অনলাইনে আপনার সন্তান নিরাপদ তো?

একটা সময় ছিল যখন শৈশব মানে ছিল খেলার মাঠে দুরন্ত বিকেল কিংবা পাঠ্যবইয়ের আড়ালে লুকিয়ে কমিক বা গোয়েন্দা গল্প পড়া। সময়ের বিবর্তনে একবিংশ শতাব্দীতে এসে শিশু-কিশোরদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নানা গ্যাজেট এবং ইন্টারনেটের সমন্বয়ে তৈরি ভার্চুয়াল জগৎ। আপাতদৃষ্টিতে জিনিসটা স্বাভাবিক মনে হলেও সন্তানের অনলাইন কার্যক্রম কোনোভাবেই হেলাফেলা করার মতো ব্যাপার নয়।

গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে ২২ শতাংশ কিশোর-কিশোরী দিনে অন্তত ১০ বার করে নিজেদের পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়া সাইটে লগ-ইন করে। এদের মধ্যে শতকরা ৭৫ ভাগেরই নিজস্ব সেলফোন রয়েছে। এ তথ্যগুলো একদিকে যেমন প্রযুক্তির ক্রমবিকাশের স্মারক, ঠিক তেমনি অন্যদিক থেকে বিবেচনা করলে দৃশ্যপট কিছুটা হলেও ভিন্ন। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের দরুন জন্মের পর থেকে একটি শিশু ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের পাশাপাশি ‘অনলাইন’ জগতের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকে। কোনো কোনো সময় এই অনলাইন দুনিয়া ব্যক্তির কাছে এতটাই প্রিয় হয়ে ওঠে যে, বাস্তব জগৎ থেকে সে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হতে পারে। এর ফলে নিত্যনতুন মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এই যেমন বর্তমানে ‘ফেসবুক ডিপ্রেশন’ নামের নতুন একটি উপসর্গ নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। এর পাশাপাশি অনলাইনে অন্যান্য ব্যক্তির স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁস, অশ্লীল ছবি বা ভিডিওর কারণে ব্যক্তির নৈতিক অবক্ষয় ঘটা অস্বাভাবিক কিছু না। বলাই বাহুল্য, অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অনলাইন দুনিয়ার অন্ধকার দিকগুলোতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশ প্রবল। এ অবস্থায় নিজের সন্তানের অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে সব অভিভাবকেরই সচেতন হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো বেশ উপকারী হতে পারে।

নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত সন্তানকে ফেসবুক থেকে দূরে রাখুন

সাধারণত ১৩ বছর বয়সের কমে ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খোলা উচিত নয় বলা হলেও বয়স লুকিয়ে খুব সহজেই অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। তাই সন্তান অল্প বয়সেই ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে ভার্চুয়াল জগতে সময় পার করছে কিনা তার ওপর নজর রাখতে হবে। এত কম বয়সে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হলে তা সন্তানের স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথে বাধা সৃষ্টি করবে।

ফিল্টারিং সফটওয়্যার ব্যবহার করুন

বিশেষ কিছু সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে সন্তানের ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর নজর রাখা যাবে। এমনকি সন্তান ঠিক কতক্ষণ অনলাইনে রয়েছে বা কী টাইপ করছে তা সম্পর্কেও জানা যাবে। এছাড়া ‘পিউরসাইট পিসি’র মতো সফটওয়্যার ব্যবহার করে সন্তানের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে এমন সাইট বা কনটেন্ট ব্লক করে রাখা যায়।

 

নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন তৈরি করুন

সন্তান বড় হয়ে গেলে ইন্টারনেট ব্যবহারের আগে কিছু নিয়ম-কানুন তৈরি করুন। তারপর আপনার ছেলে বা মেয়েকে এসব নিয়ম মেনে চলার ব্যাপারে সচেতন করুন। একই সঙ্গে ঠিক কী কারণে এমন নিয়ম করা হয়েছে তা নিয়েও সন্তানের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করুন।

সন্তানের অভ্যাস সম্পর্কে জানুন

সন্তানের ওপর নজর রাখতে আপনাকে গোয়েন্দাগিরি করতে হবে না। বরং সন্তানের অভ্যাস সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন। সে কী ধরনের মুভি পছন্দ করে বা তার কাছের বন্ধু কারা তা খুঁজে বের করুন। এক্ষেত্রে সন্তানকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনুপ্রবেশের অনুমতি দেয়ার আগে তার ফ্রেন্ড-লিস্ট আপনার কাছে কখনোই গোপন থাকবে না এমন প্রতিশ্রুতি নিন।

ঘরের কেন্দ্রস্থলে কম্পিউটার রাখুন

কম্পিউটারসহ অন্যান্য ডিভাইস ঘরের এক কোণে না রেখে এমন জায়গায় রাখুন, যেখানে সবার আনাগোনা রয়েছে। এর ফলে সন্তান ইন্টারনেটে কী করছে তা অজানা থাকবে না।

সন্তানের ফেসবুক পোস্ট সম্পর্কে জানুন

আপনার ছেলে বা মেয়ে ফেসবুকসহ অন্যান্য সোশ্যাল প্লাটফর্মে কী ধরনের পোস্ট শেয়ার করছে তা সম্পর্কে জানুন। বিশেষ করে সন্তান যদি হয় মেয়ে, তবে সে ফেসবুকে নিজের কী ধরনের ছবি বা ভিডিও শেয়ার করছে সে সম্পর্কে সচেতন হন। এখনকার সমাজে মেয়েদের ছবি বা ভিডিও এডিট করে হয়রানি করার উদাহরণ কম নয়।

নিজেই উদাহরণ তৈরি করুন

আপনি নিজেই যদি মিনিট দশেক পরপর ফেসবুক বা টুইটারে লগ-ইন করে সময় নষ্ট করেন, তবে আপনাকে দেখে সন্তানের মধ্যেও এই বদঅভ্যাস দেখা দেবে। তাই আগে নিজেকে ঠিক করুন এবং সন্তানের কাছে নিজেকে আদর্শ হিসেবে গড়ে তুলুন।

 

ডিভাইসনির্ভরতা কমিয়ে দিন

সেলফোন, কম্পিউটার কিংবা টেলিভিশনের মতো ডিভাইসের ওপর অতিরিক্ত আসক্তি কমিয়ে দিন। এর চেয়ে সন্তানের সঙ্গে একান্তে সময় কাটান অথবা বাইরে থেকে ঘুরে আসুন। সন্তানের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক হবে বন্ধুসুলভ এবং তার অনলাইন কার্যক্রম আপনার অজানা থাকবে না।

সন্তানকে সচেতন করুন

অনলাইন জগতের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে সন্তানের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করুন। সন্তান অনলাইনে পর্নোগ্রাফির মতো বিষয়ে আসক্ত হয়ে পড়লে তা তার ভবিষ্যৎ জীবনে কেমন প্রভাব ফেলবে, সে সম্পর্কে আগে থেকেই জানিয়ে রাখুন।

প্রযুক্তি সম্পর্কে জানুন

ছেলে বা মেয়ে অনলাইনে কী করছে তা জানতে অভিভাবকদের পর্যাপ্ত প্রযুক্তি জ্ঞান থাকতে হবে। তাই নতুন নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানুন। তারপর এর ভালো এবং খারাপ দিকগুলো শনাক্ত করে আপনার সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করুন।

সন্তানকে ব্যক্তিত্ববান হিসেবে গড়ে তুলুন

ছোটবেলা থেকে সন্তানের মধ্যে সুকুমারবৃত্তির বিকাশ ঘটাতে সচেতন হন। সন্তানকে সামাজিক মূল্যবোধ এবং নৈতিকতার শিক্ষা দিন। তাকে বোঝান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সে যেভাবে নিজেকে উপস্থাপন করছে তা তার ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক। তাই অনলাইন জগতেও তাকে নৈতিকতা বজায় রেখে নিজের পরিচ্ছন্ন ইমেজ তৈরি করতে হবে।

আপনার সন্তানের অনলাইন জীবন নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করতে গিয়ে আবার তার বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক কার্যকলাপ সম্পর্কে ভুলে যাবেন না। মূল কথা হলো, অনলাইন হোক বা অফলাইন, সন্তানের সঠিক পরিচর্যায় সঠিক এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেয়ার বিকল্প নেই।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup