আকাশটাই আমার মনের ক্যানভাস : চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলাম

তুলির সুনিপুণ আঁচড়ে যিনি যুগ যুগ ধরে অগণিত ভক্তকে মন্ত্রমুগ্ধ করে চলেছেন, তিনি আর কেউ নন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলাম। শুধু দেশের মাটিতেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার চিত্র প্রদর্শনীতে ভক্তের ভিড়ের কথা আজ আর কারো অজানা নয়। জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন সুদূর স্পেনে, আজকাল দেশে আসা-যাওয়া এবং অসংখ্য চিত্র প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে দারুণ ব্যস্ত সময় কাটছে এ গুণী শিল্পীর। বিনয়ী এ শিল্পীর পুরস্কার প্রাপ্তির তালিকা দেখে এদেশের মানুষ বিস্মিত ও গর্বিত। তার অর্জিত পুরস্কারের মধ্যে ১৯৯৯ সালে এদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ‘একুশে পদক’, ২০১৬ সালে ‘বার্জার আজীবন সম্মাননা পুরস্কার’ এবং ‘শিল্পকলা একাডেমি’ পদক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও তিনি ১৯৭২ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল বেনিয়্যাল অব গ্রাফিক্স’, ১৯৮৩ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রিন্ট অ্যান্ড ড্রইং এক্সিবিশন প্রাইজ’ এবং ১৯৮৬ সালে ‘বাগদাদ ইন্টারন্যাশনাল আর্ট ফেস্টিভ্যাল’ পুরস্কারের মতো অসংখ্য সম্মাননা পদকে ভূষিত হয়েছেন। পাশাপাশি ১৯৯৭ সালে তিনি স্পেনের রাষ্ট্রীয় পদক, ২০১০ সালে স্পেনের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা ‘দ্য ক্রস অব দ্য অফিসার অব দ্য অর্ডার অব কুইন ইসাবেলা পুরস্কার’, ২০১৮ সালে স্পেনের ‘অর্ডার অব মেরিট’সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন এবং ভক্তকুলের অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। অসামান্য প্রতিভার অধিকারী এ শিল্পী তার ব্যক্তিগত ভাবনা ও ভালোলাগার কথাগুলো খুব সাবলীলভাবে ব্যক্ত করলেন আনন্দধারার সঙ্গে তার কথোপকথনে।

আনন্দধারা : আজকের বরেণ্য চিত্রশিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে আপনার অনুপ্রেরণা সম্পর্কে জানতে চাই।

মনিরুল ইসলাম : আমার প্রথম অনুপ্রেরণা আমার মমতাময়ী মা। তার কাছ থেকেই আমি শিল্পের জগতে আমার অবাধ বিচরণের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সমর্থন পেয়েছি। আমি শৈশব কাটিয়েছি কিশোরগঞ্জে। সে সময় আমার আশপাশে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে চিত্রশিল্পের বোধ বা এ শিল্প সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। সে সময় আমি কিশোরগঞ্জ রামানন্দা হাই স্কুলে অধ্যয়নরত ছিলাম। সেই সুবাদে স্কুলের হেডমাস্টার স্যার জগদীশ রায় চিত্রশিল্পের প্রতি আমার ঝোঁক ও ভালোলাগার বিষয়টি অনুধাবন করেন এবং আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেন। পরবর্তী সময়ে আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আমি খুঁজে পেলাম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক কাজী আব্দুল বাসেতকে যিনি আমাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে ছবি আঁকা শিখিয়েছেন। বলতে গেলে তার কাছেই আমার হাতেখড়ি। পাশাপাশি আমাদের সবার প্রিয় বরেণ্য চিত্রশিল্পী স্যার মুস্তাফা মনোয়ার এবং স্যার কিবরিয়া আমাকে সবসময় অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। আর একটি কথা না বললেই নয়, আমার পরম সৌভাগ্য হয়েছিল শিল্পগুরু জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে কাজ করার। তিনি যখন  চাঁদপুরে এসেছিলেন, তখন আমাকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেন, তার নিমন্ত্রণ আমি খুবই আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করি এবং খুবই সম্মানিত বোধ করি। আমি তার সঙ্গে চাঁদপুরে পাঁচ দিনব্যাপী এবং খুলনায় সাত দিনব্যাপী ছবি এঁকেছিলাম। সেকথা আমি আজো ভুলিনি। কারণ শিল্পের অসীম ক্ষমতার নজির আমি ততদিনে পেতে শুরু করেছি। তার শিল্পকর্মের কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং তার অনুপ্রেরণায় ধীরে ধীরে শিল্পটাকে নিজের ভেতরে লালন করতে শুরু করি। এরপর স্পেনে আসার পর পাবলো পিকাসো, জোয়ান মিরো, ফ্রান্সিস্কো গয়া এবং টেপিসের মতো বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পীর শিল্পকর্ম আমার ভেতরে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। এছাড়াও আমার বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাক্সক্ষী ও ভক্তকুলের ভালোবাসা আমার সারা জীবনের অনুপ্রেরণা।

আনন্দধারা : আপনার জীবনদর্শন নিয়ে কিছু বলুন।

মনিরুল ইসলাম : জীবনটা ক্ষণস্থায়ী, তবে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক। আর এ স্বল্পদৈর্ঘ্য জীবনে মনের মতো করে বাঁচার মধ্যেই প্রকৃত সার্থকতা নিহিত। তাই আকাশটাই আমার মনের ক্যানভাস। যত খুশি রঙে জীবন রাঙাবো বলে আজো স্বপ্ন দেখি। আমার মতে, চিত্র এমন একটি শিল্প যার নিজস্ব ভাষা রয়েছে এবং একটি শিল্পকর্ম তখনই সার্থক হয় যখন এর ভাষা সবাই বুঝতে পারে। ছবির ভাষা যে বুঝতে পারে, কেবল সে-ই শিল্পের এ নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে ভেতরে ধারণ করতে সক্ষম হয়। আমার মতে, লোকশিল্প অবশ্যই আমাদের শেকড়ে রয়েছে, কিন্তু এরপর অন্যান্য ধরনের চিত্রশিল্পের বিষয়েও মনোনিবেশ করাটা মঙ্গলজনক। কারন, এর মাধ্যমে আমাদের চিন্তা ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্র আরো বিস্তৃত হতে পারবে।

আনন্দধারা : চিত্রশিল্পকে আপনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?

মনিরুল ইসলাম : প্রকৃতপক্ষে, ছবি আঁকা একটি রহস্যময় খেলা, যার অসীম ক্ষমতা রয়েছে। আমার দৃষ্টিতে, একজন শিল্পীর চেয়েও মহৎ তার শিল্পকর্ম। শিল্পের পথে আমার যাত্রা কবে থেকে শুরু, তা হয়তো অনুমান করে বলা যাবে, তবে এ যাত্রার পরিসমাপ্তি কোথায় তা আমার জানা নেই। জীবনে চলার পথে আমি যেখানেই শিক্ষার উপকরণ পেয়েছি, সেখানেই শিখেছি, এমনকি আজো আমি শিখেই চলেছি।

আনন্দধারা : ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীদের উদ্দেশে আপনি কী বলতে চান?

মনিরুল ইসলাম : আসলে যেকোনো শিল্পেই দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়। এ যাত্রায় কেউ সফল হয়, আবার কেউবা অতলে হারায়। তবে শিল্পী হিসেবে নিজের জায়গা স্থায়ী করে রাখার বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সঠিক উপায়ে অনুশীলনটা খুবই জরুরি একটি বিষয় এবং শিল্পী হিসেবে নিজের পথ সুগম করতে হলে অবশ্যই কঠোর অধ্যবসায় প্রয়োজন। বর্তমান প্রজন্মের অনেক নবাগত শিল্পী আছেন যারা অত্যন্ত প্রতিভাবান, আমি তাদের সাধুবাদ জানাই এবং বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে তাদের সৃজনশীলতার জন্য সম্মাননা প্রদান করা হচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। কারণ যেকোনো শিল্পে স্বীকৃতি প্রদান করা হলে তা শিল্পীকে তার সৃজনশীলতা অব্যাহত রাখতে অনুপ্রাণিত করে। তাই আমি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীদের প্রতি খুবই আশাবাদী। আমি স্বপ্ন দেখি তারা বিশ্বের দরবারে আমাদের দেশের নাম আলোকিত করবে এবং তারাই পরবর্তী সময়ে নেতৃত্ব দান করতে সক্ষম হবে।

আনন্দধারা : ভবিষ্যতে আপনি কী করতে চান? বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

মনিরুল ইসলাম : খুব বেশি পরিকল্পনা করে আমার কাজ করা হয়ে ওঠে না। শুধু এটুকুই চাইব, চিত্রশিল্প বিষয়ে যা কিছু আমি জেনেছি, বুঝেছি এবং শিখেছি তা সবার মাঝে যেন বিলিয়ে দিতে পারি। আর শিল্পের অপার সৌন্দর্যে এভাবেই আজীবন বুঁদ হয়ে থাকতে চাই।

আনন্দধারা : আপনার সবচেয়ে পছন্দের বই কোনটি?

মনিরুল ইসলাম : ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড’ আমার সবচেয়ে পছন্দের বই। এটি বিশ্বখ্যাত কলম্বিয়ান কথাসাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের একটি অনবদ্য রচনা। এ উপন্যাসটির অসাধারণ মননশীলতা এবং উপস্থাপনা আমাকে ভীষণভাবে

আকৃষ্ট করে।

আনন্দধারা : আপনার অবসরযাপন সম্পর্কে জানার কৌতূহল। অবসরে চলচ্চিত্র কি দেখা হয়?

মনিরুল ইসলাম : আজকাল অবসর নেই বললেই চলে। তাই আর সবার মতো আয়োজন করে চলচ্চিত্র খুব একটা দেখা হয়ে ওঠে না। তবে আমার সবচেয়ে পছন্দের চলচ্চিত্রের মধ্যে কিংবদন্তি চলচ্চিত্র-নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ অন্যতম। এছাড়াও আমার পছন্দের চলচ্চিত্রের তালিকায় ‘দ্য গডফাদার’, ‘টু উইমেন’, ‘এন আন্দালুসিয়ান ডগ’, ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’, ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’ এবং কাসাব্লাঙ্কা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও আমি আনন্দদায়ক এবং কাল্পনিক কাহিনীর চলচ্চিত্র বেশ উপভোগ করে থাকি।

আনন্দধারা : আপনার প্রিয় গান কোনটি?

মনিরুল ইসলাম : সংগীতের সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। আমি সব ধরনের গানই শুনে থাকি। তবে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত আমি যতবার শুনি, ততবারই মুগ্ধ হই। এছাড়া অপেরা, জ্যাজ এবং আধ্যাত্মিক গান আমার শুনতে খুব ভালো লাগে। সংগীত একটি সার্বজনীন ভাষা, তাই কোন গানটি আমার কখন শুনতে ভালো লাগবে, সেটি আসলে নির্ভর করে পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর।

আনন্দধারা : জীবনে চলার পথে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে হয়তো আপনি আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছেন, সে সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন...

মনিরুল ইসলাম : নিঃসন্দেহে আমার শ্রদ্ধেয় পিতা-মাতা আমার জীবনের আদর্শ। চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে অবশ্যই আমি মহান শিল্পগুরু জয়নুল আবেদিনকে আমার আদর্শ হিসেবে মনে করি। এছাড়া দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী স্যার মুস্তাফা মনোয়ার এবং স্যার কিবরিয়ার প্রতি আমি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।

সবশেষে আমি বলতে চাই, আমার বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী এবং ভক্তদের ভালোবাসার কারণেই আজ আমি এখানে আসতে পেরেছি, তারাই আমার অনুপ্রেরণা। আমি সারাজীবন চিত্রশিল্পকে মনে ধারণ করে সবাইকে আমার ভালো কাজ উপহার দিতে চাই। ধন্যবাদ।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup