প্রেম আছে বলেই পৃথিবীটা এত সুন্দর : মিজানুর রহমান আরিয়ান

অর্ধ শতাধিকেরও বেশি নাটক নির্মাণ করে দর্শক ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন তরুণ নির্মাতা মিজানুর রহমান আরিয়ান। প্রেমের গল্প রচনা ও নির্মাণে তার মুন্সিয়ানা অনবদ্য। ‘বড় ছেলে’ খ্যাত এই নির্মাতা তার বর্তমান কাজের ব্যস্ততা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আনন্দধারার সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন। 

 

আনন্দধারা : বর্তমান ব্যস্ততা কী নিয়ে?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : আমার ভাবনা এবং অস্তিত্ব পুরোটাইজুড়ে রয়েছে নির্মাণ। তাই নির্মাণ নিয়েই আমার সব ব্যস্ততা। ঈদুল ফিতরের জন্য বেশ কয়েকটি নাটকের কাজ করেছি। তাই ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী কাজের পরিকল্পনা নিয়েই বর্তমান ব্যস্ততা চলছে।

আনন্দধারা : ঈদুল ফিতরের কাজে কেমন সাড়া পেলেন?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : আমার নির্মাণ সবকিছু দর্শকদের জন্য। দর্শক ভালোবেসে আমার কাজগুলো গ্রহণ করে, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে। এবারে ‘শেষটা সুন্দর’, ‘দেখা হবে কি?’, ‘প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাতটা’, ‘২২ শে এপ্রিল’ নামে ঈদের নাটক নির্মাণ করেছি। বরাবরের মতো এই নাটকগুলো ব্যাপকভাবে দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। যেহেতু দর্শকের জন্যই নাটক নির্মাণ করি, তাই আমার নাটকের প্রতি দর্শকের এমন ভালোবাসায় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তবে আমার কাছে প্রতিটি নির্মাণই একেকটা নতুন চ্যালেঞ্জ হলেও এবারের ঈদের জন্য নির্মিত ‘২২ শে এপ্রিল’ নাটকটি নির্মাণ করা একটু বেশিই চ্যলেঞ্জিং ছিল।

আনন্দধারা : আপনাকে ‘ডিরেক্টর অব রোমান্স’ খ্যাত নির্মাতা বলা হয়। তাহলে ‘২২ শে এপ্রিল’-এর মতো গল্প নির্মাণের কারণ কী?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : সমাজ কিংবা দেশ এবং মানুষের প্রতি নির্মাতাদের কিছু দায়বদ্ধতা আছে বলে মনে করি। বনানীতে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই ‘২২ শে এপ্রিল’ নাটকটি নির্মাণ করেছি। দর্শকদের কথা মাথায় রেখেই এবারের ঈদে ‘২২ শে এপ্রিল’ আমার সৃষ্ট একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রয়াস। একঝাঁক তারকা শিল্পীকে নিয়ে একটি সুন্দর গল্পকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। তবে এই গল্পের মাঝেও প্রেম-ভালোবাসা বিদ্যমান ছিল।

আনন্দধারা : মিডিয়ায় আপনার পথচলার সূচনা কীভাবে?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : নিজের সম্পর্কে পজিটিভলি বলতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। ছোটবেলা থেকে খুব ভালো ছাত্র ছিলাম। কুমিল্লা জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং রাইফেলস পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে মাধ্যমিকে আমার একটি বিষয়ের ফলাফল খারাপ হয়। আর এই কারণে আমার স্বপ্নের জায়গা বুয়েটে পড়ার সৌভাগ্য হয়নি। তখন আমার নিজের মধ্যে খুব অস্বস্তিবোধ কাজ করতে শুরু করে। বুয়েটে পড়তে না পারার কষ্টটাকে লাঘব করার জন্যই আমি মূলত মিডিয়াতে কাজ শুরু করি। যেখানে অনেকের স্বপ্নের মাঝে নিজের স্বপ্নকে খুঁজে পাওয়া যাবে।

আনন্দধারা : নির্মাণের আগে কী কারো সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : না। সম্পূর্ণ নিজ প্রচেষ্টায় নির্মাণের কাজ শিখেছি। আগে থেকে লেখালেখি করতাম। তখন অনলাইন এবং ইউটিউব থেকে নির্মাণের যাবতীয় বিষয় রপ্ত করেছি। তখন থেকেই নিজে নাটকের পাণ্ডুলিপি লেখা শুরু করি।

আনন্দধারা : প্রথম নাটক নির্মাণ করেন কবে?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : আমার নিজের রচনায় ‘তুমি আমি সে’ নামের নাটকের মধ্য দিয়ে ২০১২ সালে প্রথম নাটক নির্মাণ শুরু করি। নাটকটিতে অভিনয় করেছিলেন আরিফিন শুভ ভাই।

আনন্দধারা : আপনার পরিচালিত দর্শকপ্রিয় নাটক ‘বড় ছেলে’। নাটকটি নির্মাণের আগে আপনার প্রত্যাশা কেমন ছিল?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : অন্যান্য নাটকের চেয়ে ‘বড় ছেলে’ নাটকটি নিয়ে আমাদের সবার প্রত্যাশা অনেকাংশে বেশিই ছিল। কারণ এ নাটকটিতে আমার দেখা দর্শকদের চিরচেনা এক চরিত্রের গল্প বলতে চেয়েছি। নাটকের শ্যুটিংয়ের আগের রাতে আমার নাটকের প্রডিউসার ইরফান ভাই পুরো পাণ্ডুলিপিটা পড়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন এবং তিনি আমাকে ফোন করে বললেন, ‘ভাই তুমি এটা কী লিখেছো?’ এছাড়া অপূর্ব ভাই নাটকের পাণ্ডুলিপিটা পড়ে আমায় বললেন, ‘আরিয়ান এটা তোমার এই পর্যন্ত বেস্ট স্ক্রিপ্ট।’ স্বভাবতই সিনিয়র দু’জন মানুষের কাছ থেকে পজিটিভ সাড়া পেয়ে আমার  নিজের মাঝেও আশার সঞ্চার হয় যে এই নাটকটি কিছু একটা হবে। পাশাপাশি নির্মাণেও বরাবরের মতোই ছিল আমার যত্নশীলতা। নাটকটির শেষ দৃশ্য ধারণের সময় ইউনিটের সবাই কেঁদেছে। অন্যান্য নাটক এডিট প্যানেলে সবাইকে নিয়ে দেখলেও আমি এ নাটকটি পুরোপুরি দেখতে পারছিলাম না। যতবারই দেখার চেষ্টা করেছি, ততবারই আমার চোখ জলে ছলছল করছিল। সর্বশেষ নাটকটি টেলিভিশনে প্রচারের পর আমার মায়ের কান্না দেখে আমার মনে হয়েছে নাটকটি দর্শক হৃদয়ে আশানুরূপ সাড়া ফেলবে এবং সর্বোপরি সেটাই হয়েছে।

আনন্দধারা : ‘বড় ছেলে’ নাটকটি কি আপনার জীবনেরই গল্প?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : না, যদিও আমি বাবার বড় ছেলে এবং আমার বাবাও তার বাবার বড় ছেলে। আমি কিংবা আমার বাবার গল্প এটা না হলেও আমার দেখা-অদেখা আর উপলব্ধির মধ্যকার অনেক সংসারের বড় ছেলেরই গল্প এটি।

আনন্দধারা : নির্মাণের বাইরে নাটক রচনার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টাকে গুরুত্ব দেন?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : সবসময় দর্শকের কথা মাথায় রেখে গল্প লিখি। প্রতিটা সংলাপ লেখার পরপরই ভাবি দর্শক এটাকে কীভাবে নেবেন। সর্বোপরি সাধারণ দর্শকদের জন্যই নাটক লিখি এবং নির্মাণ করি । যারা কিনা আমার নাটক দেখে হাসবে, কাঁদবে, আনন্দ পাবে কিংবা নিজের জীবনের গল্পকে আমার লেখা এবং নির্মাণে দেখতে পাবে।

আনন্দধারা : আপনার নির্মাণে কি প্রেমের দিকটাই প্রাধান্য পায় বেশি?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : সত্যি কথা বলতে গেলে আসলে প্রেম আছে বলেই পৃথিবীটা এত সুন্দর। আমার সব গল্পে প্রেম থাকলেও সেটা কখনো প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আমার গল্পে একটি পরিবারের মধ্যকার প্রেমের সম্পর্কটাকে বেশি প্রাধান্য দিই। তবে যেই বিষয়টা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো দর্শকের প্রত্যাশা। প্রেমের গল্পে দর্শকদের কাছ থেকে সাড়া পাওয়ার প্রেরণারই ফল হিসেবেই আমার নির্মাণে প্রেমের বিষয়টাই বারংবার চলে আসে।

আনন্দধারা : ‘প্রেম এবং ভালোবাসা’ আপনার কাছে কী?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : প্রেম এবং ভালোবাসা আমার কাছে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। যদিও প্রেম থেকেই ধীরে ধীরে ভালোবাসার সৃষ্টি হয়। আর প্রেমের সৃষ্টি হয় ভালোলাগা থেকে। কিন্তু ভালোবাসা হচ্ছে একটি মায়া, একটি সম্পর্কের নাম। নিজের আপনজন কিংবা প্রিয়জনকে সুখী করা এবং তাদেরই মাঝে নিজের সুখ খুঁজে পাওয়ার মানেই হচ্ছে আমার কাছে ভালোবাসা।

আনন্দধারা : নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া প্রেমের কোনো বিয়োগান্ত ঘটনাই কি আপনার নাটকে গল্প হয়ে উঠে আসে?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : একদমই না। আমি ফেসবুক ও ইউটিউবে অনেক সময় দেখি, অনেকে মন্তব্য করেন আমার বাস্তব জীবনে প্রেমে বিচ্ছেদ ঘটেছে। আসলে বিষয়টা সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের জীবনে চলার পথে যোগের চেয়ে বিয়োগের সংখ্যাই তুলনামূলক বেশি। প্রেমের ক্ষেত্রে তারই প্রমাণ পাওয়া যায়। আমার আশপাশে ঘটে যাওয়া অসফল প্রেমের গল্পটাই আমি আমার মতো করে দর্শকদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করি।

আনন্দধারা : আপনার নির্মাণে তারকা শিল্পীদের উপস্থিতি ব্যাপক। নির্মাণে কী তাহলে গল্পের চেয়ে তারকাদেরই প্রাধান্য বেশি দিয়ে থাকেন?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : অবশ্যই না। আমার কাছে গল্পই হচ্ছে মূল তারকা। গল্প লিখি নিজের মতো করে। কাউকে ভেবে কখনই কোনো নাটক লিখি না। তবে গল্পের প্রয়োজনেই বর্তমানে আমাদের শিল্পীরা চলে আসেন। আমার গল্পই আমার শিল্পী নির্বাচন করে দেয়। কারণ সব সময় দর্শকদের একটি সুন্দর গল্প উপহার দিতে চাই।

আনন্দধারা : নিজের কাজের সমালোচনা শুনতে কেমন লাগে?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : একটি কাজ যখন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তখন সেই কাজটিকে নিয়ে নানান আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। তবে আলোচনার পাশাপাশি গঠনমূলক যাবতীয় সমালোচনা আমি সাদরে গ্রহণ করি এবং পরবর্তী কাজে সেসব বিষয়ে যত্নবান হওয়ার চেষ্টা করি।

আনন্দধারা : শুরুর দিকে নবীন নির্মাতা হিসেবে আপনাকে কি কোনো প্রতিকূলতার শিকার হতে হয়েছে?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : আমার কাজের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়নি। কারণ যেটা বিশ্বাস করি সেটা হলো নিজের প্রতি নিজের শতভাগ আত্মবিশ্বাস। আর সেই আত্মবিশ্বাসের বলেই আমার কাজের মধ্য দিয়ে সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে নিয়েছি।

আনন্দধারা : আপনার নির্মিত নাটকের সংখ্যা কত?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : একটি ধারাবাহিকসহ ৫০টিরও বেশি একক নাটক আমি নির্মাণ করেছি।

আনন্দধারা : নাটকের বর্তমান অবস্থাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : বর্তমানে টেলিভিশনের বাইরেও বিভিন্ন প্লাটফর্মের জন্য নাটক নির্মিত হচ্ছে। এতে করে নাটকের দর্শক বৃদ্ধির পাশাপাশি নাটকের পরিমণ্ডলও সমৃদ্ধ হচ্ছে। বর্তমানে ভালো অবস্থানে না থাকলেও ভবিষ্যৎ নাটকের একটা শিল্পমান তৈরি হবে বলে আমার বিশ্বাস।

আনন্দধারা : বর্তমানে অনেক নির্মাতার মধ্যে ইউটিউবে নিজের নাটক ভিউ নিয়ে একটা প্রতিযোগিতা বিরাজ করছে। এই প্রতিযোগিতাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : একজন নির্মাতা নাটক নির্মাণই করেন দর্শকদের জন্য। সব নির্মাতাই চান যেন তার নির্মিত নাটকটি সব দর্শক দেখে। বর্তমানে খুব সহজেই দর্শকদের নাটক দেখার মাধ্যম হচ্ছে ইউটিউব। ভালো কাজ হলে তা অবশ্যই দর্শক দেখ বেন। তা নিয়ে প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠার কিছু নেই।

আনন্দধারা : নাটক বলতে আমরা টেলিভিশন নাটককেই বুঝি। কিন্তু বর্তমানে অনলাইন মাধ্যমে নাটক নির্মাণের জোয়ার বইছে। এতে করে কি আমাদের টেলিভিশনের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে বলে মনে করেন?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : বিশ্বায়নের যুগে সবকিছুই পরিবর্তনশীল। একটা সময় নাটক বা সিনেমা দেখার জন্য একমাত্র মাধ্যমই ছিল টেলিভিশন। কিন্তু বর্তমানে নাটক বা সিনেমা দেখার নতুন নতুন অনেক মাধ্যম তৈরি হয়েছে এবং সে মাধ্যমগুলোর জন্য অনেক ভালো ভালো কাজও নির্মাণ করা হচ্ছে। দর্শক পকেটের টাকা খরচ করে হলেও আরাম-আয়েশের মধ্য দিয়েই বিনোদন উপভোগ করতে চায়। সেই জন্যই অনলাইন মাধ্যমগুলোতে কাজের দর্শকপ্রিয়তা বাড়ছে। নতুনত্বকে সাধুবাদ জানিয়েই সামনে এগিয়ে যাওয়া বলে আমি মনে করি।

আনন্দধারা : নির্মাতা হিসেবে দর্শকপ্রিয়তা কেমন লাগে?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : যে কোনো অর্জনই অনেক আনন্দের, তবে তা যদি হয় দর্শকের ভালোবাসা, তবে তার অনুভূতি ভাষাতীত। তবে আমায় না চিনে যখন আমারই সামনে কিংবা পাশে আমার কাজের প্রশংসা করা হয়, তখন সেই মুহূর্তটা আমাকে অদ্ভুত এক আনন্দ দেয়।

আনন্দধারা : চলচ্চিত্র নির্মাণের ইচ্ছা আছে কি?

মিজানুর রহমান আরিয়ান : একজন নির্মাতার চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা এবং আমারও তাই। আগামী বছর থেকেই চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করার ইচ্ছা রয়েছে।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।