প্রাকৃতিক উপাদানে ত্বকের যত্ন

ব্যস্ত এ জীবনে বাইরে বের হওয়ার কথা মনে পড়লেই ত্বক বাঁচানোর জন্য নানা প্রটেকশনের জন্য নিজেকে তৈরি করতে হয়। কাঠফাটা রোদে বাইরে কয়েক মিনিট দাঁড়ালেই মনে হয় কখন বাড়ি যাব। আর সূর্যের যা তেজ তাতে রোদে পুড়ে গায়ের রঙ নষ্ট হয়ে যায়। আর সানবার্ন, সানট্যান, ডার্কপ্যাচের সমস্যা তো রয়েছেই। এ সময় একদিকে যেমন প্রচণ্ড গরম, তেমনই অন্যদিকে বাতাসের আর্দ্রতাও বেশি থাকে। তাই এই সময় ঘাম ও অয়েল সিক্রেশন বেশি হয়। যার ফলে র‌্যাশ ব্রণের মতো সমস্যাগুলো আরো বেশি দেখা দেয়। এ ধরনের সমস্যা থেকে উদ্ধার পেতে এখন থেকেই ত্বকের যত্ন নেয়া শুরু করুন। নিয়ম মেনে ক্লিনজিং, টোনি, ময়েশ্চারাইজিং, সানস্ক্রিন লাগানোর মতো বেসিক জিনিস মেনে চলুন। ফেসওয়াশ ব্যবহার করে ত্বক পরিষ্কার রাখুন। সপ্তাহে এক-দু’বার ফেসপ্যাক ব্যবহার করুন, যা আপনার ত্বককে আরাম দেবে সঙ্গে ত্বক বুঝে ফেসওয়াশ ফেসপ্যাক ব্যবহার করলে ত্বকের নানা সমস্যা থেকে মুক্ত থাকবেন আপনি।

ত্বকের যত্নে অ্যালোভেরা আশীর্বাদ। ত্বকের জন্য প্রটেকশন তৈরি করে ত্বক ময়েশ্চারাইজ করে। অ্যালোভেরায় রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং মিনারেল যা ত্বক মসৃণ করতে সাহায্য করে। অ্যাকনের সমস্যা, ডার্ক স্পট এমনকি ত্বকের বয়স ধরে রাখতেও অ্যালোভেরার জুড়ি নেই। অ্যালোভেরা জেল ত্বকে ব্যবহারে ত্বক উজ্জ্বল ও মসৃণ হয়।

অ্যালোভেরা সানবার্নের সমস্যা থেকে ত্বককে রক্ষা করে। এর পাওয়ারফুল ত্বক মসৃণ করার ক্ষমতা সত্যি দারুণ। ত্বকের ভেতর থেকে হিল করতে সাহায্য করে। ত্বকের ওপর রন্ধনশীলতার এমন এক প্রলেপ থাকে, যা ত্বকের ময়েশ্চার করে ত্বক শুষ্ক রাখে। আর কোনো তেলতেলে ভাব থাকে না। তাই অয়েলি ত্বকের অধিকারীরা নিশ্চিন্তে ব্যবহার করতে পারেন অ্যালোভেরা। যারা মিনারেল সমৃদ্ধ মেকআপ ব্যবহার করেন, তাদের ত্বক ময়েশ্চারাইজ করে এমনভাবে যেন ত্বক শুষ্ক না হয়ে যায়। অ্যাকনে বা ব্রণের সমস্যার কারণে ত্বকে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, তা অ্যালোভেরা ব্যবহারে সহজে দূর হয়। বয়স হওয়ার আগে যেন মুখের ত্বকে বাড়তি বয়সের ছাপ হতে না পারে সেদিকটার প্রতি অ্যালোভেরা যত্নশীল। অ্যালোভেরার পাতায় আছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের প্লিথোরা, যেটা ক্যারোটিন, ভিটামিন ‘সি’ এবং ‘ই’ বা ত্বক ন্যাচারাল লুক দেয় সঙ্গে ত্বক হাইড্রেট রাখে।

সারাদিনের কর্মব্যস্ত দিনে ত্বকের লাবণ্য মসৃণতা ঠিক রাখতে অ্যালোভেরা উপকারী। গরমের সময় ত্বকে ঘাম-তেল নিঃসরণের পরিমাণ বেড়ে যায়। এর ওপর ধুলো-ময়লা, নোংরা জমতে শুরু করে। সারাদিনের জমে থাকা ধুলো-ময়লা, ঘাম, তেল রোমকূপে জমে ত্বকের ক্ষতি করে। ফলে ত্বক হয়ে পড়ে অনুজ্জ্বল, নির্জীব, র‌্যাশ-ব্রণের মতো নানা ধরনের সমস্যাগুলো গরমে আরো বেশি দেখা দিতে শুরু করে। আমরা যদি প্রতিদিন বাইরে থেকে ত্বকের স্বাস্থ্যসম্মত ফেসওয়াশ দিয়ে মুখের ত্বক পরিষ্কার করি, তাহলে আমাদের এ ধরনের সমস্যা কমে যাবে। ত্বক পরিষ্কার রাখাটা খুব জরুরি। স্বাভাবিক, শুষ্ক বা তৈলাক্ত যে ধরনের ত্বকই হোক না কেন, গরমের দিনে দু’তিনবার ক্লিনজিং কিন্তু মাস্ট। স্বাভাবিক থেকে শুষ্ক ত্বকের জন্য উপযুক্ত ক্লিনজিং ক্রিম, মিশ্র প্রকৃতির ত্বকের জন্য ক্লিনজিং মিল্ক বা লোশন। ব্রণের সমস্যা থাকলে মেডিকেটেড ক্লিনজার ব্যবহার করুন। যতই ক্লান্ত থাকুন না কেন, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ত্বক পরিষ্কার করুন।

সারাদিনের জমে থাকা ধুলো-ময়লা পরিষ্কার করলে ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি গরমের এই সময়টাতে মুখে শুধু পানির ঝাপটাও অনেক উপকারী। ময়েশ্চারাইজারও এই গরমে ত্বকের জন্য জরুরি। প্রথমে মুখ ভালোভাবে ফেসওয়াশ দিয়ে ধুয়ে-মুছে, ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম ম্যাসাজ করুন। ঘুমাতে যাওয়ার আগে ভেজা তুলার সাহায্যে অতিরিক্ত ক্রিম মুছে নিন। সূর্যের ক্ষতিকর আলট্রা ভায়োলেট রশ্মির প্রভাবে সানট্যান, সানবার্ন, ডার্কপ্যাচ, র‌্যাশসহ আরো হাজারো সমস্যা দেখা দেয়। শুধু তা-ই নয়, বলিরেখা, পিগমেন্টেশনের মতো সমস্যাগুলো বেশিরভাগই দেখা দেয় সূর্যের আলট্রা ভায়োলেট রশ্মির প্রভাবে। তাই গরমে বাইরে বের হওয়ার আগে অবশ্যই সানস্ক্রিন লাগাবেন।

ত্বকের নানা সমস্যার সমাধানে নিমের গুণাগুণও অস্বীকার করার উপায় নেই। বিভিন্ন বিউটি হারবাল পণ্যে নিমের ব্যবহার হচ্ছে এবং এর উপকার সম্পর্কে সবাই জানে। নিমের অ্যান্টি ভাইরাল কার্যক্রম ত্বকের সমস্যা সমাধানে দারুণ কার্যকর। ত্বকে অযথা চুলকানি বা ব্রণের সমস্যার সমাধানে এগিয়ে, নিম ত্বক ময়েশ্চারাইজ করে নরম ও মসৃণ রাখে। ত্বক উজ্জ্বল করে, অ্যাকনের সমস্যা দূর করে। যদি আপনার মুখের ত্বকে পিম্পলের সমস্যা থাকে, তাহলে নিমপাতা ব্যবহার করুন। ত্বকের ইনফেকশন দূর করতে নিমের সঙ্গে হলুদ মিশিয়ে পেস্ট করে লাগান। কিছুক্ষণ রেখে ধুয়ে ফেলুন।

এক কাপ নিমপাতা ফুটিয়ে ঠাণ্ডা করে বোতলে ভরে নিন। ব্যবহার করুন পানি মিশিয়ে নিয়মিত। পিম্পল আর অ্যাকনের সমস্যা কমবে। টোনার হিসেবে নিম ভালো কাজ দেয়। নিমের পানিতে তুলো ভিজিয়ে সারা মুখে মেখে দিন প্রতিরাতে। এটি অ্যাকনে, স্কার্স, পিগমেন্টেশন এবং ব্ল্যাক হেডসের সমস্যা দূর করে। ফেসপ্যাকের জন্য সেদ্ধ নিমের পেস্ট, সঙ্গে কমলার খোসার পেস্ট আর অল্প পানি, মধু, আর দুধ মিশিয়ে ফেসপ্যাকটি ব্যবহার করুন সারা মুখে। শুকিয়ে এলে ধুয়ে ফেলুন। মুখের অ্যাকনে, সাদা দানা, বাড়তি ময়লা দূর করবে। ত্বক মসৃণ হবে।

ত্বকের প্রয়োজনীয় কিছু ফেসপ্যাক

নিম এবং মধুর মিশ্রণে তৈরি ফেসমাস্ক যা অয়েলি স্কিনের জন্য উপকারী। অয়েল কন্ট্রোল করে ত্বক ফ্রেশ রাখে। এক মুঠো নিমপাতা অল্প পানি দিয়ে পেস্ট করুন। সঙ্গে এক টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে নিন। ভালোভাবে মিশিয়ে মুখে লাগান ৩০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এর অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল ক্ষমতা ত্বক জীবাণুমুক্ত রাখে। নিমের পেস্টের সঙ্গে গোলাপজল মিশিয়ে ফেসমাস্ক তৈরি করুন। মুখে লাগিয়ে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। নিম আর বেসনে ফেসপ্যাক অ্যাকনের সমস্যা দূর করে। এই ফেসমাস্ক পিম্পলস দূর করে, দাগ ছোপ দূর করে ত্বককে দেয় স্পেশাল গ্লো। এক টেবিল চামচ বেসনের সঙ্গে এক চা-চামচ নিম পাউডার আর দই মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। মুখ পরিষ্কার করে এই মাস্ক লাগিয়ে নিন। ১৫ মিনিট পর ধুয়ে নরম তোয়ালে দিয়ে মুছুন। সপ্তাহে দু’দিন এভাবে মুখের ত্বকে এই ফেসপ্যাক ব্যবহার করুন।

নিম আর অ্যালোভেরার যুগলবন্দি সত্যিই দারুণ। ত্বকের নানা সমস্যা দূর করতে প্রাকৃতিক এই দুটি উপাদানের জুড়ি মেলা ভার। ত্বকের সব সমস্যার সমাধান যেন এদের হাতে। ত্বকের সমস্যা সমাধানে চোখ বন্ধ করে ব্যবহার করা যায় নিম আর অ্যালোভেরা। ফেসমাস্ক তৈরি করতে প্রয়োজন হবে ১ চা-চামচ নিম পাউডার, ২ টেবিল চামচ অ্যালোভেরা জেল একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। প্রথমে মুখ গোলাপজলে তুলো ভিজিয়ে মুছে নিন এবং নিম-অ্যালোভেরার ফেসমাস্ক লাগিয়ে নিন। ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে মধু মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে মুখে লাগিয়ে নিন। ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। অ্যালোভেরা জেল ত্বক হাইড্রেট করে। ময়েশ্চারাইজ করে ত্বকে সব সময় একটা ফ্রেশ লুক আনে। এক চা-চামচ অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে এক টেবিল চামচ গোলাপজল মিশিয়ে ফেসপ্যাক তৈরি করুন। এই প্যাক মুখে লাগিয়ে ২০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন ঠাণ্ডা পানিতে। সপ্তাহে একবার এই প্যাকটি ব্যবহার করুন। বয়সের ছাপ, পিম্পলের দাগ, পিগমেন্টেশনের দাগ দূর করতে অ্যালোভেরা-গোলাপজলের ফেসপ্যাক কার্যকর। ত্বক ঠাণ্ডা রাখে ও মৃসণ করে।

এক টেবিল চামচ মুলতানি মাটি, ১ চা-চামচ অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে গোপালজল বা ঠাণ্ডা পানি মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে মুখে লাগিয়ে নিন। ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর লাগাতে পারেন। নরমাল ত্বক, মিশ্র ত্বক এবং তৈলাক্ত ত্বকের উপযোগী এই প্যাক।

এক চিমটি হলুদ, এক টেবিল চামচ অ্যালোভেরা জেল, এক চা-চামচ মধু আর কয়েক ফোঁটা গোলাপজল দিয়ে ফেসপ্যাক তৈরি করুন। মুখে, ঘাড়ে, গলায় লাগিয়ে ২০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে দু’বার ব্যবহার করতে পারেন। ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়। সব ধরনের ত্বকের জন্য উপকারী।

অ্যালোভেরা-নিমের ব্যবহার ত্বকের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ, যা বলে শেষ করা যায় না। আর প্রকৃতির এই দুটি উপাদান দিয়ে তৈরি ফেসওয়াশ। ফেসপ্যাকের ওপর আস্থা রাখুন। নিয়মিত ব্যবহার করুন। ত্বক সবসময় পরিষ্কার রাখা জরুরি। ত্বক সঠিক পণ্যের বা উপাদানের মাধ্যমে পরিষ্কার করা গেলে ত্বকের নানা সমস্যার সমাধান হবে। ত্বক উজ্জ্বল ও মসৃণ হবে, আপনি হবেন ঈর্ষণীয় ত্বকের অধিকারী।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup