‘মনের মিল না হলে ভেগে যাই’...

 

প্রথম ছবি দিয়েই আলোচনায় এসেছিলেন লাস্যময়ী মাহিয়া মাহি। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। একের পর এক হিট ছবি উপহার দিয়েছেন দর্শকদের। ‘ভালোবাসার রঙ’, ‘পোড়ামন’, ‘অগ্নি’, ‘রোমিও জুলিয়েট’, ‘অনেক সাধের ময়না’ তার আলোচিত ছবি। তার নামে দর্শকরা হলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। একান্ত সাক্ষাৎকারে অকপটে বলেছেন নিজের জীবনের অনেক না বলা কথা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, প্রেম-বিয়ে নিয়ে সবকিছু। সঙ্গে ছিলেন আনন্দধারা সম্পাদক রাফি হোসেন

রাফি হোসেন : তোমাকে আমরা অনেক দিন পর পেলাম। তার জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা। যতদূর মনে হয় তুমি যখন আমাদের এখানে এসেছিলে, তখন এত বড় তারকা হওনি। সেদিন তুমি বলেছিলে, এর আগে ফটোশ্যুটও করোনি।

মাহিয়া মাহি : না, আমি তার আগে সত্যি কোনো ফটোশ্যুটও করেছিলাম না।

রাফি হোসেন : কিন্তু এখন তোমাকে মোটেও সেই রকম মনে হচ্ছে না।

মাহি : এখনো সেই আগের জায়গাতেই আছি।

রাফি হোসেন : মোটেও না, তুমি আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি এগিয়েছো। তোমার প্রথম ছবি ‘অগ্নি’ যখন দেখলাম, তখনই বুঝলাম তুমি একজন ভালো অভিনেত্রী। এখন তো তুমি একজন সুপারস্টার। একজন প্রথম শ্রেণির অভিনেত্রীর মধ্যে যা যা গুণ থাকা প্রয়োজন, সব তোমার মাঝে রয়েছে। এটা একজন অভিনেত্রীর জন্য বড় পাওয়া। তোমার কি মনে হয়, দর্শকরা তোমাকে কীভাবে গ্রহণ করছে? তোমার এক্স ফ্যাক্টরটা কী?

মাহি : প্রথম সিনেমার শ্যুটিং যখন শেষ করি, এসব বিষয়ে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। কারণ জীবনে প্রথম তখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। সবাই আমার প্রথম ছবি মুক্তি পাওয়ার আগে বলেছিল, কাল থেকে সবাই তোমাকে চিনবে, জানবে। কীভাবে সবাই আমাকে চিনবে বুঝতাম না। সেই সময় শাকিব খান আছে, অপু বিশ্বাস আছে। আমরা নতুন দুটো ছেলে-মেয়ে কাজ করেছি। সবাই কেন দেখবে আমাদের ছবি। মনে হয়েছিল কেউ আসবে না আমাদের ছবি দেখতে। যখন সিনেমাটা মুক্তি পেল, তখন হলে গিয়ে দেখি শুধু মানুষের মাথা দেখা যায়। অনেক হিট করেছিল সিনেমাটা। এটা আমার ভাবনাতে ছিল না। কোনো কারণ অবশ্যই ছিল হিট হওয়ার।

রাফি হোসেন : যখন দেখলে মানুষ তোমার সিনেমাটা দেখছে। এটা তো অন্যরকম অনুভূতির বিষয়।

মাহি : তখন বুঝতেই পারিনি সামনে কী হতে চলেছে। এত মানুষ দেখে অবাক হয়ে গেছি। এরা কি বুঝে নাকি না বুঝে আসছে। সব সময় বলেছি আমার মধ্যে তেমন কিছুই নেই। তবে ভাগ্যটা খুব ভালো। ভাগ্যে খুব বিশ্বাস করি। আমার মনে হয় উপরওয়ালা নিজ হাতে এসব দিয়ে দিয়েছেন মানুষের কাছে এত পরিচিতি পাব। এছাড়া আর কারণ দেখি না।

রাফি হোসেন : একের পর এক তোমার ছবি হিট করতে লাগল। তখন সবাই বলত শাকিব খানের পর হলে মাহির নামে ছবি চলে। এতগুলো হিট ছবির পর অন্য পর্যায়ে চলে গিয়েছিলে। যদি ছবি হিট না হতো, তখন কী মনে হতো? একজনের সব ছবিই তো আর হিট হয় না। বিষয়টা কীভাবে দেখো?

মাহি : আমার পরপর সব ছবিই হিট। প্রথম ফ্লপ ছবি ‘দবির সাহেবের সংসার’। তখন বুঝতে পারি হিট ছবি কী ছিল। আমার হিট ছবির তালিকায় ছিল ‘ভালোবাসার রঙ’, ‘পোড়ামন’, ‘অগ্নি’, ‘অগ্নি-২’, ‘রোমিও জুলিয়েট’। এগুলো সব সুপার-ডুপার হিট। পরপর এতগুলো হিট ছবির পর ‘দবির সাহেবের সংসার’ মুক্তি পেল, তখন হলে গিয়ে দেখি প্রথমের কথার মতোই আমি থাকব, নায়ক, পরিচালক আর প্রযোজক থাকবে। প্রথমদিকের কথার সঙ্গেই মিলে গেল।

রাফি হোসেন : প্রথম ছবিতে কে ছিল তোমার সঙ্গে?

মাহি : আমার নায়ক ছিল বাপ্পি আর ছবির পরিচালক ছিলেন জাকির হোসেন রাজু।

রাফি হোসেন : বাপ্পির সঙ্গে তো তোমার সব ছবিই হিট ছিল। এটা কেন ফ্লপ করল?

মাহি : সব ছবিই তো দর্শক একইভাবে গ্রহণ করে না। কিন্তু ছবির গল্পটা অনেক ভালো। আমার কাজ করতে অনেক ভালো লেগেছে। এটা আমার প্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে একটা। কিন্তু এই ছবিটা চলেনি। তখন বুঝলাম আমার আগের ছবিগুলো হিট ছিল। তখন আমার মনে হলো যেহেতু এই ছবিটা খারাপ গেছে, পরবর্তী সময়ে আরো সচেতন হতে হবে। সেই সময়ে দু’দিন ফোন বন্ধ করে রেখেছিলাম। সাংবাদিকরা আমাকে ফোন করে জানতে চাইবে ছবি কেমন চলছে। তখন তো মিথ্যা বলতে পারব না।

রাফি হোসেন : ‘অগ্নি’ ছবিটি তোমার অভিনয় ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। কারণ আমাদের দেশে দেখা যায় সাধারণত নায়করাই মূল চরিত্রে অভিনয় করে থাকে কিন্তু ‘অগ্নি’ ছবিতে তোমাকে মূল চরিত্রে দেখেছিলাম। দর্শকরা তোমাকে ভালোভাবে নিয়েছিল। এই ভাবনাটা তোমার পরিকল্পনা করে করা নাকি এমনিতেই?

মাহি : একদমই কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ছবি হাতে আসছে, নিয়েছি এ রকমই। কোনটা হিট ছবি হয়েছে বুঝতামই না।

রাফি হোসেন : কখনো মনে হয়নি এতগুলো ছবি হিট হয়েছে। আমি এখন নায়িকাপ্রধান চরিত্রেই কাজ করব?

মাহি : না এ রকম কখনই মনে হয়নি। আমি কাজ করতে করতেই বিষয়টা হয়ে গেছিল। ‘পোড়ামন’ ছবিতে মেয়ে চরিত্রটি একটু বেশি ছিল। ‘অনেক সাধের ময়না’ এগুলো করতে করতেই মেয়েপ্রধান চরিত্রগুলো করা হয়ে গেছে। কিন্তু যখন কয়েকটা ছবি ফ্লপ করল, তখন মনে হলো একটু নায়িকা চরিত্রগুলো করলে বেশি ভালো হয়।

রাফি হোসেন : ছবিতে অভিনয় করার স্বপ্ন কি ছোটবেলা থেকেই ছিল? নায়িকা হওয়ার কথা কখন মনে হয়েছে?

মাহি : কখনো মনে হয়নি আমি নায়িকা হব। কারণ আয়নায় যখন নিজেকে দেখতাম, তখন কখনই নায়িকার মতো মনে হতো না নিজেকে।

রাফি হোসেন : কীভাবে সিনেমায় আসা হলো তোমার?

মাহি : ছোটবেলায় যখন নাটক-সিনেমা দেখতাম, তখন দেখতাম নায়িকাদের বিছানার পেছনে একটা বড় ছবি টাঙানো থাকত। আমার মনে হতো আমার ছবি কবে ঘরে এভাবে টাঙাব। তখন একটা ফটোশ্যুট করলাম। ছবিগুলো নাকি অনেক সুন্দর হয়েছিল। তখন স্টুডিওর অনেকেই বলল, তুমি তো সিনেমায় কাজ করতে পার। ছবিগুলো কি আমরা কোথাও দেব? তখন বললাম, দেন। কিন্তু তার আগে আমাকে একটা ছবি দেন যেটা ঘরে টাঙানো যায়। যখন স্কুলে যেতাম, তখন রাস্তায় বড় বড় বিলবোর্ড থাকত, তখন মনে হতো ইস, ওখানে যদি আমার ছবি থাকত। আমি কখনো চিন্তাও করতে পারতাম না যে, শুধু আমার একার একটা ছবি থাকত। শুধু ভাবতাম নাটকে বা সিনেমায় ছোট চরিত্রেও কাজ করতে পারতাম, তাহলে মানুষ আমাকে চিনত।

রাফি হোসেন : অভিনয় করার একটা সুপ্ত বাসনা ছিল মনের মধ্যে?

মাহি : হ্যাঁ, সেটা ছিলই। প্রথম যখন জাজ মাল্টিমিডিয়া থেকে আমাকে ফোন দিয়ে বলল, আমাদের একটা প্রজেক্ট আছে আপনি আসেন। আম্মুকে নিয়ে গেলাম। যাওয়ার পর দেখছি সব গণ্যমান্য পরিচালক বসা সেখানে। আমি তো চিনতাম না। তাদের একজন বলল, তুমি এত চিকন কেন? তোমাকে একটু মোটা হতে হবে।’ আমি বললাম কিসের জন্য? তখন তিনি বললেন, সিনেমার জন্য। আমি তো অবাক! সিনেমার জন্য তারা আমাকে পছন্দ করল কেন? তারপর ভাবলাম আমাকে একটু মোটা হতে হবে। তখন থেকে প্রতিদিন ১২টা করে ডিম খাওয়া শুরু করলাম। আর তিনটে আস্ত মুরগি। ক্ষুধা না লাগলেও ভাত খেতাম কিন্তু সাতদিন পর দেখলাম ফলাফল শূন্য। তারপর একটা মোটা ড্রেস কিনলাম যেন আমাকে দেখে মোটা লাগে। ওই পোশাক পরে গেলাম এবং সিনেমায় সাইন করলাম। বিশ্বাস হলো যে আমি সিনেমা করব।

রাফি হোসেন : তোমার মতো নিজের একার চেষ্টায় যারা সিনেমায় আসে, তাদের অনেক বেশি সাহসী হতে হয়।

মাহি : সাহসী তো হতেই হয়। বললাম না আমার ভাগ্য অনেক ভালো। আমি সরাসরি ফোন পাই এবং আবদুল আজিজ স্যার আমাকে ছবিতে নিয়ে নেন। তারপর তিন বছর বাইরের কোনো কাজ করিনি। তারাই আমাকে বেছে বেছে ছবির কাজ দিয়েছেন।

রাফি হোসেন : শুধু জাজের হয়েই ছবির কাজ করছিলে। তোমার সঙ্গে কি কোনো চুক্তি হয়েছিল?

মাহি : তাদের সঙ্গে আমার কোনো চুক্তি ছিল না। ভালোবাসার রঙ থেকে যখন আমি তাদের কাজ করি, তখন থেকেই। কোনো চুক্তি ছিল না। আমার মনে হলো আমার জাজের সঙ্গে কাজ করা উচিত। যখন আমার মনে হলো আমি এখন বাইরে কাজ করতে পারব, তখন আমি বাইরে কাজ করতে শুরু করলাম।

রাফি হোসেন : এটা নিয়ে জাজ মাল্টিমিডিয়ার সঙ্গে তোমার একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল?

মাহি : ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল, তারপর তাদের সঙ্গে আমার আর কাজ করা হয়নি। কিন্তু জাজের সঙ্গে কোনো চুক্তি ছিল না।

রাফি হোসেন : তারা অনেক ছবির কাজ করে। জাজের বাইরে এসে তোমার কাজ শুরু করা এটাও তো একটা অনেক সাহসী সিদ্ধান্ত। এটা কি ভেবেচিন্তে নিয়েছিলে?

মাহি : না, আমি সব সিদ্ধান্ত এমনি এমনিই নিয়ে নিই। আমার মনে হয়েছে কাজ করব না। বাদ দিয়ে দিয়েছি। জাজ থেকে বের হওয়ার পর আমি ‘অগ্নি ২’ ছবিটা কিন্তু করেছি।

রাফি হোসেন : এই ছবিতে অভিনয়ের কথা কি আগে হয়েছিল?

মাহি : না, কথা হয়নি। ওদের সঙ্গে সব মুখে মুখেই হতো।

রাফি হোসেন : বাপ্পির সঙ্গে তোমার ছবি তো ভালো দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিল। অনেকদিন থেকে একসঙ্গে কাজ করছ না কেন?

মাহি : আমার জাজ থেকে বের হওয়ার প্রায় দেড় বছর আগেই বাপ্পি বের হয়ে গেছে। প্রথম দিন থেকেই বাপ্পির সঙ্গে আমার কাজ হয়েছে এবং একসঙ্গে বেশকিছু ছবি করেছি। অন্য কারো সঙ্গে সেভাবে কাজ করা হয়নি। হলে হয়তো তাদের সঙ্গেও ভালো একটা কেমেস্ট্রি হতো।

রাফি হোসেন : বাপ্পির সঙ্গে তোমার এতগুলো ছবি হিট হয়েছিল। তোমার কি মনে হয় না যে, আবার কাজ করা উচিত?

মাহি : কেন জানি ওর আর আমার এখন ব্যাটে-বলে মিলছে না। আমিও চাই, বাপ্পিও চায় একসঙ্গে কাজ করতে। ভালো একটা প্রডাকশন হাউজ থেকে ভালো গল্পের ছবিতে কাজ করতে। কেন জানি হয়ে উঠছে না। আমরা দু’জনে যদি আবার একসঙ্গে কাজ শুরু করি ভালো প্রজেক্ট দিয়ে করব।

রাফি হোসেন : তুমি একসময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে ছবিতে অভিনয় করবে না, আমেরিকায় গিয়ে পড়াশোনা করবে। সেই চিন্তা কি এখন বাদ?

মাহি : জাজ থেকে যখন কাজ বাদ দিলাম, তখন মনে হয়েছিল আর কাজই করব না। আমেরিকায় গিয়ে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করব। কিন্তু সেখানে গিয়েও মানিয়ে নিতে পারলাম না। ১৫ থেকে ২০ দিন পর দেশে এসেছি।

রাফি হোসেন : তুমি তো খুব জলদি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলো। প্রেম-বিয়ে এসব ক্ষেত্রেও কি তাই?

মাহি : বিয়ের চারদিন আগে বিয়ের কথা জানতে পারি। অপু আমাদের পরিবারের পরিচিত ছিল। হঠাৎ করে একদিন আমাকে বলছে বাসা থেকে আমার জন্য মেয়ে দেখছে। তুমি সিনেমা না করলে তোমাকেই বিয়ে করতাম। আমি তখন বললাম, সিনেমা করছি তো কী হয়েছে? দুই মাস পর ছেড়ে দেব। তারপর দু’জনের বাসায় কথা বলে বিয়েটা হয়ে যায়। এটাও খুব জলদি নেয়া একটা সিদ্ধান্ত।

রাফি হোসেন : তোমার বিয়ে হওয়া কতদিন হলো? প্রেম-ভালোবাসা এই বিষয়গুলো এখন কী অবস্থায় আছে?

মাহি : বিয়ে হওয়া সাড়ে তিন বছর হলো। এগুলো আগের মতোই আছে। ওকে আমার অনেক ভালো লাগে।

রাফি হোসেন : তোমরা তো প্রেম করে বিয়ে করোনি?

মাহি : আসলে ঠিক প্রেম করে না, অপুকে চিনতাম, তাকে ভালো লেগেছিল আমাদের বিয়ের চার বছর আগে। একদিন গাড়িতে করে আমরা একসঙ্গে যাচ্ছিলাম, তখন লুকিং গ্লাসে অপুকে দেখে আমার ভালো লেগে যায়। ওইটা তো আসলে প্রেম ছিল না, ভালোলাগা ছিল। যখন ওর বিয়ের কথা বলছিল, তখন আমার মনে হলো, বিয়ে হয়ে গেলে তো অপু আমার কাছ থেকে হারিয়ে যাবে। তখন ওকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। আমি সব সময় অপুকে বলি, তুমি বলেই আমি তোমার সংসার করে গেলাম।

রাফি হোসেন : তুমি কি আসলেই ঠিকভাবে সংসার কর?

মাহি : আসলে সংসারের যেটা সেভাবে সংসার করা হয় না। অপু তো সিলেটেই থাকে প্রতি বৃহস্পতিবার শ্যুটিং শেষ করে সিলেট চলে যাই আমি। শ্যুটিং থাকে না যখন, আমি আবার সিলেটে থাকি। আমার জীবনে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত অপুকে বিয়ে করেছি। কারণ ও আমার জীবনটাকে বিভিন্নভাবে গোছাতে সাহায্য করে।

রাফি হোসেন : এটা অপুও বোঝে?

মাহি : আমার জন্য অপু অনেক ভালো কিন্তু ওর জন্য আমি না।

রাফি হোসেন : তাহলে এটা কতদিন টিকবে?

মাহি : সারাজীবন থাকবে, কারণ ওকে আমি কোনোভাবেই ছাড়ব না। একটা সংসার টেকানোর জন্য যত রকম ত্যাগ স্বীকার করা দরকার, ও সেটা করবে। অনেক ভালো মনের একজন মানুষ। ওদের পরিবারে কেউ দ্বিতীয় বিয়ে করেনি। তাই আমাদের আলাদা হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।

রাফি হোসেন : ছবি নিয়ে তোমার কী পরিকল্পনা? নাকি হুট করেই অভিনয়ও বাদ দিয়ে দেবে?

মাহি : আমি জানি না। বললাম না, পরিকল্পনা করে আমার কোনো কাজ হয় না। হয়তো কোনো একদিন সকালবেলা উঠে মনে হলো আর অভিনয় করব না। কিন্তু আমার মনে হয় সে রকম সকাল আসবে না। কারণ সিনেমাটাকে খুব উপভোগ করি, ভালোবাসি।

রাফি হোসেন : একটা সংকটময় সময়ে সিনেমাতে আসা এবং সফলতার সঙ্গে এতদূর এগিয়ে যাওয়া।

মাহি : আমার মনে হয় সংকট যথাযথ প্রডাকশন হাউজের। জাজের কথাই বলি, যখন সিনেমায় সংকটাপন্ন অবস্থা চলছিল। একেবারে নতুন আমাকে আর বাপ্পিকে দিয়ে তারা কাজ করাল, সেটা কিন্তু অনেক বড় ঝুঁকি। ঝুঁকিটা নিয়ে কাজ করেছিল বলেই আমরা সফল হলাম। এভাবেই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেই নতুন কিছু হবে। কিন্তু ক’জন প্রযোজকই পারে এই রকম ঝুঁকি নিতে? সবকিছু মিলিয়ে একটা প্রপার প্রডাকশন হাউজ দরকার।

রাফি হোসেন : ‘আয়নাবাজি’ সিনেমায় নাবিলার চরিত্র যদি তুমি করতে তাহলে পারতে, এমন কি মনে হয়?

মাহি : মনে তো হয়ই। কিন্তু যে অভিনয় করেছে তার জায়গায় থেকে সর্বোচ্চ দিয়ে করেছে। আমি হলেও এত ভালো করতে পারতাম না। একজন অভিনেত্রী হিসেবে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক, সবাই তো চায় ভালো কাজ করতে।

রাফি হোসেন : এত সমস্যা থাকার পরও দর্শকরা ভালোবেসে ছবি দেখতে আসছে এই বিষয়টা কেমন লাগে?

মাহি : আমি দেখেছি একজন মানুষ সিনেমা হলে লুঙ্গি আর শার্ট পরে সিনেমা দেখতে গেছে। এত গরম সেখানে, একটু পর শার্টটা খুলে নিজে বাতাস করছে আর সিনেমা দেখছে। তখন নিজেকে অনেক গর্বিত মনে হয়। এত কষ্ট করেও আমাদের সিনেমা দেখছে।

রাফি হোসেন : এটা তো অনেক বড় পাওয়া।

মাহি : তা তো অবশ্যই। কিন্তু একটা দুঃখ, আগে যখন শাবানা ম্যাডাম, শাবনূর ম্যাডামদের সিনেমা মুক্তি পেত, তখন তো শুধু সেটা হলে মুক্তি পেত। অনেকদিন পর সেটা বিটিভিতে দেখানো হতো। সবাই হলে গিয়ে তাদের দেখত, তাদের চিনত এবং মনে রাখত। কিন্তু আমাদের সময় মানুষ হলে কম যায়, সিনেমা হলের সংখ্যাও কম, হলের পরিবেশ ভালো না। তারপরও এত কষ্ট করে যারা হলে আসে, তাদের ধন্যবাদ জানাই।

রাফি হোসেন : এত সমস্যার পরও বলব, তুমি অনেক ভাগ্যবতী। কারণ মানুষ তোমাকে চেনে, আমরা তোমাকে ডাকছি। সামনে তুমি কী করতে চাও?

মাহি : আমার চিন্তা আমি বছরে একটাও সিনেমা করব না যদি ভালো প্রডাকশন হাউজের কাজ না পাই, ভালো কাজ না পাই। এক কথায় প্রপার প্রজেক্ট না হলে আমি কাজ করব না।

রাফি হোসেন : কলকাতার ছবিতেও তো কাজ করেছো, ওখানকার ফিডব্যাক কেমন?

মাহি : মোটামুটি। কারণ কলকাতার যারা দর্শক, তারা ওখানকার ছবিই বেশি দেখে।

রাফি হোসেন : নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত কর? অনেকে আছে, যারা ভোগান্তিতে ফেলে। তুমিও কি অনেক ভোগাও।

মাহি : আমি ভেগে যাই শ্যুটিং থেকে। যখন আমার মনে হয় আমি এই শটের জন্য প্রপার না, তখন চলে যাই।

রাফি হোসেন : তারপর?

মাহি : তারপর সবকিছু ঠিক করে ওরা আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে ফোন দেয়, তখন এসে কাজ শুরু করি।

রাফি হোসেন : তাহলে তুমি আগে কেন ঠিকঠাক করে প্রস্তুতি নাও না?

মাহি : না, আগে থেকে সব ঠিকই থাকে। কিন্তু পরিচালক যখন আমাকে গল্প শোনান, এমন হেলিকপ্টার থেকে তুমি নামবে, বাতাসে তোমার চুলগুলো উড়বে। তারপর যখন শ্যুটিংয়ে যাই, হয়তো হেলিকপ্টার আসছে কিন্তু গিয়ে দেখি ভ্যান গাড়ি। আমি চড়ে পা ঝুঁলিয়ে বসে আসছি তখনই মন অন্যদিকে চলে যায়।

রাফি হোসেন : সিনেমার নায়িকাদের নিয়ে বিভিন রকম কথা শুনি। তোমার ক্ষেত্রেও হয়তো হয়েছে। এই বিষয়গুলো তোমার কাছে কতটা সত্য মনে হয়?

মাহি : কিছুটা সত্য আবার সবগুলো সত্যও না। কারো ক্ষেত্রে কম হয় বেশি শোনা যায় আবার কারো ক্ষেত্রে বেশি হয় কম শোনা যায়।

রাফি হোসেন : এই বিষয়গুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রণ কর?

মাহি : এসব নিয়ে কোনো চিন্তা করি না। কেউ একজন বলল এটা হয়েছে, সবাই বলাবলি করছে। আমি বলি হোক। আমি এসব নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাই না। ওই সময়টাতে বেশি খুশি থাকার চেষ্টা করি। কারণ তখন যদি আমি ভেঙে পড়ি, তাহলে সবাই সেটা নিয়েই আমাকে বেশি বলবে, বেশি চর্চা করবে। যখন এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেব না, তখন এমনি এমনি সবাই চুপ হয়ে যাবে।

রাফি হোসেন : তোমার সঙ্গে কথা বলে অনেক অনেক ভালো লাগল। আমার সত্যিই মনে হলো তুমি একজন সৎ এবং সোজা মনের মানুষ।

মাহি : তখন তো এত কিছু জানতেই চাননি।

রাফি হোসেন : তখন তুমিও একটু নতুন ছিলে আর এখন তোমার নিজের প্রতি একটা আস্থা তৈরি হয়েছে। আমি আশা করব তুমি আরো সফল হও, আরো অনেক দূরে এগিয়ে যাও। তুমি দর্শকদের জন্য কিছু বলতে চাইলে বল।

মাহি : দর্শদের বলব, আপনাদের ভালোবাসায় মাহি হয়েছি। আপনাদের জন্যই আজ সাক্ষাৎকার দিতে পারছি। আপনাদের কাছে বিনীত অনুরোধ, সবসময় আমার পাশে থাকবেন। হলে গিয়ে সবাই বাংলা ছবি দেখবেন।

অনুলিখন : রওনাক ফেরদৌস

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup