গরমে কীভাবে পরিচ্ছন্ন থাকা যায়?

গরম এখন তুঙ্গে। এটি আশা করি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত গরমের অসহনীয় তাপ আমরা সহ্য করছি। তাপ না থাকলেও ভ্যাপসা আবহাওয়া তো আছেই। আপনি যতই চান না কেন, সারাক্ষণ তো আর এয়ারকন্ডিশনড ঘরে বদ্ধ থাকা সম্ভব না! কাজের তাগিদে দিনের বেশিরভাগ সময়েই আমাদের কাটাতে হয় অস্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ কোনো স্থানে।

গরমে সামান্য একটু তাপেই আমরা অনেক ঘেমে যাই। আর ঘাম মানেই ব্যাকটেরিয়া। এসব অদৃশ্য ব্যাকটেরিয়াগুলোই ছড়ায় ঘামের দুর্গন্ধ। আমাদের সবার শরীরে ঘামের দুর্গন্ধের মাত্রা একরকম না। কারণ কারো কারো শরীরে এই ব্যাকটেরিয়ার প্রকোপ বেশি থাকে আবার কারো কারো ক্ষেত্রে কম থাকে।

শুধু ঘামই গরমের একমাত্র সমস্যা না। এই ঘামের কারণে ত্বকের সমস্যা ছাড়াও জ্বর, সর্দি, কাশি থেকে শুরু করে ইনফ্লুয়েঞ্জা, টাইফয়েডের মতো মারাত্মক রোগও দেখা দিতে পারে। তবে এসব শুধু তাদের জন্য যারা গরমের সময় নিজেদের পরিচ্ছন্নতার দিকে বাড়তি নজর দেন না।

সত্যি বলতে আমাদের এই ব্যস্ত জীবনে নিজের প্রতি সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখা একটু কঠিনই। কতদিনই আপনার মনে হতে পারে আজ থাক, গায়ের কাপড়টা কাল ধুয়ে নেবেন! কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এই গরমকালে আপনার ঘামে সিক্ত কাপড়ে যে কী পরিমাণ ময়লা আর জীবাণু জমে আছে তা জানা থাকলে এভাবে ভাবতে পারতেন না!

যা হোক। এই লেখার উদ্দেশ্য আপনাকে ভয় পাইয়ে দেয়ার জন্য মোটেও না। বরং আমরা চাই এই গরমে আপনি ও আপনার পরিবার থাকুক সুস্থ ও প্রাণবন্ত। তার জন্য মেনে চলতে পারেন সামান্য কয়েকটি নিয়ম-

গোসল! গোসল... এবং গোসল

এটি বলে দেয়ার মতো কোনো বিষয় নয়। গরমের প্রতি আমাদের স্বাভাবিক আচরণ হচ্ছে গোসল করা। কিন্তু অতিরিক্ত গোসলের ফলে হিতে বিপরীতও হতে পারে। দিনে ৪-৫ বার গোসল না করে আপনার সময় ঠিক করে ফেলুন। সাধারণত বাইরে থেকে এসে আর রাতে ঘুমানোর আগে- এই দুই সময়ে গোসল করলে গরমে আপনি স্বস্তি পাবেন। অনেকে গায়ে ঘাম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গোসলে চলে যান। এটি করবেন না।

গরমকালে আপনি দিনে বেশ কয়েকবারই ঘামাবেন। কিন্তু প্রতিবার গোসল করে ঘাম তাড়াতে গেলে শরীর এর প্রতি নেগেটিভলি রিঅ্যাক্ট করবে। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে গোসল করা বেশি ভালো উপায় না কারণ এতে আপনি আরো দ্রুত ঘামাবেন।

আদর্শ সময় হচ্ছে বাইরে থেকে বাসায় এসে কিছুক্ষণের মধ্যেই গোসলে চলে যাওয়া। শরীরে যেন ঘাম না শুকিয়ে যায়। গোসলের পানিতে নিমের রস দিলে শরীরের জীবাণুগুলো চলে গিয়ে রোমকূপ পরিষ্কার হবে। পরিষ্কার রোমকূপে বাতাস আসা-যাওয়া করতে পারবে, আপনার ত্বক ভালো করে নিঃশ্বাস নিতে পারবে আর আপনি কম ঘামাবেন।

পরিষ্কার জামাকাপড় পরা

নোংরা কাপড় গরমকালের আরেকটি বড় সমস্যা। গরমকালে বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকে, যা নানা রোগজীবাণু বহন করে। এছাড়া এ সময় ধুলাবালির পরিমাণও বেড়ে যায়। ঘাম এ সময় কাপড় নোংরা হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ।

পরিষ্কার কাপড় পরলে এর মধ্য দিয়ে বাতাস চলাচল সহজ হয়, যা আপনার ত্বককে শ্বাস নিতে সাহায্য করবে। পরিষ্কার কাপড় সবসময়েই পরা উচিত, তবে গরমে এই ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

প্রতিদিন বাইরে থেকে এসে আপনার পরনের কাপড় খুলে রোদে ঘাম শুকাতে দিন। কখনোই ঘামে ভেজা কাপড় সরাসরি ভাঁজ করে কোথাও রাখবেন না। রোদ না থাকলে বাতাস আছে এমন স্থানে কাপড় ছড়িয়ে রাখুন।

কাপড়ের সঙ্গে আমাদের অন্তর্বাস ও পায়ের মোজা পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি। এই কাপড়গুলো আমাদের শরীরের সঙ্গে এঁটে থাকে বিধায় ময়লা হওয়ার ঝুঁকি এগুলোর বেশি। প্রতিদিন আপনার অন্তর্বাস ও মোজা কুসুম গরম পানিতে ধুয়ে রোদে শুকাতে দিন।

মুখের ভেতরে পরিষ্কার

আমাদের সবচেয়ে বেশি অবহেলিত স্থান মনে হয় আমাদের মুখের ভেতর। আমরা যদিও মনে করি দিনে দু’বার দাঁত ব্রাশ করা যথেষ্ট কিন্তু সত্যি বলতে দাঁতের গোড়ায় প্রতিদিন যে অসংখ্য ময়লা জমে, তা শুধু ব্রাশ করে বিদায় করা সহজ না।

বাজারে অনেক ধরনের ডেন্টাল ওয়াশ ও ফ্লস পাওয়া যায়। প্রতিদিন কমপক্ষে একবার মাউথওয়াশ ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। চা, কফি ও ধূমপান অতিরিক্ত হলে আমাদের মুখে দুর্গন্ধ ছড়ায়। গরমে আমরা যদি প্রচুর পানি পান না করি, তাহলেও আমাদের মুখে দুর্গন্ধ হয়ে যায়, যা অন্যের জন্য বিরক্তি ও আমাদের জন্য লজ্জার কারণ হতে পারে।

এই গরমকালে আপনার দাঁত ও মুখের ভেতরের পরিচ্ছন্নতা অবশ্যই নিশ্চিত করুন।

হাত ও পায়ের জন্য যা করবেন

মুখের মতোই হাত ও পায়ের বাড়তি যত্নের কথা আমরা যেন ভুলেই যাই। কিন্তু এই পা এবং হাত প্রতিনিয়ত আমাদের সব কাজ করতে সাহায্য করে চলছে। অনেকের গরমে হাতের তালু ঘামানোর সমস্যা আছে। গরমে পায়ের গোড়ালি ফেটে যাওয়ার ঘটনাও অস্বাভাবিক না।

হাত ও পায়ের যত্নের প্রথম ধাপ হলো সবসময় এদের পরিষ্কার রাখা। দিনে অন্তত ৩-৪ বার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া উচিত। খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন ছাড়াও রাতে ঘুমানোর আগে বা বাইরে থেকে এসেই হাত ও মুখ ভালো করে ধুতে ভুলবেন না। অনেকে বাইরে থেকে এসে হাত-মুখ না ধুয়ে কিছুক্ষণ পর গোসলে চলে যান, অনেকে আবার মুখ-হাত না ধুয়েই অন্য কাজে চলে যান।

গরমে যাদের তৈলাক্ত ত্বক তাদের রোমকূপে অনেক তেল জমে, যা পরে ব্রণ ও অন্যান্য ত্বকের সমস্যা সৃষ্টি করে। গরমে যেহেতু জীবাণুর প্রকোপ বেশি থাকে, তাই সাবান দিয়ে হাত না ধুয়ে কোনো কিছু খাওয়া বা নিজের ত্বক স্পর্শ করাও উচিত না।

এই সময় ব্যাগে বা পকেটে অবশ্যই ফেসিয়াল টিস্যু নিয়ে নেবেন। ফেস ওয়াইপ ব্যবহার করেও গরমের অনেক ধরনের ত্বকীয় সমস্যা থেকে বাঁচা সম্ভব।

নিজের শোবার ঘরের যত্ন

পরিচ্ছন্ন ঘর কার না ভালো লাগে। ঘরের অন্যান্য স্থান আপনার এখতিয়ারে না থাকলেও নিজের শোবার ঘরের প্রতি অন্তত যত্নবান হওয়া চাই। সকালে ঘুম থেকে উঠেই সব জানালা খুলে ঘরে মুক্ত বাতাস চলাচলের সুযোগ করা উচিত। কোথাও বেশিদিন ধুলো জমতে দেবেন না। শোবার ঘর বা অন্য কোথাও টবে গাছ থাকলে খেয়াল রাখবেন সেখানে যেন ভুলেও পানি জমে না থাকে। এসব জমানো পানিতে এডিস, এনোফিলিস ইত্যাদি মারাত্মক মশারা বংশবিস্তার করে।

ঘরের ওপরে ঝুল জমে গেলে সেগুলোর দিকেও নজর দিন। বিছানার চাদর সপ্তাহে একবার ধুয়ে ফেলুন। বালিশে গরমকালে সবচেয়ে বেশি ধুলা-ময়লা জমে বলে বালিশের কভার প্রতি ৩-৪ দিন পরপর পাল্টে ফেলা ভালো। বালিশের কভারে জমে থাকা ধুলা আমাদের মুখের সংস্পর্শে এসে আমাদের মুখের লোমকূপ বন্ধ করে দেয়।

তাছাড়া গরমকালে বিছানার চাদর ঘেমে যায়। এ সময় বাইরে যে রোদ ওঠে তার পূর্ণ সুযোগ নিন- বালিশ, চাদরসহ বিছানার আনুষঙ্গিক জিনিস রোদে শুকাতে দিন। এতে কয়েক সপ্তাহেই আপনি পার্থক্য বুঝতে পারবেন।

গরমে শীতকালের তুলনায় বেশি এয়ার ফ্রেশনার ব্যবহার করা হয়। তবে খুব কড়া সুগন্ধি গরমে ব্যবহার না করা ভালো। কারণ এতে বাতাস ভারী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এছাড়াও শিশুদের প্রতি এই সময়ে বাড়তি মনোযোগ দিতে হয়। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বড়দের তুলনায় কম বলে সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। সব সময় খেয়াল রাখবেন আপনার বাচ্চা যেন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করছে। তাদের হাত-পায়ের নখ বড় হতে দেয়া যাবে না এই সময়।

দিনে একবার প্রতিদিনই গোসল করাতে হবে আর ঘেমে গেলে কুসুম গরম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে মুছে মুছে দিন। তাদের খাবারে পর্যাপ্ত পরিমাণ ফাইবার যেমন- পালং শাক, বাদাম, কলা-কমলা ইত্যাদি খাবার রাখুন।

কিছু ছোট ছোট টিপস-

* খাবার সবসময় ঝুরির ঢাকনিতে ঢেকে রাখুন

* আপনার কলতলা ও বাথরুম প্রতিদিন পরিষ্কার ও শুষ্ক রাখার চেষ্টা করুন

* আপনার কাপড় প্রতি দুই সপ্তাহ পরপর রোদে শুকাতে দিন

* জুতা-মোজা ভালোভাবে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে ব্যবহার করুন

* অপরিষ্কার রুমাল ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন

* ঘরের আনাচে-কানাচে জীবাণুনাশক ওষুধ ব্যবহার করুন

* নিজের ঘরে বেশি বেশি গাছ লাগানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup