মা-বাবাই সবচেয়ে কাছের বন্ধু

যেকোনো সম্পর্কের ভিতই বন্ধুত্ব এবং তা পিতা-মাতার ক্ষেত্রেও তাই। পিতা-মাতার সঙ্গে সন্তানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে আপনি তার ডেইলি রুটিন, সুখ-দুঃখ সবই ভাগ করে নিতে পারবেন। তাকে যেকোনো কাজে সঠিক পরামর্শ দিতে পারবেন। এখন আমাদের চারপাশের পরিবেশের জন্যও তা অত্যধিক প্রয়োজন, তবে হুট করে বাচ্চার কাছ থেকে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠা তো সম্ভব নয়, তাই ছোট থেকেই সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন। একটা সময় ছিল যখন মা-বাবা শুধুই তাদের সন্তানের অভিভাবক ও প্রতিপালক ছিলেন। কিন্তু এখন যুগ বদলে গেছে। এখনকার ছেলে-মেয়েরা অনেক বেশি স্বাধীনচেতা। তাই সন্তানের জগতের একটি অংশ হিসেবে নিজেকে স্থায়ী বাসিন্দা করতে হবে। সন্তানের বন্ধু হয়ে উঠলে শুরুতেই মা-বাবাকেই পূর্ণ বিশ্বাস করবে, তাই আপনার কথামতোই সে চলার চেষ্টা করবে। ছোটদের সঙ্গে বন্ধুত্ব খুব সহজ ব্যাপার নয়, তবে একটু ধৈর্য আর সন্তানের খুশি-অখুশি ব্যাপারগুলোই আপনাকে সন্তানের কাছে আনবে। খুব বেশি বকাঝকা সন্তানের আর মা-বাবার জন্য কখনই শুভ ফল বয়ে আনে না। সন্তান যেকোনো কাজে বাবা-মাকে তার সাপোর্ট হিসেবে চায়, যদি আপনি তার বন্ধু হন, তবে আপনার পরামর্শও তার জন্য গ্রহণ করা সহজ হবে। সন্তানের বিশ্বাস অর্জন করতে হলে আপনাকে তার মতো ভাবতে হবে।

আমরা অনেক সময় ভুলে যাই, প্রাপ্তবয়স্কদের মতো বাচ্চাদেরও নিজস্ব অনুভূতি, পছন্দ-অপছন্দ, মতামত রয়েছে। সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে অনেক সময় আমরা ভুলে যাই সে একটা ক্ষুদে মানুষ। ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য প্রথমেই ভাবতে হবে সে একজন স্বতন্ত্র মানুষ। হতে পারে যে, বয়সে, অভিজ্ঞতায় ও আপনার সমকক্ষ নয়। বড়রা অনেক সময় বাচ্চাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা জমাতে ব্যর্থ হন। কারণ তাদের মনে হয় যে ওরা ছোট, ওদের কথায়-কাজে পাত্তা দেয়ার কিছু নেই। কিন্তু ওকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ ভাবলে, সন্তানের নিজের প্রতিও বিশ্বাস জন্মাবে। কারণ বন্ধুত্বের প্রথম শর্তই হলো আস্থা-বিশ্বাস। একে অপরকে নির্ভয়ে সব কথা শেয়ার করার অধিকার। সন্তান যেন আপনাকে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে ভাবতে শেখে। আপনার সঙ্গে সব কথা নির্দ্বিধায় শেয়ার করা যায় সেটা তাকে বোঝাতে হবে। ওর কথা পক্ষপাতিত্ব ছাড়া শুনতে হবে। অনেক সময় বাচ্চারা ভয় পায়, তাদের অভিভাবকরা তাদের সমস্যাগুলোকে মনোযোগ দিয়ে না শুনে তাদের দোষারোপ করবে।

বাচ্চারা যদি কোনো ভুল করে আপনার কাছে স্বীকার করে, তাহলে তাকে না বকে নরমভাবে তার ভুলটা ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করুন এবং তার নিজের ভুল থাকলে তা বুঝতে তাকে সাহায্য করুন। যেন আপনাকে বিশ্বাস করার সিদ্ধান্তটি নিয়ে কখনো আক্ষেপ না করে।

সন্তানকে কোনো ব্যাপারে পরামর্শ বা তিরস্কার করার আগে ভেবে দেখুন এই প্রসঙ্গে আপনি কি একই কাজ করেন? আপনি একই কাজ করছেন কিন্তু সন্তানকে সেই কাজ করার জন্য তিরস্কার করছেন, এটা ঠিক নয়। বাচ্চারা কোনো দ্বিচারিতা বা কপটতা পছন্দ করে না। ও যদি বুঝতে পারে যে আপনার মধ্যে ডবল স্ট্যান্ডার্ড কাজ করছে, তাহলে ওর ভরসা হারাতে দেরি হবে না। সংসার, অফিসের হাজার দায়িত্ব শেষে সন্তানের সঙ্গে খেলার ইচ্ছা ও শক্তি কোনোটিই হয়তো আপনার থাকবে না। কিন্তু আপনারা সোনামণির বন্ধু হয়ে ওঠার এর চেয়ে বড় সুযোগ আপনি পাবেন না। তাছাড়া এমন স্বতঃস্ফূর্তভাবে মজা করার সুযোগটাইবা কোথায় পাবেন। সংসারের নানা দায়দায়িত্ব, জীবনের টানাপড়েন সামলাতে সামলাতে আমাদের ভেতরের শিশুটি যে কখন হারিয়ে যায়, তা আমরা নিজেরাই বুঝতে পারি না। আপনার সন্তানের সঙ্গে খেলা সে শুধু আপনাকে ওর বন্ধু হয়ে উঠতে সাহায্য করবে তাই নয়, আপনিও এক অনাবিল আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ পাবেন। তাছাড়া ওর খেলার সঙ্গী হলে, খেলাচ্ছলে ও কী খেলছে তার ওপরেও নজর রাখতে সুবিধা হবে।

একজন প্রকৃত বন্ধুর কর্তব্যই হলো তার বন্ধুকে সব কাজে উৎসাহ দেয়া। ওর প্রচেষ্টা বা উদ্যমকে সবসময় যথাসম্ভব সম্মান জানানোর চেষ্টা করুন। দরকার হলে অবশ্যই সন্তানের কাজ বা প্রচেষ্টার খুঁতগুলো ধরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু চেষ্টা করুন ওর সব কাজে ওর পাশে থাকতে। নিজের বিছানা গোছানো থেকে আপনার ব্যাগ ক্যারি করা ওর সব কাজের প্রশংসা করতে ভুলবেন না। এতে ও আপনাকে নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড ভাবতে শুরু করবে।

মা-বাবা সন্তানের সবসময় ভালো চায়। সন্তানের সঙ্গে মা-বাবার সম্পর্ক কোনো ছকবাঁধা নিয়ম নয়। তবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ককে অনেক কাছাকাছি এনে দেয়। সন্তান বাবা-মাকে ভয় না পেয়ে বন্ধু ভাবে, ভালো-খারাপ সবকিছু শেয়ার করে। তখন সহজে মা-বাবা সন্তানকে পরামর্শ দিতে পারে এবং সন্তানও তা শুনে থাকে। তাই সন্তানের বন্ধু হয়ে উঠুন।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।