দেশি ফলের সাতকাহন

চলছে বর্ষাকাল। বাজারে শোভা পাচ্ছে টসটসে রসালো দেশি ফল। গ্রীষ্মকালীন ফল ও বর্ষার ফলের রয়েছে নানা পুষ্টিগুণ। আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম, তরমুজ ইত্যাদি রসালো ফল সহজলভ্য এই মৌসুমে। একেক ফলের রয়েছে একেক পুষ্টিগুণ। প্রতিটি মৌসুমি ফলই শরীরের নানা রকম ভিটামিন ও খনিজের অভাব পূরণ করতে সাহায্য করে।

কাঁঠাল

কাঁঠাল একটি সুস্বাদু রসালো ফল। এর রয়েছে নানা পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা। জাতীয় এই ফল দেশের প্রায় সব জেলাতেই কম-বেশি হয়। তবে ঢাকা জেলার গাজীপুর, টাঙ্গাইল, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, ময়মনসিংহ ও নরসিংদী এলাকায় কাঁঠাল বেশি জন্মে। গাজীপুরে রয়েছে এই ফলের সবচেয়ে বড় বাজার। কাঁঠালে রয়েছে প্রচুর শর্করা, আমিষ ও ভিটামিন-এ। কাঁচা কাঁঠাল তরকারি হিসেবে আর পাকলে ফল হিসেবে খাওয়া যায়। এর দানা ভেজে কিংবা রান্না করে খেতেও মজা। কাঁঠালে রয়েছে প্রচুর ভেষজগুণ। এর শাঁস ও দানা চীনে বলবর্ধক হিসেবে বিবেচনা করে। ফলটি সাধারণত জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে পাকে। কাঁঠালে বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন-এ, সি, বি-১, বি-২, পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেশিয়ামসহ নানা রকমের পুষ্টি ও খনিজ উপাদান পাওয়া যায়। এসব উপাদান আমাদের শরীরকে সুস্থ ও সবল রাখতে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি ভিটামিনের চাহিদাও পূরণ করে কাঁঠাল। কাঁঠালে সামান্য পরিমাণ প্রোটিনও পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা কাঁঠালে ১.৮ গ্রাম, কাঁচা কাঁঠালে ২০৬ গ্রাম ও কাঁঠালের বীজে ৬.৬ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায়। এই প্রোটিন দেহের গঠনে সাহায্য করে। কাঁঠালে রয়েছে শ্বেতসার। পাকা কাঁঠালে ০.১ গ্রাম, কাঁচা কাঁঠালে ০.৩ ও কাঁঠালের বীজে ০.৪ গ্রাম শ্বেতসার পাওয়া যায়। কাঁঠালে ভিটামিন-এ পাওয়া যায়। ভিটামিন-এ দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। কাঁঠালের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান চোখের রেটিনার ক্ষতি প্রতিরোধ করে। কাঁঠালে ভিটামিন-বি-১ ও বি-২ পাওয়া যায়। পাকা কাঁঠালে ০.১১ মিগ্রা, কাঁচা কাঁঠালে ০.৩ মিগ্রা ও কাঁঠালের বীচিতে ১.২ মিগ্রা বি-১ পাওয়া যায়। পাকা কাঁঠালে ০.১৫ মিগ্রা, কাঁচা কাঁঠালে ০.৯ মিগ্রা এবং কাঁঠালের বীচিতে ০.১১ মিগ্রা বি-২ পাওয়া যায়। কাঁঠালে রয়েছে ভিটামিন-সি। পাকা কাঁঠালে ২১ মিগ্রা, কাঁচা কাঁঠালে ১৪ মিগ্রা এবং কাঁঠালের বীজে ১১ মিগ্রা ভিটামিন-সি পাওয়া যায়, জানিয়েছেন ফারাহ মাসুদা। কাঁঠালে কিছু পরিমাণ আয়রন পাওয়া যায়। পাকা কাঁঠালে আয়রনের পরিমাণ ০.৫ মিগ্রা, কাঁচা কাঁঠালে ১.৭ মিগ্রা এবং বীজে ১.৫ মিগ্রা। চাহিদা অনুযায়ী আয়রন গ্রহণ করে পেটের অসুখ, সংক্রামক রোগ, যেমন- ম্যালেরিয়া, কৃমি, আলসার, রক্ত আমাশয় ইত্যাদি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। কাঁঠালে রয়েছে পটাশিয়াম, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। তাছাড়া সঠিক পরিমাণে কাঁঠাল খেলে স্ট্রোকের ঝুঁকিও অনেকটা কমে যায়। কাঁঠালের হলুদ ও রসালো অংশে রয়েছে ক্যান্সার প্রতিরোধক উপাদান। অ্যান্টিঅক্সিডেন্টেরও একটি ভালো উৎস। কাঁঠাল হজমে সাহায্য করে, কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিহত করে।

আম

বাজারে হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে পাকা আম। আম পাকা বা কাঁচা যা-ই খান না কেন, আমের রয়েছে নানাবিধ পুষ্টিগুণ। জনপ্রিয়তা ও স্বাদে অন্য ফল থেকে এগিয়ে থাকে আম। স্বাদ, পুষ্টি ও গন্ধে আম অতুলনীয়। এ দেশের প্রায় সব জেলাতেই আম হয়। অনুকূল আবহাওয়া ও উন্নত মাটি আম চাষের উপযোগী। তবে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর আম চাষের জন্য বিখ্যাত। পাকা আমে রয়েছে প্রচুর ক্যারোটিন। আম লিভার বা যকৃতের জন্য ভীষণ উপকারী। রাতকানা ও অন্ধত্ব প্রতিরোধে কাঁচা ও পাকা আম অতুলনীয়। কাঁচা আম দিয়ে আমরা সাধারণ আম-তেল, আম ডাল, আমের আচার তৈরি করে খেয়ে থাকি। আমের গুণের কথা আমাদের অনেকেরই অজানা। পেট, ত্বক ও চুলের যতেœ আমের জুড়ি নেই। পুষ্টিবিদদের মতে, আমের শাঁস থেকে আঁটি পুরোটাতেই রয়েছে নানাবিধ উপকারিতা। আম খেলে শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমে। এছাড়া হজমশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এই ফল। আমে রয়েছে উচ্চ পরিমাণে ভিটামিন-সি ও ফাইবার, যা রক্তে উপস্থিত খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। আম শরীরের প্রোটিন অণুগুলো ভেঙে ফেলতে সাহায্য করে। ফলে হজমশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। আমের আঁশে থাকা ভিটামিন-সি, যা ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়। আম বাটা মাখলেও ত্বকে রোমের মুখগুলো খুলে গিয়ে ত্বক পরিষ্কার থাকে। শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন-এ-এর চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশের জোগান দিতে পারে আম। তাই আম চোখের জন্যও উপকারী। ভিটামিন-এ চোখের দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি এবং রাতকানা রোগ থেকে রক্ষা করে। আমে রয়েছে প্রায় ২৫ রকমের বিভিন্ন কেরাটিনোইডস। তাই আম খেলে আপনার ইমিউন সিস্টেমকে রাখবে সুস্থ ও সবল। আমে রয়েছে টারটারিক অ্যাসিড, ম্যালিক অ্যাসিড ও সাইট্রিক অ্যাসিড, যা শরীরের ক্ষার ধরে রাখতে সাহায্য করে। আমে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে। শরীরে শক্তি জোগান দিতে আমের জুড়ি নেই।

জাম

বাংলাদেশের সুপরিচিত একটি ফল জাম। কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট, পাবনা, দিনাজপুর অঞ্চলে সাধারণত জাম বেশি পাওয়া যায়। এই ফলের কচিপাতা পেটের অসুখ সারাতে সহায়ক। আম ও জামের রস একত্রে খেলে বহুমূত্র রোগ ভালো হয়। লোকমুখে প্রচলিত আছে, জামের রস রক্তকণিকা পরিষ্কারে সহায়তা করে। কালো জামে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি উপাদান আছে। যেমন- ক্যালশিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম এবং ভিটামিন-সি থাকে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে জাম অতুলনীয় কাজ করে। এছাড়া শরীরের হাড়কে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে জাম। কালো জাম ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। জামের গ্লিসামিক ইনডেক্স কম হওয়ায় এটি ডায়াবেটিসের জন্য ভালো বলে বৈজ্ঞানিকভাবেও প্রমাণিত। জামে অ্যালার্জিক অ্যাসিড বা অ্যালাজিটেনিন্স, এন্থোসায়ানিন এবং এন্থোসায়ানিডিন্স থাকে। এই উপাদানগুলো শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে বলে কোলেস্টেরলের জারণ রোধ করে এবং হৃদরোগ সৃষ্টিকারী প্লাক গঠনে বাধা দেয়। জাম হাইপারটেনশন প্রতিরোধে সাহায্য করে। কারণ এতে প্রচুর পটাশিয়াম থাকে। ১০০ গ্রাম জামে ৫৫ গ্রাম পটাশিয়াম থাকে। এক গবেষণায় জানা গেছে, জাম ফলের নির্যাসে রেডিওপ্রোটেক্টিভ উপাদান থাকে। জামের নির্যাস ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ফ্রি র‌্যাডিক্যালের কাজ ও বিকিরণে বাধা দেয়। কালো জাম ত্বককে তারুণ্যদীপ্ত হতে সাহায্য করে। জাম ব্রেইন অ্যালার্ট হিসেবে কাজ করে এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। কালো জাম টিস্যুকে টান টান হতে সাহায্য করে।

লিচু

মৌসুমি ফল লিচু ভিটামিন ও খাদ্যশক্তির অন্যতম উৎস। এতে রয়েছে মানব শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান। শ্বেতসার এবং ভিটামিন-সি’র ভালো উৎস। ছোট-বড় সব বয়সের মানুষই এই সুস্বাদু ফল খেতে পারে। লিচুতে রয়েছে সামান্য পরিমাণে প্রোটিন ও ফ্যাট, যা মানব দেহের জন্য প্রয়োজন। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে রয়েছে ১.১ গ্রাম প্রোটিন এবং ০.২ গ্রাম ফ্যাট। লিচুতে পর্যাপ্ত পরিমাণে শ্বেতসার পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে ১৩.৬ গ্রাম শ্বেতসার থাকে। এছাড়া লিচুতে ০.০২ গ্রাম ভিটামিন-বি ১ এবং ০.০৬ গ্রাম বি ২ রয়েছে। এছাড়াও এতে কিছু পরিমাণে খনিজ লবণ থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে ০.৫ গ্রাম খনিজ লবণ পাওয়া যায়। লিচুতে রয়েছে ভিটামিন-সি, যা ত্বক, দাঁত ও হাড়ের জন্য ভালো। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে ৩১ মিগ্রা ভিটামিন-সি পাওয়া যায়। নানারকম চর্মরোগ ও স্কার্ভি দূর করতে সাহায্য করে ভিটামিন-সি। তাছাড়া এটি ত্বক উজ্জ্বল করতে ও বলিরেখা কমাতেও সাহায্য করে। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে ১০ মিগ্রা ক্যালশিয়াম রয়েছে। ক্যালশিয়াম দেহের হাড় গঠন করে ও হাড়ের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। লিচুতে অল্প পরিমাণে লৌহ পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রামে ০.৭ মিগ্রা লৌহ আছে। এছাড়াও লিচুতে রয়েছে থিয়ামিন, নিয়াসিন ইত্যাদি, যা লিচুর পুষ্টিগুণ আরো বৃদ্ধি করে। এসব ভিটামিন শরীরের বিপাক ক্ষমতা বাড়ায়। শক্তির ভালো উৎস লিচু। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচু থেকে ৬১ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। এটি শরীরের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। পাশাপাশি চর্বি কমাতে সাহায্য করে। লিচু মানবদেহে ক্যান্সার হওয়ার প্রবণতা হ্রাস করে। ক্যান্সার সৃষ্টিকারী কোষ ধ্বংস করে। এতে অবস্থিত ফ্ল্যাভানয়েডস নামক উপাদান স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। লিচুতে রয়েছে ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম এবং অন্যান্য খনিজ উপাদান, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। রাজশাহী, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম জেলায় লিচু বেশি উৎপন্ন হয়।

গরমে ক্লান্তি দূর করতে এই ফলের তুলনা হয় না। প্রায় সব জেলাতেই চাষ হয়। এখন হাইব্রিড জাতের তরমুজ চাষ হচ্ছে। তরমুজ তৃষ্ণা মেটায়। রক্তস্বল্পতা দূর করে। এতে রয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে লৌহ পদার্থ। এটি মৌসুমি ফল হলেও হাইব্রিড তরমুজ এখন সারা বছরই পাওয়া যায়। তরমুজে পানির পরিমাণ বেশি থাকায় গরমে তরমুজের চাহিদা থাকে তুঙ্গে। তরমুজের রসে ভিটামিন-এ, সি, বি২, বি৬, ই এবং ভিটামিন-সি, ছাড়াও পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, বিটা ক্যারোটিন ইত্যাদি থাকলেও ক্যালোরির মাত্রা কম। ফলে তরমুজ থেকে ওজন বেড়ে যাওয়ার টেনশন নেই। তরমুজে প্রচুর পরিমাণ পানি আছে। গরমের সময় যখন ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি বের হয়ে যায়, তখন তরমুজ খেলে শরীরের পানিশূন্যতা দূর হয়। ফলে শরীর থাকে সুস্থ ও সতেজ। তরমুজে আছে ক্যারোটিনয়েড। তাই নিয়মিত তরমুজ খেলে চোখ ভালো থাকে এবং চোখের নানা সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ক্যারোটিনয়েড রাতকানা প্রতিরোধেও কার্যকর ভূমিকা রাখে। তরমুজের রস কিডনির বর্জ্য মুক্ত করে। তাই কিডনিতে পাথর হলে চিকিৎসকরা ডাবের পানির পাশাপাশি তরমুজ খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তরমুজে থাকা ম্যাগনেশিয়াম ও পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।

বাঙ্গি

বাঙ্গি বা ফুটি গরমকালের অন্যতম একটি ফল। সুগন্ধযুক্ত সাধারণ স্বাদের বাঙ্গি পুষ্টিগুণে অনন্য। বাজারে এখন নানা আকৃতির বাঙ্গির দেখা পাওয়া যাচ্ছে। বাঙ্গি নানা স্বাস্থ্য উপকারী গুণে ভরপুর। বাঙ্গিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফলিক অ্যাসিড, যা রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে। তাই মানুষের জন্য বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের জন্য বাঙ্গি বিশেষ উপকারী ফল। বাঙ্গিতে কোনো চর্বি নেই। দেহের ওজন কমাতে এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে বাঙ্গির ভূমিকা অপরিহার্য। বাঙ্গিতে রয়েছে উচ্চমাত্রার বিটা ক্যারোটিন ও ভিটামিন-সি। বিটা ক্যারোটিন ও ভিটামিন-সি শরীরের ক্ষত দ্রুত সারাতে সাহায্য করে। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পানি, যা গরমে শরীরের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে সাহায্য করে। গরম ও অতিরিক্ত রোদের জন্য হয় সানবার্ন, সামার বয়েল, হিট হাইপার পাইরেক্সিয়া। বাঙ্গির রস এই অসুখগুলো প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। অ্যাসিডিটি, আলসার, নিদ্রাহীনতা, ক্ষুধামন্দা, নারীদের হাড়ের ভঙ্গুরতা রোধ করতে সাহায্য করে বাঙ্গি। পুরুষের হাড়ও মজবুত করে বাঙ্গি। মনের অবসাদ দূর করার ক্ষমতাও রয়েছে এ ফলের। ত্বকের ব্রণের সমস্যা কিংবা একজিমা সমস্যায় যারা ভুগে থাকেন, তাদের জন্য বাঙ্গি অনেক উপকারী। ভিটামিন-বি-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ইন্সনিটোল, যা আমাদের নতুন করে চুল গজাতে সাহায্য করে এবং চুল পড়া প্রতিরোধ করে। এই উপাদানটি বাঙ্গিতে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। নিয়মিত বাঙ্গি খেলে চুল হয় স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ও সুন্দর।

আনারস

সিলেট, মৌলভীবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও নরসিংদী জেলায় এই ফল বেশি হয়। পাকা আনারস শক্তি বাড়ায়। কফ নিরাময়ে সহায়ক, পিত্তনাশক এবং হজম বৃদ্ধি করে। এ ফলের শাঁস ও পাতার রস মধুর সঙ্গে মিশিয়ে খেলে কৃমি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আনারসের জ্যাম-জেলি তৈরি করেও সংরক্ষণ করা যায়। আনারস বাংলাদেশের একটি পুষ্টিকর ফল। এতে ভিটামিন-এ, বি, সি, ক্যালশিয়াম ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে। সারা পৃথিবীতে প্রায় ৮০-৯০ জাতের আনারস চাষ করা হয়। বাংলাদেশে হানিকুইন, জায়েন্ট কিউ (কালেঙ্গা) ও ঘোড়াশাল- এই তিন জাতের আনারস চাষ হয়ে থাকে। আনারসের ফলে ৮৬% পানি থাকে। আহার উপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম আনারসে রয়েছে প্রোটিন ০.৯ গ্রাম, শ্বেতসার ৬.২ গ্রাম, ০.১১ মিগ্রা ভিটামিন-বি-১, ০.০৪ মিগ্রা ভিটামিন-বি-২, ভিটামিন-সি ২১ মিগ্রা, ক্যালশিয়াম ১৮ মিগ্রা, লৌহ ১.২ মিগ্রা ও ক্যারোটিন ১৮.৩০ মিগ্রা। এছাড়াও রয়েছে ৪২ কিলোক্যালোরি খাদ্যশক্তি। কাঁচা ফল স্বাদে অম্ল, আর পাকা ফল মধুরাম্ল। আমাদের দেশে সাধারণত পাকা ফল খাওয়া হয়। তবে কেউ কেউ কাঁচা আনারসের চাটনি রান্না করে খেয়ে থাকেন। আনারস কফ, পিত্ত ও অরুচিনাশক। এর পাতার রস কৃমিনাশক। পাকা ফলের সদ্য রসে ব্রোমেলিন নামের একজাতীয় জারক রস থাকে বলে পরিপাক ক্রিয়ায় সহায়ক হয়। এর রস জন্ডিস রোগে উপকারী। এখন আনারসের ভরা মৌসুম।

পেয়ারা

স্বাদ, পুষ্টিগুণ আর স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রাখলে পেয়ারা খেলে প্রচুর লাভ। স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পেয়ারা রাখা যেতে পারে। এতে আছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন-সি ও লাইকোপেন, যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই দরকারি। পেয়ারার বিশেষ পাঁচটি গুণের মধ্যে রয়েছে, এটি ডায়াবেটিসের জন্য উপকারী, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, চোখের জন্য ভালো, পেটের জন্য উপকারী আর ক্যান্সার প্রতিরোধী। নিয়মিত পেয়ারা খেলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে। কারণ পেয়ারায় যে আঁশ আছে, তা শরীরে চিনি শোষণ কমাতে পারে। পেয়ারায় যে পরিমাণ ভিটামিন-সি থাকে, তা শরীরে গেলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে শরীরের রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। পেয়ারায় থাকা ভিটামিন-এ চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়। রাতকানা রোগ থেকে বাঁচায়। পেয়ারা ডায়রিয়ার বিরুদ্ধে লড়তে পারে। তাই নিয়মিত পেয়ারা খেলে ডায়রিয়া হওয়ার আশঙ্কা কমে যাবে অনেকটা। পেয়ারার আছে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা। ক্যান্সার প্রতিরোধেও পেয়ারা কাজ করে। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, লাইকোপেন, ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে পারে। নির্দিষ্ট করে বললে, প্রোস্টেট ক্যান্সার আর স্তন ক্যান্সারের জন্য পেয়ারা উপকারী।

করমচা

বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত গ্রীষ্মকালীন টক জাতীয় একটি ফল। করমচা ফল যমন পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ, তেমনি এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো। করমচা শরীরের জন্য ভালো হলেও যাদের রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি, তাদের করমচা না খাওয়াই ভালো। ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ করমচা মুখের রুচি ফেরাতে দারুণ কার্যকর। এটি রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রেখে হৃৎপিণ্ডের সুরক্ষা দেয়। যকৃত ও কিডনির রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে এই ফল। ডায়াবেটিস ও হার্টের রোগীদের অন্যতম উপকারী ফল করমচা। ওষুধের বিকল্প হিসেবে কৃমিনাশকের কাজ করে। করমচা চর্বি এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমায়। ত্বকের সুস্থতা ও রোগ প্রতিরোধে বেশ কার্যকর। অতিরিক্ত ওজন কমায়। বাতরোগ কিংবা ব্যথাজনিত জ্বর নিরাময়ে করমচা বেশ উপকারী। স্কার্ভি, দাঁত ও মাড়ির নানা রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।

লটকন

বর্ষার ফল লটকন। টকমিষ্টি এই ফলটি মানুষের কাছে খুব প্রিয়। বর্ষার মৌসুমে দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্রি হতে দেখা যায় লটকন। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-বি রয়েছে। এতে রয়েছে ভিটামিন-সি, আমিষ, লৌহ ও খনিজ পদার্থ। লটকন খেলে সহজেই বমি বমি ভাব দূর হয়। মুখের রুচি বাড়ে। এটি মানসিক চাপ কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। লটকন গাছের শুকনো পাতার গুঁড়ো ডায়রিয়া সারতে উপকারী। এ গাছের ছাল ও পাতা চর্মরোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। লটকন ফলের বীজ গনোরিয়া রোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত। স্থানীয়ভাবে লটকনের বেশ কয়েকটি নাম রয়েছে; যেমন- ডুবি, বুবি, কানাইজু, লটকা, লটকাউ ইত্যাদি। তবে অধিকংশ মানুষ এটাকে লটকন নামেই চেনে।

জামরুল

জামরুল বা গোলাপজাম অথবা সাদা জাম কয়েক নামেই পরিচিত জামরুল। জামরুল খেতে পানসে, দেখতে ঘণ্টাকৃতি। জামরুল ফলের মিষ্টতা বেশি না হলেও এই ফলটি খেতে খুবই সুস্বাদু। জামরুল সাদা, হালকা সবুজ, গোলাপি, লাল এবং কালো বর্ণেরও হয়। জামরুল স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী। এতে খনিজ পদার্থ রয়েছে কমলার তিন গুণ এবং আম, আনারস ও তরমুজের সমান। ক্যালশিয়ামের পরিমাণ লিচু ও কুলের সমান এবং আঙুরের দ্বিগুণ। আয়রনের পরিমাণ কমলা, আঙুর, পেঁপে ও কাঁঠালের চেয়েও বেশি। ফসফরাসের পরিমাণ আপেল, আঙুর, আম ও কমলার চেয়ে বেশি। জামরুলের উচ্চমাত্রার ফাইবার হজমের জন্য দারুণ উপকারী। কোষ্ঠকাঠিন্য বলতে কোনো সমস্যাই থাকে না। এর বীচি ডায়রিয়া প্রতিরোধে অনেকটা ওষুধের মতো কাজ করে। এর জাম্বোসাইন হচ্ছে একধরনের ক্ষারজাতীয় উপাদান। এটি স্টার্চকে চিনিতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সুস্থ মানুষের দেহে ডায়াবেটিস বাসা বাঁধা ঠেকিয়ে দিতে দক্ষ জামরুল। কাজেই জামরুল খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে যাবে না। জামরুলে আছে ক্যান্সার প্রতিরোধের উপাদান। তাই নিয়মিত জামরুল খেলে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় এবং ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। মস্তিষ্ক ও লিভার সুস্থ রাখতে জামরুল টনিক হিসেবে কাজ করে। জামরুল ভেষজ গুণ সমৃদ্ধ ফল। বাত নিরাময়ে এটি ব্যবহার করা হয়। ঘুম না হওয়া কিংবা দুশ্চিন্তায় যাদের চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে, তারা সেই কালি দূর করতে নিয়মিত একটি করে জামরুল খেয়ে দেখতে পারেন। জামরুলের শক্তিশালী উপাদানগুলো জীবাণু এবং ছত্রাকনাশক হিসেবে কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ত্বকে ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকায় এই ফল। এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। শরীরে প্রতিনিয়ত বিষাক্ত উপাদান ঘুরে বেড়ায়। দেহ থেকে বিষাক্ত পদার্থ ধুয়ে বের করে দিতে জামরুল কাযর্করী ভূমিকা পালন করে।

কলা

কলা পুষ্টিগুণে ভরপুর একটি ফল। আর এটি স্বাদেও ভালো। পুষ্টিবিদরা বলেন, দিনে দুটি কলা খাওয়া শরীরের জন্য বেশ উপকারী। তবে এর জন্য ছোট কলা বেছে নেয়া ভালো। কলার মধ্যে আয়রন রয়েছে। আয়রন রক্তকণিকা ও হিমোগ্লোবিন তৈরিতে কাজ করে। আয়রনের ঘাটতিতে রক্তস্বল্পতা হয়। এক মাস দিনে দুটি করে কলা খেলে রক্তের ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হবে। প্রতিদিন দুটি কলা খাওয়া শরীরের শক্তিকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। অনেকেই ব্যায়াম করার আগে কলা খেতে পছন্দ করে। কলা মুড ভালো করতে কাজ করে, বিষণ্নতা কমায়। আর প্রতিদিন দুটি কলা খাওয়া এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। কলার মধ্যে থাকা উপাদান মস্তিষ্কে সুখী হরমোনের নিঃসরণ বাড়ায়। তাই বিষণ্নতায় ভুগলে দিনে দুটি করে কলা খান। ভালোভাবে প্রসব হওয়ার জন্য গর্ভাবস্থায় প্রতিদিন কলা খাওয়া প্রয়োজন। কলা রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়ায়। এটি গর্ভাবস্থায় সকালের ক্লান্তি ভাব দূর করে। কলায় কম সোডিয়াম রয়েছে। তবে রয়েছে উচ্চমাত্রায় পটাশিয়াম। এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যকর। এতে হার্টের স্বাস্থ্য ভালো থাকে। গবেষণায় বলা হয়, প্রতিদিন দুটি কলা খেলে ৪০ শতাংশ হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। কলার মধ্যে থাকা পটাশিয়াম মস্তিষ্কের কার্যক্রম বাড়ায় এবং স্মৃতিশক্তি ভালো রাখে। গবেষকদের মতে, যেসব ছাত্র সকালের নাশতায় বা বিকেলের নাশতায় কলা খায়, তাদের মনোযোগ বাড়ে বহুগুণে। কলার মধ্যে রয়েছে আঁশ। এটি হজমে সাহায্য করে। দিনে দুটি কলা খেলে হজমের সমস্যা কমে। বিশেষ করে কোষ্ঠকাঠিন্য কমে। হজমের সমস্যা থাকলে টানা এক মাস দিনে দুটি করে কলা খেয়ে দেখতে পারেন। মশার কামড়ে ফুলে, লাল হয়ে ওঠা ত্বকের যত্ন নিতে ক্রিম বা অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার করার আগে কলার খোসা ঘষে দেখুন ত্বকের ফুলে ওঠা অংশে। কলায় থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-বি, যা স্নায়ুকে শান্ত করে। মানসিক চাপ কাটাতে ফ্যাটি ফুডের থেকে বেশি প্রয়োজনীয় কলা। কার্বোহাইড্রেটে পরিপূর্ণ হওয়ায় কলা রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রেখে স্নায়বিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। নরম ও মিহি হওয়ার জন্য পেটের সমস্যায় খুবই উপকারী খাবার কলা। অত্যন্ত খারাপ পেটের রোগেও কলাই একমাত্র ফল, যা নির্বিঘ্ন খাওয়া যেতে পারে। কলা অস্বস্তি কমিয়ে আরামদায়ক অনুভূতি দেয়। অনেক দেশে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে কলা ব্যবহার করা হয়। অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের জ্বর হলে ওষুধের বদলে খাওয়ানো হয় কলা।

আমলকী

টক-মিষ্টি ফল হচ্ছে আমলকী। ত্বকের ডিটক্স ও রক্ত পরিশুদ্ধ করতে আমলকীর জুড়ি নেই। নিয়মিত আমলকীর রস খেলে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ ও আমলকীতে থাকা অ্যামিনো অ্যাসিড এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা হৃৎপিণ্ডের কর্মক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়া ডায়াবেটিস, হাঁপানি কমাতে বেশ উপকারী টক-মিষ্টি আমলকী। সর্দি-কাশি সারাতে ও হজম ক্ষমতা বাড়াতে আমলকী বেশ উপকারী। প্রতিদিন এক চামচ আমলকীর রস মধু দিয়ে খেলে সর্দি-কাশির প্রকোপ থেকে রেহাই মিলবে। আামলকীর রস কোষ্ঠকাঠিন্য ও পাইলসের সমস্যা দূর করতে পারে। এছাড়াও এটি পেটের গোলযোগ ও বদহজম রুখতে সাহায্য করে, লিভারও ভালো রাখে। আমলকীর রসে রয়েছে অ্যামিনো অ্যাসিড এবং প্রোটিন, যা চুলের পুষ্টি জোগায়। এটি চুল পড়া রোধ করে। ভিটামিন-সি ছাড়াও আমলকীর রসে রয়েছে আয়রন, ক্যালশিয়াম, ফসফরাস।

তথ্যসূত্র :

উইকিপিডিয়া, কৃষি তথ্য সার্ভিস, বোল্ডস্কাই, হেলথ ইনসাইডার

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।