পরিবারই আমার অনুপ্রেরণা : আগুন

 

আগুনের পুরো নাম খান আসিফুর রহমান। ১৯৯৩ সালে চলচ্চিত্রের গান ‘বাবা বলে ছেলে নাম করবে’ এবং ‘ও আমার বন্ধু গো...’ দিয়ে তিনি ছড়িয়ে পড়েছিলেন বাংলাদেশের সবখানে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব খান আতাউর রহমান ও কণ্ঠশিল্পী নিলুফার ইয়াসমীনের সন্তান তিনি। আশির দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত দেশের সংগীতাঙ্গনে যে ক’জন শ্রোতাপ্রিয় সংগীত শিল্পী রয়েছেন; আগুন তাদের মধ্যে অন্যতম। ‘আমার স্বপ্নগুলো’ তার অন্যতম জনপ্রিয় একটি গান। সংগীত, অভিনয়, লেখালেখিতেও তার পদচারণা রয়েছে। সম্প্রতি আনন্দধারার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মন খুলে বললেন অনেক কথা-

আনন্দধারা : একজন আগুন হয়ে ওঠার গল্পটা শুনতে চাই-

আগুন : ১৯৮৮ সালে আমরা ‘সাডেন’ নামে একটি ব্যান্ড দল করি। আমাদের দলে পাঁচজন সদস্য ছিল। আমরা ওই ব্যান্ড থেকে ১৯৯০ সালে প্রথম অ্যালবাম বের করি। ওই অ্যালবামের নাম ছিল অচেনা। তখন শ্রোতাদের কাছে এটি খুব হিট হয়েছিল। এভাবেই আমার শুরু, তারপর থেকে তো চলছেই।

আনন্দধারা : চলচ্চিত্রের প্লে-ব্যাকে নিজেকে জড়ালেন কীভাবে?

আগুন : আমি ১৯৯২ সালে চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাক শুরু করি। আমার গাওয়া গান নিয়ে প্রথম রিলিজড সিনেমা ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। একদিন সুরকার আলম খান আমাকে ডেকে বললেন, গান গাইতে হইব! আমি ছবির নাম জানতে চাইলে চাচা বললেন, ছবির নাম ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। তিনি আরো বললেন, আমার সঙ্গে গান গাইবেন রুনা লায়লা। রুনা লায়লার সঙ্গে এটিই আমার প্রথম গান গাওয়া। একই সঙ্গে চারটি গানের রেকর্ড করা হয়। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর ভীষণ হিট করেছিল। ছবির গানগুলোও শ্রোতারা খুবই পছন্দ করেছিল। অনেকে বলেন, ছবিটি ভারতীয় ছবির নকল। আসলে কথাটি সত্য নয়। ছবিটির কপিরাইট কিনে নেয়া হয়েছিল।

আনন্দধারা : আপনার অনুপ্রেরণার মানুষদের কথা জানতে চাই?

আগুন : আমার বড় অনুপ্রেরণা ছিল আমার পরিবার। আসলে আমাদের পাঁচ ভাই-বোনের কাউকেই আব্বা-আম্মা জোর করে কিছুই করাননি। আমি ছোটবেলা থেকে সারাদিনই বাসায় দেখতাম আম্মা সংগীত চর্চা করছেন এবং বিকেলে আব্বা চলচ্চিত্রবিষয়ক মিটিং করছেন। সবসময় সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠাটাই আমার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। এমন একটি পরিবেশে বেড়ে উঠেছি বলেই হয়তো শিল্পী না হয়ে কিংবা সাংস্কৃতিক অঙ্গনে না এসে কোনো উপায় ছিল না।

আনন্দধারা : নিজের পরিবার নিয়ে বলেন?

আগুন : আমার মা, খালা ও বাবা নিয়ে আসলে নতুন করে বলার মতো কিছু নেই। তাদের নিয়ে বলাটা নতুনত্বের পর্যায়ে পড়ে না। তাদের সবাই চেনেন। তাদের সম্বন্ধে আসলে সবাই জানে।

আনন্দধারা : দীর্ঘ সংগীত জীবনে বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। তার দু’একটা সম্পর্কে বলেন-

আগুন : বিচিত্র অভিজ্ঞতা বলতে গেলে বলতে হয় প্রত্যেকটি অভিজ্ঞতা একটি অপরটি থেকে আলাদা। কতটুকু আলাদা তা এর গভীরে প্রবেশ না করলে বোঝা যাবে না। বিচিত্র ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে এই শিল্পাঙ্গনে একজন শিল্পী আরেকজন শিল্পীর পেছনে কী পরিমাণ কুৎসা রটনা করতে পারে তা দেখেছি। এ রকম বিভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। আর একটি কথা তাহলো- সংগীত জীবন তথা শিল্প জীবন মানুষকে ব্যাপক সমৃদ্ধ করতে পারে; যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমি নিজেই। আমি মানুষের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি তা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি।

আনন্দধারা : কোনো মজার স্মৃতি থাকলে ভাগাভাগি করতে পারেন?

আগুন : আমার নাম নিয়েই তো অনেক মজার স্মৃতি রয়েছে। এ মুহূর্তে একটা ঘটনা মনে পড়ল। ঘটনা বলার আগে একটা কথা বলতে ইচ্ছা করছে। আমি তখন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে একটা শো করতে গিয়েছিলাম। সালটা মনে নেই। তবে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মাত্র রিলিজ হয়েছে। বছরখানেক হবে হয়তো। আমি সিরাজগঞ্জ শহরের ভেতর মাত্র ঢুকেছি। তখন মুখে মুখে প্রচার হয়ে গেছে অমুক গাড়িতে করে আগুন ভাই আসছে। তো সেই শহরে পা দেয়ার পর আগুন আসছে আগুন আসছে রব উঠে গেছে। চারদিকে আগুন আগুন শব্দ আর মানুষের ছোটাছুটি। পরে ফায়ার সার্ভিস চলে আসছে এবং শুধু এটিই না, বেশ কয়েকটা জায়গায় এমন হয়েছে যে, আমি গেছি আর আগুন আগুন বলায় এলাকা ফাঁকা হয়ে গেল। আমি আরামে স্টেজে উঠেছি। আমার নামটা আগুন হওয়ায় কত মহাযন্ত্রণা থেকে বেঁচে গেছি। আগুন আসছে বললে আমাকে দেখতে যাওয়ার আগে আগুন লাগছে মনে করে সবাই আগুন নেভাতে দৌড় দিয়েছে। আর আমি সেখান থেকে নিরাপদে চলে আসছি। এ রকম অনেক হাস্যকর মজার ঘটনা আমার জীবনে আছে।

আনন্দধারা : গায়ক, অভিনেতা, সুরকার ও গীতিকার-এর মধ্যে প্রিয় কোন পরিচয়?

আগুন : এক্ষেত্রে আমি বলব, সর্বাগ্রে একজন গায়ক। তারপর অভিনেতা বা অন্যকিছু।

আনন্দধারা : এক সময় পত্রিকায় লিখতেন। লেখালেখি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা?

আগুন : আমি সাধারণত ব্যঙ্গাত্মক লেখা লিখতাম। সামাজিক বিভিন্ন সমস্যাকে কেন্দ্র করে গল্পের আকারেই লেখাগুলো লিখেছি। যারা লেখাগুলো পড়েছে, তারা বুঝতে পারত, সমাজের কোন বিষয়টিকে সেখানে আঘাত করা হয়েছে এবং তুলে আনা হয়েছে। পাশাপাশি পত্রিকায় কলাম লিখেছি। এখন লেখালেখি থেকে বেশ দূরে আছি। বর্তমানে অসংখ্য মানুষের মধ্যে মঞ্চে পারফর্ম করার সময় কথাচ্ছলে মেসেজ পৌঁছে দেয়াটাই আমার এই মুহূর্তে বেটার মনে হচ্ছে। যেহেতু শিক্ষিত ও ভালো পাঠক-শ্রোতা আমরা দিনদিন হারাচ্ছি, তাই সরাসরি শ্রোতা-দর্শকদের কাছে মেসেজ পৌঁছে দেয়াটাই বেশ উপযোগী বলে আমি মনে করি।

আনন্দধারা : প্রিয় লেখকের তালিকায় কারা রয়েছে?

আগুন : আমি একসময় প্রচুর বই পড়তাম। রবীন্দ্রনাথ আমার প্রিয় লেখক। এছাড়া নজরুল ও শীর্ষেন্দুর লেখাও পড়তাম। তবে এখন আর বই পড়া হয় না। পড়ব কীভাবে বই পড়ার সংস্কৃতিই তো দেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।

আননদধারা : অবসর সময় কাটে কীভাবে?

আগুন : আমি সবসময় গান নিয়ে থাকি, গীটারে টুংটাং করি। তাই আমার কোনো অবসর নেই।

আনন্দধারা : নতুনদের জন্য আপনার পরামর্শ?

আগুন : নতুন প্রজন্ম সম্বন্ধে আমি ভীষণভাবে আশাবাদী। কিন্তু নৈরাশ্য আমার মধ্যে কাজ করে যে, একটা মানুষের জ্ঞানভাণ্ডার পূর্ণ হওয়ার আগেই সে যদি অতিরিক্ত লাফালাফি করে এবং সোসাইটি তাকে নিয়ে যদি অতিরিক্ত লাফালাফি করে, তাহলে সে ছিটকে পড়তে বাধ্য। মানুষের ধারণক্ষমতাটা বুঝতে হবে। একজন যদি গান গাইতেই থাকে, তাহলে তার নতুন কী দেয়ার থাকে? ফলে শ্রোতারা মুখ ফিরিয়ে নেন। তার পরও কিছু মানুষ আছে সুপারম্যানের মতো। তবে আধুনিকতাকে ধারণ করে তারা কেন শেকড়ে ফিরে যাচ্ছে, সেটা আমার কাছে বড় বিস্ময়। গান নিয়ে আমার চিন্তা হলো আধুনিকতাও থাকবে, শেকড়টাও থাকবে। আমরা বড় বড় রেস্টুরেন্টে গেলে দেখি যে মাটির বাসনে করে খাবার দেয়া হচ্ছে। সবাই শেকড়ে ফিরে যাচ্ছে। তাহলে সংগীতে কেন নয়? এখন আমি যে ঘর থেকে আসছি, আমি তো যা ইচ্ছা করতে পারি না। রাজপুত্র হওয়াটাও বিরাট দোষের। রাজপুত্র মানে রাজ্যটাকে দেখভালের দায়িত্ব তার। দশজনকে বোঝানোর দায়িত্ব তার। আমি চাই সংগীত তার সঠিক পথে থাকুক। সব দায়িত্ব আমার কাঁধে এখনো আসেনি। আল্লাহ জানে কবে সেই দায়িত্বটা কাঁধে আসবে। আমি মনে করি, এ দায়িত্বটা আমাদের মতো কিছু মানুষের কাঁধে আসার সময় ঘনিয়ে আসছে। আমি সবসময় সুবীর নন্দী চাচা, নিলয় দা, সঞ্জীব দা তাদের বলতাম কিছু একটা করতে। আর নতুনদের বলব, তারা সততা নিয়ে কাজ করুক। গানটা ভালোভাবে শিখে তারপর এই জগতে আসুক।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup