‘কবিতায় যে নারীরা এসেছে বেশিরভাগই সত্যি’

যারা কবিতা পছন্দ করেন তাদের কাছে টোকন ঠাকুর একটি পরিচিত নাম। শব্দ, বাক্য, উপমায় কবিতায় ঘোর তৈরি করেন। কবিতার জন্য অনেক পাগলামি, অনেক একলা থাকা। শাহবাগকে কবিতার রাজধানী বলে ওঠেন। তার কবিতা, ভ্রমণ, কবিতা যাপন, কবিতার মধ্যে থাকা নারীদের কথা অকপটে বলেছেন। কবিতা লেখার পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন টোকন ঠাকুর।ব্ল্যাক আউটতার প্রথম চলচ্চিত্র। মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছেকাঁটা কবিতা চলচ্চিত্রের টোকন ঠাকুরের না বলা অনেক কথা, শুনেছেন জাহিদ আকবর...

আনন্দধারা : কবি ঠোকন ঠাকুরের কবিতার ভ্রমণ সম্পর্কে জানতে চাই ?

 টোকন ঠাকুর : আমার জন্ম ঝিনাইদহের নবগঙ্গা নদীর ধারেই। বলতে পারেন নবগঙ্গা থেকে এখন বুড়িগঙ্গা শহরে বসবাস। জন্মস্থানে স্কুল-কলেজ শেষ করে খুলনায় চলে যাই। খুলনা আর্ট কলেজ থেকে ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটে পড়াশোনার জন্য ঢাকায় চলে আসি। ঝিনাইদহ থাকতেই কবিতা লেখার শুরু।

আনন্দধারা : কবিতাই কেন লিখতে হলো, কবিতার বাইরে অনেক কিছু তো করা যেত?

টোকন ঠাকুর : আশির দশকের শেষের দিকে। বাংলাদেশের যে চেহারা, গ্রামপ্রধান এলাকায় তখন বড় হচ্ছিলাম। তখন উঠতি বয়স নিজেকে প্রকাশ করার জন্য। প্রকাশ করা বোঝাতে আনন্দ-বেদনা, ব্যথা, স্বপ্ন, পৃথিবীর উদ্দেশে তাকানো, দেখা- এই সবকিছু প্রকাশ করার জন্য তখন কবিতা লেখাটা হয়ে গেল। ঝিনাইদহ বসে নিজেকে ব্যক্ত করার জন্য কবিতা লেখা ছাড়া আর কোনো কিছু আমার জন্য ছিল না। নিজেকে প্রকাশ করার জন্য বিকল্প আর কিছু পাইনি। সেই অর্থে আমার ব্যাপক বন্ধু-বান্ধব ছিল না। সেই কারণে কবিতার মধ্যে নিজেকে রাখতে পেরেছি। সেই থেকে শুরু। চর্চা করা। ঢাকার পত্রপত্রিকায় লেখা পাঠানো। সেখান থেকে একটা-দুইটা প্রকাশিত হতো। নিজের নাম ছাপার অক্ষরে দেখার আনন্দ। এক ধরনের মুগ্ধতা থাকে নিজের নাম দেখার মধ্যে।

আনন্দধারা : চর্চাটা কেমন ছিল নিজেকে প্রস্তুত করার?

টোকন ঠাকুর : স্কুল-কলেজের লাইব্রেরিতে প্রচুর পড়তাম। আমি একমাত্র লাইব্রেরিতে যেতাম। আমার জন্য স্কুল লাইব্রেরি খুলতে হতো। অন্যরা স্কুলের বই খুঁজত, আমি শুধু গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধের বইসহ বিচিত্র রকমের বই খুঁজতাম। ঝিনাইদহ বসেই বোদলেয়ারসহ অনেক কিছু জানা হয়ে গেছে। স্বাদ পেয়ে গেলাম সেখানে বসে। সেখানে বসে বোদলেয়ার কিংবা জীবনানন্দ দাশ অথবা আবুল হাসান নিয়ে কথা বলতে পারছি না। এসব নিয়ে আমার তখন অনেক উন্মাদনা।

আনন্দধারা : কবি আবুল হাসান নিয়ে আপনার দারুণ একটা ঘটনা আছে।

টোকন ঠাকুর : আহা! আহা! অনেক দারুণ স্মৃতি। আমি, মারজুক রাসেল, আলফ্রেড খোকন আর আমাদের আমেরিকার বন্ধু মৃগাঙ্ক মিলে পাগলামি। আমরা এই কয়েকজন মিলে আবুল হাসানের কবরের পাশে একরাত যাপন করেছি। সেখানে বসে আমরা কী করেছি সেটা অপ্রকাশিত থাকুক। আবুল হাসানের কবিতা একজন উঠতি বয়সের তরুণকে যেভাবে আলোড়িত করতে পারে। তার ভাবনা আমার ভাবনা যেন ভাগাভাগি হয়ে যাচ্ছে।

আনন্দধারা : কবিতায় প্রথম মুগ্ধতার কবির নাম কী?

টোকন ঠাকুর : কবিতায় আমার প্রথম মুগ্ধতার নাম কবি আবুল হাসান। তিনি ২৮ বছর বয়সে মারা গেছেন। ইংরেজি বিভাগে পড়তেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার কবিতা আমার লাইন বাই লাইন মুখস্থ ছিল। যে তুমি হরণ করো, রাজা যায় রাজা আসে, পৃথক পালঙ্ক। আবুল হাসান নিয়ে ঢাকায় একটা অনুষ্ঠান হবে। একদিনের নোটিসে ঢাকায় চলে এসেছি। তখন আমার ঢাকায় থাকার জায়গা ছিল না। বড়ভাইদের সঙ্গে কোনো হলে থাকতাম। ঝিনাইদহ থেকে বইমেলার সময় ঢাকায় আসতাম।

আনন্দধারা : একজন কবি কীভাবে হয়ে ওঠে। আপনি কীভাবে হয়ে উঠলেন?

টোকন ঠাকুর : এটা পড়ার জন্য। আমার কলেজে একজন শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক শহীদুর রহমান। উনি প্রথম জীবনে ঢাকায় থাকতেন। তার বন্ধু আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, রফিক আজাদ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ। শহীদ স্যার আমার তৈরি হওয়ার সময় ব্যাপক প্রশ্রয় দিতেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা প্রথম পড়ি ঝিনাইদহে শহীদ স্যারের বাসায়। বইয়ের মধ্যেই আমার বিশ্বময় ভ্রমণ হয়েছে। বই আমাকে তৈরি করেছে। বই আমাকে নিজের মধ্যে ডুব দিতে শিখিয়েছে। পারিপার্শ্বিক সমাজ এগুলো বুঝে উঠতে শিখিয়েছে। বইয়ের বিকল্প ছিল না। তখন অনলাইনের এত আধিপত্য ছিল না। কোনো কিছু পাওয়া যেত না। শুধুই বই। খুলনায় যখন চলে গেলাম, উমেশচন্দ্র লাইব্রেরি, খুলনা লাইব্রেরি- এগুলোার সঙ্গে নিত্য যোগাযোগ ছিল। বই আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। এখন তো আমার নিজেরই ১০-১৫টা বই আছে। তখন তো কিছুই জানতাম না। পরে কী হবে সেটা জানতাম না। শুধু জানতাম আমি এর মধ্যেই থেকে যাব।

আনন্দধারা : কবিতার মধ্যেই তো জীবন কাটিয়ে দিলেন?

টোকন ঠাকুর : কবিতার জন্য ২০০১ সালে প্রথম কলকাতা গেলাম। কবিতাই কিন্তু আমাকে নিয়ে গেল সেখানে। ঢাকাতেও আমাকে আসলে কবিতাই নিয়ে এসেছে। যতই আমি চারুকলায় পড়ি, কবিতার কারণেই ঢাকায় আসার ইচ্ছা ছিল। সেই কারণে বলতে পারি বাংলা কবিতার কারণে অনেক ঋণী আমি। এটাও বলা যায়, একটা জীবন বাংলা কবিতাকে দিয়ে দিলাম। অনেকে অনেক কিছু করে। সমাজ-সংসার করে। অর্থ জমায়। আমি শুধু কবিতাই জমালাম। কবিতার মধ্যেই আমার জীবন চলে যাচ্ছে। কবিতার মধ্যে ঢুকে গেলাম। কবিতা আমার জীবন খেয়ে নিল।

আনন্দধারা : কবিতার প্রতি প্রেমের কথা শুনলাম। ব্যক্তিজীবনের প্রেম নিয়ে কিছু জানতে চাই।

টোকন ঠাকুর : মানব-মানবীর প্রবৃত্তি থেকে প্রেম হয়। একটা বয়সে প্রেম এসে ধাক্কা দেয় মনে। ঝিনাইদহে ভালো লাগত একটা মেয়েকে। পরে আরেকজনের সঙ্গে মেয়েটার বিয়ে হয়ে যায়। অনেক পরে ফ্যানে ঝুলে সেই মেয়েটা মারা যায়। কবিতা কিংবা প্রেম অপ্রেম। প্রেম পাওয়ার ইচ্ছা, প্রেমহীনতা সবকিছু একাকার। কবি একটা গাছের মতো। গাছের পাতা নড়ে, পাখি আসে, ফুল ফোটে, পাখি উড়ে যায়।

আনন্দধারা : আপনার কবিতার শব্দে যে নারীদের কথা উঠে আসে তারা কতটা সত্য?

টোকন ঠাকুর : আমি এখন যে বাসায় বসবাস করছি, সেখানে এখন আছে দুটো টিয়া আর একটা ঘুঘু। তাদের প্রতি আমার প্রেম আছে। যেসব কবিতায় কোনো না কোনো নারীর নাম এসে গেছে, সেইসব বেশিরভাগই সত্য। কোথাও হয়তো মূল নামটা বলা হয়নি। কবিতায় আসলে সত্যের বাইরে যাওয়া যায় না। মাটি খুঁড়ে যেমন জল বের হয়, কবিতা তেমন ক্রমাগত নিজের ভেতর থেকে উপলব্ধিগত সত্য বের হয়। সেই সত্য হয়তো বৈজ্ঞানিক সত্য না। কিন্তু উপলব্ধিজাত সত্য।

আনন্দধারা : কবিতা কেন লিখছেন? কী সেই মায়া, ঘোর, মুগ্ধতা?

টোকন ঠাকুর : শব্দের ঘোর, বাক্যের ঘোর, টেনে নিয়ে যায় বাক্য। কবিতা কারো সংসারে উন্নতি করে না। খুব বেশি অর্থ জোগাই না। মানুষ যতদিন বেঁচে আছে তার অনুভূতি আছে। তার অনুভূতির মধ্যে আনন্দ, ব্যথা-বেদনা আছে। আমার অসংখ্য একা মুহূর্তের শিলালিপি কবিতা। আমার অসংখ্য নিঃসঙ্গ একা মুহূর্তের পাণ্ডুলিপি হলো কবিতা। আমার অনেক না পারা, পারতে চাওয়ার ইচ্ছার স্মারক হচ্ছে কবিতা। কোথাও পৌঁছাতে চাওয়া হলো কবিতা। কবিতা হলো গোপন কথার মতো। কাউকে সে বলবে না কিন্তু একজনকে সে খুঁজছে বলার জন্য। বেশিরভাগ লোককে সে বলছে না গোপন কথা। কোনো একজন লোককে সে বলবে তাকে খুঁজছে। কবিতার সাদা পৃষ্ঠাটা গোপন মানুষের মতো। একটা সাদা পৃষ্ঠার কাছে নিজেকে উপুড় করে ঢেলে রাখা যায়। তাতে একটা কবিতা হয়ে উঠতে পারে, হয়। মানুষের একটা জন্মগত ব্যাপার সে নিজেকে কোথাও রাখতে চাইছে। কোনো একটা ঘরে সে ঘুমায়। কোনো একটা রাস্তা দিয়ে হাঁটে, কোনো একটা মানুষের সঙ্গে কথা বলে। সবকিছুই ধারণ করে মানুষ। সব নিয়েই আসলে কবিতা। ঝপঝপ করে যেমন বৃষ্টি আসে। ঠেকানো যায় না। কবিতাটাও তেমন, যখন চলে আসে তখন আর ঠেকানো যায় না। শব্দ, বাক্য বৃষ্টির মতো, কখনো ঝড়ের মতো নেমে পড়ে সাদা পৃষ্ঠায়। সাদা পৃষ্ঠা তখন আর সাদা পৃষ্ঠা থাকে না, তখন একটা কবিতা হয়ে ওঠে।

আনন্দধারা : কিছু কবিতা পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের অনুরোধে-চাপে লিখতে হয়। কিছু কবিতা নিজের ইচ্ছায়। কী পার্থক্য থাকে এই দুই ধরনের কবিতার মধ্যে?

টোকন ঠাকুর : একটা সময় র্ছিল কবিতা পত্রিকায় পাঠাতাম। সাহিত্য সম্পাদকের পছন্দ হলে দুই-তিনমাস পর ছাপাতেন। আবার চার-পাঁচ মাস পর আরেকটা ছাপাতেন। এখন যেটা হয়ে গেল, গত ১০-১২ বছর ধরে আমার ৭০ ভাগ কবিতাই সাহিত্য সম্পাদকের অনুরোধে। শুধু অনুরোধ বলব না, প্রেসারে লেখা। শহরের প্রধান প্রধান কাগজ, পরেরদিন তাদের পেজ মেকআপ, আগেরদিন আমাকে কবিতা লিখতে হয়েছে। অনুরোধে যে দু-একটা কবিতা যে ভালো হয় না এমন নয়। হয় হয়তো।

একেবারে নিজের ভেতর থেকে চলে আসা কবিতা অন্যরকম জিনিস, সেটা ফলের মতো মনে হয়। টুপ করে একটা ফল পড়ল। ক্ষুধার্ত একটা মানুষ যাচ্ছিল ফলটা পেয়ে গেল। সেটার মধ্যে যে সৌন্দর্য, মুগ্ধতা, নিজের ভেতর থেকে যে কবিটাটা চলে আাসে সেটা সেইরকম। বরই গাছে ঝাঁকি দিয়ে বরই পড়ল, সেটা খেলাম, এটা অনুরোধে লেখা কবিতা। এখন বেশিরভাগ কবিতা বরই গাছে ঝাঁকি দিয়ে লেখার মতো। আমি বলব সাহিত্য সম্পাদকরা আমার কবিতার শত্রু। তারা আমার ভেতর থেকে ইচ্ছাতে আসা কবিতার জন্য অপেক্ষা করতে দেন না। কবিতা একটা ঘোরের ব্যাপার, স্বপ্নের ব্যাপার, একটা প্রেমিক ছেলের উসকোখুসকো চুলের ব্যাপার। একটা ছেলে রোদের মধ্যে হেঁটে যাচ্ছে, তার মনের কথা সমাজ জানে না। আমার এক বন্ধু বিভাস রায় চৌধুরী বলেন, কবি হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী সন্তান। কয়েকটা শব্দ, কয়েকটা বাক্য- এই নিয়ে তার আত্মপ্রকাশ। এটাই তার অস্ত্র, অবলম্বন, বেঁচে থাকা। একটা কবিতা লেখার পর তার মনে হয় ভার নেমে গেল। সে মুক্ত হলো। সেই মুক্তির আনন্দে কবিতা হয়। কোনো ছেলে-মেয়ে যখন প্রেমে পড়ে, তখন কাউকে বলতে চায় না। কিন্তু দু-একজনকে ডেকে বলে। কবির সঙ্গে কবিতার প্রেম-বিরহের একটা ব্যাপার আছে।

আনন্দধারা : কার কার কবিতা লেখা পড়ে আন্দোলিত হন।

টোকন ঠাকুর : উঠতি বয়সে আবুল হাসানের কবিতা খুব টানত। মনে হতো আমার বয়স ২৮ বছর হলে আবুল হাসানের মতো মারা যাব। এসব কথা জানিয়ে দু-একজন বন্ধুকে চিঠি লিখেছি। পরবর্তী সময়ে আল মাহমুদ, বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা, উৎপল কুমার বসু, রণজিৎ দাশের কবিতা আমাকে টানল, জীবনানন্দ দাশের কবিতার প্রতি আমার ভালোলাগার পর্যবেক্ষণ ছিলই। শামসুর রহমানের বাড়িতে আমার অনেক যাতায়াত ছিল। পত্রিকায় কাজ করতাম বলে লেখা আনতে, বিল দিতে যেতাম, আল মাহমুদের বাড়িতেও যেতাম। ঢাকা শহরের সব লেখকের বাড়িতেই আমার যাতায়াত ছিল। আহমদ ছফার সঙ্গে আমার ১৩ বছর গভীর সম্পর্ক। আহমদ ছফাকে আমার বটগাছ মনে হয়। মনে হয় মাঠের কিনারে একটা প্রাচীন বটগাছ দাঁড়িয়ে আছে। তাকে খুব অনুভব করি। অতটা অনুভব আর কাউকে করি না অথবা তাদের কাউকে বটগাছ মনেই হয়নি।

আনন্দধারা : কবিতার পাশাপাশি সিনেমার প্রতি একটা ঝোঁক রয়েছে?

টোকন ঠাকুর : আমরা শাহবাগে আড্ডা দিতাম। আমি, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নুরুল আলম আতিক। ওরা তখন প্রোডাকশন বানানোর পরিকল্পনা করছে। শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটে তখন প্রচুর আড্ডা দিতাম। শাহবাগ আমাদের কবিতার রাজধানী, শাহবাগ আমাদের তরুণ কবিতা, সেই শাহবাগে বসে আমি, সরয়ার, আতিক, কামরুজ্জামান কামু, মারজুক রাসেল সেখানে বসে বছরের পর বছর কবিতা, চিত্রকলা, শিল্পের নানান ফর্ম, উপাদান নিয়ে থেকেছি, নেশা করেছি, জীবনটাকে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করলাম। কাগজের উড়োজাহাজের মতো, যতটুকু যেতে পারে যাক। তৃতীয় বিশ্বের একটা দেশে কবিতা লিখে জীবনযাপন খুবই কঠিন। তবুও কবিতা ছেড়ে যেতে চাইনি। সিনেমার প্রতি একটা নেশা যখন চারুকলায় পড়ি তখন থেকেই গড়ে উঠেছে। সিনেমায় অনেক টাকা, অনেক মানুষজন, টেকনোলজি লাগে, অনেক বড় ম্যানেজমেন্টের প্রশ্ন। সিনেমা বলতে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সিনেমা, কিমকিদুমের সিনেমা, আব্বাস কিয়ারোস্তমির সিনেমা কবিতার থেকে খুব বেশি দূরে নয়। তাদের ছবি আমাকে খুব টানে। ঋতিক ঘটকের এক-একটা ছবি ৫০ বারও দেখেছি। আমার প্রথম ছবি ২০০৬ সালে ‘ব্ল্যাক আউট’ খুব মানুষের কাছে নিয়ে যেতে পারিনি। একজন তরুণ কবি ও একজন তরুণ চিত্রশিল্পীর বিভিন্ন অবদমন, স্ট্রাগল, তাদের ভেতরের সমস্যা, তাদের অনেক কথা নিয়ে ছবিটা করেছিলাম। ছবিটা এখন ইউটিউবে ছেড়ে দেব ভাবছি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একটা শর্টফিল্ম করেছিলাম ‘রাজপুত্তুর’ নামে।

আমার নতুন ছবিটার নাম ‘কাঁটা’। শহীদুল জহিরের গল্প। বাংলা ভাষার শক্তিশালী একজন গল্পকার। তার ৩০-৩৫টার মতো গল্প আছে। তার মধ্যে কাঁটা অনেক শক্তিশালী একটা গল্প। এটা দিয়ে সরকারি অনুদান পেয়ে গেলাম। ছবিটার জন্য অনেক ঘুরেছি। ছবিটার শ্যুটিং শেষ করেছি। কাঁটা একটা ঐতিহাসিক ভ্রমণ। এটার সম্পাদনা চলছে। আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে মুক্তি দিতে পারব।

আনন্দধারা : প্রকাশিত প্রথম কবিতার বই সম্পর্কে জানতে চাই?

টোকন ঠাকুর : আমার প্রথম কবিতার বই অন্য একটা প্রকাশনী থেকে প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে হয়নি। তখন একটা মেয়ের সঙ্গে আমার গভীর প্রণয় ছিল। সে আমাকে বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পে যোগ দিতে বলল। কিন্তু আমার ইচ্ছা ছিল না। সে মেয়েটা আমার লেখালেখির ঘনিষ্ঠজন, লেখালেখির অভিভাবক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে অভিযোগ করল। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, সেই মেয়েটি এবং কবি আসাদ চৌধুরী আমাকে একপ্রকার জোর করে তরুণ লেখক প্রকল্পে নিয়ে এলেন। এখানে ছয়মাস সেই কোর্সটা করলাম। এখান থেকে আমার প্রথম কবিতার বইটা প্রকাশিত হলো। বইটার নাম ছিল ‘অন্তরনগর ট্রেন ও অন্যান্য শব্দ’ নামে। সেই বইটা প্রকাশিত হওয়ার পর হুমায়ুন আজাদকে দিলাম। বইটা নিয়ে তিনি বললেন, একটাও বাক্য নেই শুধু শব্দ, শব্দকুঞ্জ। স্যারের কথা ঠিক ছিল। আমার কাছে তখন মনে হতো আহমেদ ছফা একট বটগাছ, হুমায়ুন আজাদ একটা বিশ্ববিদ্যালয়। পরে সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে আমার প্রেম জন্মে। তিনি আমার কবিতা অনেক পছন্দ করতেন। নানানজনকে আমার কবিতার কথা বলতেন। এছাড়া ফরহাদ মজহার, সেলিনা হোসেন, আসাদ চৌধুরী- এসব মানুষের কাছে আমার অনেক ঋণ রয়ে গেছে। আমার বন্ধুদের কাছেও আমার অনেক ঋণ। তাদের সঙ্গে দেখা হলে আমার কবিতা দিয়ে আমাকে সম্বোধন করত। সেই এক তুমুল সময়।

আনন্দধারা : এই যে একা আছেন। এই একা থাকা নিয়ে কোনো বাক্য বলবেন?

টোকন ঠাকুর : একটা একলা থাকা জীবন যেমন চেয়েছি আবার চাইওনি। চেয়েছি বলেই একলা থাকা জীবন পেয়েছি। একলা থাকার ফলে একাকিত্বের প্রতি একটা নেশা জন্মে গেল। আমি বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। একা থাকা মানে বাবা-মায়ের ওপর ব্যাপক চাপ। কিন্তু একাকিত্বের প্রতি একটা নেশা জন্মে যায়। আসলে কিছু বিষয় অমীমাংসিত। কিছু কথা কাউকে বলব বলব করে আর বলা হয় না। কিছু কথা বুকের মধ্যে থেকে যায়। এটা রেখেই সে মরে যায়। মানুষ কোথায় যেতে চায় সেটা সে জানে না। কিন্তু একটা সময় তাকে থেমে যেতে হয়। একটা সময় জীবন থেমে যায়। আমার তিন লাইনের একটা কবিতা আছে, কবিতার নাম- ‘আত্মজীবনী’-

‘খড়ি হতে চেয়েছিলাম

কিন্তু কী কুক্ষণে যে হয়ে পড়লাম খড়

আর তক্ষুনণ উঠলো ঝড়’

ঝড় উঠলে তো খড় আর থাকবে না, কোথায় উড়ে চলে যাবে। এভাবে একটা ভ্রমণ করছি। জীবন আসলে একটা ভ্রমণ। এটা সবার জন্যই। এই ভ্রমণের মধ্যে আছি।

আনন্দধারা : আগামীর কবিদের জন্য কিছু বলেন?

টোকন ঠাকুর : কবিদের জন্য বলার কিছু নেই। কবি স্বয়ং ঈশ্বরের মতো একটা রোল প্লে করে থাকে। যখন সে কষ্টটা পাবে কান্নাটা চাপতে পারবে না, কেঁদে দেবে, তখনই কাঁদবে। একজন তরুণ যখন কবিতা লিখবে তখন তার মধ্যে চাপ, প্রেসার, তার নিজের আনন্দ প্রকাশ, জ্বালা-যন্ত্রণা, মুক্তি বা তার ভ্রমণের গল্পটা লিখে ফেলবে। তবে এটার যেহেতু একটা ধারাবাহিকতা আছে। আমার আগে শত শত কবি কবিতা লিখে চলে গেছেন। আমি কোনো না কোনোভাবে তাদেরই বংশধর। আগামীতে যারা কবিতা লিখতে আসবে বা এখন যারা প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেও প্রথাগতভাবে সেই বংশধরেরই মানুষ। ভালো হয় যদি চর্যাপদ থেকে সবকিছুই তুলোধনা করে পড়তে পারে। বিশ্বের সব কবিতাই পড়তে পারে।

আনন্দধারা : কবি টোকন ঠাকুরের কবিতা পড়ে কোনো নারী প্রেমে পড়ছে কবির?

টোকন ঠাকুর : কবিতা পড়ে প্রেম করতে চাওয়া নারীর সংখ্যা একাধিক। আমাকে বিয়ে করতে চাওয়া নারীর সংখ্যা একাধিক। কবিতার মধ্যে একটা তুমি আছে। প্রত্যেক কবি যখন লেখে, তার ওপারে একজন তুমি থাকে। পাঠক পড়ে তার ভালো লাগলে সে ভাবে সে নিজে তুমিটা। এমন অসংখ্য ঘটনা আছে আমার কবিতা লেখার জীবনে। ঢাকার বাইরের অনেক মেয়ে আছে আমার কবিতা পড়ে বাসায় চলে এসেছে। যখন চিঠির যুগ ছিল, পাঠক সমাবেশে আমার নামে অনেক চিঠি এসে যোগ হতো। রোকেয়া হলের একটা মেয়ে আমার কবিতা কেটে কেটে তার দেয়ালজুড়ে সেঁটে রাখত। কবিতা পড়ে মা ও মেয়ে দু’জনই প্রেমে পড়ে গেছে আমার। এখনো অসংখ্য মেয়ে আমাকে নানান ধরনের উপহার পাঠান। কবিতা তাদের মধ্যে কী যে ম্যাজিক তৈরি করে জানি না।

আনন্দধারা : পাঠকদের জন্য কিছু বলেন?

টোকন ঠাকুর : পাঠকদের জন্য রইল আমার শ্রদ্ধা-ভক্তি। তাদের প্রণোদনা না পেলে লিখতে পারতাম না। দূরের পাঠক যে আমাকে দেখেনি, আমিও দেখিনি তাকে। তার আর আমার মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। সম্পর্কের মাঝে একটা সাঁকো আছে। সেই সাঁকোটাই হচ্ছে কবিতাটা। তার সঙ্গে আমার বন্ধন গড়ে দিল। গড়ে দিচ্ছে। আমার মরে যাওয়ার পর যে পাঠকের কাছে আমার কবিতা জ্বলে উঠবে, তার সঙ্গে আমার প্রেম শুরু হয়ে যাবে। কবির সঙ্গে নারীর প্রেম যতটা, তার চেয়ে বেশি প্রেম পাঠকের সঙ্গে। 

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup