ক্ল্যাসিক্যাল অনেক ধৈর্যের ব্যাপার

বাংলাদেশে নাচের অবস্থান, অবস্থা, ভবিষ্যৎসহ নানা বিষয়ে রাফি হোসেন আড্ডা দিয়েছেন এ সময়ের কয়েকজন নৃত্যশিল্পীর সঙ্গে। আড্ডায় ছিলেন স্নাতা শাহ্ রিন, র‍্যাচেল প্রিয়াংকা প্যারিস, সুদেষ্ণা স্বয়ম্প্রভা ও অর্থী আহমেদ। তাদের কথায় উঠে এসেছে আমাদের দেশে নাচের হালচাল। ভবিষ্যতের জন্য নানা পরিকল্পনা।

 

রাফি হোসেন : আমাদের দেশ থেকে অনেকেই ক্ল্যাসিক্যাল নাচ শিখছে। এরপর খুব কমই আছে, যারা এটাকে নিয়মিত অনুশীলন করছে। বেশিরভাগই মডেল বা অভিনেত্রী অন্য কোনো পেশায় চলে যাচ্ছে। কেন নাচটাই নিয়মিত করছে না?

সুদেষ্ণা স্বয়ম্প্রভা : আমার মনে হয় এটা ব্যক্তিগত পছন্দের একটা ব্যাপার আছে। আর সেই সঙ্গে সেই আর্ট ফর্মটার প্রতি তার অনুরক্তি হয়তো কম। শেখার ইচ্ছা ছিল তাই হয়তো শিখেছে, তারপর এখানে ফিরে হয়তো অন্য কিছু করছে। অনুরক্তি যার আছে সে নিয়মিত করবেই।

র‌্যাচেল প্রিয়াংকা প্যারিস : একটা সময় ছিল যখন নাচের সঙ্গে থাকা মানুষেরা প্রতিষ্ঠিত ছিলেন না। অর্থনৈতিক দিক থেকে তারা সচ্ছল নন। শুধু নাচ করে চলাটা খুবই মুশকিল।

অর্থী আহমেদ : এখনো নাচ করে পুরোপুরি সচ্ছলভাবে চলা যায় তেমন অবস্থাটা আসেনি। তবে আগের থেকে অনেক ভালো অবস্থান এখন হয়েছে।

সুদেষ্ণা : আগে অন্য কিছু একটা করে নাচটাকে দ্বিতীয় হিসেবে রাখত সবাই। কিন্তু এখন নাচটাকেই প্রথম হিসেবে রেখে অন্যগুলোকে আয়ের মাধ্যম হিসেবে রাখছে সবাই।

রাফি হোসেন : এতগুলো বছর এই কাজের জন্য দেয়ার পর অন্য কোনো পেশায় নিয়মিত করলে তা তো কষ্টদায়ক। শুরু থেকেই অন্য কোনো পেশায় নিজেকে তৈরি করতে পারত সে। আমাদের দেশে কি ক্ল্যাসিক্যাল নাচের যথাযথ অবস্থান তৈরি হয়েছে?

র‌্যাচেল : ইউটিউব বা এমন মাধ্যমে নাচ দেখে মানুষের ভেতরে নাচের প্রতি আগ্রহটা অনেক বেড়ে গেছে। আমার ক্লাসেই কিছুদিন আগে ঝিনাইদহের একটা ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন একজন শিক্ষক। তার নাচ দেখলাম। ভারতনাট্যমের একটা পিওর ক্ল্যাসিক্যাল আইটেম সে করেছে। তার নাচ অনেকের থেকেই অনেক ভালো হয়েছে। তার ভেতরে ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ। টিভি দেখে সে নাচ শিখেছে। স্কাইপে ভারতের একজন গুরুর সঙ্গে যোগাযোগ করে সে তার কাছে শিখেছে। এভাবে সে তার বেসিক ধারণা নিয়েছে। এখন সে ঢাকা এসে একজন গুরুর কাছে প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করেছে।

সুদেষ্ণা : আগের থেকে সবার মধ্যেই নাচের প্রতি আগ্রহটা বেড়েছে। সাধারণ মানুষও নাচ দেখছে। একদম শুরুর দিকে আমাদের দেশে যারা শুধু ক্ল্যাসিক্যাল নিয়েই কাজ করে গেছেন, তাদের সাধনার ফল হিসেবেই আজকের এই অবস্থান। এখন একজন নৃত্যশিল্পী চাইলে অনেক সহজেই ক্ল্যাসিক্যাল নাচ শিখে এই শিল্পে আসার সাহসটা করছে।

র‌্যাচেল : আগের নাচগুলো দর্শকরা তেমন একটা দেখতেন না। আমাদের পূর্বজ যারা ছিলেন, তাদের নাচ সবাই দেখতে দেখতেই চোখ তৈরি হয়েছে। এখন আমাদের প্রজন্মের যারা আছেন, তাদের দেখে আরো অবস্থানগুলো ভালো হবে। পরবর্তী প্রজন্মও তখন এই ধারা এগিয়ে নিতে পারবে।

নাম : স্নাতা শাহ্ রিন নাচের ধরন : কত্থক নাচ শেখা : ১৯৯৩ থেকে একক পরিবেশনা : মহিলা সমিতিতে একক শো-২০১৯ নিয়মিত পেশা : শিক্ষক, স্কলাস্টিকা; কোরিওগ্রাফার, প্রাচ্যনাট

রাফি হোসেন : তোমরা কি নিয়মিত শো করার জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছ?

র‌্যাচেল : আমাদের এখন নাচের পরিবেশনা করার জন্য জায়গা হচ্ছে শুধুই শিল্পকলা।

রাফি হোসেন : অন্যান্য জায়গাতেও তো ভাড়া নিয়ে ছোট পরিসরে আয়োজন করতে পারো।

সুদেষ্ণা : ক্ল্যাসিক্যালের জন্য যারা আছেন, তাদের জন্য ছায়ানট আছে, কত্থক উৎসব করেন সাজু মামা।

স্নাতা শাহ্ রিন : থিয়েটারের যে দলগুলো আছে তারা নিয়মিত শো করে। প্রতি মাসেই শো করার জন্য তারা আবেদন করে রাখে। প্রতি মাসেই তাদের শো করার ফলে চর্চাটাও বেশি থাকে আর দর্শকও বাড়ে।

র‌্যাচেল : নাচের ক্ষেত্রে এমন কিছু করতে চাইলে ফোরাম করা উচিত। একলা কারো পক্ষে এটা সম্ভব নয়।

রাফি হোসেন : এতদিনেও এই রকম একটা ফোরাম তৈরি হলো না কেন?

স্নাতা : আসলে সবাই আমরা ভিন্ন ফর্মে নাচ করি। আসলে এভাবে কথা আগে বলা হয়ে ওঠেনি। এখন যেমন কথা বলতে বসে মনে হচ্ছে আমরা তো এই চারজন মিলেই একটা ফোরাম শুরু করতে পারি।

রাফি হোসেন : নিজ নিজ ফর্মের নাচ নিয়েই তো পরিবেশনা করে যেতে পারো। তাতে করে একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবে তুমি প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। কেউ আসলে কারো জন্য করে দেবে না। নিজেদেরই উদ্যোগ নিতে হয়।

স্নাতা : আমরা আমাদের সময় পর্যন্ত গ্রুপে নাচ করে এসেছি। এককভাবে পরিবেশনা করার মতো শিল্পী এখনো তৈরি হয়নি। ১ ঘণ্টার একটি একক নাচ করা অনেক কঠিন একটা বিষয়। কোনো জায়গা ভাড়া নিয়ে আমি এমন একটা শো করতে গেলে তার জন্য আগে তেমনভাবে প্রস্তুত শিল্পী প্রয়োজন হবে। এই সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা সমস্য হচ্ছে, আমাদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় হ্যান্ডস নেই। ভারত থেকে নিয়ে আসা গানের সঙ্গেই আমরা বর্তমান নাচগুলো করি। লাইভ যদি কাউকে দিয়ে করাতে চাই, তা অনেক বেশি খরচের ব্যাপার। তাদের যদি ভারত থেকে নিয়ে আসি, তাহলে লাইভ পরিবেশনার জন্য তারা একটা সম্মানী নেবে আবার রিহার্সালের জন্যও আলাদা সম্মানী নেবে।

অর্থী : এ ব্যাপারগুলো অনেক বেশি খরচের।

রাফি হোসেন : কিন্তু এটাও তো সত্য, তোমরা যদি উদ্যোগ না নাও, তাহলে এগুলো কোনোদিনও হবে না। কাউকে না কাউকে তো শুরুটা করতে হবে। তোমরা যদি এসব আয়োজন নিয়মিত করতে থাকো, তাহলে মিউজিশিয়ান যারা আছেন, তারাও তৈরি হবেন।

স্নাতা : আমরা এর আগে কিছু কাজ করেছি। নৃত্যাঞ্চল, শিল্পকলা থেকে একক পরিবেশনা করেছি। এটা যে শুরু হয়নি তা নয়। কিন্তু এগুলো আরো বেশি নিয়মিত হওয়া দরকার।

রাফি হোসেন : শোগুলো ঢাকার একটি নির্দিষ্ট দিকে করতে হবে তা-ও না। ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে শোগুলো করতে হবে, যাতে সেই প্রান্তের মানুষ সহজে যেতে পারে পরিবেশনা দেখতে। শহরের বিভিন্ন পাশে এমন আয়োজন নিয়মিত করতে থাকলে তোমরাও তো তখন অনেক বেশি কাজের সুযোগ পাবে।

স্নাতা : শিল্পকলাতে আয়োজন করলে উত্তরা বা মিরপুর থেকে একজন এসে দেখতে চাইবে না। দেখার ইচ্ছা থাকলেও ঢাকার জ্যামের কারণে তা সম্ভব হয় না।

রাফি হোসেন : ক্ল্যাসিক্যাল ফেস্টে এত মানুষ যাচ্ছে। তারা সবাই যে বোঝে তা তো নয়। কিন্তু আগ্রহ নিয়ে যাচ্ছে। পাঁচ দিন এভাবে শুনতে শুনতেই তো তাদের কান তৈরি হবে শোনার। একটা সময় পর তারা বুঝবে। এর থেকে একটা ব্যপার তো পরিষ্কার যে দর্শক-শ্রোতাদের কাছে যদি পৌঁছানো যায় তাহলে লোকে আসবে। তোমরা এ শহরের বিভিন্ন দিকে যদি ছোট ছোট করে আয়োজনগুলো করতে পারো, তাহলে একটা সময় পর দেখবে লোকে অনেক বেশি আগ্রহ নিয়ে নিয়মিতভাবেই আসবে।

নাম : র‌্যাচেল প্রিয়াংকা প্যারিস নাচের ধরন : গৌড়ীয় নৃত্য নাচ শেখা : ৪ বছর বয়স থেকে একক পরিবেশনা : গৌড়ীয় নৃত্য সন্ধ্যা, নৃতাঞ্চল-২০০৩; গৌড়ীয় নৃত্য সন্ধ্যা, আইসিসিআর-২০১৩; এপার বাংলা ওপার বাংলা সন্ধ্যা-২০১৪ নিয়মিত পেশা : প্রভাষক, নৃত্যকলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; গৌড়ীয় নৃত্যের প্রশিক্ষক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি

অর্থী : আমরা যারা ক্ল্যাসিক্যাল করছি, শুধু নিজের পরিবেশনার কথা না ভেবে আমাদের শিক্ষার্থী বা অনুজ যারা আছে, তাদের সামনে নিয়ে আসা দরকার। এটা নিয়েও আমাদের উদ্যোগ নেয়া দরকার।

র‌্যাচেল : এটা নিজের পরিবেশনার সময় করতে পারো। নিজের শো যখন করছো তখন ওদের আগে একটা পরিবেশনা করার সুযোগ দিলে।

অর্থী : আমরা শেষ যে উৎসবটা করলাম, সেখানে আমরা ভাগ করে দিয়েছিলাম পরিবেশনাগুলো। সেখানে তিনজন জুনিয়র ও তিনজন সিনিয়র তাদের পরিবেশনা করবে এভাবে ভাগ করা ছিল। ক্ল্যাসিক্যাল অনেক ধৈর্যের একটা ব্যাপার। এরপর যখন আবার তারা দেখে বেশি পরিবেশনার সুযোগ পাচ্ছে না, তখন আগ্রহটা হারিয়ে ফেলে। আর বললেন যে, অনেকে নাচ শিখে মডেলিংয়ে চলে যায়, তাদের আসলে লক্ষ্যই ছিল তারকা হওয়ার।

রাফি হোসেন : এটা অন্যায়, তা নয়। কিন্তু নাচ দিয়েই আমি তারকা হব, খ্যাতি পাব এমন হলে ভালো। একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবেও তো খ্যাতি পাওয়া যায়।

র‌্যাচেল : একটা নাচের শোর আয়োজন করতে অনেক টাকা লাগে। আমি হয়তো এখন একটা আয়োজনের জন্য ব্যবস্থা করলাম নিজে থেকে। কিন্তু এটা কি আমার পক্ষে প্রতি মাসে করা সম্ভব?

স্নাতা : থিয়েটারের দলগুলো একটা প্রডাকশন তৈরি করে সেটাই বারবার প্রদর্শন করে। নাটকপাড়ায় তাদের শো থাকে। সেখানে লোকজন এমনিতেই অনেকে থাকে। তারা কোনো একটা শো দেখলে, ইচ্ছে হলেই ঢুকে দেখে আসছে। সেখানে টিকিটের দামও অনেক কম। এভাবে তাদের মোটামুটি হয়ে যায়। কিন্তু আমার একটা প্রডাকশন তৈরি করতে গেলে তার পেছনে খরচ হয় অন্তত ৫০ হাজার টাকা। এরপর বাকি প্রস্তুতির খরচ তো আছেই।

রাফি হোসেন : শুরু করাটাই আসলে একটু কঠিন হয়। এরপর তা সহজ হয়ে যায়। সুদেষ্ণার মা যখন নাচ করেছেন, তখন তো তাদের জন্য এই ব্যাপারগুলো আরো অনেক বেশি কঠিন ছিল। তারা তো নিজেরা চেষ্টা করে অনেকদূর এনেছেন। এখন তোমাদের আরো খানিকটা প্রচেষ্টা হলে সামনের দিনের ছেলে-মেয়েদের জন্য আরো সহজ হবে।

র‌্যাচেল : স্টেজ শো নিয়ে বলছিলাম যে, আমাদের তুলনামূলক সুযোগ কম। টিভিতে তো সুযোগ আরো কম, নেই বললেই চলে।

অর্থী : আমি নাচ শিখে আসার পর প্রতি ঈদেই আমার সঙ্গে বিভিন্ন চ্যানেল থেকে যোগাযোগ করত নাচ করার জন্য। কিন্তু তারা কেউই ক্ল্যাসিক্যাল বা এমন কিছু চাইত না। তাদের নির্ধারণ করা কোনো সিনেমার গান বা অন্য কোনো গানের সঙ্গে আধুনিক নাচ করতে হবে আমাকে। আমি তো এসব করব না, একটা সময় পর আমার সঙ্গে তারা আর যোগাযোগ করেনি। তারা বুঝে গেছে আমাকে এমন প্রস্তাবনা দিয়ে কাজ হবে না।

রাফি হোসেন : এগুলো সত্যি। কিন্তু এটাও সত্যি, বেঙ্গল অনেক বড় করে তাদের আয়োজন করে লোকের কাছে ক্ল্যাসিক্যালের একটা জায়গা তৈরি করতে পেরেছে। এখন বিভিন্ন চ্যানেলই তাদের বলে, এমন শো তাদের দিতে। তেমনই তোমরাও যদি ছোট ছোট করে ভালো আয়োজন করতে থাকো, তাহলে এক সময় এগুলোও সবার আগ্রহের জায়গায় পরিণত হবে।

র‌্যাচেল : বেঙ্গলে আয়োজনে প্রথমবার কিন্তু কোনো বাংলাদেশি ছিল না।

রাফি হোসেন : মানো আর না মানো, আমাদের দেশে এটা আছে যে, দেশের মানুষ যত ভালো পরিবেশনাই করুক তা দেখতে আমরা আগ্রহী হই না। এটা শুধু নাচের ক্ষেত্রে নয়, সব ক্ষেত্রেই। দেশের বাইরে থেকে একজন গানের শিল্পী এলে হাজার হাজার টাকা টিকিট কেটে সবাই তার গান শুনতে যায়। অথচ আমাদের দেশের শিল্পীদের শোতে কি তাই হয়? হয় না। তার মানে কি আমাদের দেশের ভালো গানের শিল্পী নেই? অবশ্যই আছে। বেঙ্গল শুরুটা করে সবার কাছে একটা জায়গা তৈরি করে নিয়েছে, এরপর তো দেশের শিল্পীদেরও সেখানে সুযোগ দিচ্ছে। তোমরা নিজেরাও যদি ছোট ছোট আয়োজন করতে থাকো, তাহলে এক সময় পর দেখবে টিভি চ্যানেলগুলোও তোমাদের কাছে চলে আসবে। তোমাদের শোগুলো দেখানোর জন্য।

নাম : সুদেষ্ণা স্বয়ম্প্রভা নাচের ধরন : মণিপুরি, ভারতনাট্যম নাচ শেখা : ছোটবেলা থেকেই মায়ের কাছে একক পরিবেশনা : বেঙ্গল ক্ল্যাসিক্যাল উৎসব-২০১৭; তনুশ্রী নৃত্য উৎসব, কলকাতা নিয়মিত পেশা : নাচ, অভিনয়

সুদেষ্ণা : আমরা করছি এখনো। তার সংখ্যা অনেক কম, কিন্তু হচ্ছে।

রাফি হোসেন : তোমরা একসঙ্গে হয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন দিন দায়িত্ব নিয়ে কিন্তু আয়োজনগুলো করতে পারো। এতে খরচের চাপ কমবে, আয়োজনগুলোও হবে।

র‌্যাচেল : ভারতে এসব নিয়ে প্রচুর প্রতিযোগিতা হয়।

সুদেষ্ণা : ওখানে সারা বছরজুড়ে বিভিন্ন জায়গাতে উৎসবের আয়োজন করছে।

রাফি হোসেন : ভারত আয়তনে বড় এবং তাদের সংস্কৃতিচর্চার পরিমাণ বেশি। আমাদের দেশে শুরুর দিকে তো বেশিরভাগ মানুষ মনে করত আর্ট কালচার হচ্ছে হিন্দু ছেলে-মেয়েরা করে। কিন্তু এখন তো আর সেই অবস্থা নেই।

সুদেষ্ণা : বেঙ্গলে আয়োজন, পরম্পরার আয়োজনের মতো অন্যরাও যদি বছরে দু-তিনটা উৎসব করে, তাহলে সেখানে ক্ল্যাসিক্যাল নাচ ও গান দুটোই সুযোগ পায়।

রাফি হোসেন : এখন ছেলে-মেয়েরা শেখার সুযোগ পাচ্ছে কতটা?

অর্থী : আমি বড় হতে হতে ওয়ারদা রিজহাম আপু, প্রেমা আপুকে দেখেছি নাচ শিখতে বাইরে যাচ্ছে। সেটা দেখে আমি নিজেও অনুপ্রাণিত হয়েছি। শিখে এসেছি ভারত থেকে। এখন অনেকেই যাচ্ছে।

রাফি হোসেন : সবাই যে ভারতে যেতে পারবে বা তাদের যেতে হবে এমন তো না। দেশেও তো শিখতে পারে।

স্নাতা : আমি দেশেই শিখেছি।

রাফি হোসেন : অনেকেই আছেন নাচ শিখে তা আর নিয়মিত করছেন না। কিন্তু অন্যকে শেখাচ্ছেন।

অর্থী : ওনাদের হয়তো মনে হচ্ছে আমি নিজে না করে অন্যদের মাঝে তা ছড়িয়ে দেই।

রাফি হোসেন : আগে যারা শিখেছেন তাদের মাঝেও আমি এই ব্যাপারটা দেখেছি। তারা পারফর্মের থেকে বেশি গুরুত্ব দিতেন নতুনদের শেখাতে।

স্নাতা : আমার গুরু আমাদের একটা কথা বলেন, আমি যেহেতু প্রয়োজনীয় পরিমাণে চর্চা করি না, তাই আমি পরিবেশন করতেও যাব না। তোমরা কর। অনেক সময় আমরা তাকে জোর করি, স্যার চলেন এই শোতে আমাদের সঙ্গে একটু নাচেন। কিন্তু তিনি মোটেই রাজি হন না। তিনি বলেন, আমি যদি আবার প্রতিদিন ৪ ঘণ্টা করে চর্চা করতে পারি, তাহলেই আবার স্টেজে উঠব।

রাফি হোসেন : নাচ নিয়ে কার কী স্বপ্ন?

স্নাতা : আমি অনেক বছর ধরেই নাচ করছি। ইদানীং নাট্যপাড়ায় কোরিওগ্রাফার হিসেবে আবার কাজ করা হচ্ছে। তাদের নাটকের গল্প, মুড, পরিচালক কী বলতে চাচ্ছে সবকিছু বুঝে একটা কাজ করতে হয়। এটা আমার কাছে খুবই ভালো লাগে। আমার ছেলেটা ছোট। ওকে রেখে কোথাও যেতে পারি না। ও একটু বড় হলে আমি ভারতে গিয়ে ক্ল্যাসিক্যাল নাচটা আরো শিখতে চাই। আমি নাচ শেখাই, কিন্তু আমার ইচ্ছা অনেকদিন পর্যন্ত মঞ্চে নাচ করার।

র‌্যাচেল : আমার ধ্যান-জ্ঞান একটাই, গৌড়ীয় নৃত্যকে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করা। এটা অনেক দিনের একটা কাজ। এটা বলা হয় বাংলার ক্ল্যাসিক্যাল নাচ। আমাদের দেশের মানুষ যেন বাংলার নাচ হিসেবে এটাকে গর্বভরে পরিচয় দিতে পারে।

সুদেষ্ণা : আমি মণিপুরি নাচকেই ফোকাস করছি। এটা নিয়েই আরো এগোতে চাই।

রাফি হোসেন : তুমি তো অনেকগুলো ফরমের নাচ শিখেছ। এতগুলো ফরম শেখার আগ্রহ হল কেন?

সুদেষ্ণা : আমি তো ছোটবেলা থেকেই মায়ের কাছেই সব শিখেছি। মা রবীন্দ্রনাথের গানের ওপর নাচ নিয়ে কাজ করেন। এটা করতে গেলে বিভিন্ন ধরনের নাচের মুদ্রা মিলিয়ে করতে হয়। মায়ের মনে হয়েছে আমি যদি এই মুদ্রাগুলো সঠিকভাবে না জানি, তাহলে আমার নাচটা ঠিক হবে না। তাই আমাদের স্কুলে ফর্মের বেসিকটাই পড়ানো হয়। আমরা চেষ্টা করি সবটাই ঠিকভাবে শিখিয়ে দিতে। এই ব্যাপারটা করতে গিয়েই আমারও অনেকগুলো ফর্ম শেখা হয়েছে।

নাম : অর্থী আহমেদ নাচের ধরন : ভারতনাট্যম নাচ শেখা : ১৯৯৭ সাল (৩ বছর বয়স থেকে) একক পরিবেশনা : ভারতে বেশ কয়েকটি উৎসবে একক পরিবেশনা করেছেন, চেন্নাইয়ের লাইভ অর্কেস্ট্রার সঙ্গে আইইউবি অডিটোরিয়ামে নিয়মিত পেশা : নাচের শিক্ষক; অ্যাডমিন অফিসার, সাধনা এবং একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

রাফি হোসেন : এর মধ্যে তুমি কোনটা ধরে রাখতে চাও?

সুদেষ্ণা : আমি মণিপুরিতে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছি। এটাই আমি নিয়মিত পরিবেশন করছি। আমার কনটেম্পোরারি নাচের প্রতি একটা দুর্বলতা আছে। আসলে আমি যা-ই শিখেছি, তার কারণে কোনো ফর্মের স্টাইলে সমস্যা হচ্ছে না। সবটাতেই আমি আমার সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে শিখে যাচ্ছি। ভবিষ্যতে যদি একটিকে বেছে নিতে হয়, কোনটাকে বেছে নেব, তা এখনই ঠিক বলতে পারছি না। তবে আপাতত আমি মণিপুরি নিয়েই আছি।

র‌্যাচেল : আমি রবীন্দ্র ভারতীতে গৌড়ীয় করেছি একদম প্রথম দিন থেকেই। ভারতনাট্যমের ক্লাস শুরুর আগে থেকেই। কিন্তু আমার গ্র্যাজুয়েশন হয়েছে ভারতনাট্যমের ওপরই। দুটো একসঙ্গে করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে একটু সমস্যা হয়েছে। প্রতিটা নাচের আসলে একধরনের গন্ধ আছে। একসঙ্গে একাধিক করতে গেলে যেটা পুরোপুরি অনুভব করা যায় না।

সুদেষ্ণা : আমি মনে হয় একটার সঙ্গে আরেকটা মিশিয়ে ফেলি না। হয়তো ছোটবেলা থেকেই করছি বলে, নিজের অজান্তেই সবটা আলাদা থাকে।

অর্থী : এটার একটা কারণ হতে পারে, তাথৈ আপু অনেক গোছানো। তিনি জানেন কোনটা কোথায় রাখতে হবে।

রাফি হোসেন : গুরুরাও তো চান না অনেকগুলো নিয়ে কেউ কাজ করুক। যেটা শিখেছে শুধু সেটাই চর্চা করুক, এটাই তাদের চাওয়া থাকে। এটা শুধু নাচের ক্ষেত্রে না, গানের ক্ষেত্রেও।

অর্থী : নাচ শুধু স্টেজেই করতে হবে তা আমার কাছে মনে হয় না। শেখানোটাও বেশ জরুরি। সেটাও একজন শিল্পীর কাজ। আমার ইচ্ছাটা শেখানোর দিকে। আরো কিছুদিন পরিবেশনা করব, আরো শিখব। তারপর আমি রিসার্চ এবং শেখানোর দিকে চলে যাব। আমি নিজে স্টেজে নাচ করার থেকে আমার শেখানো একটা নাচ স্টেজে পরিবেশন হচ্ছে দেখতে বেশি ভালো লাগে। আমি নতুন একটা কাজ শুরু করেছি, ‘ড্যান্স ইওর এজ’। অনেক সময় দেখা যায় ছোট বাচ্চারা বড়দের মতো পোশাক পরে, বড়দের গানের সঙ্গে নাচ করছে। কিন্তু সেই গানটা মোটেই শিশুদের জন্য না। এর মধ্যে তো কিছু গান আছে যা শুধুই বড়দের। আমরা যদি বড়দের কথা ছোটদের সামনে না বলি, বড়দের টিভি অনুষ্ঠান তাদের সামনে না দেখি, তাহলে নাচের ব্যাপারে কেন করব। এই সচেতনতা তৈরি করতে চাচ্ছি। এই সচেতনতা অভিভাবকদের মধ্যে আসতে হবে, যারা নাচের অনুষ্ঠান করেন, তাদের মধ্যে আসতে হবে আর সবচেয়ে আগে আসতে হবে শিক্ষকদের মধ্যে। ভালো সাড়াও পাচ্ছি সবার কাছ থেকে।

র‌্যাচেল : টিভি অনুষ্ঠানের সঙ্গে বাস্তবের নাচের বেশ পার্থক্য। প্রতিযোগিতাগুলোতে যে নাচ হচ্ছে তা নিয়ে এমন হচ্ছে। এখানে যারা নাচ শিখছে তারা একেবারে বাইবেলের মতো করে তা শিখছে। তাদের মনে হচ্ছে জীবনের একটাই লক্ষ্য তা হলো, এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়া। একটা প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হওয়া একটা বাচ্চা দেখলাম কান্না করতে করতে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে।

রাফি হোসেন : এটা আসলে ওর দোষ না। ওকে এভাবেই বার বার বলা হয়েছে বা বোঝানো হয়েছে, এর জন্যই এমনটা হয়েছে।

অর্থী : আমার ইচ্ছার মধ্যে আরেকটা ব্যাপার আছে তা হলো নাচের ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করতে চাই। বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা বা এমন কাজগুলোর জন্য। যার জন্য নাচ জানাটাও বেশ জরুরি।

রাফি হোসেন : শেষ প্রশ্ন তোমাদের কাছে। তোমাদের দৃষ্টিতে নতুনদের মধ্যে এখন ভালো নাচ করছে কারা?

অর্থী : প্রন্তি দে’র নাচ খুব ভালো লাগে। ও ভারতনাট্যম করে। আমার সিনিয়র মৌলি আপু এখন বেঙ্গালুরুতে শিখছেন, ওনার নাচের আমি ভক্ত। অনিমা রয় নামে আমার একজন শিক্ষার্থী আছে। ওকে নিয়ে আমার অনেক আশা আছে। ওর নাচ বেশ ভালো লাগে আমার। ও যদি ধরে রাখতে পারে তাহলে ভালো করবে।

সুদেষ্ণা : উপমা ভারতনাট্যম করছে। জয়া, ইমরান কত্থক করছে। আফিয়া ওড়িশি নাচ বেশ ভালো করছে। এখনো সামনে আসেনি, কিন্তু ওর নাচ বেশ ভালো। মৌলির নাচ তো খুবই ভালো। সে ভীষণ পরিশ্রমী একজন নৃত্যশিল্পী। আমাদের প্রচুর সম্ভাবনাময় ছেলে-মেয়ে আছে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তারা ক্ল্যাসিক্যাল একটু শিখে আর তাতে মন দিল না। এভাবে ঝরে যায়।

র‌্যাচেল : ওদের নামগুলোর সঙ্গে আমি যোগ করব প্রিয়াংকার কথা। রাজশাহীর এই মেয়েটি ভারতনাট্যম করছে।

রাফি হোসেন : সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।

 

ছবি: শাহরিয়ার কবির হিমেল ; মেকআপ  ও স্টাইলিং : ফারজানা মুন্নি, কিউবেলা

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup