সাক্ষাৎকার : ‘সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে যে কেউ শিল্পী হয়ে যাচ্ছে’

কণ্ঠশিল্পী, চিত্রশিল্পী শায়ান চৌধুরী অর্ণবের সঙ্গে অভিনেত্রী, মডেল, কণ্ঠশিল্পী ও উপস্থাপিকা রাফিয়াথ রশিদ মিথিলা। সম্পর্কে দু’জন মামাতো-ফুপাতো ভাই-বোন। অর্ণবের কাজে বেশ প্রভাবিত মিথিলা। গান, ছবি আঁকা, গিটার বাজানো এসব কিছু শিখেছেন অর্ণবের কাছেই। একসঙ্গে দু’জনে একটি নতুন গান নিয়ে কাজ করলেন সম্প্রতি। সেই গান নিয়েই গল্প, আড্ডায় মাতলেন আনন্দধারা সম্পাদক রাফি হোসেনের সঙ্গে।

 

রাফি হোসেন : দীর্ঘদিন পর অর্ণব আবার গান করলে? সে গানে দু’জনই যুক্ত আছো। কেমন লাগছে তোমাদের?

অর্ণব : মিথিলা আমার পেছনে জোঁকের মতো লেগে থেকেই আমাকে দিয়ে গানটা করিয়েছে। ও আসলে অনেক অ্যাকটিভ। আমার অনেক আগেই একটা গানের কিছু অংশ করা ছিল সেটার বাকি কাজ মিথিলার জোরাজোরি শেষ করলাম। গানের কাজ প্রায় শেষ। তবে আমরা এ গানটির ভিডিও ফিকশনের শ্যুট কলকাতাতে করেছি।

মিথিলা : আমার যতটুকু মনে হয় অর্ণবের ভক্তরা সবাই অর্ণবের গান শোনার জন্য ব্যাকুল। সবার মনে আবার প্রশ্নও জেগেছে, অর্ণব গান করছে না কেন? অর্ণব যে খুবই অলস সেটা তো আর সবাইকে বলা যায় না। আমরা দু’জনেই কাজিন। আর সেই সুবাদে তার গান না করার প্রশ্নের জবাব আমাকে দিতে হয়। কেন অর্ণব গান করছে না, কোথায় সে, সে কি হারিয়ে গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই জন্যই আমি তাকে আবার গান করার জন্য অনেক পীড়াপীড়ি শুরু করি। তবে অনেকেই মনে করছেন, অর্ণবের সঙ্গে আমিও গান গেয়েছি। গানের সঙ্গে আমি যুক্ত আছি, তবে সেটা গানের ভিডিওতে মডেল হিসেবে।

রাফি হোসেন : দেশের বাইরে শ্যুট করার কারণ কী?

অর্ণব : এটা কলকাতাতে শ্যুট করার কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না। আমার যেহেতু শান্তিনিকেতনে থাকা হয় আর মিথিলারও কলকাতাতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকায় দুইয়ে মিলে প্ল্যান করে আমরা কলকাতাতে শ্যুট করি। কলকাতার বিভিন্ন লোকেশন মিলিয়ে গানটির ভিডিও ধারণের কাজ অনেক সুন্দর হয়েছে। গানের শেষের দিকে কিছু কাজ বাকি থাকলেও আশা করছি ঈদের আগেই গানটি মিউজিক ভিডিওসহ রিলিজ করা হবে।

মিথিলা : এটা বাংলাদেশেরই প্রোডাকশন। ধ্রুব মিউজিক স্টেশনের ব্যানার থেকে গানটি প্রকাশ করা হবে। গানটি দেশের বাইরে শ্যুট করার আলাদা বা অন্য কোনো কারণ নেই। এই গানটির মিউজিক ভিডিওর শ্যুটিং করতে গিয়ে আমরা খুব সুন্দর সময় কাটিয়েছি। এটা অর্ণবের পরিপূর্ণ একটা মিউজিক ভিডিও।

রাফি হোসেন : বর্তমানে গান শোনার চেয়ে দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটাকে তোমরা কীভাবে দেখছো?

অর্ণব : আমি ভিজ্যুয়াল আর্ট নিয়ে লেখাপড়া করেছি। আমার কাছে সবসময় মনে হয় মিউজিকের সঙ্গে ভিজ্যুয়ালটা কেমন হবে। মিউজিকের জন্য ভিজ্যুয়াল নাকি ভিজ্যুয়ালের জন্য মিউজিক সেটা আসলেই মুখ্য বিষয়। গান অবশ্যই শোনার বিষয়। তবে বর্তমানে যুগের সঙ্গে গানের একটি গল্পনির্ভর ভিডিও দর্শকরা দেখার প্রত্যাশা করে।

মিথিলা : এ বিষয়টাতে আমি অর্ণবের সঙ্গে পুরোপুরি একমত পোষণ করছি।

রাফি হোসেন : একজন শিল্পীর জীবনে নিয়মানুবর্তিতা কতটা জরুরি বলে তোমরা মনে করো?

অর্ণব : একজন শিল্পীকে অবশ্যই শৃঙ্খল হতে হবে। আমি আমার জীবনে শৃঙ্খল আর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে জীবন সাজানোর শিক্ষাটা শান্তিনিকেতন থেকে পেয়েছি। আমার গানের পেছনে এ শিক্ষাটা আমায় দারুণভাবে সহায়তা করে।

মিথিলা : আমাদের শিল্পীদের খুবই নিয়মমাফিক চলতে হয়। আমি যদি ব্যক্তিগতভাবে বলি তাহলে বলতে হয়, একজন অভিনয় শিল্পীর জীবনের সঙ্গে নিয়মমাফিক চলাচল করা একটা প্রাত্যহিক রুটিনের মতোই। আমি নিজেও ব্যক্তিজীবনে নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করি। কারণ যে কোনো শিল্পচর্চার সঙ্গে নিয়মানুবর্তিতা খুবই জরুরি।

রাফি হোসেন : আমাদের গান কি কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে?

অর্ণব : হারিয়ে যাচ্ছে এ কথাটা আমি বলব না। এখন তো নতুন নতুন অনেকেই ভালো কাজ করছে। তবে বর্তমানে কাজের মাধ্যমটা পরিবর্তন হয়েছে। তবে আমার যে বিষয়টা মনে সেটা মিউজিকের জন্য যে সাধনা, চর্চা কিংবা পরিশ্রম যা-ই বলি না কেন সেটা কিন্তু এখন আর সেই অর্থে হচ্ছে না। সবাই কেন জানি মনে হয় একটু হিট, একটু ভাইরাল হওয়া নিয়ে ব্যস্ত। তবে আমার হয় পরিপূর্ণ শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে। একটা নতুন ছেলে কিংবা মেয়ে কীভাবে তৈরি হবে সেই শিক্ষাটা এখন কেউই পাচ্ছে না। আমার মনে হয় সবার মধ্যে একটা আলাপ-আলোচনা করা দরকার।

মিথিলা : আমার মনে হয় আমাদের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিটা খুব একাকিত্ব বোধ করছে। বর্তমানে ইউটিউব কিংবা সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে যে কেউ শিল্পী হয়ে যাচ্ছে। আমাদের মৌলিক কিংবা ইউনিক মিউজিক সৃষ্টি হচ্ছে না।

রাফি হোসেন : অর্ণব তুমি কী এখন তোমার শুরুর দিকের মতো মিউজিক করতে চাও নাকি ভিন্নভাবে কিছু করতে চাও অথবা অন্য কোনো ভাবনা আছে?

অর্ণব : আমি চাই নতুনভাবে গান ছাড়াই মিউজিক দিয়ে কিছু করা যায় কিনা। আবার চাই সেই মিউজিক মানুষকে কতটা সম্পৃক্ত করবে। আমার একটা জিনিস খুবই ভালো লাগে যখন একসঙ্গে দুই-তিন হাজার মানুষ একসঙ্গে রবীন্দ্রসংগীত গায়। শান্তিনিকেতনে এ দৃশ্য দেখলে সত্যিই আমার চোখ-আত্মা দুটোই জুড়িয়ে যায়। ছোটবেলা থেকে ওদের গান গাওয়ার এ শিক্ষাটা সত্যিই মনোমুগ্ধকর। আমার খুবই ইচ্ছে এই রকমভাবে যদি আমাদের দেশেও কিছু করা যেত। শান্তিনিকেতনের মতো যদি কোনো শিক্ষালয় আমাদের থাকত, আমার খুব ইচ্ছে হয় আমি বাচ্চাদের গান শেখাই। যার যা প্রতিভা তার ওপর নির্ভর করে তাদের শেখাই।  

মিথিলা : অর্ণব যে একসঙ্গে গান গাওয়ার যে দৃশ্যের কথা বলল তা নিজ চোখে না দেখলে বোঝার উপায় নেই। কীভাবে যে গানের সুরে মন শীতল হয়ে যায় বোঝার কোনো উপায় থাকে না। আমি অর্ণবকে বলেছি চলো আমরা বাচ্চাদের নিয়ে কোনো একটা কাজ শুরু করি।

রাফি হোসেন : তোমাদের দু’জনের পরস্পরের কাছে কিছু জানার আছে কী?

অর্ণব : আমার মিথিলার কাছে একটা প্রশ্ন আছে, সেটা হলো ও এত শক্তি পায় কীভাবে। ওর এত ফ্যান-ফলোয়ার কীভাবে তৈরি হয়েছে?

মিথিলা : অর্ণবের সম্পর্কে আমি সব জানি। আমার ওর সম্পর্কে জানার কিছু নেই।

রাফি হোসেন : তোমাদের ফ্যান-ফলোয়ার কিংবা ভক্ত তাদের সঙ্গে তোমাদের সম্পর্কটাকে কীভাবে উপলব্ধি করো?

অর্ণব : আমি যদি এক কথায় বলতে চাই তাহলে বলব আমরা তাদেরই একজন এবং তারা আমাদেরই।

মিথিলা : অর্ণবের সঙ্গে আমি বলতে চাই, তারা আমাদের আপন কিংবা নিজের করে নিয়েছে বলেই আমরা আজ কিছু একটা হয়ে উঠতে পেরেছি।

 

অনুলিখন : আখন্দ জাহিদ

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup