নিউট্রাল প্যারেন্টিং

অনেকেই মনে করে ছেলে সন্তান মায়ের বেশি আদরের আর মেয়ে সন্তানের বাবার সঙ্গে বন্ধুত্ব বেশি হয়। কিন্তু মা-বাবা কি সন্তানের মধ্যে ভাগ করতে পারে? তাদের আদর, চিন্তা, স্বপ্ন এখন ছেলে হোক মেয়ে হোক সবার জন্যই সমান। আবার এমনো হয়, অনেক সময় একই সংসারে ভাই-বোন আলাদা সুযোগ-সুবিধা পায়। আবার অনেক বাড়িতে ভাই-বোন একই খেলনা শেয়ার করে, কখনো পুতুল বা কখনো গাড়ি। ছেলে-মেয়ে আলাদা বা যেখানে জেন্ডার অনুযায়ী কিছু চিরাচরিত বা ধরাবাঁধা বৈশিষ্ট্য মেনে চলাটাই দস্তুর। অনেক সময় এ ধরনের ধারণাগুলো শৈশব থেকেই ছেলে-মেয়েদের ওপর চাপিয়ে দেন অভিভাবকরা। এতে বাচ্চারা প্রচলিত প্রাচীন নিয়ম-কানুন আর রীতিনীতিতে তৈরি করতে থাকে তাদের মানসিকতা। পরবর্তীকালে এ ধরনের মানসিকতা তাদের জীবনে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। জেন্ডার স্টেরিওটাইপের ক্ষতিকর এ প্রভাব অনেকটাই এড়ানো যায় নিউট্রাল প্যারেন্টিংয়ের মাধ্যমে। এটি সন্তানকে বড় করে তোলার আধুনিক ধরন, যেখানে জেন্ডার বা লিঙ্গের ভিত্তিতে বাচ্চাদের ওপর কোনো প্রত্যাশা চাপিয়ে দেয়া হয় না বা পক্ষপাতিত্ব করা হয় না। যেহেতু এ ক্ষেত্রে বাচ্চাদের লিঙ্গের কারণে মানুষকে যাচাই করার কুশিক্ষাটি দেয়া হয় না। তাই তারা ছেলে বা মেয়ের যোগ্যতার মধ্যে কোনোরকম ভেদাভেদ না করে চলার গুণটি অর্জন করে।

বাচ্চাদের মধ্যে সুস্থ মনোভাব গড়ে তোলার আগে নিজের মধ্যে যত ভ্রান্ত মনোভাব আছে তার বিসর্জন দিন। মেয়েলি বা ছেলেসুলভ আচরণের নির্দিষ্ট কোনো বৈশিষ্ট্য বা মাপকাঠি নেই। আপনার ছেলেটির খেলা, যেমন কুস্তি, ক্রিকেট, ফুটবল ইত্যাদিতে তেমন উৎসাহ নেই, বরং সে তার অবসর সময় পুতুল খেলা বা রান্নাবান্নার মতো ঘরোয়া খেলায় উৎসাহ পাচ্ছে। সেদিকে কখনই মনে করা উচিত নয় যে আপনার ছেলেটি পিছিয়ে আছে অন্যের থেকে। একটা সময় তার স্বভাবেও পরিবর্তন আসতে পারে। তবে তার যেদিকে সহজাত প্রতিভা রয়েছে, সেদিকেই তাকে উৎসাহ দিন। এমনও তো হতে পারে বড় হয়ে বিখ্যাত শেফ বা টয় ডিজাইনার হবে। তাই বাচ্চার যেখানে আগ্রহ তাতে সমর্থন দিন।

ঘরের কাজকর্মের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে কোনোরকম বাছবিচার করবেন না। আপনার ছেলেকে রান্না কাজে আর মেয়েকে বাজারের কাজে, যন্ত্রপাতি সারানোর কাজে প্রশিক্ষণ দিন। এতে তাদের মধ্যে যে সাম্যবোধ জাগবে তা-ই নয়, সঙ্গে সব ধরনের কাজে নিজেকে স্বাবলম্বীও করে তুলবে।

ক্রিকেট হোক বা পুতুলের বিয়ে, আপনার সন্তান তার কোনো বন্ধুকে খেলা থেকে বঞ্চিত করছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখুন। ক্রিকেট বা ফুটবল টিমে যে মেয়েরাও যোগ দিতে পারে বা পুতুলের সংসার যে একজন ছেলেও দিব্যি গোছাতে পারে, সেই শিক্ষা দিন আপনার সন্তানকে।

এ যুগেও আমাদের সমাজে লিঙ্গবৈষম্য এক অপ্রিয় সত্য। বাসে, ট্রেনে, কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের আজো প্রায়ই বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। একটু বড় হলে এসব সমস্যার ব্যাপারে আপনার সন্তানকে সতর্ক করুন। এতে ওর মধ্যে সচেতনতা আসবে। তার মানে এই নয় যে, আপনার সন্তানকে তাদের পছন্দের খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত করবেন। আপনার ছেলে যদি ক্রিকেট, ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চায় বা আপনার মেয়ে যদি পুতুলের সাজগোজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চায় তাকে থাকতে দিন। কিন্তু নির্দিষ্ট খেলাধুলার প্রতি তার ভালোবাসা যথার্থ কিনা সেদিকে খেয়াল রাখবেন। আমরা আমাদের সন্তানকে ছেলে বা মেয়ে হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে বড় করতে চাই। বাবা-মা ঘরে ছেলে-মেয়ে দু’জনের আবদার, খেলাধুলায় সমান মনোযোগ দিন। ছেলে-মেয়েকে স্বাধীনভাবে বড় হতে সাহায্য করুন।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।