দেখে এলাম ‘স্তালিন

ঈদ-পরবর্তী নিষ্প্রাণ সময়ে ঢাকার মঞ্চে এসেছে কামালউদ্দিন নীলু নির্দেশিত নতুন নাটক ‘স্তালিন’। দর্শক খরার সঙ্গে সন্ধি করে চলতে থাকা মঞ্চ নাটকের মধ্যে স্তালিন পেয়েছে আশানুরূপ দর্শক সাড়া। ১৯২২ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যোসেফ স্তালিন। তাকে ঘিরেই সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার-সিএটির নতুন এ প্রযোজনা। স্তালিনই নাটকটির কেন্দ্রীয় চরিত্র। এ নাটকটির মধ্য দিয়ে তার কর্তৃত্ববাদী চরিত্র তুলে ধরা হয়। গত ১০ জুন, সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে নাটকটির উদ্বোধনী মঞ্চায়ন হয়। এরপর ১১-১২ জুন নাটকটির আরো দুটি প্রদর্শনী হয়। কামালউদ্দিন নীলু নির্দেশিত এই নাটকটি দেখে বেশ কয়েকজন  তাদের অভিমত ব্যক্ত করেছেন 

 

রামেন্দু মজুমদার

নাট্যব্যক্তিত্ব

মঞ্চ নাটকের ক্ষেত্রে নাটকটি একটি সুন্দর প্রযোজনা হলেও আমার কাছে এটি একেবারেই পছন্দ হয়নি। নাটকটির বিষয়বস্তু নিয়ে আমার প্রশ্ন রয়েছে। কারণ নাটকটিতে স্তালিনকে একনায়কতন্ত্র একজন শাসক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও নাটকটির মধ্য স্তালিনসহ সমাজব্যবস্থাকে উপহাস করা হয়েছে। নাটকটি মঞ্চায়নের পর থেকে অনেক সমালোচনার পাশাপাশি অনেক নেতিবাচক কথাও উঠেছে। যারা এ ধরনের মন্তব্য করেছে, তারা প্রত্যেকেই নিজেদের অবস্থান বিচার-বুদ্ধি দিয়েই করেছে। এ ধরনের মন্তব্যের বিষয়ে আমার কোনো ধরনের বক্তব্য না থাকলেও নাটকটির মঞ্চায়ন বন্ধ করে দেয়ার যে আন্দোলন হয়েছে, সে আন্দোলনের সঙ্গে আমি কোনোভাবেই একমত পোষণ করতে পারছি না। নাটক নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক থাকবেই, তবে ভালো মানের প্রযোজনা মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে মঞ্চ নাটকে দর্শক ফিরিয়ে আনার একটা প্রবণতাও কিন্তু লক্ষ্য করা গেছে।

 

আতাউর রহমান

নাট্যব্যক্তিত্ব

স্তালিন নাটকটির নির্দেশক কামাল উদ্দিন নিলু আমার খুব কাছের একজন মানুষ। তবে তিনি এ নাটকটির মধ্য দিয়ে নির্দেশক হিসেবে কী বোঝাতে চেয়েছেন তা আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। স্তালিন কোন ধরনের মানুষ ছিলেন, সে বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। স্তালিনকে বাংলাদেশে এনে এভাবে মাথা নত করার কোনো দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। নাটকটিতে স্তালিন চরিত্রের ছেলেটি খুব ভালো অভিনয় করেছে। তবে নির্দেশকের ছক বাঁধা নিয়মের অভিনয় আমার মনঃপূত হয়নি। নাটকের মধ্য দিয়ে আমার মনে হয় দর্শকদের জোর করে হাসানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সংলাপে ফান থাকতেই পারে, তবে অভিনয় শিল্পীদের অসংলগ্ন দৈহিক অঙ্গভঙ্গি দিয়ে জোর করে হাসানোর চেষ্টা করা হয়েছে নাটকটিতে। আমি নাটকের এসব অসংলগ্ন দৈহিক অঙ্গভঙ্গি দেখে জোর করে হাসার চেষ্টা করেও হাসতে পারিনি। আমার যতদূর মনে হয়, নাটকটিতে নির্দেশক নিজের কর্তৃত্বটাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সর্বোপরি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভিনয়শৈলীসহ এ নাটকটি কোনো একটা প্রযোজনা হিসেবে দাঁড়িয়েছে বলে আমার মনে হয় না।

 

নায়লা আজাদ নূপুর

অভিনেত্রী

আমার কাছে নাটকটি ভালো লেগেছে। তার প্রথম কারণ হলো আমাদের দেশে এ ধরনের নাটক খুব বেশি করা হয় না আর দ্বিতীয়ত যে স্টাইলে নাটকটি মঞ্চায়ন করা হয়েছে সেটি আমার কাছে পারফেক্ট মনে হয়েছে। নাটকের কনটেন্ট নিয়ে যদি বলতে চাই, তাহলে আমি বলব আমার কাছে মনে হয় না নাটকটিতে ইতিহাস বিকৃতি করা হয়েছে। আমি মঞ্চে যেটা দেখেছি সেটা একজন নির্দেশকের দেখানো প্রেজেন্টেশন দেখেছি। তবে যারা নাটক বন্ধের দাবি করেছে, তারা নিজেদের অপারগতা কিংবা বোকার পরিচয় দিয়েছে। আমাদের দেশের নাট্যবোদ্ধারা নাটক দেখতে গিয়ে নিজেদের পাণ্ডিত্য জাহির করার জন্য নাটকের ভুল খুঁজে বেড়ান। নাট্যবোদ্ধাদের এমন আচরণ আর খুত খুঁজে বেড়ানোর স্বভাব অন্য একজনের ভালো কাজের অনুপ্রেরণায় আঘাত হানে। আমরা নিজেদের খুব বড়াই করে বলি, আমরা বাঙালি আমরা সংস্কৃতিমনা কিন্তু আসলে আমরা খুবই ছোট মনের। আমাদের দেখার দৃষ্টি কিংবা অন্তর্দৃষ্টি অনেক ছোট। পরশ্রীকাতরতায় আমরা জ্বলে যাই। আমরা আমাদের আমিত্ব জাহির করার জন্য এবং নিজের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আমরা সমালোচনা করতে শুরু করি। এই প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির কখনোই কোনো প্রকার উন্নতি সাধন হবে না। কারো কাজের প্রশংসা করতে না পারলে অন্তত সমালোচনা না করে নিশ্চুপ থাকাই উত্তম বলে আমি মনে করি। কামালউদ্দীন নীলু তার নাটকে তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে এবং সেটাই আমার কাছে ভালো লেগেছে।

 

আহমেদুল কবির

চেয়ারম্যান

থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ

স্তালিন নাটকটি ব্যক্তিগতভাবে আমার ভালো লেগেছে, তবে নাটকের টেক্সটা আমার কাছে মনে হয়েছে গৎবাঁধা। আমরা যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক জায়গা থেকে বিবেচনা করি, সেহেতু আমি উদাহরণ টেনে বলতে পারি গ্যালিলিও নাটকটির কথা। গ্যালিলিও নাটকটির টেক্সটটা পড়েই আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, গ্যালিলিও একজন বিজ্ঞানী, একজন ভোজনরসিক, গ্যালিলিও কোথাও হচ্ছে জীবনের জন্য মিথ্যা কথা বলেন, সব বিষয় কিন্তু পরিষ্কার। কিন্তু স্তালিনের টেক্সটটাতে সে রকম কিছুই আমি পাইনি। স্তালিনের নাটকটি দেখে আমার কাছে টেক্সটের মতোই গৎবাঁধা এবং একই রকম মনে হয়েছে। নাটকটির আলোর ব্যবহার আমাকে খুবই আশাহত করেছে। আলোকসজ্জা মঞ্চের মধ্যে কোনো প্রকার অর্থ তৈরি করেনি। মঞ্চের মাঝে লাইটের কোনো জাদু কিংবা মুন্সিয়ানা আমি পাইনি। সব জায়গায় একটা লাল লাইট ব্যবহার করা হয়েছে স্তালিনকে বোঝানোর জন্য, যে সব জায়গায় লাল লাইটই ব্যবহার করতে হবে কেন, সে বিষয়টা আমি বুঝতে পারিনি। এছাড়া যারা নাটকটিতে অভিনয় করেছেন, তারা দীর্ঘদীন ধরে সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (সিএটি) করেন, তারা খুবই ভালো করেছেন। আমাদের দেশে নিয়মিতই মঞ্চ নাটক হচ্ছে। তবে একেকটা একেক ধরনের। মঞ্চ নাটকে কামালউদ্দীন নীলু বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা নির্দেশক। তিনি দীর্ঘদীন সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটারের (সিএটি) সঙ্গে কাজ করছেন। তারই ধারাবাহিকতায় স্তালিন নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে। একটি নাটক নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হতেই পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক। তবে আমার কাছে কোন নাটক নিয়ে কী ধরনের আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। মূল গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নিয়মিত নাটক মঞ্চায়নের বিষয়টা। স্তালিন নাটকটির কিছুদিন আগে মঞ্চাঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে জামিল আহমেদ নির্দেশিত জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নাটকটি। ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’, ‘স্তালিন’ নাটকের মতো গ্রুপ থিয়েটারসহ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমাদের যে নিয়মিত নাটক মঞ্চায়ন হচ্ছে আমার কাছে এ বিষয়টাই মুখ্য। তবে নাটক নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থাকবে কিন্তু নাটক বন্ধ করে দিতে হবে, সেটা জামিল আহমেদের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখেছি আবার সেটা স্তালিনের বেলায়ও ঘটেছে। এটা কেন? আমি কোনোভাবেই নাটক বন্ধ করে দেয়ার এমন সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত পোষণ করতে পারছি না। ভিন্ন মত, ভিন্ন চিন্তা নিয়েই যে কেউই নাটক করতেই পারেন। যারা এ নাটকগুলো নির্দেশনা দিয়েছেন তারা শিল্পাঙ্গনের সম্মানিত ব্যক্তি। জামিল আহমেদ একজন মুক্তিযোদ্ধা, কামালউদ্দীন নীলু হচ্ছেন একজন খ্যাতিসম্পন্ন নাট্যনির্দেশক এবং তিনি একজন শিক্ষক ছিলেন। উনারা যা-ই করুন না কেন, আমার কাছে মনে হয় না সমাজ, দেশ কিংবা রাজনৈতিক চিন্তার বাইরে থেকে কিছু করবেন। এভাবে আন্দোলন করে নাটক বন্ধ করে দেয়ার দাবি কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। তবে হ্যাঁ, নাটক নিয়ে কোনো বক্তব্য থাকলে সেটা লিখিত আকারে হওয়াটাই আমি মনে করি বাঞ্ছনীয়।

 

জাহিদ রেজা নূর

সাংবাদিক

স্তালিন নাটকটি দেখে আমার মনে হয়েছে, সোভিয়েত ইতিহাসের জ্বলজ্যান্ত সত্য ঘটনাগুলো আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। আমি আশা করেছিলাম, স্তালিনের সব নির্মমতা, প্রগলভতা এবং চরিত্রের ভালো-মন্দ দিক উঠে আসবে নাটকে। আমার ১০ বছরের সোভিয়েত জীবনে ধীরে ধীরে যখন বেরিয়া, ঝদানভ (নাটকে ছিলেন না), মলোতোভদের হিংস্রতার খবর শুনছিলাম সেই আশির দশকের মাঝামাঝি, ভেবেছি সেটাই দেখতে পাব মঞ্চে।

কিন্তু যে স্তালিনকে দেখলাম নাটকে আগাগোড়া চিৎকাররত, তার সঙ্গে সোভিয়েত লৌহমানব স্তালিনের সাদৃশ্য পেলাম কমই। আমরা বিভিন্ন লেখায় যেভাবে পড়েছি, বিভিন্ন তথ্যচিত্রে যেভাবে দেখেছি তাকে, তাতে আর যা-ই হোক, তাকে ও তার পারিষদদের ক্লাউন বলে মনে হয়নি কখনো। বরং ঠাণ্ডা মাথার খুনি বলেই মনে হয়েছে। নাটক সম্পর্কে আমাদের গতানুগতিক ভাবনা ভেঙে দিয়ে নির্দেশক একটা এমন ফর্মের মধ্যে আমাদের নিয়ে গেছেন, যাতে ঢুকতে একটু কষ্ট হয়। প্রচলিত ধরন নয় বলেই হয়তো রসিকতার আড়ালে শ্লেষ আর নৃশংসতাটুকু থাকে। একজন মানুষ রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে নিয়েই চারদিকে গণশত্রু দেখতে পান, নিজ দলের মানুষ ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করেন না, এরপর নিজ দলের লোকজনকেও বিশ্বাস করেন না, বিশ্বাস করেন না পলিটব্যুরোর সদস্যদের, এমনকি একসময় নিজেকেও অবিশ্বাস করতে শুরু করেন।

চমক ছিল মিলনায়তনে ঢোকার শুরুতেই। সেখানেই শুরু হয়ে যায় নাটক। এরপর মিলনায়তনে ঢুকেই সের্গেই আইজেনস্টাইনের ইভান গ্রোজনি চলচ্চিত্রের কিছু অংশ দেখার পর বন্দুকের নলের সামনে চলচ্চিত্রকারকে দেখতে পাই এবং শুনতে পাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ। সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার বা সিএটিকে এ কারণেই ভালো লাগে যে, নাটকের মাধ্যমে যেকোনো সময়ই বিশ্বাসযোগ্য একটা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে তারা।

যে কুশীলবরা দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অভিনয় করে গেলেন, যারা থাকলেন শব্দযন্ত্র আর আলো নিয়ন্ত্রণে, তাদের কুশলতায় মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। স্তালিন চরিত্রে শাহাদাত হোসেন কিন্তু অভিনয় খারাপ করেননি। কিন্তু যে কাহিনিটি নিয়ে এগিয়েছেন কামালউদ্দিন নীলু, তার দৈর্ঘ্য কি আরেকটু কম হতে পারত না?

নাটক দেখে মনে হলো, স্তালিনের মাধ্যমে গোটা মার্ক্সবাদী আচরণকেই যেন কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন নাট্যকার। সোভিয়েত ভুলকে ছাড়িয়ে মার্ক্সবাদ যে নতুন ব্যাখ্যার পথে এগিয়েছে, সেখানেও নির্ভরতা পাওয়া যেতে পারে এ কথা যারা মানেন, তারা নাটক দেখে হোঁচট খাবেন।

একটা কথা না বললেই নয়, সবচেয়ে কানে লেগেছে ‘লেলিন’ শব্দটি! সতেরোর বিপ্লবের নায়ক ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানোভকে (লেনিন) ‘লেলিন’ বলে ডাকা হলে সত্যিই হোঁচট খেতে হয়।

আরেকটা কথা, নাটকজুড়ে তথ্যের পর তথ্য জোগাড় করা হয়েছে ইটের মতো। কিন্তু তা থেকে কোনো ইমারত শেষ পর্যন্ত গড়ে উঠল কই?

 

বন্যা মির্জা

অভিনেত্রী

মঞ্চে নাটক আমি প্রথমত ও মুখ্যত থিয়েটার হিসেবেই দেখি। এই নাটকের প্রচুর বিষয় মনোযোগ কাড়ার মতো। শুরুতেই লাল রঙের আবহ, কাস্তে-হাতুড়ি আর মাথায় ক্যাপ পরে দর্শকের যাত্রা শুরু করতে হয়। আমার জন্য, হয়তো অনেকের জন্যই তা নতুন। একটা দারুণ অনুভূতি সমেত শুরু হয়। বাইরের প্যাসাজ থেকেই অভিনয় শুরু হয়। তারপর সবাই মূল প্রেক্ষাগৃহে যায়। সেখানেও দর্শকের পেছন দিক থেকে স্তালিন কথা বলতে শুরু করেন। এই চমকগুলোর মধ্য দিয়ে দর্শক নাটক দেখা শুরু করেন। শুরুতে তো বটেই, আমি এখনো মনে করি যে আলোকসজ্জা, মঞ্চসজ্জা, অভিনয় সবকিছু খুবই ভালো। এরপর থাকে বিষয়বস্তু বা কনটেন্ট। স্তালিন সারাবিশ্বেই অত্যন্ত পরিচিত চরিত্র। তিনি এত বছর ধরেই নিন্দিত ও নন্দিত মহানায়ক। সারাবিশ্বের মার্ক্সবাদী ও বামপন্থীদের কাছেও তার সম্বন্ধে মনোভাব একদম দুইভাগে বিভক্ত। এই পরিচালক বা নির্মাতা কামালউদ্দীন নীলু দীর্ঘদিনের সম্মানিত নির্দেশক। তিনি যে ইন্টারপ্রিটেশনটা নিয়েছেন, সেটা অনেকের কাছেই অগ্রহণযোগ্য মনে হবে সেটাও ঠিক। বামপন্থীদের অনেকের কাছেই স্তালিনের এ রকম ইন্টারপ্রিটেশন বা পরিবেশন গ্রহণযোগ্য মনে হবে না। এবং যারা দীর্ঘদিন নির্দিষ্ট ধারার রাজনৈতিক চর্চার মধ্যে আছেন, তাদের পক্ষ থেকে অগ্রহণযোগ্য মনে হওয়া অতি ন্যায্য বলেই আমি মনে করি। কিন্তু নাটক বন্ধের দাবিকে সমর্থন করার প্রশ্নই ওঠে না। বরং এসব ক্ষেত্রে ‘বন্ধ’ করে দাবি ওঠানোটাই শিল্পচর্চার জন্য ক্ষতিকর। এর আগে অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদের নাটক বন্ধ করার দাবিও তুলেছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ নাট্যবিদরা। সেটা খুবই বিপজ্জনক। ‘অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন’-এর মতো ঔপনিবেশিক আইনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই করতে হয়েছে আমাদের। এখনো শিল্পকলার হল বণ্টনের চর্চার মধ্যে বৈষম্য আছে। ‘বটতলা’ সমেত অনেক নাট্যদলই এই বৈষম্যের প্রসঙ্গ তুলে আসছেন। তার মধ্যে কোনো নাটকই বন্ধের দাবি করা কাজের কথা নয়। নাটকের কনটেন্ট নিয়ে তর্ক হতে পারে, আলোচনা হতে পারে, নির্মাতা ও সংগঠনকর্মীদের মধ্যে উন্মুক্ত বিতর্ক হতে পারে, নতুন নাটক তো হতে পারেই।

স্তালিন ইতিহাসের নায়ক না খলনায়ক এই বিতর্ক ডায়নামিক। মার্ক্সবাদ, লেনিনবাদ কোনো অপৌরুষেয় শাস্ত্র নয়, এ নিয়ে আলোচনা চলবে না। নাটক বন্ধ করার স্লোগান তোলা প্রতিক্রিয়াশীল আচরণের নামান্তর। স্তালিন নাটকের সমালোচনা নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করেন বিভিন্ন দলের নাট্যকর্মীরা। তারা দাবি জানান নাটক বন্ধ কোনো সুখকর বিষয় নয়। ‘স্তালিন’ নিয়ে যাদের আপত্তি আছে, তারা আবার নাটকটি দেখুন। তারপর প্রযোজনা সংগঠনকে বলুন একটা ‘মিট দ্য ডিরেক্টর’ পর্ব আয়োজন করতে। সেখানে আলোচনা হোক। তবে সমালোচিত নাটক স্তালিন নিয়ে নাট্যাঙ্গনের অনেকেই কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছে।

স্তালিনের মাধ্যমে পাঁচ বছর পর ঢাকার মঞ্চে ফিরলেন কামালউদ্দিন নীলু। ১০ মিনিট বিরতিসহ পৌনে তিন ঘণ্টার নাটকে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মো. শাহাদাত হোসেন। আরো অভিনয় করেছেন সাবিনা সুলতানা, রায়হান আখতার, এ কে আজাদ, মোহাম্মদ রাফী সুমন, শাওন কুমার দে, শিপ্রা দাস, শান্তনু চৌধুরী, সুব্রত প্রসাদ বর্মণ, মর্জিনা মুনা, মেজবাউল করিম, চিন্ময়ী গুপ্তা, কাবেরী জান্নাত প্রমুখ।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।