গরুর কোন অংশ দিয়ে কোন পদ ভালো হয় এবং সংরক্ষণ : নাজমা হুদা, রন্ধনবিদ

কোরবানির ঈদ মানেই মাংস কাটা, বিলি করা আর খাওয়া। এ সময় গরুর মাথা থেকে পা পর্যন্ত সব অংশের মাংস ঘরে আসে, তবে কোন অংশের মাংস কী নাম, কোন রান্না ভালো হয় তা একটু জেনে নিই।সাধারণত প্রথমে গরুকে সাতটি ভাগে ভাগ করে কাটা হয়। যেমন- রাউন্ড কাট, লোয়িন, রিব, চাক, প্লেট, ব্রিসকেট ও ফোরস্যাঙ্ক। এসব অংশ দিয়ে মাংসের অনেক আইটেম রান্না করা যায়, একনজরে দেখে নিই।

রানের মাংস

রানের মাংস দিয়ে কিমা সবচেয়ে ভালো হয়। কিমা জাতীয় যত রান্না তার সবই রানের মাংস দিয়ে ভালো হয় এবং রানের মাংস দিয়ে সব ধরনের রান্না, যেমন টিকিয়া, কাবাব, গ্রিল ইত্যাদি।

সিনার মাংস

সবার খুবই প্রিয় এই অংশের মাংস রেজালা, কোরমা, বিরিয়ানি, কালিয়া চাপ খুব ভালো হয়। যেহেতু এতে চর্বি ও কুচকুচে হাড় থাকে, তাই সবার খুব পছন্দ। তবে রান্নার মাংসের সঙ্গে যদি সিনার ও রানের মাংস মিলিয়ে রান্না করা হয়, সেটা আরো লোভনীয় হয়।

টেন্ডার লোয়িন

গরুর পিঠের দুদিকের অংশ সবচেয়ে সুস্বাদু। এ অংশ দিয়ে অনেক ধরনের রান্না করা যায়। যেহেতু ম্যারিনেট করা খাবার খুব তাড়াতাড়ি সেদ্ধ হয়। যেমন- স্টেক, কোল্ড বিফ, রোস্ট, গ্রিল, সতে, সিজলিং ইত্যাদি।

কলিজা

এতে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেশি থাকে। তাই যদি ভিনেগার ভিজিয়ে তারপর একটু হলুদ-লবণ দিয়ে পানি বলক তুলি, তার মধ্যে কলিজা একটু জাফরান দিয়ে পানি ঝরিয়ে নিই, তাহলে স্বাস্থ্য ভালো হবে। এভাবে বহুদিন ফ্রিজে রাখা যাবে। মজার মজার কিছু রান্না, মেথি, সাতকরা দিয়ে কলিজা ভুনা, থাইস্টাইলে দই বা সসে কলিজা, গ্রিল বা মাংসের সঙ্গে মিলিয়ে রান্না করতে পারেন।

মগজ

হাই কোলেস্টেরল যুক্ত খাবার। মগজ ফ্রিজে না রেখে ঈদের দিন খেয়ে ফেললে ভালো। মগজ ভালো করে ধুয়ে ওপরের যে পর্দা থাকে তা অবশ্যই তুলে ফেলতে হবে। ভেতরে রক্তের যে শিরা থাকে, তাও খুব ভালো করে পরিষ্কার করে নিতে হবে। মগজ ভুনা, ফ্রাই, কাবাব বা কোনো সবজির সঙ্গে মিলিয়ে ও টকদই বা ভিনেগার দিয়ে রান্না করা যায়। তবে বাসায় বয়স্ক অসুস্থ লোক থাকলে সেদিকে লক্ষ্য রেখে রান্না করা উচিত।

হাঁটু ও পায়ের অংশ

আলাদাভাবে রান্না করা হয় স্লো কুকিং পদ্ধতিতে। পায়ের অংশ দিয়ে স্যুপ, নেহারি এবং কিছু থাই রান্না সকালের নাশতায় খুব প্রিয় একটি খাবার। পায়ের সঙ্গে নান, রুমালি রুটি, পরোটা, চালের আটার রুটি, লুচি এমনকি গমের আটার রুটিও খুব মজা করে খাওয়া হয়।

জিহ্বা

এটা পরিষ্কার করা একটু ঝামেলা। তবে গরম পানিতে সেদ্ধ করে ওপরের চামড়া খুব সহজে তোলা যায়। এরপর ছোট ছোট টুকরো করে ভুনা, কাবাব করা হয়। তবে ক্লোড সালাদ, স্যান্ডউইচ খুব প্রসিদ্ধ একটি খাবার। ইউটিউবের মাধ্যমে আপনা থেকেই প্রচুর রেসিপি পাবেন।

লেজ

বিদেশে Ox-tail খুব পছন্দের একটি খাবার। ষাঁড়ের লেজ খুব মোটা হয়, তাই এই লেজের রান্নাগুলো খুব সুন্দর হয়।

স্লো কুকিং পদ্ধতিতে বেশকিছু আইটেম করা যায়। তবে ভুনা ও কাবাব করে মানুষকে তাক লাগানো যায়।

তবে কোরবানির সময়ে বিভিন্ন বাজার থেকে বিভিন্ন অংশের মাংস আসে। তাই এটা দিয়ে চিটাগাংয়ের প্রসিদ্ধ রান্না মেজবানি ও ঝুরা মাংস করে ফ্রিজে রেখে অনেক দিন খাওয়া যায়।

আপনি যদি বিভিন্ন অংশের মাংস আলাদা করে প্যাকেটের গায়ে লিখে রাখেন, তাহলে একেকদিন একেক রকম রান্না করে টেবিলের আকর্ষণ বাড়াতে পারেন এবং সেরা রাঁধুনি খেতাবও পেয়ে যাবেন। এসব আইটেম শুধু গরু দিয়ে যে হবে তা কিন্তু নয়, খাসি, ভেড়া, মহিষ সব ধরনের মাংস দিয়ে করা যাবে।

এবার ছোট্ট করে সংরক্ষণ নিয়ে একটু বলি- যাদের ফ্রিজ নেই তারা মাংস ধুয়ে একটু হলুদ মাখিয়ে তারে গেঁথে রোদে শুকিয়ে অনেক দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে পারেন। আবার মাংস একটু বেশি তেল-চর্বির মধ্যে সব মসলা মাখিয়ে জ্বাল দিয়ে কিছুদিন রাখতে পারেন। তবে দুই বেলা করে জ্বাল দিতে হবে।

আজকাল কম-বেশি সবার ঘরেই ফ্রিজ আছে। তাই ফ্রিজে রাখার পদ্ধতি জেনে নিন। ফ্রিজ কোরবানির আগে খুব ভালো করে পরিষ্কার করে নিতে হবে, যাতে কোনো গন্ধ না থাকে।

এবার গরু জবাই দেয়ার পর মাংস সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজে না রেখে ২-৩ ঘণ্টা পর যখন একটু শুকিয়ে আসবে, তখন প্যাকেট করে ফ্রিজে রাখতে হয়। তবে এক প্যাকেটে ৫ কেজির বেশি মাংস রাখা উচিত নয়। একটা প্যাকেটের ওপর আরেকটি প্যাকেটের মাঝে একটি কাঠের টুকরো দিয়ে রাখলে ওঠাতে সুবিধা হয়। কলিজা সংরক্ষণের আগে অবশ্যই ভিনেগারে ভিজিয়ে হলুদ, লবণ, পানিতে বলক তুলে পানি ঝরিয়ে শুকনো করে প্যাকেট করে রাখলে অনেকদিন ভালো থাকে।

যারা একটু বেশি রেড মিট পছন্দ করেন, তারা যদি গ্রিল করে বা বারবিকিউ অথবা কয়লা পুড়িয়ে খেতে পারেন, তাতে চর্বি পুড়ে গলে যায়। এতে একটু রিস্ক কম থাকে।

ফ্রিজে যদি মাংস আলাদা করে প্যাকেটের গায়ে লিখে রাখা যায়, তবে প্যাকেট নাড়াচাড়া করে রাখলে প্যাকেট তুলতে অসুবিধা হয় না।

মাংস ফ্রিজে রাখার পর ১৮ থেকে ২২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে সংরক্ষণ করতে হয়। তাহলে এক বছর ভালো থাকবে।

আপনি যদি কসাইয়ের সঙ্গে থেকে কীভাবে কোন অংশ কাটবেন তা বলে দেন, তবে আপনার জন্য ভালো হবে। কারণ আমাদের দেশের কসাই এত অভিজ্ঞ নয়। সবচেয়ে কাজের কথা, সব শেষে রান্নাঘর পরিষ্কার করে ধুয়ে এবং ডেটল, স্যাভলন দিয়ে পরিষ্কার করতে অবশ্যই ভুলবেন না।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup