জীবাণুমুক্ত থাকুন ঈদে

 

অসুস্থতা এমন একটি সমস্যা, যেটি কারোরই কাম্য নয়। সুস্থ থাকার প্রয়োজনীয়তা একমাত্র অসুস্থ হলেই বোঝা যায়। সামান্য সর্দি কিংবা হাড়-কাঁপানো জ্বর, যেকোনো ধরনের অসুখই আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও কর্মক্ষমতায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। সামনে আসছে পবিত্র ঈদুল আজহা। এই ঈদে দায়িত্ব অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি থাকে বলে আপনার শরীরের ওপর বাড়তি চাপের সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

এত কাজের ভিড়ে যেকোনো অসুখে ভোগা এড়াতে হলে কিছু বাড়তি সতর্কতা মেনে চলাই উচিত। তেমনি কয়েকটি ছোট ছোট উপকারী টিপস নিয়ে আনন্দধারার এই লেখাটি। এর মধ্যে অনেক নিয়মই আমরা জানি কিন্তু হয়তো নিয়মিত মানা হয় না। মনে রাখবেন ঈদ কেন্দ্রিক হলেও এসব টিপস বারো মাসই আপনাকে সুস্থ, সবল ও রোগবালাই থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করবে।

ঘন ঘন হাত ধোয়া

আমাদের মধ্যে অনেকেরই বারবার ক্রমাগত হাত ধোয়ার অভ্যাস থাকে। অনেকের ক্রমাগত হাত ধোয়াকে আমরা শুচিবাই বলে মজা করলেও হাত ধোয়া একটি উপকারী অভ্যাস, যা আপনাকে বিভিন্ন অদৃশ্য জীবাণু-ব্যাকটেরিয়া থেকে মুক্তি দেবে।

কখন আর কয়বার হাত ধোবেন তার কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই। তবে সাধারণত আমরা টয়লেট ব্যবহারের পর, খাবার বা রান্নার আগে ও পরে হাত ধুই। তবে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধোয়ার আগেই সাবান দিয়ে একবার হাত ধুয়ে নেয়া ভালো। কারণ রাতে আমরা সাধারণত হাত ধুই না। তাছাড়া আমাদের বিছানায় লেগে থাকা জীবাণু আমাদের হাতেও চলে যায়।

সকালে প্রথমেই হাত না ধুয়ে আপনার মুখ বা অন্য নরম স্থান স্পর্শ করলে সে জায়গায়ও জীবাণু সংক্রমিত হয়ে পড়ে। যাদের হাত ঘেমে যায় তাদের জন্য ২-৩ ঘণ্টা পরপর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া অত্যন্ত জরুরি।

যত্ন সহকারে পা ধোয়া

পা বোধকরি আমাদের শরীরের সবচেয়ে অবহেলিত অংশ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমরা আমাদের যাবতীয় কাজ এই পায়ের ওপর ভর দিয়েই করি। পা যেহেতু মেঝের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগে থাকে, তাই পায়ে জীবাণু আটকানোর আশঙ্কা থাকে প্রবল।

প্রতিদিন গোসলের সময় পায়ের প্রতি বাড়তি নজর দিতে হবে। স্পঞ্জ দিয়ে পায়ের নখের মধ্যভাগ, গোড়ালি, পায়ের তালু ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। পায়ের ওপরের অংশেও অনেক মৃত কোষ জন্মে, সেগুলো পরিষ্কার করতে হবে।

কখনো খালি পায়ে টয়লেট ব্যবহার করা উচিত নয়। কোরবানির ঈদে রাস্তায় অনেক ময়লা-আবর্জনা জমে, তাছাড়া আমাদের ঘরও বেশ অপরিষ্কার হয়ে পড়ে। সে সময় খেয়াল রাখবেন আপনার পা যেন ক্রমাগত ময়লা না হয়। ঘরের মেঝে যথাসম্ভব পরিষ্কার রাখুন।

নিয়মিত গোসল

অনেকে আছেন এই গরমেও রোজ গোসল করার সময় পান না বা হয়তো ইচ্ছে হয় না। এটি কখনোই করা উচিত নয়। একদিন গোসল না করে থাকা মানে শরীরে রোগ-ছড়ানো জীবাণুদের জায়গা করে দেয়া।

প্রতিদিন বাইরে বের হওয়ার আগে আর বাইরে থেকে এসেই গোসল করে নেয়ার চেষ্টা করবেন। তবে গরমে ৪-৫ বার গোসল না করাই ভালো। কারণ এতে সর্দি-জ্বর হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দিনে কমপক্ষে ১ বা বেশি হলে ২ বার গোসল করতে পারেন।

যদি কোনো কাজে শরীর ঘেমে যায়, তাহলে সে ঘাম শরীরে শুকাবেন না। গোসল না করলেও শরীরে পানির ছিটা দেবেন যাতে ঘাম চলে যায়; এরপর শুকনো তোয়ালে দিয়ে মুছে নেবেন।

দাঁত ভালো করে পরিষ্কার করা

দাঁত পায়ের মতোই একটি অবহেলিত অংশ। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ও সকালে উঠে ব্রাশ করার কথা বলেন সবাই। তবে একটি বিতর্ক আছে, খাবারের আগে দাঁত মাজা উচিত নাকি পরে? একপক্ষের যুক্তি হলো খাবারের আগে না মাজলে মুখে আগে থেকে জমে থাকা জীবাণু খাবারের সঙ্গে চলে যাবে। আরেকপক্ষ বলে খাবারের পরে আমাদের দাঁতে যে ময়লা থাকে, তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। উভয়পক্ষের যুক্তিই ঠিক। এর সহজ সমাধান হতে পারে নিয়মিত ফ্লস করা। অর্থাৎ দাঁতের ফাঁকগুলো সরু ফিতা দিয়ে পরিষ্কার করা। দাঁতের ফাঁকগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করলে দাঁতে ময়লা জমে যাওয়ার ভয় থাকে না আর আমাদের মুখের স্বাস্থ্যও ভালো থাকে।

শিশুদের জন্য বেশি সতর্ক থাকা

শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে বেশি নাজুক থাকে। আর সামান্য পান থেকে চুন খসলেই তাদের হয়ে যেতে পারে গুরুতর কোনো রোগ। এবার কোরবানির ঈদের দিনও আবহাওয়া রুক্ষ থাকতে পারে। তাই শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করাতে হবে। এছাড়াও আর যা করতে পারেন-

* বাচ্চার বয়স যদি ১-৫ মাসের মধ্যে হয়, তাহলে একটু পরপরই তার হাত স্যানিটারি টিস্যু দিয়ে মুছে দিতে বলেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া তাদের কাপড় প্রতিদিন অ্যান্টিসেপটিক দিয়ে ধুয়ে দিন।

* বাচ্চাদের খাবার সবসময় ঢেকে রাখুন আর চেষ্টা করুন বাসি খাবার না দিয়ে ফ্রেশ খাবার খাওয়াতে। তাদের খাওয়ানোর আগে, কোলে নেয়ার আগে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন।

* বাচ্চার চারপাশ সবসময় পরিষ্কার রাখুন আর বাচ্চার ঘরে যেন পর্যাপ্ত আলো-বাতাস থাকে তা নিশ্চিত করুন।

* বাচ্চার হাত-পায়ের নখ নিয়ম করে কেটে রাখুন।

* তাদের খাবার প্লেট, ফিডার ইত্যাদি ভালো করে ধুয়ে রাখুন।

* ১০ বা তার চেয়ে বেশি বয়সের বাচ্চাদের নিয়মিত গোসল করান।

* বাচ্চাদের কাপড় ঘামে ভেজা থাকে বেশি। তাই রোদে অবশ্যই শুকিয়ে পরে সাবান পানিতে ধুয়ে নিন।

বয়স্কদেরও প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা

শিশুদের মতোই বয়স্করাও জীবাণুতে বেশি আক্রান্ত হন। তাদের চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও খুব জরুরি।

* তাদের খাবারে প্রচুর পরিমাণে সবজি থাকা উচিত। মশলা, ঝালজাতীয় খাবার একেবারে পরিহার করাই তাদের জন্য উত্তম।

* প্রতিদিন তাদের কাপড় সাবান পানি দিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে।

* তাদের বিছানা প্রতিদিন ঝেড়ে সপ্তাহে অন্তত একবার চাদর বদলে ফেলতে হবে।

* ঘরে-বাইরে সর্বত্র জুতা পরে চলাচলের অভ্যাস করতে হবে।

* টয়লেট ব্যবহারের পরে, খাবারের আগে অবশ্যই হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে।

* নিয়মিত গোসল করানোর চেষ্টা করতে হবে। সম্ভব না হলে ‘স্পঞ্জ বাথ’ দেয়া যেতে পারে।

* তাদের ব্যবহৃত বাসন, পিরিচ, কাপ, গ্লাস ইত্যাদি সবকিছু আলাদা করে রাখতে হবে এবং নিয়মিত সাবান বা ছাই দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে।

ঈদের আগে ও পরে ঘর পরিষ্কার

ঈদের আগে ঘরের শোভা বাড়ানোর জন্য অনেকে নতুন উদ্যমে ঘর পরিষ্কার করা শুরু করেন। আর কোরবানির ঈদের পর ঘর পরিষ্কার একটি মহাযজ্ঞ হয়ে ওঠে। ঈদের আগে অবশ্যই আপনার বাসার ফ্রিজ পরিষ্কার করে নেবেন। সেই সঙ্গে ঘরের আনাচে-কানাচে যে ধুলা জমে তা-ও পরিষ্কার করে নেবেন। কারণ কোরবানির পর আপনার ঘর আরো অনেক অগোছালো হয়ে যেতে পারে।

ঈদের দিন কাজ শেষে সঙ্গে সঙ্গে গরম পানি আর সাবান দিয়ে মেঝে পরিষ্কার করে ফেলুন। ঈদের আগে ঘরের ছোটখাটো কোনো পরিবর্তন চাইলে করে ফেলুন। রান্নাঘর, কলতলা, গোসলখানা, টয়লেট ইত্যাদি জায়গাগুলো ফিনাইল দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিন।

ঈদের পর আবারো হয়তো এই কাজগুলো করতে হবে। কিন্তু একটু সাবধানতা অবলম্বন না করলে ঘরের ময়লা আপনার শরীরের ক্ষতি করে ফেলতে পারে।

খাবারে পরিমিতি

ঈদের প্রধান সমস্যা হলো অফুরন্ত খাবার। গরু, খাসি ইত্যাদি চর্বিযুক্ত খাবার আমাদের শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। ঈদের সময় আমরা বেশি বেশি মিষ্টিজাতীয় খাবার খাই, তেল-চর্বিজাতীয় খাবারও বাদ পড়ে না একদম। অনেকেরই অনিয়ন্ত্রিত খাবারের কারণে পেটে পিলে হয়, বমি, মাথাধরা, বদহজমসহ আরো অনেক ধরনের সমস্যা তৈরি হয়।

যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের সমস্যা আছে তারা যথাসম্ভব মিষ্টি ও তেলযুক্ত খাবার থেকে দূরে থাকতে চেষ্টা করবেন। এ সময় অনেকে দাওয়াত রক্ষার্থে অনেক কিছু খেয়ে ফেলেন। যেকোনো দাওয়াতে গেলে চেষ্টা করবেন সবজি জাতীয় খাবার বেশি করে খেতে। এর ফলে অন্যান্য খাবার খাওয়ার মতো ক্ষুধা অবশিষ্ট থাকবে না।

এগুলো কিছু সাধারণ ঘরোয়া টিপস, যা আপনাকে ঈদের আনন্দ আরো ভালোভাবে উপভোগ করতে সাহায্য করবে। মনে রাখবেন ভালো থাকা শুধুই নিজের কাছে। আমরা যদি আমাদের জীবনযাপন নিয়ন্ত্রণে আনি, তাহলেই একমাত্র সুস্থ থাকা সম্ভব।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।