নাচের চেয়ে অভিনয়ের প্রতিই আমার দুর্বলতা বেশি

রুমানা রশীদ। তবে তিনি ঈশিতা নামেই পরিচিত। নাচ, গান আর অভিনয়ে সমানভাবে পারদর্শী ঈশিতা, শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’র মধ্য দিয়ে মিডিয়াতে আসেন। শিশুশিল্পী হতে স্বনামে জনপ্রিয় তিনি। নিজ অভিনয়ে দর্শক হৃদয় জয় করা এ অভিনেত্রী অভিনয়ের পাশাপাশি ব্যস্ত রয়েছেন লেখালেখি আর নাটক রচনায়। পাশাপাশি নাটক নির্দেশনায় রয়েছে তার সফল উপস্থিতি। সংসার, লেখাপড়া, শিক্ষকতা, ব্যবসা সবকিছু মিলিয়ে বর্তমানে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তিনি। যার পরিপ্রেক্ষিতে অভিনয়ে উপস্থিতিতে কিছুটা ভাটা পড়েছে তার। নিজের অভিনয় ও ব্যক্তিজীবনের নানা বিষয় নিয়ে আনন্দধারার সঙ্গে কথা বলেছেন জনপ্রিয় এ অভিনেত্রী-

 

আনন্দধারা : আপনি তো প্রায় অভিনয় ছেড়েই দিয়েছেন। কিন্তু কেন?

রুমানা রশীদ ঈশিতা : অভিনয় আমি ছেড়ে দিইনি। তবে বছরে এখন দুটো-তিনটার বেশি কাজ করা হয় না। আসলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনের নানান পরিবর্তন ঘটে। আমার ব্যক্তিজীবনের একটা অংশ অনেক জায়গাজুড়ে রয়েছে। তাই সবকিছু মিলিয়ে ইচ্ছা থাকলেও অভিনয় নিয়মিত করার সময় হয়ে ওঠে না। অভিনয় আমার প্রাণের সঞ্চার। তবে আশা করছি সময়ের সঙ্গে আবারো সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

আনন্দধারা : সম্প্রতি আপনার অভিনীত ‘পাতা ঝরার দিন’ নাটকটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এ কাজটি নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কেমন ছিল?

রুমানা রশীদ ঈশিতা : ‘পাতা ঝরার দিন’ নাটকটি আমার অনেক পছন্দের একটি কাজ। এ নাটকটিতে অভিনয়ের জন্য আমাকে চিন্তা করার জন্য আমি প্রথমেই কৃতজ্ঞতা জানাই নাটকটির পরিচালক রেদোয়ান রনিকে। রনি বাংলাদেশের একজন গুণী এবং জনপ্রিয় নির্মাতা। যখন তার কাছ থেকে এ কাজটির অফার পেলাম, তখন বিশেষভাবেই মনোযোগটা একটু অন্যরকমই ছিল। রনির কাছ থেকে পুরো গল্পটা শোনার পর সিনেমার মতো প্রতিটা দৃশ্য আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। রনির সঙ্গে আমার ভালোভাবে পরিচয় না থাকলেও তার মুখ থেকে গল্পটা শোনার পর এত ভালো লেগে গিয়েছিল, আমি যে কথা কাউকে কখনো বলি না সে কথাটাই রনিকে বলে দিয়েছি- যে ভাই কাজটা কিন্তু আমিই করব। এ নাটকের গল্পের অসাধারণ ভিন্নতার কারণেই কাজটি করার শুরু থেকেই এটি নিয়ে আমার অনেক প্রত্যাশা ছিল এবং সর্বশেষ দর্শকও আমার প্রত্যাশাকে সম্মান জানিয়েই নাটকটি ভালোবেসে নিজের করে নিয়েছে।

আনন্দধারা : আপনি কী ইচ্ছে করেই অভিনয় কমিয়ে দিয়েছেন?

রুমানা রশীদ ঈশিতা : আমি যখন যে কাজটাই করি না কেন সেটা খুবই মনোযোগ সহকারে করার চেষ্টা করি। ২০০৪ সালে গ্র্যাজুয়েশন করেছি এবং ২০০৫ সাল থেকে টানা ১১ বছর চ্যানেল আইয়ে চাকরি করেছি। ওখানে আমাকে লম্বা সময় দিতে হয়েছে। তারপর চাকরি থেকে বের হয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন অর্থাৎ এমবিএ শেষ করি। তার মধ্যে সংসার-সন্তান সবকিছু মিলিয়ে অভিনয়ে আর মনোযোগটা দেয়া হয়ে ওঠেনি।

আনন্দধারা : আপনার ক্যারিয়ারের সোনালি সময়ে অভিনয় থেকে দূরে যাওয়ার এমন সিদ্ধান্ত কেন নিলেন?

রুমানা রশীদ ঈশিতা : আমি তো সেই ছোট্ট বেলা (ক্লাস ওয়ান) থেকেই অভিনয় করি। তাই অভিনয়ের বাইরে গিয়ে অন্য কোনো পেশায় নিজেকে পরখ করার চেষ্টা ছিল আমার। তাই গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই চ্যানেল আইয়ে জয়েন করি। চ্যানেল আই আমাকে কাজের জন্য মোটামুটি স্বাধীনতা দিয়েছিল। আমি ওনাদের হয়ে নাটক নির্মাণ করেছি। পাশাপাশি আমি স্ক্রিপ্টও লিখতাম। বর্তমানে আমার একটা রেস্টুরেন্ট ব্যবসা রয়েছে। তাছাড়া আমি একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি। আমার পড়াতে খুবই ভালো লাগে এবং আরো কিছুদূর নিজেও লেখাপড়া করার ইচ্ছে রয়েছে আমার। সবকিছু মিলিয়ে ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা থেকেই আমার আসলে অভিনয় থেকে একটু দূরে সরে পড়তে হয়েছে।

আনন্দধারা : আপনি নিজেও নাটক নির্মাণ করেছেন? আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে নারী নির্মাতা তৈরি না হওয়ার কারণ কী?

রুমানা রশীদ ঈশিতা : আমার নির্মাণের বিষয়টা অন্যদের চেয়ে আলাদা এ কারণে যে, আমি যত নাটক নির্মাণ করেছি সব অফিশিয়ালভাবেই করেছি। এ ব্যাপারে আমাকে কোনো প্রকার সংগ্রাম করতে হয়নি। অফিস থেকেই আমাকে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হতো। আমার মতো এমন সুযোগ হয়তো সবার হয়ে ওঠে না। সত্যি বলতে আমার কাছে মনে হয়, আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় নির্মাতা একটু বেশিই আছেন। নারী নির্মাতা তৈরি না হওয়ার পেছনে এটা একটা অন্তরায়। কারণ চাহিদার চেয়ে সাপ্লাইয়ের পরিমাণটা বেশি হয়ে গেছে। তবে এর মাঝেও আমাদের যারা নারী নির্মাতা রয়েছেন, তারা খুব ভালো কাজ করছেন। যে কোনো ক্যারিয়ারে আসার আগেই নিজের প্রতি প্রবল আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে এবং আমার মনে হয় বর্তমানে অনেকের মাঝে তা রয়েছে। আমার দেখা মতে বর্তমানে অনেক মেয়েই সহকারী পরিচালক হিসেবে খুব ভালো কাজ করছে এবং ভবিষ্যতে নির্মাণের ক্ষেত্রে তারা তাদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নেবে।

আনন্দধারা : আপনি যদি ছোটবেলা থেকে অভিনয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হতেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে ঈশিতা হয়ে ওঠা কি আপনার জন্য কষ্টসাধ্য হতো?

রুমানা রশীদ ঈশিতা : আসলে আমি যখনই বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই দেখেছি আমার জীবন একটা নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে চলমান। তারই ধারাবাহিকতা ছোটবেলা থেকেই আমি অভিনয়ের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা। আর আমি যদি ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের সঙ্গে জড়িত না হতাম, তাহলে বড় হয়ে আমাকে আর অভিনয় শিল্পী হয়ে ওঠা হতো না। তবে সবকিছু মিলিয়ে আমি এটুকু বলতে পারি, আমি নিজেকে অভিনয়ের বাইরে অন্যভাবে চিন্তা করিনি।

আনন্দধারা : স্বামী কিংবা সংসার থেকে অভিনয়ে কি কোনো প্রকার বাধা আসে?

রুমানা রশীদ ঈশিতা : একদমই না। আমার স্বামী আমার অভিনয়ের ব্যাপারে যথেষ্ট পরিমাণে হেল্পফুল। তাছাড়া আমার শ্বশুরবাড়ি প্রায় অধিকাংশ মানুষজন কোনো না কোনোভাবে মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত। আর সংগীতশিল্পী ফিরোজা বেগম আমার ফুফি শাশুড়ি। তিনিই তার ভাইয়ের ছেলের জন্য আমাকে পছন্দ করেন এবং গানের বিষয়ে কথা বলতে নিয়ে আমার স্বামীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন তিনি। যে পরিবারে একজন ফিরোজা বেগম রয়েছেন, এমনকি যে পরিবারের মানুষজন সংস্কৃত অনুরাগী তাদের বাড়ির বউ মিডিয়াতে কাজ করা নিয়ে কোনো বাধা হওয়ার কথা নয়।

আনন্দধারা : মিডিয়ার কারো সঙ্গে সংসার করার ইচ্ছে ছিল না?

রুমানা রশীদ ঈশিতা : মিডিয়া আমার একটা পরিবার। আর এই মিডিয়ার মানুষজন আমার পরিবারেরই অংশ। তাই আমার মনে হয়েছিল পরিবারের মানুষজন নিয়ে আলাদাভাবে স্বপ্ন দেখার কিছুই নেই। সে কারণেই মিডিয়ার কারো সঙ্গে আমার সংসার করা হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া আমার সে ধরনের ইচ্ছে কখনো মনের মধ্যে কাজ করেনি।

আনন্দধারা : আপনার প্রিয় অভিনয় শিল্পী কে?

রুমানা রশীদ ঈশিতা : আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে যারা কাজ করেছেন এবং করছেন তাদের প্রায় সবার কাজই আমার ভালো লাগে। তবে সিনিয়র শিল্পীদের মধ্য সুবর্ণা মুস্তাফা, ফেরদৌসী মজুমদার, আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূর, আফজাল হোসেনের অভিনয় আমার খুবই পছন্দ। আর একেবারে এ প্রজন্মের নবীন শিল্পীদের মধ্যে সিয়াম আহমেদ ও শবনম ফারিয়ার অভিনয়ও আমার ভালো লাগে।

আনন্দধারা : নাচ বাদ দিয়ে অভিনয়কে পেশা হিসেবে নিলেন কেন?

রুমানা রশীদ ঈশিতা : নাচকে পেশা হিসেবে নেয়ার অপশন আমাদের দেশে খুব একটা নেই। যদি কেউ তার ভালোবাসা থেকে নাচ কন্টিনিউ করে যেতে চায়, তাহলে তাকে জীবনে অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আর অভিনয়ের বিষয়টা নাচের চেয়ে একটু ভিন্ন। কেউ যদি ইচ্ছে করে তাহলে অভিনয় করেই জীবন অতিবাহিত করা সম্ভব। আমি ছোটবেলা থেকে শুরু করে একটা লম্বা সময় ধরে নাচ শিখেছি। নাচের প্রতি আমার ভালোলাগা, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা সবকিছুই রয়েছে, তবুও নাচ আমাকে মন থেকে খুব বেশি আকৃষ্ট করত না। সত্যি কথা বলতে আমাকে নাচের চেয়ে অভিনয়ের প্রতিই আমার দুর্বলতা বেশি কাজ করে, যা শুরুতে ছিল এবং রয়েছে। সে কারণেই নাচের পরিবর্তে আমি অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি।

আনন্দধারা : আপনি তো খুব ভালো গান করেন। গানে নিয়মিত হওয়ার ইচ্ছে আছে?

রুমানা রশীদ ঈশিতা : আসলে সত্যি বলতে গানের সঙ্গে আমার ব্যাটে-বলে মিলছে না। আমার গান গাইতে খুবই ভালো লাগে। সবকিছু মিলিয়ে যদি ঠিকভাবে গুছিয়ে উঠতে পারি, তাহলে গান নিয়ে আমার কিছু পরিকল্পনা রয়েছে, তা নিয়ে কাজ শুরু করব।

আনন্দধারা : নির্মাণ নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

রুমানা রশীদ ঈশিতা : আমার কাছে মনে হয় নির্মাণ একটা চ্যালেঞ্জিং জব। মিডিয়াতে আমার চার বছরের একটা লম্বা সময় বিরতি ছিল। এ সময়টাতে আমি এক কথায় মিডিয়া থেকে সম্পূর্ণ আলাদাই ছিলাম। বর্তমানে আমাদের নির্মাণের ক্ষেত্রে অনেক কিছুই কারিগরি দিক দিয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। যেগুলো নিয়ে কাজ করতে আমি অভ্যস্ত নই। যদিও নির্মাণের যে গ্র্যামার তা একই, তার পরও কারিগরি দিক দিয়ে আমি অভ্যস্ত না। নির্মাণের বিষয় নিয়ে আমার ভবিষ্যতে তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই।

অনুলিখন : আখন্দ জাহিদ

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup