বৈশাখ-সাজের সখী ‘গয়না’

গয়না আর নারীমন যেন এক সুতোয় বাঁধা! উসব যেটিই হোক আর সাজ যেমনই হোক, গয়না যেকোনো সাজকে পূর্ণতা দিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আর দিনটি যদি হয় বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় উৎসব বৈশাখকে ঘিরে, তবে তো গয়নাই বলা চলে সাজের মধ্যমণি হয়ে ওঠে।

পশ্চিমা ফ্যাশনের অনেক কিছুই আমরা বাঙালিরা আমাদের দৈনন্দিন সাজে ব্যবহার করি যেমন ইমিটেশন, মেটাল বা ব্রোঞ্জের ব্রেসলেট, পাথর বা মেটালের কানের দুল, আংটি, নেকলেস ইত্যাদি। কিন্তু পশ্চিমা দেশের সঙ্গে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের গয়নার কিছু চোখে পড়ার মতো পার্থক্য আছে।

আমাদের গ্রামবাংলার সাধারণ নারীরা বেশ কয়েক যুগ ধরে ব্যবহার করেছেন ফুলের গয়না, মাটির বিভিন্ন কারুকার্য করা গয়না। সবসময় খুব দামি উপাদান না হলেও হাতের কাছে অনেক সাধারণ জিনিস দিয়ে অসাধারণ নকশা ও ডিজাইনের গয়না তৈরিতে আমাদের দেশের কুমোর-কারিগররা মুন্সিয়ানা অর্জন করেছেন।

সেই ঐতিহ্যকে তুলে ধরার দিন আমাদের পহেলা বৈশাখ। তার মানে এই না যে এসব গয়না বছরের অন্যান্য দিন পরা যাবে না। খাঁটি তামা, পিতল বা মাটির গয়নাগুলো বছরের পর বছর ব্যবহার করলেও ফিকে হয়ে যায় না।

প্রতিবারের মতো এই বৈশাখেও বাইরে রোদের প্রকোপ থাকবে বেশি। তাই চেষ্টা করবেন হালকা সাজ বজায় রাখতে। মুখে হালকা ধাঁচের মেকআপের সঙ্গে একটি আরামদায়ক পাতলা দেশি সুতি শাড়িই সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও আরামদায়ক বৈশাখী সাজ। বৈশাখ উপলক্ষে ফ্যাশন হাউজ ও পাইকারি কাপড়ের দোকানগুলো বাহারি কাপড়ে ভরে যায় এবং থাকে বৈশাখের বিভিন্ন আকর্ষণীয় মূল্যছাড়।

শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে গয়না পরলে বেশ মানায়। কিন্তু গত ২-৩ বছর ধরে ম্যাচিংয়ের চেয়ে কন্ট্রাস্ট কালারের দিকে বেশি ঝুঁকছেন মেয়েরা। ধরুন নীল শাড়ির সঙ্গে সাদা বা বেগুনি রঙের গয়না। তবে এক্ষেত্রে ট্রেন্ডের চেয়ে আপনার পছন্দ ও রুচিকে বেশি গুরুত্ব দিন।

আপনি কী ধরনের ও কোন রঙের গয়না পরবেন তা নির্ভর করে আপনার জামা-কাপড়ের ওপর। হাই-নেক ব্লাউজ পরলে গলায় নেকলেস না দিয়ে মালা পরা ভালো। আবার ব্লাউজ ফুলহাতা হলে চুড়ি এড়িয়ে চলা ভালো।

 

মাটির গয়না

ফ্যাশন যতই বদলাক, আজো বৈশাখে প্রথম পছন্দ মাটির গয়না। ঢাকার দোয়েল চত্বর, শাহবাগ, আজিজ সুপার মার্কেট ও ধানমন্ডির দিকে আপনি অনায়াসে পেয়ে যাবেন বিভিন্ন ডিজাইনের মাটির গয়না। এছাড়া বেইলি রোড, টিএসসি মোড়সহ বিভিন্ন জায়গায় রাস্তায়ও অনেকে চুড়ি-গয়নার পসরা নিয়ে বসেন।

বর্তমানে এক রঙা মাটির গয়না ফ্যাশনে নেই। বেশিরভাগ গয়নাই ভিন্ন রঙ ও কারুকার্যের সমাহার। আগের মতো পুরো গয়নার সেট না হলেও অনেকে আলাদা করে মালা ও কানের দুল কিনছেন এসব দোকান থেকে। বৈশাখের ঠিক এক সপ্তাহ আগে অনেক নতুন নতুন ডিজাইনের গয়না ওঠে এসব মার্কেটে এবং শুরু হয় ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়।

এসব দোকান থেকে মাটির গয়না পাবেন ৭০-১৫০ টাকার মধ্যে।

কাঠের গয়না

মাটি ছাড়াও আরেকটি দেশীয় উপাদান হচ্ছে কাঠ। মাটি অনেকটাই ট্র্যাডিশনাল লুক এনে দেয় কিন্তু যারা একটু আধুনিক ধাঁচে সাজতে চান তারা কাঠের গয়না পরতে পারেন।

 কাঠের গয়না বেশিরভাগই নেকলেস স্টাইলে তৈরি করা হয়, অনেক সময় সঙ্গে কারুকার্য করা লকেট থাকে। শুধু গলার না, কাঠের আংটি, কানের দুল এমনকি চুড়িও পাওয়া যায়। আড়ং, দেশী দশ, আজিজ সুপার মার্কেটে একটু বেশি মূল্যে কিনতে পারেন এই সুন্দর গয়নাগুলো। তাছাড়া শাহবাগ, ধানমন্ডি, টিএসসি মোড়েও পেয়ে যেতে পারেন সুলভ মূল্যে।

বড় দোকানগুলোতে ৮০-২৫০ টাকার মধ্যে পাবেন কাঠের চুড়ি, ২০০-৩০০ টাকার মধ্যে পাবেন কাঠের মালা এবং ৮০-২০০ টাকার মধ্যে পাবেন কাঠের কানের দুলগুলো।

কাচের গয়না

কাচের চুড়ির রিনিঝিনি আওয়াজে সরগরম হয়ে যায় বৈশাখি পাড়াগুলো। কাচের চুড়ি আবহমানকাল থেকেই জনপ্রিয় একটি গয়না। যদিও দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য কাচের চুড়ি তেমন উপযুক্ত না, তারপরও বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন, চৈত্রসংক্রান্তির মতো ‘বাঙালি’ উৎসবে হাতে এক জোড়া কাচের চুড়ি না থাকলে যেন মানায় না। হালফ্যাশনে এক রঙা চুড়ি না কিনে সবাই বাহারি রঙগুলো পছন্দ করছেন। শাহবাগের একজন চুড়ি বিক্রেতা বলেন, ‘এখন সবাই জরি-চুমকিওয়ালা ডিজাইনের চুড়ি বেশি পছন্দ করে, যদিও তাদের দাম একটু বেশি’।

কাচের চুড়ি সবচেয়ে চোখে পড়বে বৈশাখের কয়েকদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার ভবনের সামনে, চারুকলায়, শাহবাগে, স্বাধীনতা জাদুঘরের উল্টো পাশে। ৫০-১৫০ টাকার মধ্যে খুব সুন্দর সুন্দর কাচের চুড়ি পেয়ে যেতে পারেন সেখানে।

মেটালের গয়না

বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে পিতল-তামার মতো ধাতব গয়নাগুলো। নকশাখচিত এসব গয়না যেকোনো কাপড়ের সঙ্গে খুব সহজে মানিয়ে যায় ও বছরের যেকোনো সময়েই এদের ব্যবহার করা যায়। ফিতা দিয়ে ঝোলানো লম্বা মালার সঙ্গে পিতলের পেন্ডেন্ট সাধারণ সাজকে অতুলনীয় ও স্নিগ্ধ করে তোলে।

এদের আরেক ধরনের ভ্যারাইটি হলো ‘অ্যান্টিক গয়না’। ধাতুতে একটু কালচে কালচে দাগসংবলিত এসব গয়না শুধু রঙের জন্যই নয় বরং তাদের ভিন্নধর্মী ডিজাইনের জন্য বিভিন্ন বয়সের মানুষের পছন্দের গয়নায় পরিণত হয়েছে। যেসব দোকানে মাটি ও কাঠের গয়না পাবেন, খুব সম্ভবত সেসব দোকানেই মেটালের গয়নাগুলো পেয়ে যাবেন। পিতলের মালাগুলোর দাম পড়বে ১৫০-৩০০ টাকার মতো, কানের দুল পাবেন ৮০-২০০ টাকার মধ্যে।

পুঁতি, প্লাস্টিক আরো অনেক

অনেকেরই আগ্রহ থাকে রঙ-বেরঙের পুঁতির মালার দিকে। পুঁতির মালার সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো এটি অত্যন্ত ব্যবহার উপযোগী একটি গয়না। ফরমাল, ক্যাজুয়াল যেকোনো সাজের সঙ্গে মানায়। পুঁতির মালাগুলো অনেক সময় একটি সুতার হয় বা অনেক সময় অনেক সুতার হয়। রঙ ছাড়াও সাদা, তামাটে রঙের পুঁতির মালার চলও বেশ বেড়েছে। নিউমার্কেট, আজিজ সুপার মার্কেট, দোয়েল চত্বর ও শাহবাগ এলাকায় মাত্র ৫০-৩০০ টাকার মধ্যে বিভিন্ন ডিজাইনের পুঁতির মালা পেয়ে যাবেন।

পুঁতি ছাড়াও প্লাস্টিক ও ফলের বিচির তৈরি মালাগুলো এখন বাজারের নতুন আকর্ষণ। শাড়ির সঙ্গে বা বৈশাখি সালোয়ার-কামিজ বা ফতুয়ার সঙ্গে এসব ভিন্নধর্মী গয়না বেশ মানায় এবং বাচ্চা বা কিশোরীদের জন্যও দেখতে সুন্দর এই গয়নাগুলো।

ফুলের গয়না

এটি অনেকটাই নিজস্ব আগ্রহের ব্যাপার। বৈশাখে কম-বেশি সবাই ফুলের তৈরি মুকুট পরতে ভালোবাসেন। তবে গরমে খোঁপায় একপ্রস্থ গাঁদাফুলের মালা জড়ালে বাঙালি সাজে অপরূপ দেখা যায় একেকজনকে। গাঁজরা, ক্যালেন্ডুলাসহ ছোট ফুলগুলো দিয়েও পূর্ণ করা যায় বৈশাখি সাজ।

পুরুষরাও পিছিয়ে নেই

এতক্ষণ তো শুধু মেয়েদের কথাই বললাম! কিন্তু পুরনো দিনের মতো আজকাল ছেলেদেরও গয়নার ব্যাপারে আগ্রহ দেখা দিয়েছে এবং সেই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজ বিশেষভাবে গয়না তৈরি করছে। ছেলেদের কমন গয়না হতে পারে আংটি ও কানের পিন। এছাড়া অনেকে চাইলে কিনতে পারেন ছেলেদের ব্রেসলেট।

আসছে বৈশাখ সবার আনন্দে কাটুক।

মডেল : আইরিন জাহান ইমু ও রিতা রদিক্স

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।