সাক্ষাৎকার : সংস্কৃতি হচ্ছে আমাদের মৌলিক অধিকার -লিয়াকত আলী লাকী

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক অভিনেতা ও সংগীতজ্ঞ লিয়াকত আলী লাকী। ছোটবেলা থেকেই সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন সংস্কৃতিচর্চা ও রাজনীতির সঙ্গে। নাট্যকলায় অবদানের জন্য ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করেন। কর্মব্যস্ততার কারণে শৈশব থেকে নাট্যচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত গুণী এ মানুষটির উপস্থিতি টেলিভিশন কিংবা বড় পর্দায় লক্ষ্য করা না গেলেও মঞ্চে নিয়মিত অভিনয় করে চলেছেন তিনি। আমাদের সংস্কৃতি, সংস্কৃতির বর্তমান অবস্থা ও অন্যান্য বিষয়ে আনন্দধারা সম্পাদক রাফি হোসেনের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

রাফি হোসেন : আমাদের সংস্কৃতির বর্তমান অবস্থা কেমন বলে আপনি মনে করছেন?

লিয়াকত আলী লাকী : আসলে বিষয়টি এক কথায় বলা একেবারেই সম্ভব না। আমরা যদি আমাদের সংস্কৃতির পেছনের দিকে তাকাই তাহলে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার বছর কিন্তু স্পষ্ট দেখতে পাই। আমরা সেই সময়টাকে নিয়ে চলার চেষ্টা করেছি এবং করছি। শিল্পের বিভিন্ন বাহন আছে। একেকজন সেটাকে একেকভাবে দেখে। কিন্তু অনেকের ভেতরে সেই হাজার বছরের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য রয়েছে। আমাদের সেই ইতিহাসের ভেতর দিয়ে নানারকম ধর্মের মহামিলন ঘটেছে এবং সংঘর্ষও হয়েছে। একটা জায়গায় এসে আমরা স্থিত হয়েছি। সবার কাছ থেকে সবাই নিয়েছি এবং নিয়েই কিন্তু আমরা বাঙালি হয়েছি। এই যে আমরা বাঙালি এবং আমাদের এই ভাষা, কিছুদিন আগেও গুগলে সার্চ দিয়ে দেখা যায় বাংলা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর ভাষা। আমার কাছে মনে হয় আমরা জন্মগতভাবেই জাতি হিসেবে উদাসীন। এজন্যই আমাদের দেশে বাউল, সুফি, সহজিয়া, মরমিয়া সংস্কৃতির বিশাল প্রভাব তৈরি হয়েছে। এটি যখন আমরা বোধে নিয়ে কাজ করি তখন কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল কিংবা অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমরা একটু মিলিয়ে দেখতে পারি। সেখানে দেখা যায় আমাদের এই অঞ্চলটি অত্যন্ত আলোকিত এবং উজ্জ্বল। কিন্তু সেটি থেকে যখন আমরা বিস্মৃত কিংবা পথভ্রষ্ট হই, তখন অনেক সম্পদ থেকে আমরা দূরে সরে আসি। আমাদের সংস্কৃতির একটি হলো স্বাধীনতা এবং আরেকটি অন্যতম জায়গা হচ্ছে ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সব মানুষের অংশগ্রহণে ভাষা এবং সংস্কৃতিভিত্তিক একটি মহাবিপ্লব হয়ে গেল। আর সেই আন্দোলনের পর থেকে আমরা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে গেলাম। আমি কবির ভাষায় বলব, ‘অপমানে তুমি জ্বলে উঠেছিল সেদিন বর্ণমালা, সেই থেকে শুরু দিনবদলের পালা।’ ভাষা আন্দোলনের পর দিনবদল শুরু হলেও পাশাপাশি শুরু হতে থাকে নানা প্রতিকূলতা। সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে যখন আমরা সমস্ত জাতি একসঙ্গে হয়ে গেলাম সেটাকে ভাঙার চেষ্টা করা হলো। সেই ভাঙনের মধ্যে দিয়ে আমরা শোষিত, নির্যাতিত এবং বঞ্চিত হয়েছি। তারপর মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে আমরা একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করলাম। আমি যদি এটাকে আদর্শ হিসেবে ধরি, তাহলে অন্য জায়গাগুলো পরিষ্কার হবে। সেই আদর্শের আবার একটা বড় আঘাত এবং বিচ্যুতি হয়েছে আমাদের জীবনে। সেটি ১৯৭৫ সালে। তখন যে শুধু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা তার পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে তা কিন্তু নয়। আমাদের সংস্কৃতি হাজার বছর লড়াই করে যে জায়গাটিতে এসেছে ’৭৫-এ এসে সেই জায়গাটিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এমনি করে একের পর এক বিভিন্ন প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে আমাদের সংস্কৃতি চলতে শুরু করে। সংস্কৃতির স্বরূপ কী হবে সেটি আর আমার বলার প্রয়োজন হবে না। যে যখন এসেছে সে তখন তার মতো করেই সংস্কৃতিকে দাঁড় করিয়েছে। অনেকে আবার ধর্মের সঙ্গে সংস্কৃতির একটা সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার জায়গা তৈরি করেছে। তবে আমি এই বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। বঙ্গবন্ধু আমাদের যে আত্মপরিচয়টা বললেন সেটা যদি আমি ধরি তাহলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালি, আমি মুসলমান, আমি মানুষ।’

এটাকে যদি আমি ধরে নেই, তাহলে আমাদের ধর্ম আমাদের সংস্কৃতির মধ্যেই অন্তর্গ্রথিত হয়ে যায়। এটা হলো একটা দিক আর দ্বিতীয় দিকটা হলো সময় পাল্টায় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানারকমের প্রযুক্তির উদ্ভাবন হয়। আমরা নানারকম সময় এবং সময়ের প্রযুক্তির সঙ্গে মিলেমিশে বা যুদ্ধ করে কিংবা অনেক সময় সাংঘর্ষিক হয়েও সেটিকে নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। তবে আমার যেটা মনে হয়, আমরা যদি আমাদের সংস্কৃতির ভূমি কিংবা ভিত্তিতে না দাঁড়াই, তাহলে কিন্তু আমাদের স্বকীয়তাকে রক্ষা করতে পারব না। আমাদের ডিজিটাল প্রযুক্তি যেগুলো এসেছে আমার তো মনে হয় সেগুলোকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে এবং এই প্রযুক্তির যে নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে সেটা আমাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। সেটাও কিন্তু আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে। সে চ্যালেঞ্জ ঠিক কীভাবে মোকাবেলা করব সেই পথ কিন্তু আমাদেরই দেখাতে হবে। আমি মনে করি প্রযুক্তির মানবীকরণ করা খুবই জরুরি। প্রযুক্তি ব্যবহার হবে আমার মানবিক মূল্যবোধকে সহায়তা করার জন্য এবং এই মানবিক মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে কোনোভাবেই প্রযুক্তির ব্যবহার করা উচিত নয়।

রাফি হোসেন : খুব সুন্দর কথা বলেছেন কিন্তু আমি জানি না সম্প্রতি যা কিছু ঘটছে, যদিও এ রকম আগেও ঘটত কিন্তু রেডিও, টেলিভিশন কিংবা সংবাদ মাধ্যমে এভাবে প্রচারে আসত না। যদিও আমি সে বিতর্কে যাচ্ছি না। কিন্তু যে জিনিসগুলো ঘটছে, অবক্ষয় বলি আর নির্মম ঘটনা বলি ঘটনাগুলো কিন্তু ঘটছে। আপনার কী মনে হয়? আমার তো বরাবরই মনে হয় কোথায় গিয়ে যেন আমাদের সংস্কৃতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু এই রকম বীভৎসতা আমি কিন্তু আমার জীবনে দেখিনি। মাঝেমধ্যে নিজেকে এলিয়েন মনে হয়। মনে হয় আমি কি এদেশের নাগরিক! যদি এ বিষয়টা নিয়ে আপনি কিছু বলতেন?

লিয়াকত আলী লাকী : আপনার সঙ্গে আমিও একমত। গত কয়েকদিন ধরেই আমি খুব বিষণ্নতায় ভুগছি। যে চারদিকে এত এত কিছু ঘটছে আমরা শুধুই দেখছি, দেখছি আর দেখছি, কিন্তু কিছুই করতে পারছি না। যদি সাধারণ মানুষ হতাম, তাহলে হয়তো কোনো কিছুই কাজ করত না। কিন্তু একজন সাংস্কৃতিক মানুষ হিসেবে যেহেতু দেখতে হয়, শুনতে হয় কিন্তু কোনো কিছু করতে না পারাটা খুব কষ্ট দেয়। আমার কাছে যেটা মনে হয় সেটা হলো, যদি আমি পরিবার থেকে আসি, তাহলে বলতে হবে পরিবারের যখন বাবা হলাম, আমার ঘরে আমার পরিবারে নতুন প্রজন্ম এলো। তাকে আসলে কীভাবে কোন পরিবেশে আমি নিয়ে বেড়াব সেটি কিন্তু স্পষ্ট নয়। এবং ধরুন একটা শিশু, একটা কিশোর, একটা যুবক বা সাধারণ মানুষ যারাই থাকে, তাদের আসলে কে অভিভাবক হিসেবে নৈতিকতা বা মূল্যবোধ শেখাবে। আমরা শিখেছি বাবা-মায়ের কাছ থেকে, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে স্কুলের শিক্ষকের কাছ থেকে, সমাজের কাছে থেকে এবং রাজনীতির কাছ থেকে। সে সময় আমাদের কী ত্যাগ, আহা! রফিক, শফিক, সালাম,  বরকত- এরা ভাষার জন্য প্রাণ দিল। তখন মনে হয়েছে, কত বড় অবদান। এ রকম যদি অবদান আমরা রাখতে পারতাম। এখন হয় কি একটা মানুষকে নানান মানুষ এবং নানান জিনিস শাসন করে। সেটা যদি বলি তাহলে বর্তমানে আমার মোবাইল একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেটা দ্বারা আমি গাইডেড হচ্ছি। সেখান থেকে আমরা তথ্য নিচ্ছি, অনেক কিছু হয়তো পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু আসল জ্ঞান কিংবা এটার ভেতরে যে সবকিছু নিহিত তা কিন্তু নয়। অনেক অপ্রয়োজনীয় জিনিস রয়েছে, যা কোনো না কোনোভাবে আমাকে প্রভাবিত করছে। আবার দেখা যাচ্ছে একটা চলচ্চিত্র হচ্ছে, সেখানে একটা হিরো ও তার নীতি-নৈতিকতা তার আচার-আচরণ এবং একটা চলচ্চিত্রের যে শিরোনাম আমাদের খুব কষ্ট দেয়। হাজার মনীষীর দেশ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মাইকেলের দেশে একটা চলচ্চিত্রের নাম এমন হবে কেন? চলচ্চিত্রের শিরোনাম এবং তার বিষয়বস্তু কী হবে আমরা যদি তার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণটা না করি, যে একটা ছবি দেখার পর মানুষ কী নিয়ে বের হবে হল থেকে। প্রেমের স্বরূপটা আসলে কী? যদি রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলি, ‘যদি আরো  কারো ভালোবাসো, যদি আর ফিরে নাহি আসো তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও আমি যত দুঃখ পাই গো।’ এই মূল্যবোধ কি আসলে আমরা আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। আমি বহু কষ্ট নিয়ে মঞ্চে ‘আমরা তিনজন’ নামে একটি নাটক করেছি।

রাফি হোসেন : আসলে প্রশ্নটা আপনার কাছে করা এজন্য যে, আপনি যে অবস্থানে আছেন সে অবস্থানে আপনি অনেক ভালো কাজ করছেন। কিন্তু তারপরও সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখছি ঘটনাগুলো ঘটার জন্য পুরো দেশ এবং জাতি হিসেবে আমরা দায়ী। হঠাৎ করে কিন্তু এ ঘটনাগুলো হয়নি। আপনাদের কাছে আমাদের দাবি কিংবা চাওয়াটা একটু বেশি কিন্তু আমার মনে হয় আপনি যে দায়িত্বে বা অবস্থানে আছেন সেই জায়গাটা থেকে এই অবস্থাটা ঠিক করা বা ফেরানো সম্ভব? আপনার কি মনে হয় না যে কোন দিকটা দিয়ে বা কোন দিক দিয়ে শুরু করলে আমরা আসলে সঠিকভাবে কাজটা করতে পারব...

লিয়াকত আলী লাকী : সেটি আপনিও বলতে পারবেন এবং সেটি যার যার মতো করে কিন্তু সবাই বলতে পারবে। যদি আমার অবস্থান থেকে আমার কাছে জানতে চান, তাহলে আমি বলব আমার খুব আত্মবিশ্বাস এবং সে পথ আমার কাছে খুব পরিষ্কার। প্রথমত যে কারণে আমরা শুধু শিল্পের যেসব শক্তি আছে তাকে বিকশিত উৎকর্ষ সাধিত করছি। দ্বিতীয় যে বিষয়টি সেটি হলো সবার কাছে যদি শিল্প পৌঁছতে না পারি, সবার অন্তরে যদি আলো প্রজ্বলিত করতে না পারি, তাহলে শিল্পের ভূমিকা তো খণ্ডিত হয়ে যাবে। তারপর আসবে সে বিষয়টি যে, বাংলাদেশের সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বা সারা বিশ্বে আমরা পৌঁছাব। যে কারণে কিন্তু আমরা আমাদের শিল্পকলা একাডেমিকে জেলা থেকে উপজেলায় সম্প্রসারিত করেছি। অনেকে মনে করবে, সেখানে একটি রবীন্দ্র জয়ন্তী, নজরুল জয়ন্তী, নাচ, গান, আবৃত্তি হবে শুধু তা নয়। আমি কিন্তু শিল্প-সংস্কৃতিকে সেভাবে দেখি না। আমি মনে করি আমাকে সেই শিল্প-সংস্কৃতি নির্মাণ করতে হবে, যা শুধুই মানুষকে হাসাবে, কাদাবে না, তাকে ভাবাবে স্বপ্ন দেখাবে। যেমনটা আমরা দেখেছি, আমরা যখন লোকশিল্পীদের কাছে জারি, সারি, ভাটিয়ালি, যা কিছুই শুনেছি সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু আমাদের ভেতরে একটা স্বপ্ন তৈরি হয়েছে, চিত্তের ভেতরে একটা বিপ্লব ঘটেছে এবং উৎকর্ষও সাধিত হয়েছে। সেই প্রবাহে বলতে হয় ‘Empowerment of art and culture is very essential no other way’ আমি মনে করি না সংস্কৃতির বিকল্প কোনো পথ আছে। তবে অবশ্যই আমি মনে করি আমাদের এখানে নানা ধর্ম আছে ধর্মের অনুশাসন আছে, সেটি নিজেদের মতো করে একটি বড় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু যদি মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হয়, তাহলে অবশ্যই সংস্কৃতিচর্চার প্রয়োজন রয়েছে। একজন মানুষের অসাধারণ শক্তি। যদি আমি ধর্মের দিক দিয়ে চিন্তা করি, তাহলে আমাকে সৃষ্টি করেছেন কে? অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা। সৃষ্টিকর্তার হাতে যদি আমার সৃষ্টি হয়, তাহলে আমার শক্তিটা কতখানি। সৃষ্টিকর্তার হাতে তৈরি একজন মানুষের অসাধারণ গুণ এবং সে সৃজনশীল শক্তির অধিকারী। কিন্তু আমরা সেই সৃজনশীল প্রক্রিয়ার মাধ্যমটা এখনো পুরোপুরি ঠিক করতে পারিনি। আবার ধরুন একটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, একটি গ্রামে অন্যটি শহরে করছে। যদি গ্রামের ঘটনাটির কথাই ধরি, তাহলে আমি কি প্রশ্ন করতে পারি না, যেখানে গ্রামের মেম্বার, চেয়ারম্যান, সচেতন নাগরিক আছে তাদেরকে। কিংবা ধরুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তা, উপজেলা অফিসার বা এক কথায় যদি বলি জনপ্রতিনিধিরা যারা রয়েছেন তাদেরকে। রাষ্ট্রের প্রক্রিয়ায় অনেকেই ক্ষমতাবান হয়ে যাচ্ছেন। তাদের ভূমিকাটা কী, আসলে তা আমার জানা নেই। একটা নারী নির্যাতন হচ্ছে, তার খবর শুনে আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। সাধারণ মানুষ তাকিয়ে থাকছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা ক্ষমতাবানদের বক্তব্য শোনার জন্য। কিন্তু তা কেন আমি জানি না। আসলে কাঠামোটা এমন হবে যে আমাদের আর এ ধরনের ঘটনা দেখতে হবে না। এ ধরনের ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে বিচার হবে এবং দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা কোনোদিনও ঘটবে না আর কোনোদিন একটা শিশুও নির্যাতিত হবে না। সেই জায়গাটাতে আমরা যেতে চাই। আমাদের বাংলাদেশ কিন্তু এমন ছিল না। তবে কেন হচ্ছে সেটা কিন্তু আমরা বলতে পারি। যে কোনো একটা মানুষ যখন তার চতুর্দিকে নানা জিনিস দেখে, তখন তার ভেতরে একটা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। যেমন অনেক আগে আমরা ‘দ্য প্লে বয় অব দ্য ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি নাটকে দেখলাম, একটি ছেলে তার বাবাকে খুন করে ফেলেছে আর সে যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটছে সবাই তাকে বাহ্বা দিচ্ছে এবং তাকে হিরো হিসেবে আখ্যায়িত করছে। আমাদের দেশে যদি এ রকম মূল্যবোধের জায়গায় চলে আসে, তাহলে আমরা কী আশা করতে পারি। একটা অন্যায় যদি কেউ করে এবং সে যদি আমার সন্তান হয়, তার পাশে কেউ না থাকে তাকে কেউ সাপোর্ট না দেয়, তাহলে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না বলে আমি মনে করি। এমন অনেক ঘটনা আমরা দেখি যে, বাবা তার সন্তানকে ধরিয়ে দিচ্ছে। একটা কথা সত্য, সমাজ কিংবা প্রকৃতি নীরবে হলেও কিন্তু অপরাধীর বিচার করে। একটা বিষয় মেনে নেয়া খুব কষ্টের যে, অনেক সময় অপরাধ না করেও একটা সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়। কিন্তু সেটা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে আমি একান্তভাবেই বিশ্বাস করি যে, এ ধরনের যাবতীয় সমস্যার পাশাপাশি অন্যান্য সমস্যা সমাধানের জন্য সংস্কৃতিকে ক্ষমতা দেয়া দরকার, কারণ সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির বিবেক এবং দর্পণ। সংস্কৃতি হচ্ছে আমাদের মৌলিক অধিকার।

রাফি হোসেন : আপনি তো দীর্ঘ সময় ধরে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। আপনাকে যদি সরাসরি প্রশ্ন করি, আপনি আপনার দায়িত্বে থেকে সংস্কৃতির ক্ষমতায়ন কতটা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পেরেছেন? কিংবা আমাদের সংস্কৃতির প্রসারের জন্য আপনার চিন্তাভাবনা কী?

লিয়াকত আলী লাকী : এটা খুব সুন্দর একটি প্রশ্ন করেছেন। আমার আগে মহাপরিচালক হিসেবে যারা ছিলেন প্রত্যেকে বরেণ্য এবং আমার শ্রদ্ধেয়। জেলাকে বড় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আনার জন্য জেলা শিল্পকলা নিয়ে আগেই পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। জেলার পুরনো ভবনগুলোকে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। আমি আসার আগে একটি জেলার বাজেট ছিল ৫০ হাজার টাকা। আমি আসার পর সেই বাজেট ৪ থেকে ৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এবার তো আমরা প্রতিটা জেলাতে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা করে দিচ্ছি। উপজেলাগুলোকে আমার সময়ে সম্প্রসারিত করা হয়েছে। উপজেলাগুলো সম্প্রসারিত করার কারণ হচ্ছে উপজেলাকে বাদ দিয়ে তো আর জাতীয় পর্যায়ে চিন্তা করা যায় না। বর্তমানে আমরা উপজেলাগুলোতে লোকবল সৃষ্টি করছি। আমরা একটা বৃহৎ পরিকল্পনা তৈরি করেছি আর তা হলো প্রত্যেকটি উপজেলাতে একটি করে কালচারাল সেন্টার থাকবে এবং সেখানে একটি করে সিনেপ্লেক্স যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এই কাজগুলোর মধ্যে আমরা সীমাবদ্ধ কিংবা সন্তুষ্ট নই। এই দেশ, এই মাটি আপনাদের সবার ভালোবাসায় আমার পৃথিবীর অনেক জায়গায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার। জাপানে একবার একটা ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে গেলাম আর সেই কনফারেন্স হল একটি গ্রামে। একটা গ্রামে কী করে ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স হয় তা আমার বুঝে আসেনি। আমাদের যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, আমি তখন ভয় পাচ্ছিলাম। থাকার জায়গা, খাওয়ার জায়গা কেমন হবে। গ্রামের মধ্যে পৌঁছে দেখি সবকিছু কল্পনাতীত। এক কথায় অসাধারণ। দারুণ সব আধুনিক উপাদান সংমিশ্রিত সেখানে দুটো অডিটোরিয়াম রয়েছে। সেখানকার সবকিছুই যেন তাদের ঐতিহ্য বহন করছে। আমার তখন মনে হলো ওরা যদি সাংস্কৃতিক প্রসার বিস্তারে গ্রামে যেতে পারে, তাহলে আমি কেন উপজেলায় যেতে পারব না। এটা নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। আপনি যদি ১৬ কোটি মানুষের দায়িত্ব কাউকে দেন, তাহলে এই প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হতে হবে। যেমন আমরা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, শচীন দেব বর্মণ, অতুল প্রসাদ, রজনীকান্ত সেন, সুচিত্রা সেনের বাড়ি কিন্তু আমরা উদ্ধার করেছি। ১৫ জন মনীষীর ওপর সাংস্কৃতিক কেন্দ্র করার প্রকল্প ইতোমধ্যে সাবমিট করা হয়েছে। আমার কাছে যেটি মনে হয় সেটি হচ্ছে, যৌক্তিক যে প্রকল্পগুলো আছে, সেগুলো দ্রুত অনুমোদন করে দিতে হবে। আমাদের উপজেলাগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব একটা আলোকিত কালচারাল সেন্টারে পরিণত করতে হবে। এছাড়া আমার মনে হয় একটি উপজেলার ৪ থেকে ৫ লাখ মানুষের জন্য একটি মাত্র কালচারাল সেন্টারে কভার করা সম্ভব হবে না। সেজন্য আমি বলেছি আমাদের একটা স্যাটেলাইট চ্যানেল দরকার। গ্রামের মধ্যে যে একটা প্রতিভা জন্ম নিয়েছে দেখা যাবে সে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাকে কে দেখবে? এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের একটি দায়িত্ব আছে। রাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করতে এসে আমি নিজেকে দায়বদ্ধ মনে করি বলেই আমরা এ ধরনের বৃহৎ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছি।

রাফি হোসেন : শিল্পকলা একাডেমির তত্ত্বাবধায়নে যেসব বিভাগ রয়েছে, তা নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

লিয়াকত আলী লাকী : থিয়েটার, চলচ্চিত্র, আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য, চিত্রকলা, চারুকলা, ফটোগ্রাফি ইত্যাদি নিয়ে শিল্পকলা একাডেমির বিভিন্ন বিভাগ। এর মধ্যে আরো তিনটি বিভাগ আমরা যুক্ত করার প্রস্তাবনা রেখেছি। একটি হচ্ছে লোকসংস্কৃতি, আরেকটি শিশু বিভাগ। আমি বলতে চাই, সব  শিল্পের বিকাশ নিয়েই শিল্পকলা একাডেমি। আপনি কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, একটা আন্তর্জাতিক মানের শাস্ত্রীয় সংগীত উৎসব প্রতি বছর হবে না কেন? আমরা এটি গত বছর করেছি। কিন্তু এখানে যে বাজেট আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পেতে হবে সেটা বলাই বাহুল্য। আপনার প্রশ্নগুলোর জন্য আমি আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জানাই। কারণ আপনি স্বপ্ন দেখছেন, শিল্পকলাকে সেভাবেই ক্ষমতায়ন করতে হবে, সে রকমভাবে বাজেট দিতে হবে, যাতে প্রত্যেকটা মানুষের কাছে সে পৌঁছে যেতে পারে এবং এ কাজটি সংস্কৃতির স্বার্থে যত দ্রুত সম্ভব কোনো প্রকার বিলম্ব না করে করা দরকার। প্রধানমন্ত্রী স্বপ্নের একটা প্রকল্প আমাদের দিয়েছেন। ‘ঢাকা অপেরা হাউজ’ ১০টি অডিটোরিয়াম হবে সেখানে। ‘সিডনি অপেরা হাউজ’ নয় একর জায়গার ওপর আর আমাদের অপেরা হাউজটি হবে ২০ একর জায়গার ওপর। আমরা সৌভাগ্যবান যে, হাতিরঝিলের মধ্যে এত বড় পরিসরে ‘ঢাকা অপেরা হাউজ’-এর জন্য স্থান নির্ধারণ করা গেছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে যখন ‘ঢাকা অপেরা হাউজ’টি চালু হয়ে যাবে, তখন আন্তর্জাতিক মানের পারফরম্যান্স যারা করবে, তাদের তো এখন থেকেই প্রস্তুত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের থিয়েটার, গান, নাচ যা-ই কিছু বলি না কেন সবকিছু তো সেই অনুযায়ী তৈরি করে তুলতে হবে। সেটা কিন্তু আমাদের ভাবনার একটি জায়গা। আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে এক ধরনের কথা শুনে থাকি, সেটা হলো লুপ্তপ্রায় সংস্কৃতি। আমি লুপ্তপ্রায় কথাটার সঙ্গে একমত পোষণ করতে পারছি না। আমার কাছে শব্দটা ভালো লাগে না। লুপ্তপ্রায় আমরা কতদিন বলব! আমি বলি যে লুপ্তপ্রায় শব্দটাকেই বিলুপ্ত করে দিতে হবে। সারাদেশ থেকে ১৩৫০০ গান সংগ্রহ করেছি। যে কারণে শিল্পকলা একাডেমিতে আমি জাতীয় যন্ত্র সংগীত উৎসব করলাম, যা বাংলাদেশে কখনো হয়নি এবং সেখানে সারাদেশ থেকে ১২৫০ জন শিল্পী অংশগ্রহণ করেছে। এই আয়োজন করার কারণ হচ্ছে যে সবার মাঝে এখন থেকে একটা স্বপ্ন কাজ করবে। যে প্রতি বছর ঢাকার এ রকম আয়োজনে অংশগ্রহণ করতে পারব। তবে এটাও ঠিক যন্ত্রসংগীত উন্নয়নেও আমাদের কাজ করতে হবে।

আমাদের ছয় শতাধিক বাদ্যযন্ত্র ছিল। এখন তা এসে দুই শতাধিকের কোঠায় ঠেকেছে। আমরা ছয় শতাধিক বাদ্যযন্ত্র ফিরিয়ে আনতে পারব কিনা জানি না, তবে যা রয়েছে সেগুলোকে তো বিকশিত করতে হবে। এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি সমস্ত যন্ত্র কি-বোর্ডের মধ্যে চলে এসেছে। খেয়াঘাটে যেমন শত শত মাঝি নৌকা বা খেয়া পার করে যখন একটা ব্রিজ হয়ে যায় তখন তারা কিন্তু একটা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে যায়। আমাদের এটাও মাথায় রাখতে হবে। যখনই যন্ত্রগুলো আবিষ্কার হলো সে সময় থেকে আমরা যদি বিশ্বের অন্যান্য দেশের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব প্রত্যেকটি দেশেরই কমপক্ষে একটি করে অর্কেষ্টা টিম রয়েছে কিন্তু আমাদেরও কি একটা অর্কেষ্টা টিম থাকা উচিত নয়? আমাদের শিল্পকলায় আমি ১২টি বিষয়ের ওপর কোর্স করাচ্ছি। শিল্পকলায় আগে কোনো পিয়ানো ছিল না কিন্তু বর্তমানে আমাদের সংগ্রহের দুটি পিয়ানো রয়েছে। পিয়ানো, বাঁশি, ভায়োলিনসহ আরো অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র শেখার জন্য বিভিন্ন মেয়াদে প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমাদেরও একটি জাতীয় পর্যায়ের অর্কেষ্টা টিম থাকবে। সেটি আমার আশা এবং আমরা সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।

রাফি হোসেন : লাকী ভাই আমরা যেহেতু সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করছি কিন্তু আমাকে একটা বিষয় খুব পীড়া দিচ্ছে। আমাদের টেলিভিশনের যে স্বর্ণযুগ ছিল, সেটা কিন্তু এখন আর নেই। এখন কেউ আর টেলিভিশন দেখে না। দুঃখজনক হলেও সত্যি। আপনি আমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন। আমাদের সংগীত হারিয়ে যাচ্ছে। চলচ্চিত্রের অবস্থাও মৃতপ্রায় এবং থিয়েটার অবস্থাও তেমন সুবিধাজনক নয়। আপনার কি মনে হয় আমরা কীভাবে এর উত্তরণ ঘটাতে পারি?

লিয়াকত আলী লাকী : আপনার পর্যবেক্ষণটা খুবই যৌক্তিক এবং এই পর্যবেক্ষণটা আমিসহ আমাদের সবারই। যখন কোনো প্রতিকূল অবস্থা কিংবা চ্যালেঞ্জ আসে সেটা আমরা কীভাবে মোকাবেলা করব সেটা কিন্তু আমাদের ভাবনায় চলে আসে। সত্যি কথা বলতে আমি আমার সর্বোচ্চ দেয়ার পক্ষপাতি এবং দিয়েও আসছি। যেটা মনে হয় সেটা হলো এসব যাবতীয় বিষয় নিয়ে বৃহৎ পরিকল্পনা থাকতে হবে। সাংস্কৃতিক নীতিমালাও হালনাগাদ করতে হবে। যে আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো আসলে আমি এভাবে মোকাবেলা করব। এই মানুষগুলোকে নিয়ে করব। আমরা এক সময় সোশ্যাল স্টার দেখেছি যখন আমাদের গ্রামে পত্রিকা, টেলিভিশন, ছিল না। শুধু রেডিও ছিল তখন আমি সোশ্যাল স্টার দেখেছি। আমার শিক্ষক, একজন ফুটবলার, একজন যাত্রা শিল্পীকে সোশ্যাল স্টার হিসেবে দেখেছি। এখন আর তাদের স্টার বলা হয় না। সংগীত পরিবেশন করে হৃদয় না কাঁপিয়ে হাঁটু কাঁপাতে পারে তারাই হচ্ছে এখন স্টার। আমি সবসময় বলি পাকিস্তান আমলে আর যা-ই ঘটুক না কেন সমাজটা শাসন করত লোকসংস্কৃতির মানুষেরা। লোক কবিরা, লোক শিল্পীরা। তারা যখন একটা পালা গান করত, মুগ্ধ হয়ে সবাই দেখত। যাত্রা, পুতুল নাচ, সার্কাস থেকে শুরু করে সবকিছু ছিল মন্ত্রমুগ্ধকর। আমার আবারও যেটা মনে হয় সেটা হলো, মূল ধারার সংস্কৃতিকে ক্ষমতায়ন দিতে হবে এবং বিকশিত করতে হবে। আমরা নাটক দেখার জন্য সবাই আসি শিল্পকলায়। মহিলা সমিতিতে এত সুন্দর মঞ্চ, আমরা যাচ্ছি না বা নাটক করছি না। কিন্তু লন্ডন শহরে প্রতি রাতে বিভিন্ন জায়গায় ১০০ থেকে ১৫০ নাটক মঞ্চায়িত হয়। আমাদের উত্তরার দর্শক কী করে শিল্পকলা এসে নাটক দেখবেন। সে তো তার এরিয়ার মধ্যে একটা থিয়েটার আশা করতেই পারে। একটা মানুষের সপ্তাহে একদিন কাজের মধ্য থেকে স্বস্তির দম ফেলানোর জন্য হলেও একটু বিনোদনের ব্যবস্থা থাকা উচিত। শুধু শিল্পকলাকেন্দ্রিকই নয়, আমরা কি কোনোভাবে পারি না তাদের স্বস্তি দিতে। আমি বলেছি ঢাকা শহরে অন্তত ২০টি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হওয়া দরকার। আমি মেয়র হানিফ ভাইকে শ্রদ্ধা জানাই তিনি দুটি কাজ করে গেছেন। এর মধ্যে একটা হলো রবীন্দ্র সরোবর ও মহানগর নাট্যমঞ্চ। প্রতিদিন যে কোনো অনুষ্ঠান হলে পরে সেখানে কিন্তু ২ থেকে ৪ হাজার লোকের সমাগম হয়। এ রকম কি ২০টি মঞ্চ পুরো ঢাকায় তৈরি করা যায় না। এই শহরের ২ কোটি মানুষের জন্য তো কমপক্ষে প্রয়োজন ১০০টি। সেখানে অন্তত ২০টি করা হোক এ বিষয়ে আমি সিটি মেয়রদের কাছে বিনীত অনুরোধ করছি। আমি অনেক আন্তর্জাতিক উৎসবে গিয়েছি, যেখানে সিটি মেয়ররা প্রতি দুই বছর পরপর সে উৎসবের আয়োজন করে থাকে। আমি এক সিটি মেয়রকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ কাজ কী? তিনি উত্তরে বললেন বিনোদন। আমি দেখেছি আরেকটি ছোট সিটিতে ৮২টি হলে সপ্তাহের প্রতি রোববার সিটি মেয়রের নিজ খরচে একসঙ্গে আয়োজন করা হয় বিনোদনের। কিন্তু আমাদের ১৬ কোটি মানুষের বিনোদনের জন্য তো সেই ব্যবস্থাটুকু করতে হবে। এখন বিনোদনের কথা বললেই বলা হয় টেলিভিশন দেখো। টেলিভিশনের অবস্থা তো আপনি আগেই বলে দিয়েছেন। টেলিভিশনে আমাদের যারা গুণী অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কাজ করছেন এবং গুণী নির্মাতা যারা নির্মাণ করছেন, তাদের তো হাত-পা বেঁধে দেয়া হচ্ছে। কিছুদিন আগেও তো ৩ থেকে ৪ লাখ টাকায় একটা নাটক বিক্রি করতে পারত। কিন্তু এখন তা নেমে এসেছে ৫০ হাজার টাকায়। কেউ কেউ আবার বলছে আপনার কাজ চালাচ্ছি এই তো বেশি। আবার অনেক ক্ষেত্রে কেউ কেউ বলে যদি বিজ্ঞাপন এনে দিতে পারেন, তাহলে আপনার অনুষ্ঠান বা নাটক চালাতে পারি। এমন করে চলতে থাকলে মান থাকবে কী করে? আমরা যদি আমাদের পাশের দেশ ভারতের দিকে তাকাই তাহলে বুঝতে পারব। ভারত হচ্ছে সাংস্কৃতিক উর্বর একটি দেশ। তারা আমাদের মতো এ সংকট অনেক আগেই অতিক্রম করে ফেলেছে। পেশাভিত্তিক সংস্কৃতিচর্চায় তাদের সংস্কৃতি বিকাশে সরকার থেকেই প্রণোদনা দেয়া হয়। আমাদেরও এমন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। আশা করি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আমরাও এ প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন করতে পারব।

রাফি হোসেন : আপনি তো পুরোপুরি একজন সাংস্কৃতিক মানুষ। ছোটবেলা থেকেই সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন রাজনীতির সঙ্গে। বর্তমানে অনেক ব্যস্ততার মাঝে অভিনয় করে চলেছেন মঞ্চে। শত ব্যস্ততার মাঝেও অভিনয়ের জন্য সময় করা হয় কীভাবে?

লিয়াকত আলী লাকী : নস্টালজিয়া বলে একটা জিনিস আছে। আমার শৈশবটা ছিল খুব অসাধারণ। শৈশব থেকে আমি নাট্যচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম এবং এখনো আছি। এখনো প্রতি মাসে মঞ্চে দুটো নাটকে কাজ করি। শত ব্যস্ততার মাঝেও আমাকে সময় বের করে নিতে হয়। কারণ এটি ছাড়া আমি বাঁচব না। আমি শিল্পের মধ্যেই আছি, শিল্পের মধ্যেই বসবাস করছি। আমি যতদিন বাঁচব শিল্পের সঙ্গেই থাকব।

রাফি হোসেন : আমাদের সাংস্কৃতিক যারা দর্শক আছে তাদের সম্পর্কে আপনার ভাবনা বা কোনো প্রকার চাওয়া আছে?

লিয়াকত আলী লাকী : আমি প্রথমেই দর্শকদের অভিবাদন আর শ্রদ্ধা জানাই। কারণ তারা শিল্পী, কবি, সাহিত্যিকদের বিশ্বাস করে। তাদের প্রতি দর্শকদের আস্থা এখনো আছে। আমরা জানি আমাদের যখন জাতীয় সংকট হয়েছে, তখন ভাষা আন্দোলনের চেতনা ধরে রেখেছে দুটো জিনিস একটি হচ্ছে শহীদ মিনার, আরেকটি হচ্ছে গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’। দুটোই কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি। সংস্কৃতির যে কী শক্তি তা নিশ্চয় আমরা উপলব্ধি করতে পারি। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ যখন আঘাতপ্রাপ্ত হলো তখন এই শিল্প-সংস্কৃতি কিন্তু সেই মূল্যবোধটাকে ফিরিয়ে আনতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। আমি মনে করি, সংস্কৃতির শক্তি হলো মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং সেটি হলো সত্য, সুন্দর, কল্যাণ এবং ভালোবাসার সম্পর্ক। ভালোবাসা হলো সংস্কৃতির প্রধান শক্তি। সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে যে প্রেম সেটি জাগ্রত হয়। সংস্কৃতির একটা দর্শন আছে যে, সে কিন্তু ছোট-বড় কাউকে বিভেদ করে না। ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য তাহার ওপরে নাই’, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। দর্শকদের আস্থার ওপর আমরা শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছি। দেশের সংস্কৃতির সব কার্যক্রম যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে দেশটা তো অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাবে। তাই দর্শকদের কাছে বিনীত অনুরোধ সাংস্কৃতিক পরিম-লে নিজেকে এবং পরবর্তী প্রজন্মকে প্রবাহিত করুন।

অনুলিখন : আখন্দ জাহিদ

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup