বৈশাখে দেশি উপহার

বিভিন্ন উপলক্ষে উপহার আদান-প্রদানের প্রথা সব দেশের মানুষের মধ্যে থাকলেও বাঙালিদের মধ্যে মনে হয় এটা একটু বেশিই দেখা যায়। আমরা কিন্তু উপলক্ষ ছাড়াও উপহার দিতে ভালোবাসি। ছোট কিন্তু থটফুল কিছু দিয়ে আমরা প্রায়ই আমাদের পরিবারের সদস্য কিংবা বন্ধুদের চমকে দিতে পছন্দ করি। কারো বাসায় দাওয়াতে গেলেও আমরা সঙ্গে করে একটি কফির জার নিয়ে নেই। বাসায় ভালো-মন্দ রান্না হলে পাশের বাসায় খাবার পাঠাতে ভুলি না আমরা বাঙালিরা।

উপহার পেতে কেউ বেশি পছন্দ করে, কেউ দিতে। অনেকে জন্মদিনে সে কী নেবে তা আগে থেকেই বন্ধুদের জানিয়ে রাখে, অন্যদিকে অনেকে এক বছর ধরে ভেবে রাখে পরের জন্মদিনে বন্ধুকে কী উপহার দেবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে উপহার দিতে বেশি পছন্দ করি। বিভিন্ন উপলক্ষে ছোট হলেও থটফুল কিছু দিতে চেষ্টা করি পরিবারের সদস্য কিংবা বন্ধুদের। জন্মদিন থেকে শুরু করে বন্ধু দিবস, ঈদ-পূজা কিংবা কোনো উপলক্ষ ছাড়াই উপহার দিতে ভালোবাসি। তবে কখনো আমার বাংলা নতুন বছরে উপহার কেনা হয়নি। এবার বন্ধুদের দেশীয় উপহার দেয়ার কথা মাথায় এলো। তাই প্রচুর গবেষণা করে বেরিয়ে পড়লাম দেশি উপহারের খোঁজে, সঙ্গে নিলাম দু’জন বন্ধুকে। যাদের একজন এই লেখার ছবিগুলোর মডেল ও আরেকজন চিত্রগ্রাহক।

প্রথমে গেলাম দোয়েল চত্বরের বিখ্যাত মৃৎ শিল্প ও হ্যান্ডি ক্র্যাফটসের দোকানগুলোতে। সারি সারি দেশীয় সামগ্রীতে ঠাসা প্রত্যেকটি দোকান সেখানের। সেজন্য দেশি উপহার খুঁজতে চাইলে প্রথমে সেখানে যাওয়াটাই ঠিক হবে। পাটের বিভিন্ন সামগ্রী, একতারা, দোতারা, ডুগডুগি, চাবির রিং, কাঠের ঢেঁকি, জুয়েলারি বক্স, নকশাওয়ালা আয়না, মাটির গহনা, মাটির ফুলদানি, মাটির ঘোড়া, হাতি, মাটির কলস, থালা, বাটি, ল্যাম্প, বিভিন্ন ধরনের চুড়ি, দৃশ্য, বাঁশের তৈরি হাতপাখা ইত্যাদি জিনিস দেশি উপহার হিসেবে একদম পারফেক্ট হবে। সুন্দর নকশার সবক’টি জিনিসের দামও একদম হাতের নাগালে। শরিফুল ইসলাম নামের একজন দোকানির সঙ্গে কথা বলে জানলাম, বৈশাখী পণ্য তৈরির আয়োজন শুরু হয়েছে আরো মাস খানেক আগে থেকে। সারা বছরে বৈশাখের আগের মাসটিতেই নাকি তাদের সবচেয়ে বেশি ব্যবসা হয়। একতারা, দোতারা, ‘পহেলা বৈশাখ’ খোদাই করা চাবির রিং, মাটির গহনা তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় পণ্য।

মাটির থালা-বাটিও বৈশাখের সময় বেশি বিক্রি হয়ে থাকে। বৈশাখে অতিথিদের জন্য খাবার পরিবেশনে মাটির থালা, বাটি বৈশাখি স্পিরিটের সঙ্গে বেশ মিলে যায়। তাই উপহার হিসেবে এগুলো খারাপ না। লাল-সাদা শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে মাটির গহনাগুলো পরলে বৈশাখি আমেজটা বেশ ভালোভাবে তুলে ধরা যায়। বৈশাখ উদযাপন করতে মাটির তৈরি দৃশ্য, ব্যাংক, ফুলদানি, মগ, হাতি, ঘোড়া, মাছ এগুলোও উপহার হিসেবে দিতে পারেন কাছের মানুষগুলোকে।

বৈশাখি নকশার আদলে বাঁশের তৈরি ছোট কুলাগুলো দেখতে চমৎকার এবং উপহার হিসেবে পারফেক্ট। কুলা ছাড়াও বাঁশের তৈরি অন্যান্য জিনিসও পেয়ে যাবেন, যেগুলো ঘর সাজাতে কাজে লাগতে পারে আপনার পরিচিত কারোর।

কাঠের ভেতরে খোদাই করা ল্যাম্পগুলো দেখতে বেশ সুন্দর এবং এগুলো উপহার হিসেবে দিয়ে যে কাউকেই খুশি করতে পারবেন আপনি। কাঠের ফুলদানি, কলমদানিও উপহার দেয়ার মতো। সুন্দর নকশার এ পণ্যগুলো বৈশাখি থিমের সঙ্গে মিলে যায়। কাঠের তৈরি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়াও কাঠের তৈরি ঢেঁকি, ছোট একতারা, দোতারা, চাবির রিং ও গ্রামবাংলার ঘরগুলো বৈশাখের জন্যই বিশেষ বানানো।

মাটি ও কাঠের তৈরি গহনা ছাড়াও অন্যান্য উপাদানের গহনা পেয়ে যাবেন দোয়েল চত্বরে। যেগুলোর নকশা আপনার লাল-সাদা রঙের শাড়ির কথা মাথায় রেখেই বানানো হয়েছে।

দোয়েল চত্বর ঘুরে গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। সারা বছরই চারুকলার আশপাশে দেশীয় সামগ্রী নিয়ে বসে বিক্রেতারা। তবে বৈশাখের আগে সেখানে রীতিমতো বিক্রেতাদের ভিড় জমে যায়। ভিন্ন ধাঁচের মাটির গহনা উপহার দিতে চাইলে সেখানে চলে যেতে পারেন। সুন্দর মিনিমালিস্টিক নকশার মাটির গহনা থেকে শুরু করে চুড়ি ও ব্যাগও খুঁজে পাবেন সেখানে। আর বৈশাখের সময় নতুন সংযোজন হিসেবে আসে মাটি, কাঠ ও বাঁশের বিভিন্ন সামগ্রী।

চারুকলা ধরে শাহবাগ দিয়ে এবার চলে এলাম আজিজ সুপার মার্কেটে। আজিজের দেশীয় পোশাকের আউটলেটগুলোতেও পাবেন দেশীয় বিভিন্ন পণ্য। কলম-পেন্সিল রাখার ছোট পাটের তৈরি ব্যাগগুলো বৈশাখি উপহারের একটি ভালো অপশন। কাঠের শোপিসগুলোও বেছে নিতে পারেন। আজিজের কিছু স্টেশনারি দোকানে পাটের তৈরি মলাটের স্কেচবুক ও নোটবুক পাওয়া যায়। যেগুলো দেশি উপহার হিসেবে চালিয়ে দেয়া যায়।

দেশি ক্র্যাফটের সামগ্রী খুঁজলে অবশ্যই আড়ং হয়ে যাবেন একবার। আড়ংয়ের প্রত্যেকটি আউটলেটেই পাবেন মাটির থালা-বাসন থেকে শুরু করে নকশি কাঁথার নকশায় নোটবুক। কাঠের বাটি, চামচদানি যেমন পাবেন, তেমনই গ্রামের বউ-বরের পুতুলও পাবেন সেখানে। বিভিন্ন সাইজের রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশাও দেশি উপহারের জন্য পারফেক্ট হবে।

যাকে উপহার দিচ্ছেন, তিনি কেমন বা তার কেমন জিনিস ভালো লাগবে জানা থাকলে উপহার খোঁজা খুব কঠিন হবে না। তাই এই নববর্ষে কাছের মানুষগুলোকে উপহার দিয়ে খুশি করে দেয়ার সুযোগ আছে আপনার হাতে।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।