ভ্রমণ : খোয়াই নদী পেরিয়ে কালেঙ্গার পথে

সুন্দরবনের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমতল অভয়ারণ্য রেমা-কালেঙ্গা বন। হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় অবস্থিত। এখানে রয়েছে ৬৩৮ প্রজাতির উদ্ভিদ। ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৬৭ প্রজাতির পাখি এবং ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। রেমা-কালেঙ্গা বনে জীববৈচিত্র্যের আকর্ষণ পর্যটক মাত্রই বারবার টানে। সেই টানে হঠাৎ পরিকল্পনায় বসন্তের এক ভোরে রওনা দেই রেমা-কালেঙ্গার উদ্দেশে। ঢাকার মহাখালী থেকে বাস। দুর্বার গতির বাস বেলা ১১টার পরপরই শায়েস্তাগঞ্জ পৌঁছে দেয়। ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে ছিল আমার বেশকিছু ভ্রমণের সহযাত্রী জামান সোহাগ। শায়েস্তাগঞ্জ থেকে একটা সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে উপস্থিত হই চুনারুঘাট উপজেলা পরিষদে। সরকারের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে সোহাগ খুব সহজেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে বন বিভাগের রেমা-কালেঙ্গা রেস্টহাউজে থাকার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হলো। থাকার জায়গার ব্যবস্থা করে সেখান থেকে পুনরায় অটোরিকশা করে কালেঙ্গা খোয়াই নদীর ঘাট। উজানের পাহাড়ি ঢলে নদীর পেট একেবারে টইটম্বুর। ওদিকে ওপর থেকে চৈত্রের সূর্যবাহাদুর দাঁত কিটমিটিয়ে তাকিয়ে আছে। দক্ষ মাঝি তার সব কলাকৌশল প্রয়োগ করে ঢলের পানির খরস্রোতে কেটে কেটে এগিয়ে চললেন। ওপারে ঘাট থেকেই পথ এগিয়েছে রেমা টি-এস্টেটের মাঝ দিয়ে। চা বাগানের কয়েকটি টিলা পেরিয়ে পথ তার আপন খেয়ালে ডালপালা ছড়ানো শুরু করল। পথনির্দেশক সাইনবোর্ডটি দেখে দেখে এগোতে থাকলাম। পাশের পথটি চলে গেছে শকুন প্রজনন ও অভয়াশ্রম এলাকার দিকে। উল্লেখ্য, দেশে শকুন প্রজনন কেন্দ্র ও অভয়াশ্রম রয়েছে মাত্র দুটি। রেমা-কালেঙ্গা এবং দ্বিতীয়টা সুন্দরবনে।

পথ এখনো অরণ্যে প্রবেশ করেনি। এদিকে অন্যের ফেলে যাওয়া ক্যান্ডি, স্যালাইন ও বিস্কুট-চানাচুরের র‌্যাপার কুড়াতে কুড়াতে সোহাগের ময়লা কুড়ানোর থলে এরই মধ্যে ভরে গেল। বনের গভীরে প্রবেশের আগে সর্বশেষ বসতির ছোট্ট দোকানটা পেয়ে চুলায় পুড়িয়ে ময়লাগুলোর একটা গতি করা গেল। ছোলা সেদ্ধ এবং মুড়ি খেয়ে ছোট ছোট জংলী পানের একটি করে খিলি মুখে পুরে পথচলা শুরু করলাম। গজারি গাছের ছায়ায় ঢাকা সরু পথ। বনের মাঝে কোথাও কোথাও অল্পক্ষণ আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে। এঁটেল মাটির পিচ্ছিল পথে বুটের ওজন দুইগুণ বেড়ে গেল। এক পর্যায়ে পথ এগিয়েছে বুনো ফল ডেউয়া বাগানের মাঝ দিয়ে। অজস্র কচি ডেউয়া পড়ে পথ সেজে রয়েছে এক গোলাপি রঙের কার্পেটে। গজারি বৃক্ষের দীর্ঘ এলাকার মাঝ দিয়ে ক্রমেই প্রবেশ করি অন্ধকার প্রায় ঘন অরণ্যে। আশপাশ দিয়ে  অজস্র কাঠবিড়ালীর ছোটাছুটি। রেমা-কালেঙ্গার অতি পরিচিত রূপ এটি। স্বভাবে কাঠবিড়ালী এতটাই চঞ্চল যে, ক্যামেরাবন্দি করা বড়ই মুশকিল। এমন পরিস্থিতিতে যে কারো মনেই জিদ চেপে বসতে পারে, ছবি না তুলে নড়ছি না। পাশাপাশি এটাও মনে রাখা চাই, এ কাজে অধিক মনোযোগী হলে বিপদ অবধারিত। সুতরাং, বানর আর কাঠবিড়ালীর ছড়াছড়ি হলেও ছবি তোলার শখে লাগাম টেনে ধরতে হলো বারবার। আকাশ সেই কখন থেকেই গুড়ুম গুড়ুম ডাকছে। শুরু হলো বৃষ্টি। বৃক্ষের পাতায় বর্ষণের শো শো শব্দ বহুদূর থেকে ধেয়ে আসতে আসতে ক্রমেই আমাদের গ্রাস করে ফেলল। বিকেল সাড়ে ৪টায় গিয়ে উপস্থিত হই কালেঙ্গা। রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিট কর্মকর্তা দু’জনেই অপেক্ষায় আছেন। দেখা মাত্রই এগিয়ে এসে জানতে চাইলেন, ঢাকা থেকে এসেছি কিনা। রেস্টহাউজের পরিপাটি বন্দোবস্ত দেখে মনে হলো এক্ষুনি শুয়ে পড়ি আর লম্বা একটা ঘুম দেই।

খাবার শেষে রেস্টহাউজের কেয়ারটেকার আমাদের নিয়ে আশপাশটা ঘুরে দেখাতে চাইল। তাকে আশাহত না করে রাতের বাজারটা দেখতে বের হলাম। কালেঙ্গায় বছর পাঁচেক আগেও একবার যাওয়া হয়েছিল। মাত্র চার-পাঁচ বছরে দুই দোকানের জায়গায় বর্তমানে প্রায় ১৫টা  দোকান হয়ে গেছে। ওষুধের দোকানও আছে। পরিচয় হলো ওষুধের দোকানদারের সঙ্গে। এত মানুষ থাকতে কেয়ারটেকার বেছে বেছে ওষুধের দোকানদারের সঙ্গে কেন পরিচয় করিয়ে দিলেন তা বুঝতে পারলাম একটু পরে। দোকানদার নূরুল আলম স্বপন ব্যবসার পাশাপাশি সবচেয়ে মনোযোগ দিয়ে যে কাজটি করেন তা হলো পরিবেশ সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং সেই সূত্রে লেখালেখি। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বন এবং তার পশুপাখিকে বাঁচিয়ে রাখা কতটা জরুরি সে বিষয়ে রচনা করেছেন একাধিক নাটক, যার মধ্যে একটি স্থানীয়ভাবে প্রায়ই মঞ্চায়ন হয়ে থাকে। কয়েক বছর আগে একই বিষয় কেন্দ্রিক তার লেখা কাহিনীর ওপর নির্মিত একটি নাটক টেলিভিশনেও প্রচারিত হয়েছে। দেশে যখন নির্বিচারে বনভূমি উজাড় করে ফেলা হয়, ঠিক সেই পরিস্থিতিতে এমন অজপাড়াগাঁয়ের স্বপনের মতো লোক পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় হৃদয় দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এমন একজন গুণী মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়ে দু’চারটা কথা বলার সুযোগ পাওয়া সত্যিই একটা প্রাপ্তি বটে।

বিট কর্মকর্তার ঠিক করে দেয়া গাইড পরের দিন ভোর সাড়ে ৫টায় এসে ডেকে তুলল। মুখপোড়া বানর আর চশমা বানর দেখতে চাইলে এখনই বেরিয়ে পড়তে হবে। ঠিক আছে তবে এক্ষুনি রওনা করা যাক। ট্রেইলেই দেখা হলো তীর-ধনুক ও লাঠি, বল্লম হাতে কয়েকজন যুবকের সঙ্গে। সারা রাত বন পাহারা দিয়ে ঘরে ফিরছে। অবাক করা ব্যাপার হলো, মাত্র কয়েক বছর আগে এরাই বনের কাঠ চুরি করত। বংশ পরম্পরায় বন থেকে কাঠ চুরিই ছিল তাদের একমাত্র পেশা। অথচ আজ তারা সমন্বিত প্রচেষ্টায় বন রক্ষার কাজে নিয়োজিত। শুধু একজন বা দু’জন নয়, বরং একটি সমাজে এই রূপ আমূল পরিবর্তনের নজির আজকের বাস্তবতায় আশাতীত বলা যায়। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ এলাকার তরুণ যুবক এমনকি বৃদ্ধরা পর্যন্ত এই কাজে সম্পৃক্ত এবং পালাক্রমে প্রত্যেকেই পাহারা দিয়ে থাকে। যাহোক, চলতে চলতে পথ রোধ করে দাঁড়াল সরু একটি খাল। আগের দিনের বৃষ্টিতে খালের পেট ফুলে উঠেছে। কুলকুল করে এগিয়ে যাচ্ছে দূর থেকে বেয়ে আসা মিষ্টি পানি। হাঁটু জলের খাল পেরিয়ে বনের গভীরে প্রবেশ করে বেলা ২টা পর্যন্ত বনের নানা পয়েন্টে ঘুরে বেড়ালাম। গাইডের সঠিক পথনির্দেশনার ফলে মুখপোড়া এবং চশমা উভয় ধরনের বানরের দেখা মিলল বনের একাধিক পয়েন্টে। বয়সে কম হলেও গাইড নোমান বেশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে। শব্দ শুনেই বলে দিতে পারে কোনটা কোন পাখির ডাক। গাছ চেনার ক্ষেত্রেও রয়েছে তার বেশ মুন্সিয়ানা। বসন্তে ফুল ফুটে রয়েছে গাছে গাছে। একেক ফুলের একেক সুগন্ধ। সবটা বনজুড়েই নানা ফুলের মিশ্রণে এক সুমিষ্ট গন্ধ ভুরভুর করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ দূর থেকে কানে ভেসে আসে একদল উল্লুকের ডাকাডাকি। ওদের পেছনে ছোটা বিফল জেনেও তারুণ্যের উচ্ছ্বাসকে আর প্রবোধ মানানো গেল না। অনুসরণ করে এগিয়ে যাই বনের অনেকটা গভীরে। সমস্বরে উচ্চ শব্দে একদল উল্লুকের চিৎকারে সমস্ত বন যেন উথাল-পাতাল হতে লাগল। মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে গেল চিৎকার-চেঁচামেচি। সামান্য দূরেই ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ সীমান্ত। সুতরাং আর অগ্রসর না হয়ে ধরতে হলো ফিরতি পথ।

ছায়ায় বসে খানিক জিরিয়ে নিতে গিয়ে চোখে পড়ে বড় ঠোঁটওয়ালা একঝাঁক পাখি। কী চমৎকার একেকটি পাখি, কমলা রঙের দীর্ঘ ঠোঁট, ধবধবে সাদা পালকে ধূসর বর্ণের হালকা আবরণ আর স্বভাবে খুব সতর্ক। সামান্য শব্দ পেলেই চওড়া পাখনা বিছিয়ে দেয় উড়াল। নিঃশব্দে এবং ধীরকদমে এগোতে থাকলে বনের অনেক জায়গাতেই এমন বিরল প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। পথে চোখে পড়ে মালয়ান কাঠবিড়ালীসহ বেশ কয়েক প্রজাতির কাঠবিড়ালী। আরো চোখে পড়ে নাম না জানা সবুজ লাল এবং সবুজ হলুদ মিশ্রণের একাধিক প্রজাতির পাখি। ঘুঘু তো রেমা-কালেঙ্গার এক সচরাচর পাখি। অনবরতই শোনা যায় ঘুঘুর সেই বেদনাবিধুর ডাক- ঘু ঘু ঘু। বনের একমাত্র টাওয়ারটার কাছাকাছি গেলে লক্ষ করলাম একটি লোহার নল দিয়ে মাটির নিচ থেকে অনর্গল পানি বেরিয়ে আসছে। জানতে পারলাম রেমা-কালেঙ্গা এলাকায় টিউবওয়েল চেপে বা বিদ্যুৎচালিত মোটর দিয়ে পানি তুলতে হয় না। এ এলাকায় বিশেষ ভূমি বৈশিষ্ট্যের কারণে নির্দিষ্ট পরিমাণ গভীর পর্যন্ত নল পুঁতলেই অনর্গল পানি উঠে আসে। নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে শুরু করে  জমিতে সেচ দেয়াসহ অন্যান্য কাজ তাতেই সমাধা হয়ে থাকে। এমন সুপেয় পানি পেয়ে একটু না পান করলে কৌতূহলের খোরাক মেটে কীভাবে? শরীর ঠাণ্ডা করার পর আরোহণ করলাম টাওয়ারে। টাওয়ার থেকে বনের বেশ খানিকটা এলাকা স্পষ্ট দেখা যায়। দৃষ্টিসীমা ছাড়িয়ে শুধু সবুজ আর সবুজ।

রেস্টহাউজে ফিরে দেখি কেয়ারটেকার টেবিলে খাবার সাজিয়ে রেখে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। কৈ মাছের ঝোল, মলা মাছের চচ্চড়ি, টমেটো ভর্তা সঙ্গে ডাল। সারা দিনের পরিশ্রম শেষে এমন অমৃতের মতো খাবার পেয়ে যেন দিশেহারা হয়ে গেলাম। একটু বিশ্রাম না করতেই বিকেল ৪টায় নোমান এসে আবারো হাজির, চলেন বনের অন্য প্রান্ত দিয়ে ঘুরে আসি। দেরি করলে রেসাস বানর এবং বন মোরগ দেখা থেকে নিশ্চিত বঞ্চিত হবেন। তাকে অনুরোধ করে মাত্র ১৫ মিনিট সময় চেয়ে নিলাম। কিছুদূর এগোতেই জঙ্গলের ভেতর নড়াচড়া করছে রেসাস বানরের দল। খেয়াল করে দেখি মাথার ওপর প্রকাণ্ড কড়ই গাছের এ-ডাল থেকে সে-ডালে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে একদল রেসাস বানর। বানরের মুক্ত বিচরণ অবলোকন করতে করতে অন্ধকার নেমে এলো। বন মোরগ ও মুরগিগুলো মানুষের উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্রই জঙ্গলে ঢুকে পড়ল।

যাতায়াত

ঢাকার ফকিরাপুল ও মহাখালী থেকে শ্রীমঙ্গলগামী যে কোনো বাসে গিয়ে নামতে হবে শায়েস্তাগঞ্জ অথবা সিলেটগামী ট্রেনে করে গিয়েও শায়েস্তাগঞ্জ নামা যেতে পারে। শায়েস্তাগঞ্জ থেকে সহজেই মিলে যায় রেমা-কালেঙ্গা যাওয়ার সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা মাইক্রোবাস।

এনা পরিবহন : মহাখালী কাউন্টার- ০১৭৬০৭৩৭৬৫০. ০১৬১৯৭৩৭৬৫০। ফকিরাপুল- ০১৮৬৯৮০২৭৩৬। হানিফ এন্টারপ্রাইজ : ফকিরাপুল- ০২৭৫৪১৬০৪, ০১৭১৩৪৫০৭৬১। শ্যামলী পরিবহন : আরামবাগ-০২৭১৯২৯১, ০১৭১৯২২১৫

ঢাকা থেকে যে ট্রেনগুলো সিলেটের উদ্দেশে ছেড়ে যায় তার মধ্যে পারাবত এক্সপ্রেস সকাল ৬টা ৪০ এবং জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস দুপুর ১২টায়। আরো রয়েছে উপবন রাত ৯টা ৫০ ও কালনী এক্সপ্রেস বিকেল ৪টা। ট্রেনে সময় লাগে সাড়ে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা।

থাকার ব্যবস্থা

এখানে থাকার জন্য রয়েছে বন বিভাগের বিশ্রামাগার। সেক্ষেত্রে সিলেট বন বিভাগের কর্মকর্তার অনুমতির প্রয়োজন পড়বে। পাশাপাশি থাকার জন্য নিসর্গ তরফ হিল কটেজে চমৎকার ব্যবস্থা আছে। যোগাযোগ-০১৭৩১৯৭৭৮০৭। এছাড়াও থাকা যেতে পারে হবিগঞ্জ শহরের হোটেল আমাদ এবং হোটেল সোনার তরীতে। বাহুবলে রিসোর্ট প্যালেস নামে একটি পাঁচতারকা হোটেল আছে।

বি.দ্র. রেমা-কালেঙ্গা ভ্রমণে অবশ্যই ভ্রমণ গাইড নেয়া উচিত। গাইড নোমান- ০১৭১২৮৭৫২৩৩ , আব্দুর রহিম-০১৭৪১১৪৪৭১৪।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।

Home popup