ভ্রমণ  : পায়ের আলতায় আলতাদীঘি

বহু লোককথা সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকাজুড়ে রয়েছে প্রাচীন অনেক দীঘি। সেসব ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা। মজার ব্যাপার হলো, সব ঘটনা প্রায় কাছাকাছি। আলতাদীঘিকে ঘিরেও রয়েছে ঠিক তেমনই এক লোককথা। দেশের উত্তরের জনপদ বর্তমান নওগাঁ জেলার ধামইরহাট এলাকায় ছিলেন এক সামন্ত রাজা। নাম ছিল বিশ্বনাথ জগদল। সুখে-দুঃখে রাজার রাজ্য ভালোই চলছিল। খ্রিস্টীয় ১৩ শতকে দেখা দিল এক মহাবিপত্তি। দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টির দরুন এ এলাকায় পানির সংকট দেখা দিলে ক্রমেই তা প্রকট আকার ধারণ করল। কৃষিনির্ভর রাজ্য নিশ্চিত এক মহামারীতে পতিত হওয়ার উপক্রম। রাজ্যের প্রজারা রাজদরবারে এসে জড়ো হলো এবং সমস্যার সমাধানে কিছু একটা করতে অনুরোধ করল। জনশ্রুতি আছে, এই পরিস্থিতিতে রানী এক রাতে স্বপ্নে দেখলেন সমস্যা সমাধানের জন্য একটি বৃহদাকার দীঘি খনন করতে হবে। রানী রাজাকে বললেন, রাজ্যের নির্দিষ্ট একটি জায়গা থেকে আমি পায়ে হেঁটে যাব এবং যতক্ষণ পর্যন্ত আমার পা ফেটে রক্ত বের না হবে, ততক্ষণ হাঁটতে থাকব। আর যতদূর পর্যন্ত হাঁটব তত বড় একটি পুকুর খনন করে দিতে হবে। কথা মতো পাইক-পেয়াদা ও দাসী-বাদীসহ রানী একদিন হাঁটতে শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে রানী বহুদূর চলে যাচ্ছিলেন, তখন পাইক-পেয়াদারা চিন্তা করলেন, রানী যদি হাঁটতেই থাকেন, তাহলে রাজার পক্ষে এত বড় পুকুর খনন করা সম্ভব হবে না। তাই তারা হাঁটার এক পর্যায়ে কৌশলে পেছন থেকে রানীর পায়ে আলতা ঢেলে দিয়ে চিৎকার করে উঠে বলল, রানীমা রানীমা আপনার পা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। তখন রানী ওই স্থানে বসে পড়লেন। রানীকে দেয়া কথা মতো পরে রাজা সেই পর্যন্ত দীঘি খনন করলেন। রানীর পায়ের আলতা ঢেলে দেয়ার সেই ঘটনা থেকে কালক্রমে দীঘির নাম হয়ে যায় আলতাদীঘি। পরে দীর্ঘ সময়ের পথপরিক্রমায় ওই দীঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এক বিশাল বনভূমি। বর্তমানে আমাদের কাছে যা আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যান বলে পরিচিত।

এমন একটি ঘটনা শোনার পর প্রকৃতিপ্রেমী যে কোনো মানুষ মাত্রই মনের মধ্যে ইচ্ছা জাগবে রানীর স্বপ্নের সেই দীঘি একবার পরিভ্রমণ করে আসি, অভিজ্ঞতার খাতায় যুক্ত করি নতুন এক অভিজ্ঞতা। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য আজকের বিষয় আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যান ভ্রমণের বিস্তারিত।

সাতান্ন হাজার বর্গমাইলের ছোট্ট এই দেশটিতে ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর চাপ ও নানান সব অপরিকল্পিত উদ্যোগের কারণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ। বনভূমি সংকোচন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। ইতোমধ্যেই প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছে বাংলাদেশ। আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যান এই প্রভাবের বাইরে নয়। আলতাদীঘি নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলায় অবস্থিত। জেলা সদর থেকে দূরত্ব ৬০ কিমি। আয়তন ২৬৪.১২ হেক্টর। এর মধ্যে পড়ে মইশুর, জয়জয়পুর, ছোট মোল্লারপাড়া, বাখরপুর, চকযাদু, জোতমাহমুদপুর এবং দাদনপুর মৌজার অংশবিশেষ। বনের মাঝে ৪২.৮১ একর (১.২০ কিমি দৈর্ঘ্য ০.২০ কিমি প্রস্থ) আয়তনের একটি বিশাল দীঘি রয়েছে। দীঘির ঠিক উত্তর প্রান্তের পাড় ঘেঁষে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। একে কেন্দ্র করে চারিদিকের প্রাকৃতিক শালবন এবং নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী সাঁওতালদের ভিন্নধর্মী জীবনাচার উদ্যানের গুরুত্ব ও সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি করে তুলেছে। চিত্তবিনোদনের জন্য পর্যটনবান্ধব পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে প্রতিদিন অনেক দর্শনার্থী এসে থাকে।

আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যানে বৃক্ষের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো শাল প্রধান প্রজাতি। সহযোগী প্রজাতি হিসেবে রয়েছে আমলকী, হরীতকী, বহেড়া, শিমুল, কুম্ভী, তেন্ডু ইত্যাদি। এক সময় শিয়াল, বেজি, বনবিড়াল, খেঁকশিয়াল, গুঁইশাপ ও হরেকরকম পাখির কলকাকলিতে পরিপূর্ণ ছিল। বর্তমানে পর্যাপ্ত খাদ্য ও বাসস্থানের উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে এলাকাটি বন্যপ্রাণী শূন্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হলেও চলতি পথে হঠাৎ করেই পথ রোধ করে দাঁড়াতে পারে যে কোনো ধরনের প্রাণী। আর প্রাণ ভরে উঠতে পারে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলতানে।

নদী, পাহাড় আর বন-জঙ্গলে পরিপূর্ণ আমাদের প্রকৃতির অন্যতম উপাদান হলো, আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। আলতাদীঘি উদ্যানও এর বাইরে নয়। তাদের জীবন-জীবিকা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রূপ বর্ণিল করে রেখেছে এখানকার প্রকৃতি। উদ্যানকে কেন্দ্র করে রয়েছে কয়েকশ’ সাঁওতাল পরিবার। আদিকাল থেকে তাদের প্রধান পেশা শিকার করা। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর চাপে প্রকৃতিকে প্রতিনিয়তই সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হচ্ছে। বিলুপ্ত হওয়ার পথে পশুপাখি। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা বা জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার উপলব্ধি থেকে সাঁওতালরা পূর্বপুরুষের আদিম পেশায় পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। বর্তমানে তারা শিকার ছেড়ে হাতে নিয়েছে লাঙল-কোদাল। স্থানীয় বাঙালিদের জমিতে বর্গা চাষ শুরু করেছে। আবার কেউবা অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে দিন চালায়। এভাবে ক্রমেই বিবর্তনের পথে তাদের সংস্কৃতি ও জীবনাচার। এত কিছুর পরও তাদের ভাষ্য টিকে থাক জীববৈচিত্র্য, বেঁচে থাক পৃথিবী। সাঁওতালদের জীবনাচার প্রত্যক্ষ করার জন্য আলতাদীঘি উদ্যান হতে পারে উপযুক্ত গন্তব্য।

সুবৃহৎ আলতাদীঘি উদ্যানের আরেক অন্যতম সৌন্দর্য হলো, শত শত উঁই ঢিবি। বনের মধ্যে যতদূর হাঁটা যায় তার প্রায় সবটা পথজুড়েই বৃক্ষের ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছে শত শত উঁই ঢিবি। হালকা লাল বর্ণের পাঁচ থেকে প্রায় আট ফুট উচ্চতার একেকটি ঢিবি উঁইপোকার অসাধারণ শিল্পী সত্তার নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পর্যটকমাত্রই বনজুড়ে এই ঢিবির বিন্যাস চিত্তাকর্ষক উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সাধারণত দেশের অন্য কোথাও একই জায়গায় এত অধিকসংখ্যক উঁই ঢিবি দেখা যায় না। সুতরাং এদিক বিবেচনায় আলতাদীঘি উদ্যানের গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য খানিকটা আলাদা।

২০১১ সালে এটা জাতীয় উদ্যান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। উদ্যান ঘোষণার পর থেকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি চিত্তবিনোদনের সুযোগ বৃদ্ধির কাজও চলমান। এছাড়াও দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে বনের মাঝ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পথ ও ট্রেইল, যার ফলে বনের ভেতরে অনায়াসে ভ্রমণ করা যায়। বনকে উন্নত করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে পরিকল্পিত এক কার্যক্রম। সেই কার্যক্রমের আওতায় শালের সহযোগী প্রজাতি হিসেবে হরীতকী, বহেড়া, বেত, জাম, বট, জারুল, গর্জন, ডেউয়া, ডুমুরসহ অন্যান্য প্রজাতির চারা রোপণ করা হয়েছে। এই কার্যক্রম যথাযথ বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে, জনগণের মাঝে সচেতনতা বাড়বে, অন্যদিকে বিনোদনের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিসহ পর্যটনের দ্বার উন্মোচিত হবে বলে আশা করা যায়।

যাতায়াত এবং থাকা

ঢাকা থেকে আলতাদীঘি যাওয়ার সহজ পথ হলো, মহাখালী, কল্যাণপুর ও গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে সাড়ে ৫ ঘণ্টায় জয়পুরহাট। ভাড়া ৫০০ টাকা। সেখান থেকে নওগাঁ-ধামইরহাটের পথে ১৯ কিমি পর্যন্ত যেতে হবে অটোরিকশা বা বাসে। তারপর রিকশাভ্যানযোগে ২০ মিনিটের পথ। অথবা নওগাঁ সদর হয়েও যাওয়া যেতে পারে। রাতযাপনের জন্য জয়পুরহাটে রয়েছে উন্নত ও মাঝারি মানের বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল। একটি ডাবল রুমের ভাড়া মানভেদে ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা। অধিকন্তু আপনার ভ্রমণ যদি হয় ব্যক্তিগত গাড়ি করে, তাহলে অনায়াসে নিকটবর্তী জেলা বগুড়ায় এসে রাতযাপন করতে পারেন হোটেল নাজ গার্ডেনে।

এসআর ট্রাভেলস : ফোন-০১৯৯১১৭৭১৭, ৯০৩৯৩১২, ৯০৩৩৭৯৩। শ্যামলী পরিবহন : ফোন-০২৮০১১৬১, ০২৮০৯১১৬২। শাহ ফতেহ আলী : ফোন-০১১৯৩২২১০৮৫। এছাড়াও রয়েছে হানিফ এন্টরপ্রাইজ, কেয়া পরিবহন ও এসআই পরিবহনের বাস।

হোটেল পৃথিবী ইন্টারন্যাশনাল, সদর রোড, জয়পুরহাট : ফোন- ০১৭১৭৮৬৬৫২৯। হোটেল সা’দ, ১নং স্টেশন রোড : ফোন-০৫৭১৫ ১০৯৭, ০১৭২১৯০৪৪৮৮। হক কনভেনশন সেন্টার : ফোন-০৫৭১ ৬২৬৩৩, ০১৭১৩৩৬৪০৬৬। হোটেল নাজ গার্ডেন, বগুড়া, ফোন-০১৭৫৫৬৬১১৯৯।

 

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup