। তাতে হেলান দিয়ে নির্দেশনা দিচ্ছেন পরিচালক সৌকর্য ঘোষাল। এ দৃশ্যের পাত্র-পাত্রী বাংলাদেশের জয়া আর কলকাতার কিশোর বিশান্তক মুখোপাধ্যায়।

সৌকর্য ঘোষালের স্ত্রী পূজা চট্টোপাধ্যায় এ ছবির একজন কুশলী। গরমের কথা তুলতেই বললেন, আজ আর কী! গরম ছিল কাল, ৪৫ ডিগ্রি। তার মধ্যে আবার দৃশ্য পড়েছিল চিতার। সেই গরমে লকলকে আগুন ঘেঁষটে চলেছে জয়ার অভিনয়। জয়া তবু অবিচল। জয়ার নিষ্ঠা আর একাগ্রতার কথা পূজা পাঁচমুখ করে বলতে থাকেন।

দূর থেকে জয়াকে দেখি। টেকের পরে টেক চলছে। টেকের ছোট ছোট ফাঁকেও অভিনেত্রী-সত্তা থেকে তিনি চকিতে ফিরে আসছেন আপন স্বভাবে। জয়া প্রকৃতিমুগ্ধ। মগ্ন হয়ে কাশফুল দেখছেন। এক হাতে কাশের ডাঁটা ধরে আরেক হাত সাদা কেশরে বোলাচ্ছেন আলতো করে। গ্রামের লোক এসেছে নায়িকা দেখতে। রোগাপটকা এক কুকুরও ভিড়ে গেছে জটলায়। ওরা কি টের পায়, কার কাছে গেলে প্রশ্রয় পাওয়া যাবে? সুযোগ পেলেই ছুটে যাচ্ছে জয়ার কাছে। আদর কেড়ে নিচ্ছে জয়ার।

টেক শেষ হলে জয়া এলেন। গলগল করে ঘামছেন। একজন দৌড়ে এসে মুখ মুছিয়ে দিলেন। আমাদের দেখেই জয়ার ক্লান্তি উধাও। মুখে সেই অমলিন স্নিগ্ধ হাসি, ‘কষ্ট হয়নি তো পথে?’ কণ্ঠে ঝরে পড়ল আতিথ্যের আন্তরিকতা। শান্তিনিকেতনে যাচ্ছি শুনে জয়াই গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, শ্যুটিংয়ের ফাঁকফোকরে নিছকই নির্জলা আড্ডার লোভে।

শ্মশান মানেই পাশে কোনো নদী। এখানকারটা নদী নয়, নদ। ভিড় পেছনে রেখে আমরা সন্ধ্যাবেলার অজয় নদের তীরের দিকে হেঁটে যাই। এটা-সেটা কথার ফাঁকে শুনি জয়ার এবারের অভিজ্ঞতা। কাল চিতার পাশে দাঁড়িয়ে শ্যুটিং করার সময় মনে হচ্ছিল, মাংস গলে পড়ে যাবে। আগুনে গরম মাটিতে সারা দিন ছোটাছুটিও করতে হয়েছে খালি পায়ে। পায়ে ফোসকা পড়ে যায় যায় অবস্থা। বেশ কিছুদিন ধরে এভাবেই শ্যুটিং চলছে, ভোর থেকে রাত ১১টা-সাড়ে ১১টা পর্যন্ত। সত্যি, চলচ্চিত্রের পর্দায় যা ঝলমলে রঙিন দেখায়, তার পেছনে কতই না শারীরিক ক্লেশ! সে চিহ্ন থেকে যায় আড়ালে, সৃষ্টির হৃদয় নিংড়ে নেয়া যন্ত্রণার কথা যদি বাদও দিই।

জয়ার সেই সৃষ্টিপ্রক্রিয়ারও সাক্ষী হওয়া গেল, রাতে। রাতের লোকেশন বোলপুরে। মস্ত এক পোড়ো জমিদারবাড়িতে ভুতুড়ে আবহাওয়া। পাত্র-পাত্রী চারজন। দৃশ্য যথেষ্টই দীর্ঘ। আস্ত সিকোয়েন্সই বলা চলে। এ দৃশ্যে মাথায় এক তন্ত্রসাধকের প্রবল আঘাতে জয়া পড়ে যাবেন ঝপাৎ করে। শুরু হলো টেক। অভাবনীয় সব পতনদৃশ্য। জয়া সব সময় বলেন, অভিনয়ের সময় নাকি তার মাথার ঠিক থাকে না। বোঝা গেল তার মানে। প্রতিবার মাথায় বাড়ি খেয়ে গা-হাত-পা ছেড়ে এমনভাবে লুটিয়ে পড়তে লাগলেন মাটিতে, যেন হঠাৎ স্নায়ুর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন। হাড়গোড় যে জখম হতে পারে, সে দুশ্চিন্তার লেশমাত্র নেই। পরিচালক সৌকর্য সন্তুষ্ট হলেন ১৫তম টেকের পর। আগের দৃশ্যগুলোর সবক’টিতেই কিন্তু জয়া নিখুঁত। তবু যে সেসব বাদ গেল, তার কারণ অন্যত্র বা অন্য কেউ।

ছবিতে কিশোরমনের উন্মোচন সৌকর্যের প্রিয় বিষয়। নেটফ্লিক্সে যারা রেইনবো জেলি দেখেছেন, তারা জানেন তার হাতযশের কথা। এমন ধাঁচের ছবিতে জয়া এই প্রথম। কেন জয়া? সৌকর্য জানালেন, এমন এক সুঅভিনেত্রীর তার প্রয়োজন ছিল, যিনি দেখতেও হবেন সাক্ষাৎ লক্ষ্মী। তিনি আরো বলেন, ‘অভিনয়ে জয়া মেজাজের নানা পর্দায় যেভাবে দ্রুত আসা-যাওয়া করতে পারেন, তা অতুলনীয়।’

জয়া আহসানের অভিনয়ের গুণপনার খবর পশ্চিমবঙ্গে এখন ঘটনা। কলকাতার প্রথম সারির জনপ্রিয় থেকে আর্টহাউজ সিনেমার সব পরিচালকই আগ্রহভরে জয়াকে তাদের ছবিতে নিয়েছেন। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, অতনু ঘোষ, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়। কে নয়?

কী সেই অনন্য জাদু যে জয়াকে নিজের ছবিতে পেতে মুখিয়ে থাকেন তারা? অতনু ঘোষের কাছে বুঝতে চেয়েছিলাম সে রহস্য। অতনু ময়ূরাক্ষী ছবির পরিচালক। সে ছবির থিমেটিক ট্রিলজি বা ত্রয়ী চলচ্চিত্র হিসেবে এ বছর তার দুটো ছবি হচ্ছে। বিনিসুতোয় আর রবিবার। দুটোতেই আছেন জয়া। প্রথমটিতে ঋত্বিক চক্রবর্তীর বিপরীতে, দ্বিতীয়টিতে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের। জয়ার অভিনয়ের দারুণ এক ভাষ্য দিলেন অতনু ঘোষ। বহুদিন ধরে অভিনয় করতে করতে এর কলানৈপুণ্য শিল্পীদের রক্তে ঢুকে যায়। তৈরি হয়ে ওঠে অভিনয়ের এক মুখস্থ অভ্যাস। অভিনয় তখন এক সীমারেখায় আটকে পড়ে। তার প্রাণ শুকিয়ে আসে। জয়া এ ব্যাপারে ভীষণ সজাগ। অভিনয়কে তিনি মোটেই অভ্যাস হয়ে উঠতে দেননি। অতনু বলেন, ‘এ অভ্যাস ঝেড়ে ফেলার জন্য জয়া চরিত্রের ভাবটা খুঁজে বের করেন। আর নিজের সেই উপলব্ধির ভেতর থেকে অভিনয়কে ডিকনস্ট্রাক্ট (বিনির্মাণ) করেন।’

এমন যার কৃতি, তার কি স্থিরতা থাকতে পারে? ফলে জয়ার পায়ের তলায় সরষে। আগস্ট থেকে এই যে শ্যুটিং শুরু হয়েছে কলকাতায়, তা প্রায় নিশ্চিদ্রভাবে চলবে আগামী বছরের জানুয়ারি অব্দি। আর ফেব্রুয়ারি থেকে একের পর এক সেসব মুক্তির পালা। চরিত্র থেকে চরিত্রে অভিনয়ের নতুন নতুন সীমানা ডিঙানোরও।

ক্যামেরার সামনে সেই যে লালপদ্ম হয়ে ফুটে ছিলেন জয়া আহসান, তার শেকড় বাংলাদেশে। কিন্তু দেশের সীমানা পেরিয়ে সে লালপদ্মের রূপ-রস-গন্ধ সম্মোহিত করেছে ভারতকে। সংবেদনশীল, অনুচ্চ ও সৌন্দর্যমণ্ডিত অভিনয়ে পশ্চিমবঙ্গে জয়া আহসান হয়ে উঠেছেন আমাদের সংস্কৃতির এক নন্দিত দূত।

লেখক : সাজ্জাদ শরিফ

সৌজন্য : প্রথম আলো

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup