ঈদে চুল থাকুক ঝলমলে ও নিরাপদ

ত্বকের পাশাপাশি আমাদের চুলও হয়ে উঠতে পারে আমাদের সৌন্দর্যের প্রতীক। চুলের যত্ন শুধু উৎসব ঘিরে নয়, বরং সারা বছরই করতে হয়। অনেকেই বলেন সারাদিন বাইরে কাজ সেরে এসে চুলের যত্নে সময় দেয়া হয়ে ওঠে না।

কিন্তু ব্যাপারটি তা নয়। আমরা যতটা ভাবি যে চুলের যত্ন নেয়া একটি বেশ সময়সাপেক্ষ কাজ, বাস্তবতা হলো, চুল ভালো রাখতে হলে খুব কম পরিশ্রমই লাগে, যা লাগে তা হলো সচেতনতা।

দিনের শুরুটা একটু ভিন্নভাবে করলে চুলটা একটু ভিন্ন রকম করে আঁচড়ালে, ছুটির দিনগুলোতে ঘরে থাকা জিনিস দিয়ে একটু চুলকে পুষ্টি জুগিয়ে দিলেই কিন্তু যথেষ্ট।

চুলের মর্ম তারাই বোঝেন যাদের চুল ইতোমধ্যে ঝরে পড়া শুরু করেছে। চুলের ক্ষতি হওয়ার পেছনে দায়ী আমাদের দূষিত পরিবেশ ও আমাদের অবহেলা। তাছাড়া ঈদের সময় বা অন্যান্য অনুষ্ঠানকে ঘিরে আমরা প্রায়ই আমাদের চুলের ওপর অনেক স্টাইল ‘আরোপ’ করি, যা পরবর্তী সময়ে চুলের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এবারের ঈদের আয়োজনে বাড়তি ঝামেলা হিসেবে থাকবে রোদ। তাই এবারের ঈদে চুলের যতেœ হতে হবে বাড়তি সচেতন।

ঈদের দিন সকালে চুল ধুয়ে ফেলুন

অনেকে মনে করেন ঈদের দিনই চুল না ধুয়ে এর আগের দিন ধুলে ভালো হয়। কিন্তু যত তাড়াতাড়ি আপনি চুল ধোবেন, তত তাড়াতাড়িই চুলের আর্দ্রতা হারাবে। তাই চেষ্টা করুন ঈদের দিন সকালে শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে নিতে। বাড়তি কন্ডিশনার হিসেবে ঈদের আগের দিন রাতে মাথায় বাটা মেহেদি লাগিয়ে নিতে পারেন। এতে চুল সিল্কি ও পরিষ্কার দেখাবে।

বাইরে বেরোনোর আগে আবহাওয়া দেখে নিন

বর্তমানের আবহাওয়াটা অনেক বেসামাল। তাই বের হওয়ার আগে জেনে নেবেন আজ কি বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা আছে নাকি আকাশ রৌদ্রোজ্জ্বল থাকবে। যদি বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে ব্যাগে একটি ড্রাই শ্যাম্পু নিয়ে নিতে পারেন। বৃষ্টিতে চুল উষ্কখুষ্ক হয়ে গেলে ড্রাই শ্যাম্পু চুলের মসৃণতা ফিরিয়ে আনবে।

আর যদি বাইরে কড়া রোদ থাকে, তাহলে ব্যাগে ছাতা অবশ্যই রাখুন। কারণ সূর্য থেকে আসা অতিবেগুনি রশ্মি আমাদের চুলের জন্য ভয়াবহ প্রমাণ হয়। দীর্ঘদিন রোদে পুড়ে গেলে আমাদের চুলের আগা ফাটতে শুরু করে ও লালচে হয়ে যায়। তাই মাথায় স্কার্ফ বা টুপিও পরে নিতে পারেন।

লক্ষ্য থাকবে চুল যেন বেশিক্ষণ রোদে না থাকে।

ঘন ঘন শ্যাম্পু নয়

ঈদের দিন তো আর একদিনে শেষ হয়ে যায় না। প্রায়ই দেখা যায় অনেকে ঈদের প্রতিটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে মাথায় শ্যাম্পু করে নেন। এর কোনোই প্রয়োজন নেই আসলে। বরং বেশি বেশি শ্যাম্পু ব্যবহারে আপনার তালুর চামড়া গরম হয়ে যেতে পারে, এতে উকুন, খুশকি ও তালুর রোগজনিত সমস্যাও দেখা দিতে পারে। প্রতিদিন শ্যাম্পু ব্যবহারে চুলের আগা নরম হয়ে পড়ে।

তাই শুধু ঈদের দিন ভালোভাবে শ্যাম্পু ব্যবহার করুন ও সঙ্গে অবশ্যই কন্ডিশনার লাগান। এতে আপনার চুল কমপক্ষে ৩-৪ দিন মসৃণ থাকবে। এই ৩-৪ দিন পারতপক্ষে চুল ভেজাবেন না। অনেক সময় বাসাবাড়ির নলের পানিতে থাকা আয়রন চুলের সিল্কিভাব কমিয়ে ফেলে ও চুল আঠালো করে।

তেল ব্যবহারে কার্পণ্য নয়

যেহেতু ঈদের সময় চুলকে সাজানোর প্রয়োজন হয় বেশি, তাই চুলে কেমিক্যালের ব্যবহারের মাত্রাও বেড়ে যায়। হেয়ার স্প্রে, হেয়ার জেল, হেয়ার সেটিং স্প্রে ইত্যাদি পণ্য যথাসম্ভব কম ব্যবহারের চেষ্টা করুন কারণ এতে থাকা ক্ষতিকারক পদার্থ আপনার চুল পড়ার অন্যতম কারণ।

গরমে চুলের শুষ্কতা আরো বেড়ে যায়। ফলে তেল হতে পারে একটি আদর্শ সমাধান। তেল চুলের শুষ্কভাব দূর করে, চুলের আর্দ্রতা বাড়ায়, চুলের গোড়া পরিষ্কার করে। নারিকেল তেল খুবই কমন একটি উপকরণ। তবে চাইলে অলিভ অয়েল, সরষের তেলও ব্যবহার করতে পারেন।

চুলের গোড়া মজবুত করতে ক্যাস্টর অয়েলের জুড়ি নেই। অথবা আমলকী পেস্টের সঙ্গে নারিকেল তেল মিশিয়ে বানিয়ে নিতে পারেন আপনার নিজস্ব তেল!

যদি পার্লার থেকে চুল সেট করেন, সেক্ষেত্রে বাসায় এসে অবশ্যই চুলে তেল মেখে নিন। সরাসরি চুল ধুয়ে ফেলবেন না। তেল দিলে চুল নরম হবে ও চুল বাঁধা খোলার সময় চুল কম পড়বে। এক পেয়ালা তেল হালকা কুসুম গরম করে আপনার তালুতে ম্যাসাজ করুন। এতে তালুতে রক্ত চলাচল বাড়বে ও হেয়ার ড্রেসিংয়ের কারণে চুলে যে টান পড়েছে সেটি উপশম হবে।

এমনি ১-২ ঘণ্টা তেল রেখে শ্যাম্পু করে নিতে পারেন। পরামর্শ থাকবে পর পর কয়েকদিন টানা পার্লারে চুল না বানানোই ভালো। বেশি ড্রেসিংয়ের ফলে আমাদের চুল অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে। চেষ্টা করুন কোনো প্রডাক্ট ব্যবহার না করে সাধারণভাবে চুল সাজাতে।

হেয়ার ড্রায়ারের ব্যবহার কমানো

যেমনি অতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আছে, তেমনি অতিরিক্ত ব্লো ড্রাইং অথবা হেয়ার ড্রায়ারের ব্যবহার পরিহার করা উচিত। শীতকালে এর প্রভাব এত বেশি পড়ে না, তবে গরমকালে এমন ভুল না করাই শ্রেয়।

ভেজা চুল বাতাসে শুকানোটাই সবচেয়ে উপকারী চুলের জন্য। হ্যাঁ, যদি খুব তাড়া থাকে তাহলে ভাপ একেবারে কমিয়ে অন্তত ১০ ইঞ্চি দূরে থেকে ব্লো ড্রাই করুন। কিন্তু একে অভ্যাসে পরিণত করবেন না।

চুলের প্যাক ব্যবহার করুন

শুধু শ্যাম্পু বা তেল নয়, চুলকে আরো আকর্ষণীয় ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল করতে হলে এতে বিভিন্ন ঘরোয়া উপকরণ দিয়ে তৈরি প্যাক লাগাতে পারেন। বাজারে হারবাল হেয়ার প্যাক পাওয়া যায় অনেক রকমের। তবে সাবধান থাকতে হবে ঘরের উপকরণ দিয়ে নিজের হাতে তৈরি করা প্যাক লাগানোই বেশি উপকারী।

প্রথমেই আপনার চুলের ধরন ও সমস্যা চিহ্নিত করুন। চুল তৈলাক্ত হলে বেশি তেল দেয়ার প্রয়োজন নেই, এতে চুল আরো তেল চিটচিটে হয়ে যাবে। তৈলাক্ত চুলের জন্য আমলকী, টকদই ও লেবুর রস অনেক কাজে দেয়।

চুলের পরিমাণ বুঝে মেহেদি পেস্টের সঙ্গে পরিমাণমতো আমলকীর রস অথবা টকদই অথবা একটি ডিম ও লেবুর রস মেখে ২০-৪৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।

শুষ্ক চুলের জন্য তেলের প্রয়োজন হবে হেয়ার প্যাকে। মেহেদির সঙ্গে সামান্য নারিকেল বা ক্যাস্টর অয়েল মিশিয়ে তার সঙ্গে দিতে পারেন ২-৩টি পাকা কলার পেস্ট। তাছাড়া পাকা কলা আর পেঁপের পেস্টও শুষ্ক চুলের জন্য ভালো। খুশকি ও চুল পড়া রোধ করতে আমলকী ও টকদইয়ের প্যাক বেশ উপকারী।

নিয়মমতো এসব প্যাক ব্যবহারে আপনার চুল আরো ঝলমলে ও ঈদের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠবে।

নতুন কিছু করতে চাইলে

ঈদে নতুন চুলের স্টাইল চাইলে সেটি ঠিক ঈদের আগের দিন বা ১-২ দিন আগে করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ চুল কাটার পর অন্তত ৪-৭ দিন সময় নেয় নতুন হেয়ার কাট আপনার চেহারার সঙ্গে অ্যাডজাস্ট বা খাপ খাওয়াতে। তাছাড়া সদ্য কাটা চুল নিয়ে হরেক রকম হেয়ার স্টাইল সম্ভব হয় না।

তাই ঈদের কমপক্ষে ১ সপ্তাহ আগেই চুল কেটে ফেলা উচিত। কাটতে না চাইলেও এই সময় চুলের আগা ট্রিম করে নিলেও দেখতে অন্যরকম লাগবে। রঙ করতে চাইলেও তা ৫-৭ দিন আগেই করে নেবেন। যদি নতুন স্টাইল ভালো না লাগে, তা যেন ঈদের আগে বদলানোর সময় থাকে সে চিন্তা করে নতুন কিছু করা ভালো।

শেষ কথা

চুলের যত্নে শেষ কথা বলতে আসলে কিছু নেই। এই পুরোটাই অভ্যাস ও সচেতনতার ব্যাপার। একেক জনের চুল একেক রকম। তাই ওপরের সব টিপস সবার জন্য সমানভাবে কাজ করবে না। আপনার চুলের জন্য কী ধরনের যত্ন প্রয়োজন তা বোঝার চেষ্টা করুন ও ব্যস্ত সময় থেকে সামান্য সময় বের করুন চুলের জন্য। দেখবেন খুব সহজেই সুন্দর, দীর্ঘ, কালো চুলের অধিকারী হয়ে গেছেন!

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।