ঈদে যেভাবে করবেন ত্বকের যত্ন

ঈদের কেনাকাটা, সাজ-সরঞ্জামের ঝামেলায় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই আমাদের ত্বকের কথা। কী কাপড় পরবেন, কী করে সাজবেন ইত্যাকার বিষয় নিয়ে অনেক পরিকল্পনা থাকলেও এই সময়ে আপনার ত্বকের যে বাড়তি যত্নের প্রয়োজন পড়ে, সে কথা প্রায়ই মাথায় থাকে না আমাদের।

একটি সুন্দর, প্রাণবন্ত ত্বক যেকোনো সাজকেই অতুলনীয় করে তুলতে পারে। ত্বকের যত্ন খুব কঠিন কিছু নয়। সামান্য কয়েকটি ব্যাপার মাথায় রাখলে খুব সহজেই শত ব্যস্ততার মাঝেও আপনি রূপচর্চা করে নিতে পারেন।

তবে মনে রাখতে হবে, এসব রূপচর্চার ফল সঙ্গে সঙ্গে পাবেন না। ধীরে ধীরে আমাদের ত্বক ব্রণ, মেছতা, কালো দাগসহ বিভিন্ন অ্যাকনে থেকে মুক্ত হয়। ত্বককে সে সময়টুকু দিতে হবে। তাই ঈদের একদিন আগে নয়, বরং ৩-৪ সপ্তাহ আগে বা পারলে ১ মাস আগে থেকেই এই টিপস ফলো করতে পারেন।

ত্বক পরিষ্কার রাখতে হবে যতটা সম্ভব

যেকোনো রূপচর্চার প্রথম পরামর্শই থাকবে একটি পরিষ্কার ত্বকের নিশ্চয়তা রাখা। প্রতিদিন গোসল করা সত্ত্বেও আমাদের ত্বকে জানা-অজানায় অনেক ময়লা চলে আসে, যা খালি চোখে দেখা যায় না। আর আমাদের মুখের ত্বক যেহেতু সবচেয়ে নরম, তাই এখানে ময়লা জমে গেলে রোমকূপে ময়লা ঢুকে পড়ে- ফলাফল ব্রণ ও অন্যান্য স্কিন প্রবলেম।

তাই ঈদের আগে যদি হাতে ১ মাস সময় থাকে তাহলে ১ সপ্তাহ পর পর স্কিন স্ক্র্যাব করুন, একটি ভালো মানের এক্সফোলিয়েটিং মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন। আর প্রতিদিন ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুতে হবে।

স্ক্র্যাবার বা এক্সফোলিয়েটর ক্রিম মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার করবেন না। অল্প একটু প্রডাক্ট নিয়ে ম্যাসাজের দিকে বেশি নজর দিন। এসব প্রডাক্ট ত্বক থেকে অতিরিক্ত তেল শুষে নেয় বলে এদের ব্যবহারের পর অবশ্যই একটি ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করবেন।

শরীরে পানিশূন্যতা দূর করা

ডাক্তাররা বলেন, শরীরে প্রয়োজনীয় পানির অভাব থাকলে তার বহিঃপ্রকাশ হয় আমাদের মুখে বিভিন্ন অ্যাকনের মাধ্যমে। রমজান মাসে রোজা রাখার কারণে আমাদের সাধারণত পানি খাওয়ার পরিমাণ কমে যায়। ইফতারে বেশ খানিকটা ফলের জুস বা শরবত খেয়ে নিলেও কিন্তু বিশুদ্ধ পানির ঘাটতিটা সহজে পূরণ করা যায় না। তাই রোজার আগেই প্রচুর পানি পান করার অভ্যাস করে তুলুন। দিনে অন্তত ৫ থেকে ৮ গ্লাস ঠাণ্ডা পানি পান করুন।

রমজানে সেহরি ও ইফতারেও পানির পরিমাণ বাড়ান। এই সময়ে প্রতিদিনই জুস খাওয়া হলেও এর প্রবণতা কমানো উচিত। রোজ মিষ্টি শরবত বা জুস খেলে আপনার ত্বকে চিনির পরিমাণ বেড়ে যাবে- এতে মেদ যেমন বাড়বে, তেমনি ত্বকের অ্যাকনে সমস্যাগুলোও মাথাচাড়া দেবে। তাই চেষ্টা করুন যথাসম্ভব কম চিনিযুক্ত শরবত খেতে।

শাক-সবজি ফল খাওয়ার পরিমাণ বাড়ান

যেহেতু এই রমজান আর ঈদ দুটোই বেশ গরমকালে পড়েছে, তাই এই সময়টা খাবারের দিকে বাড়তি নজর দিতে হবে। মাছ, মাংস, ভাজা-পোড়া আর বেশি মসলাযুক্ত খাবার না খাওয়ার পরামর্শ দেন ত্বক বিশেষজ্ঞরা।

সবুজ শাক-সবজি থেকে প্রাপ্ত ভিটামিন ই, ভিটামিন সি ও মিনারেল আমাদের শরীরের ভেতরের পানিশূন্যতা দূর করে ও ত্বকে বয়সের ছাপ কমায়। ভিটামিন সি, সিলিনিয়ামযুক্ত সবজি আমাদের ত্বককে টানটান করে, বলিরেখা হতে দেয় না।

বাইরে বের হওয়ার আগে অবশ্যই সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন

শুধু ঘরোয়া পরিচর্যায় সবসময় ভালো ফল পাওয়া যায় না। বিভিন্ন কাজে আমাদের ঘরের বাইরে যেতে হয়। এই সময়ে, যখন বাইরের তাপমাত্রা অনেক বেশি, আমাদের ত্বক সহজেই শুষ্ক হয়ে যায় ও অনেক সময় সানবার্ন বা রোদে পোড়া ভাব হয়ে যায়। এটি ত্বকের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে ব্রণ, মেছতাসহ বিভিন্ন ত্বকজনিত সমস্যা তো হয়ই, অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ রোদের তাপে স্কিন ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়।

প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে বের হওয়ার কমপক্ষে ২০ মিনিট আগে আপনার হাত, মুখ, গলা, ঘাড়ে সানস্ক্রিন ক্রিম বা লোশন মাখুন। যে ব্র্যান্ড আপনার ত্বককে স্যুট করে তার যেকোনো একটা ব্যবহার করলেই হবে। তবে একবার দিয়েই বসে থাকবেন না। চেষ্টা করবেন প্রতি ২-৩ ঘণ্টা পর পর সানস্ক্রিন লাগাতে। এক সপ্তাহ সানস্ক্রিন ব্যবহার করে তফাৎ লক্ষ্য করুন।

 

ভারী জামা-কাপড় না পরা

গরমে আমরা কেউই ভারী জামা-কাপড় পরতে পছন্দ করি না। অস্বস্তি তো লাগেই কিন্তু তার সঙ্গে এতে আমাদের ত্বকেরও বেশ ক্ষতি হয়। ভারী জামা, খুব গাঢ় রঙের জামা তাপ শুষে নেয় দ্রুত, ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই গরম লাগতে শুরু করে।

চোখে না পড়লেও গরম জামার কারণে আমাদের রোমকূপগুলো প্রতিনিয়ত ঘামতে থাকে। এতে ঘামাচি, র‌্যাশ, অ্যাকনের মাত্রা বেড়ে যায়। তাই গরমে হালকা, সুতির জামা-কাপড় বেশি পরার চেষ্টা করবেন। রঙগুলোও যেন হালকা হয়।

ঈদের সাজের ক্ষেত্রেও তাই। খুব ভারী কাপড় দিনের বেলা না পরাই শ্রেয়। তবে রাতে কোনো অনুষ্ঠান থাকলে পরতে পারেন।

মেকআপ

জামার কথা থেকেই মেকআপে চলে আসা। ঈদে কেমন করে সাজবেন তা নিয়ে নিশ্চয়ই একটা চিন্তা মাথায় আছে। যেভাবেই সাজুন, চেষ্টা করবেন যত ‘ন্যাচারাল লুক’ আনা যায় মেকআপে। গরমের দিনে যদি সকালে বা দুপুরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয় তখন হালকা মেকআপ সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয়। কারণ গরমে কেক-ফেস হলে তা দৃষ্টিকটু লাগে ও এতে ব্রণ হওয়ার সম্ভাবনাও ৮০ শতাংশ বেড়ে যায়।

কীভাবে এড়াবেন কেক-ফেস

মেকআপের আগে প্রথমেই একটি ক্লিঞ্জার দিয়ে মুখ ভালো করে ধুয়ে নিন। এরপর শুকিয়ে প্রথমে একটি কাপড়ের সঙ্গে বরফের টুকরো পেঁচিয়ে তা সারা মুখে, ঘাড়ে, গলায় ঘষুন। এতে ত্বক আরো মসৃণ হবে, মেকআপ দীর্ঘক্ষণ থাকবে আর মুখ সহজে ঘামাবে না।

এরপর একটি ময়েশ্চারাইজার নিয়ে মুখে লাগান ও এর ১০ মিনিট পর মেকআপ শুরু করুন। প্রাইমার, আর মেকআপ শেষে সেটিং স্প্রে ব্যবহার করতে পারলে ভালো। বেস মেকআপ সবসময় হালকা রাখুন। এখানেও মেকআপের আগে মুখে সানস্ক্রিন মেখে নিতে হবে।

হালকা বেসের সঙ্গে চোখ গাঢ় সাজ আর হালকা লিপস্টিক- এটা বর্তমানের মেকআপ ট্রেন্ড। তবে মেকআপ সম্পূর্ণই আপনার নিজের মতো করুন। শুধু লক্ষ্য রাখবেন কোনো প্রডাক্ট যেন বেশি না হয়ে যায়।

বাসায় এসে সবার আগে মেকআপ পরিষ্কার করুন। কখনোই মেকআপ নিয়ে ঘুমাতে যাবেন না। প্রথমেই মেকআপ রিমুভার দিয়ে একটু টিস্যু ভিজিয়ে সারা মুখে ভালোভাবে ঘষুণ। রিমুভার না থাকলে নারিকেল তেল বা অলিভ অয়েল দিয়েও করা যাবে।

হাত দিয়ে ঘষে ঘষে মেকআপ তুলে ফেলুন এরপর আবারো একটি পরিষ্কার টিস্যু নিয়ে তেল বা রিমুভারটি উঠিয়ে ফেলুন। এবার পালা তিনটি স্টেপে মুখ পরিষ্কার করার-

ক্লিনজিং : কোনো ক্লিঞ্জার বা এক্সফোলিয়েটর দিয়ে ভালোভাবে মুখ পরিষ্কার করুন। ম্যাসাজ করুন সারা মুখে। কিছুক্ষণ পর ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

টোনিং : একটি ভালো ব্র্যান্ডের টোনার নিয়ে আপনার এক্সফোলিয়েট করা ত্বকে মাখুন।

ময়েশ্চারাইজিং : এবার একটি সাধারণ ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম নিয়ে ত্বকে ভালো করে লাগান।

এই ৩ ধাপ করতে না পারলেও ক্লিনজিং ও ময়েশ্চারাইজিং পার্টটি যেন কোনোভাবেই বাদ না যায় তা লক্ষ্য রাখুন।

ঘরে তৈরি ফেস প্যাক

ঈদের দিন বা এর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই ঘরে বানানো কয়েকটি ফেস প্যাক ব্যবহার করলে আপনার ত্বকে চোখে পড়ার মতো পার্থক্য লক্ষ্য করতে পারবেন। খুব সহজে ঘরে থাকা উপাদান দিয়ে এই প্যাকগুলো বানানো যায় বিধায় ঈদের কাজের চাপেও আপনি সময় করে নিতে পারবেন।

টমেটো

টমেটো ত্বকের জন্য খুবই উপকারী একটি উপাদান। একে প্রাকৃতিক সানস্ক্রিন বললেও বেশি বলা হবে না। রোদে পোড়া ভাব নিমিষে দূর করার জন্য সপ্তাহে ২-৩ দিন ৩ ঘণ্টার জন্য টমেটোর রস শরীরে মেখে রাখুন।

তাছাড়া একটি টমেটোর সঙ্গে দুই টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে একটি প্যাক বানানো যায়, যা ১০-১৫ মিনিট রেখে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে পারেন অথবা মধুর জায়গায় ব্যবহার করতে পারেন এক চা-চামচ লেবুর রস।

টমেটো পেস্টের সঙ্গে টকদই ও ওটমিল ব্যবহার করেও প্যাক বানাতে পারেন।

মসুর ডাল

মসুর ডালও ত্বকের পরিচর্যায় একটি বিশ্বস্ত উপকরণ। চাইলে শুধু মসুর ডাল পানিতে ভিজিয়ে ব্লেন্ড করে নিতে পারেন। পেস্টটি মুখে ও শরীরে মেখে রাখুন যতক্ষণ পর্যন্ত না পেস্টটি শক্ত হয়ে যাচ্ছে। একবার শক্ত হলে তার ওপর আরেকটি পেস্টের প্রলেপ দিন। এভাবে তিনবার করে তৃতীয়বার পেস্টটি তুলে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে পারেন। পুরো প্রক্রিয়াটি ১-২ ঘণ্টার মতো সময় নেবে। মসুর ডাল মিহি করবেন না, আধা ভাঙা হলে ত্বকে আটকাবে ভালো।

ডিম

ডিম এমন একটি উপকরণ যার সঙ্গে সবকিছু যায়। ডিমের সাদা অংশ দিয়ে বানানো ফেস মাস্কটি ব্ল্যাকহেড, ব্রণ ইত্যাদি দূর করে ত্বক টানটান করে। ডিমের সাদা অংশ আলাদা করে একে একটু ফেটিয়ে নিন। এই ফেটানো অংশটি মুখে মেখে রাখুন। একেও এক লেয়ার শুকানোর পর আরেক লেয়ার ব্যবহার করতে পারেন। শুকিয়ে গেলে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। এগ হোয়াইটের সঙ্গে এক চা-চামচ মধু বা কাঁচা দুধও মিশিয়ে নিতে পারেন।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।