আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী : জ্যোতিকা জ্যোতি

বাংলাদেশ একটি স্বপ্নপুরী। এখানে প্রকৃতির পরতে পরতে স্বপ্ন বোনা থাকে। মেঘের ডানায় সেই স্বপ্নেরা উড়ে বেড়ায়। সেসব নিয়েই রঙিন ছিল আমার শৈশবকাল। গ্রামের মেয়ে হওয়ায় আমি দেশটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। শৈশবের সে দিনগুলো এখনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে রঙিন হয়ে। তখন খুব মিস করি সেই দিনগুলোকে।

আমি সেই সৌভাগ্যবানদের একজন যে বাংলাদেশের ষড়ঋতুর রূপ দেখেছি প্রকৃতির পরতে পরতে। গ্রামে বেড়ে ওঠা আমার শরীরে-মনেই যেন মিশে আছে বাংলার মিষ্টি সকাল, অলস দুপুর, প্রজাপতি রঙিন বিকেল, প্রদীপশিখার সন্ধ্যা, সুদূর থেকে ভেসে আসা বাঁশির সুরেলা রাত, ফজরের আজানের সুরে মাখা ভোর। যতবার বিদেশে যাই, ততবার আমি নতুন করে চিনি বাংলাদেশের অপরূপ প্রকৃতি, ততবার বুঝি ষড়ঋতুর বাংলাদেশ! আর তাই তো মনের অজান্তে বার বার গেয়ে উঠি- এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি...। আসলেই এমন দেশ কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। গানের চেয়েও সুন্দর আমার বাংলাদেশ।

সেই ছয় ঋতুর এক ঋতু গ্রীষ্ম, যার অপরিহার্য এক রূপ বৈশাখি ঝড়। যাকে নিয়ে আমাদের স্মৃতির কোনো শেষ নেই। পাতা ঝরানো, ধুলো ওড়ানো বাতাসে চোখ বন্ধ করে মনে ভাসে ঝড়ের দিনে আমকুড়ানো, ঝড় আসার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে হইচই, কালবৈশাখিকে থামানোর জন্য আজান, গাছপালা ভেঙে পড়া, বাড়িঘর উড়ে যাওয়া আর ঝড়শেষে ঠাকুমার সঙ্গে পাড়াবেড়ানো, কোথায় কী হলো দেখা ইত্যাদি। আমার খুব মনে পড়ে শিলাবৃষ্টিতে ভিজে শিল কুড়িয়ে টুপটাপ গিলে ফেলা, হাতে রেখে শিলার পানি হয়ে যাওয়া দেখা! আমার এসব কথা মনে পড়লেই মনে হয় ওই কবিতাটা তো আমার জন্যই যেন লেখা- ‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ/ পাকা জামের মধুর রসে রঙিন করি মুখ।’

একবার বৈশাখি আমাদের পরে খুব ক্ষেপে গেল। তার যত রাগ গিয়ে পড়ল আমাদের স্কুলে। সেদিন তো স্কুলের চালটাকেই উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এরপর কিছুদিন আমরা বাইরে গাছতলায় বসে ক্লাস করতাম। তবে মন ভালো হয়ে গিয়েছিল সেদিন বিকেলেই। এক আপু এসে বললেন মন খারাপ করিস না। চল ঘুরে আসি। ও পাড়ার দিঘিরপাড়ে বৈশাখি মেলা বসেছে। আপু সেদিন বলেছিল, এভাবে মন খারাপ করতে নেই। বৈশাখ তো এমনই। এটা তো প্রকৃতির খেলা। এখানে কারো হাত নেই।

সেদিন ঝড়ের সঙ্গে খুব বৃষ্টি হয়েছিল। বৃষ্টি থামলে পুকুরপাড়ে আম কুড়াতে গেছি। আমবাগানের পাশেই ছিল একটু ছোট্ট খানা। আমি সেখানে গিয়ে দেখি আমের সঙ্গে শুধু কই মাছ আর কই মাছ ছোটাছুটি করছে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে খানা থেকে উঠে এসেছিল কইগুলো। আমি কয়েকটা মাছ ধরে বেতের ঝুড়িতে ওঠালাম। ওরা তখন কান বেয়ে ঝুড়ি ডিঙিয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে। আমি তাড়াতাড়ি বাড়িতে গিয়ে অ্যালুমিনিয়ামের পাতিল এনে অনেকগুলো কই মাছ ধরেছিলাম। আমি সেদিন যেখান থেকে কই মাছ ধরেছিলাম, ওই খানাটা আমাদের বাড়ি থেকে দেখা যেত। সেদিনের পর থেকে বৃষ্টি হলেই আমি খানার পাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।

এখন অনেক বৈশাখ পার করার পর জীবন অন্যরকম। এখন জীবনের ঝড়ের ফাঁকে কখনো বোঝা যায় না বৈশাখি ঝড়। ইট-পাথরের দেয়াল আমাকে বিচ্ছিন্ন রাখে বৈশাখি ঝড়ের হাওয়া, বাতাস, শিলাবৃষ্টি থেকে। কখনো জানালার ফাঁকে দেখি বৈশাখির কালরূপ। তবে শ্যুটিংয়ের কাজে গ্রামে থাকলে যদি ঝড় হয়, মিস করি না, ডুবে যাই আমার হারিয়ে ফেলা শৈশবে।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।