অসম সম্পর্ক

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিয়ের রীতি বদলে গেছে অনেক। এই বদলের হাত ধরে বদলে গেছে সম্পর্কের গতিপথও। অসম সম্পর্ক আসলে কী? সম্পর্ক কখনোই অসম হতে পারে না। কারণ দু’জনের মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তাতে মানসিক বিষয়টা বেশি কাজ করে। তাই মনের দিক থেকে মিল থাকলে আজকাল সম্পর্কের ক্ষেত্রে বয়স কোনো ব্যাপার না। তবুও সমাজের কাছে আজো আমাদের অসম সম্পর্ক নামের শব্দটিকে মোকাবেলা করতে হয়। আসলে বিয়ে বা সম্পর্কের বয়স এখনো ঠিক করে দেয় সমাজ। সঙ্গী কত বছরের বড় বা ছোট হলে সমাজের চোখে শোভনীয় হবে, সেই মানদণ্ডের কোনো নির্দিষ্ট গাছপাথর আমাদের নেই।

কে কার প্রেমে পড়বে, কোন বয়সের ওপর পড়বে কিংবা কোন বয়সে তাকে বিয়ে করবে এই চিন্তাগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক থাকার কথা। কিন্তু সেগুলো এখন হয়ে উঠেছে সমাজকেন্দ্রিক! তাই সমাজ ঠিক করে দিচ্ছে কীভাবে এবং কেমন করে প্রেমে পড়া উচিত। মোরালিটির লেবাস থেকে ‘উচিত’ বলে মনে হলেও স্বাধীনচেতা যেকোনো মানুষের কাছে এই জিনিস ‘অ্যাবসার্ড’।

আমাদের সমাজ মনে করে পুরুষের বয়স যত বেশি হবে, তত অর্থসমাগম হবে। প্রভাব-প্রতিপত্তি হবে এমন ভেবেই এই উপমহাদেশে ১০ বছরের আগেই মেয়েদের বিয়ে দেয়া হতো ৩০-৩৫ বছরের কোনো সুঠাম যুবকের সঙ্গে। এই সম্পর্কগুলোই কিন্তু অসম বয়সের সম্পর্ক ছিল। খুব বেশি দূরে না যাই। আমাদের দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানির সম্পর্কগুলো কিন্তু এই সময়ের জন্য অসম সম্পর্কই। তবে এখন অনেকাংশে বিষয়টি কমে এসেছে। এখনকার যুগে যে ‘সেম এজ’ বিয়ের কথা বলা হয় সেটা এক জেনারেশন আগেও খুব একটা প্রচলিত ছিল না। এখন বয়সী বড় মেয়েদের বিয়ে করছে পুরুষরা। যদিও সেটা এখনো অনেক কম। পরিবর্তন হতে আরো কিছু সময় লাগবে। কারণ আমাদের সমাজের প্রচলিত ধারণাগুলো আজো আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলে।

 

কেন এই সামাজিক ট্যাবু

আসলে স্ত্রী বা প্রেমিকা স্বামীর চেয়ে বড় হলে অসুবিধা কী? এই প্রশ্নের সবচেয়ে সোজা উত্তর নারীর রিপ্রডাক্টিভ ক্ষমতা কমে আসে ৩০ বছরের পর। ৩৪ বছরের পর বাচ্চা হওয়াটাকে ‘লেট মাদার’ বলা হয়। তাই নারী ছোট হলে দাম্পত্য জীবনে শান্তি আসে। কিন্তু ২৫ বয়সের মেয়ে যদি ২৩ বছরের ছেলেকে বিয়ে করে, তাহলেও কেন বড়-ছোট নিয়ে কথা শুনতে হয়? ওই সময় রিপ্রডাক্টিভ ক্ষমতা মেয়েদের বেশিই থাকে। বাচ্চা হওয়াতেও সমস্যা হয় না!

২০০৯ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে একটি লেখা ছাপানো হয় Rethinking the Older Women and Younger Men relationship। সেখানে ড. ক্যারনের একটি Couple and Relationship Therapy নামে একটি জার্নালের কথা উল্লেখ করা হয়। ওই জার্নালে বলা হয়েছে, ‘একজন অল্প বয়সী পুরুষের মাঝে একজন নারী vitality খুঁজে পায়। আর ওদিকে পুরুষ চায় একজন আত্মবিশ্বাসী স্বাবলম্বী নারীকে। তাই এই ধরনের সম্পর্কগুলোতে একটি শক্ত খুঁটি থাকে।’

আমেরিকায় ১৯৬০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বয়সে বড় নারীদের কম বয়সী পুরুষকে বিয়ে করার রেট ৫.৪ পার্সেন্ট হলেও American Association of Retired Persons-এর সার্ভে অনুযায়ী, ২০১৬ সালে প্রায় ৩৪ পার্সেন্ট ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সের নারীরা ডেট করছে অল্পবয়সী তরুণদের সঙ্গে।

প্রচলিত সমাজে বলা হয়, ‘মেয়ে ছোট না হলে নাকি স্বামীরা আনন্দ পায় না!’ এই কথাকে বুড়ো আঙুল দিয়ে সেক্স থেরাপিস্ট Lonnie Barbach বলেছেন, ‘বেশি বয়সের নারীরা এমন তরুণকেই খুঁজে বের করে যে, দাম্পত্যজীবনে তাল মিলিয়ে তাদের সঙ্গে অ্যাকটিভ হতে পারবে। আগেকার যুগে নারীদের মধ্যে এই অ্যাকটিভ এবং প্যাসিভ রোল নিয়ে একটা লজ্জা ছিল বলেই সে সময় নারীরা কম বয়সীর সঙ্গে কমফোর্ট ফিল করত না।’

কিন্তু পৃথিবী এগিয়ে গেছে অনেক। সময় বদলেছে! নারীরা এখনো যৌনতায় অ্যাকটিভ। তাই অল্প বয়সের পুরুষ তাদের জীবনে কোনো অস্বস্তির বিষয় নয়। কিন্তু Barbach-এর একটি কথা উড়িয়ে দেয়াও যায় না। অনেক সময় তরুণরা বেশি বয়সের নারীর মধ্যে একটা শারীরিক আকর্ষণ খুঁজে পায়। শুধু সেই কারণে সম্পর্ক করতে গেলে সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি হয়ে ওঠে না। মূলত এই কাহিনিগুলো ঘটে বলেই ড়ষফবৎ ড়িসবহ এবং younger সবহ-এর রিলেশনে নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট ফেলে!

কিছু ভালো দিক

All womens talk ব্লগটি অসম বয়সের সম্পর্কের পাঁচটি ভালো দিক নির্ধারণ করেছে। ভালো দিকগুলো একটু বিশ্লেষণ করা যাক।

ভিন্ন ম্যাচিউরিটির লেভেল : সাধারণত এই কথাটি প্রায় সবাই বলে, মেয়েরা নাকি ছেলেদের চেয়ে একটু বেশি আবেগী। আসলে শরীরের বয়সটাই সব নয়। ৫০ বছরের শরীরে অনেকে ২০ বছরের একটা তরুণ বা তরুণীর হৃদয়কে ধারণ করতে পারে। আর তখনই কিন্তু সম্পর্কটা হয়! এই যে বয়সে বড় একজন অথচ ধারণ করে আছে সঙ্গীর বয়স আর চিন্তাধারাকে, এটা সম্পর্কের কেমেস্ট্রির জন্য আসলেই দারুণ।

প্রেমটা মানুষের সঙ্গে, বয়সের সঙ্গে নয় : একটা মানুষের চিন্তার সঙ্গে মিল হলেই কিন্তু বিয়ে বা সম্পর্ক হয়। তাই বিচার করতে হবে মানুষকে। মনে রাখতে হবে আপনি বার্থ সার্টিফিকেটের সঙ্গে নয়, একজন মানুষের সঙ্গে প্রেম করছেন। যদি এই চিন্তার মিল ঠিকঠাক থাকে, তাহলে চোখ বন্ধ করে আপনি সুখী।

রিয়েলিস্টিক জীবনযাপন : পার্টনারের সঙ্গে বিশাল এজ গ্যাপ আপনাকে রিয়েলিস্টিক করে তুলবে। আপনি কখনোই অহেতুক স্বপ্নে ভাসবেন না। দুজনের এজ গ্যাপ মানে একজন চূড়ান্ত ম্যাচিউরড থাকবে যে কিনা আপনাকে বাস্তববাদী করে তুলবে। জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রেই সেটা খুব দরকার।

শরীর এবং মনকে বোঝা : পার্টনার যত বড় হবেন, তত আরেক পার্টনারের শরীর এবং মনকে বোঝার চেষ্টা করবেন। আর এই বোঝাপড়াই সুস্থ দাম্পত্য জীবন এনে দেবে। একে অপরকে ঝধঃরংভরবফ করার জায়গাটা আসবে।

শুধু ভালোবাসা নয় : বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একজন তরুণ তরুণীর মধ্যে সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার কারণ থাকে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা বিনিময় শেষ। তারপর কথা বা প্রেম চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো প্লাটফর্ম থাকে না। এসব ক্ষেত্রে Age gap পার্টনাররা ভালো অবস্থানে থাকে। তারা একে অপরের সঙ্গে প্রথম থেকেই শুধু আবেগী ভালোবাসাই শেয়ার করে না। বরং নিজের লাইফের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, নিজেদের ভ্যালু, ভালোলাগার জায়গাও শেয়ার করে। আর তাতে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো কারণের ঘাটতি কখনোই পড়ে না!

রয়েছে খারাপ দিকও

এক যুগ আগেও বাংলাদেশে ২০ বছরের বড় পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হতো। কিন্তু এখন জায়গাটা চেঞ্জ হয়ে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রেই অসম বয়সের সম্পর্কের প্রতি নাক সিটকানো মনোভাব চলে এসেছে তার কারণও অনেকগুলো।

ডমেস্টিক ভায়োলেন্স বৃদ্ধি : অসম বয়সের সবচেয়ে ঘৃণ্য ফলাফল হচ্ছে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স। এটা এত ব্যাপকহারে বাংলাদেশে বিদ্যমান ছিল যে, Age gap relation-এর প্রতিই অনেকের আস্থা হারিয়ে গেছে। বয়সে বড় পার্টনার সব সময় একটা কর্তৃত্ব অনুভব করে। আর যেহেতু ম্যাচিউরিটি লেভেল কম-বেশি থাকে, তাই অন্য পার্টনারকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের একটা প্রবণতা চলে আসে। সেই প্রবণতা থেকেই চড়-থাপ্পড়-গালিগালাজ সর্বোপরি কর্তৃত্ব ফলানোর চেষ্টা করা হয়।

প্রভাব বিস্তার : ‘আমি বয়সে তোমার চেয়ে ৩০ বছরের বড়, তাই তোমাকে আমার কথা শুনতেই হবে।’ হতে পারত এই ৩০ বছর বয়সের ব্যবধানের এক সুন্দর মেলবন্ধন। দু’জনের জায়গা থেকে দু’জনের চিন্তাধারা শেয়ারের জায়গা। তা না হয়ে, এই একটা লাইন পুরো সম্পর্ককে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দেয়। বয়সে ছোট পার্টনারের ওপর শুরু হয় অবিবেচকের মতো প্রভাব বিস্তার করা। পার্টনারের পোশাক পরা, কারো সঙ্গে মেশা, বাইরে যাওয়া, বিজনেস বা চাকরি করা! সবকিছুর মধ্যে একটা অলিখিত বেড়াজাল দাঁড় করানো হয়। এই অনর্থক বেড়াজাল কেবল নিজের ইগো থেকেই সৃষ্টি। আর ইগোজনিত প্রভাব অসম বয়সের সম্পর্ককে নোংরা করে ফেলে এক নিমেষে।

বোঝাপড়ায় ব্যবধান : অসম বয়সের মানুষের মধ্যে চিন্তার মিল থাকলে তা দারুণ কিছু আইডিয়ার জন্ম দেয়। কিন্তু যদি চিন্তার মিল না থাকে! যদি তাদের মধ্যে বোঝাপড়ার ব্যাপক ব্যবধান থাকে! তখনই কিন্তু আসলে জন্ম নেয় দূরত্ব। আমার এই মুভি ভালো লাগে তোমার লাগে না, আমার বিকেলে ঘুরতে ইচ্ছে করে তো তুমি নাক ডাকিয়ে ঘুমাও, আমার উচ্ছল আড্ডা ভালো লাগে তো তোমার গম্ভীর আড্ডা! বোঝাপড়ার অমিল যেকোনো সম্পর্ককে শেষ করতে বাধ্য।

শারীরিক সম্পর্কে ফাটল : বয়স কম মানে স্বভাবতই রোমান্টিক। পূর্ণিমার কোনো রাতে পাশের সঙ্গীকে জড়িয়ে থেকে চাঁদ দেখা কিংবা সমুদ্রের পাড়ে না ছুঁয়ে বসে থাকা এসব রোমান্টিক ব্যাপার দেখা যায় কম বয়সী প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে। আবার কোনো কোনো রাতে দানব-দানবী হয়ে যাওয়াটাও তাদের বৈচিত্র্য ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু বেশি বয়সী মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রিত এবং কখনো কখনো অতি অবাস্তববর্জিত। তাই ফাটল ধরে তাদের শারীরিক সম্পর্কে।

মোট কথা মানসিক মিল এবং চিন্তাধারার মিল একটা অসম বয়সের সম্পর্ককে প্রাণবন্ত করতে পারে। তেমনি অমিল ধ্বংস করে দেয় সবটাকে। যে ক্ষেত্রে সমবয়সী কিংবা অল্প বয়সের ব্যবধান অনেকাংশে নিরাপদ।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।