স্কুল থেকেই বড় পর্দায় সফল নায়িকারা

নায়িকা। যা মনের রঙতুলি দিয়ে আঁকা এক শব্দের নাম। যে শব্দের ওপর নিজের মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা অকৃত্রিম ভালোবাসাকে নিংড়ে দেন ভক্তকুল। নিজের মনের অজান্তেই নায়িকাদের নিয়ে মনে মনে স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করেন তারা। পাশাপাশি নায়িকাদের সম্পর্কে জানার ব্যাকুলতা ভাসতে থাকে ভক্ত মন। চলন-বলন, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাবার-দাবার, শিক্ষা-দীক্ষাসহ অন্যান্য নানা বিষয়ে কৌতূহলের কমতি থাকে না তাদের। বাংলা চলচ্চিত্রে মাধ্যমিক ধাপ অতিক্রম করার আগেই নিজের নামের সঙ্গে নায়িকা খ্যাতি লাগানো তারকাদের গল্প নিয়েই সাজানো হয়েছে এ আয়োজন-

শাবানা

কিংবদন্তি চলচ্চিত্র অভিনেত্রী শাবানা ১৯৫২ সালের ১৫ জুন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গেণ্ডারিয়া হাই স্কুলে ভর্তি হলেও পড়ালেখা ভালো লাগত না তার। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার তাই ইতি ঘটে মাত্র ৯ বছর বয়সে। চলচ্চিত্রকার এহতেশাম ছিলেন তার চাচা। শাবানার বাবার খালাতো ভাই। তার মাধ্যমেই শাবানার চলচ্চিত্রে আগমন হয়। শিশুশিল্পী হিসেবে ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তার চলচ্চিত্রে আবির্ভাব ঘটে। পরে ১৯৬৭ সালে ‘চকোরী’ চলচ্চিত্রে চিত্রনায়ক নাদিমের বিপরীতে প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করেন এ অভিনেত্রী। শাবানার প্রকৃত নাম রত্না। চিত্র পরিচালক এহতেশাম ‘চকোরী’ চলচ্চিত্রে তার শাবানা নাম প্রদান করেন। তার পূর্ণ নাম আফরোজা সুলতানা। তিনি তার ৩৬ বছর কর্মজীবনে ২৯৯টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ষাট থেকে নব্বই দশকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিলেন এই অভিনেত্রী। এরপর ২০০০ সালে এসে রূপালী জগৎ থেকে নিজেকে আড়াল করে ফেলেন এ নায়িকা। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অভিনয়ের জন্য ৯ বার ও প্রযোজক হিসেবে ১ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন এবং ২০১৭ সালে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন।

ববিতা

ফরিদা আক্তার পপি যিনি রুপালি জগতে ববিতা নামে পরিচিত। যিনি একজন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী এবং প্রযোজক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ৭০-৮০ দশকে তিনি অভিনয় শুরু করেন। ববিতা ১৯৫৩ সালে বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলায় জন্ম নেন। তবে তার পৈত্রিক বাড়ি যশোর জেলায়। তিন বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় বোন সুচন্দা চলচ্চিত্র অভিনেত্রী, বড় ভাই শহীদুল ইসলাম ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, মেজ ভাই ইকবাল ইসলাম বৈমানিক, ছোট বোন গুলশান আখতার চম্পা চলচ্চিত্র অভিনেত্রী এবং ছোট ভাই ফেরদৌস ইসলাম বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। এছাড়াও অভিনেতা ওমর সানী তার ভাগ্নে এবং অভিনেত্রী মৌসুমী তার ভাগ্নে বউ (ওমর সানীর স্ত্রী) এবং অভিনেতা রিয়াজ তার চাচাতো ভাই। চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান তার ভগ্নিপতি। তার মা ডাক্তার থাকায় ববিতা চেয়েছিলেন ডাক্তার হতে। তিনি পড়াশোনা করেছেন যশোর দাউদ পাবলিক বিদ্যালয়ে। সেখানে অধ্যয়নকালে বড় বোন কোহিনুর আক্তার চাটনি (সুচন্দা) চলচ্চিত্রে প্রবেশের সূত্রে পরিবারসহ চলে আসেন ঢাকার গেন্ডারিয়ায়। এখানে তিনি গেন্ডারিয়া স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন। ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রে অভিনয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট অর্জন করতে পারেননি এ অভিনেত্রী। তবে প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট অর্জন না করলেও ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে শিক্ষিত করে তোলেন তিনি। দক্ষতা অর্জন করেন ইংরেজিসহ কয়েকটি বিদেশী ভাষায়। ক্রমেই নিজেকে পরিমার্জিত করে তোলেন একজন আদর্শ শিল্পীর মাত্রায়।

১৯৬৯ সালে ‘শেষ পর্যন্ত’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নায়িকা হিসেবে অভিষেক ঘটে সুন্দরী অভিনেত্রী ববিতার। ১৯৬৯ সালের ১৪ আগস্ট চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় এবং ওইদিনই তার মা মারা যান। ববিতা সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে প্রশংসিত হন। তিনি ২৫০-এর বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৭৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তনের পর টানা তিনবার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার জেতেন। এছাড়া ১৯৮৬ সালে আরেকবার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী, ১৯৯৭ সালে শ্রেষ্ঠ প্রযোজক এবং ২০০৩ ও ২০১৩ সালে দু’বার শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন। সর্বশেষ ২০১৮ সালে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা পুরস্কার লাভ করেন।

শাবনূর

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের তুমুল জনপ্রিয় অভিনেত্রী শাবনূর। ৯০ দশক থেকে এ পর্যন্ত আসা চিত্রনায়িকাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাকে। ১৯৭৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর যশোর জেলার শার্শা উপজেলার নাভারণে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিকভাবে তার নাম রাখা হয় কাজী শারমিন নাহিদ নূপুর। পরে স্বনামধন্য নির্মাতা এবং তার মেন্টর এহতেশাম তার নাম রাখেন শাবনূর। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় তিনি। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই মাত্র ১৩ বছর বয়সে শাবনূর চলচ্চিত্রে পা রাখেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার এহতেশাম পরিচালিত ‘চাঁদনী রাতে’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে তার। প্রথম ছবি ব্যর্থ হলেও পরে সালমান শাহের সঙ্গে জুটি গড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান তিনি। একে একে এ জুটি সুপারহিট ছবি উপহার দিতে থাকে দর্শকদের। সালমানের অকালমৃত্যুতে সাময়িকভাবে শাবনূরের ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়লেও তার চিরায়ত বাঙালি প্রেমিকার ইমেজ এবং অসাধারণ অভিনয় ক্ষমতা তাকে দর্শকদের হৃদয়ে শক্ত আসন গড়তে সাহায্য করে। পরে রিয়াজ, শাকিল খান, ফেরদৌস, অকাল প্রয়াত নায়ক মান্না ও শাকিব খানের সঙ্গে জনপ্রিয় জুটি গড়ে অসংখ্য ব্যবসাসফল ও জনপ্রিয় ছবি উপহার দেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়াতে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। চলচ্চিত্রে কামব্যাক করার পরিকল্পনা করেই নিজেকে প্রস্তুত করছেন তিনি।

শাবনূর ২০০৫ সালে মোস্তাফিজুর রহমান মানিক পরিচালিত দুই নয়নের আলো ছবিতে অভিনয় করে তার ক্যারিয়ারের একমাত্র জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন তিনি।

পূর্ণিমা

অভিনয়ে, রূপে, গুণে সৃষ্ট অপরূপা নায়িকা পূর্ণিমা ১৯৮১ সালের ১১ জুলাই চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে। তবে তার বেড়ে ওঠা ঢাকায় নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় নিজের অভিনয় নৈপুণ্যের মাধ্যমে আলো ছড়াতে ঢাকাই ছবিতে পা রাখেন তিনি। ভক্তকুলের ভালোবাসা নিয়ে ক্যারিয়ারে প্রায় দেড় যুগেরও বেশি সময় অতিক্রম করেছেন এ নায়িকা। তার পারিবারিক নাম দিলারা হানিফ রিতা। ১৯৯৭ সালে জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত ‘এ জীবন তোমার আমার’ ছবির মাধ্যমে ঢাকাই ছবিতে পা রাখেন।

তারপর ২০০১ সাল থেকে শুরু করে দর্শকদের উপহার দিয়েছেন অনেক ব্যবসাসফল ছবি। তার অভিনীত ‘লাল দরিয়া’, ‘মনের মাঝে তুমি’, ‘মেঘের পরে মেঘ’, ‘সুভা’, ‘রাক্ষুসী’, ‘শাস্তি’, ‘হৃদয়ের কথা’, ‘আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা’সহ আরো অনেক ছবি এখনো দর্শক হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়।

২০০৩ সালে মুক্তি পায় তার সব থেকে ব্যবসাসফল ছবি ‘মনের মাঝে তুমি’। এটি বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত বাংলাদেশের সব থেকে ব্যবসাসফল ১০টি ছবির মধ্যে অন্যতম।

২০১০ সালে কাজী হায়াৎ পরিচালিত ‘ওরা আমাকে ভালো হতে দিল না’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিভাগে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন পূর্ণিমা। ২০১১ সাল থেকে তিনি ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি টিভি নাটকেও কাজ করেছেন। বিয়ে পরবর্তী কন্যাসন্তানের জননী হওয়ার পর থেকে অভিনয়ে কিছুটা বিরতি নিলেও সবকিছু গুছিয়ে আবারো ফিরেছেন সিনেমায়।

 

পূজা চেরি

পূজা চেরি একজন মডেল ও অভিনেত্রী। মডেলিং ও শিশুশিল্পী হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয়। ঢাকাই সিনেমার নতুন সেনসেশন পূজা চেরি। অনেকে চঞ্চলা শাবনূরকে তার মধ্যে খুঁজে পায়। শিশুশিল্পী হিসেবেই অভিষেক সিনেমায়। এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে এই নায়িকা। এখন দেখা যাক তার পূর্বসূরিদের পথে হাঁটবেন, নাকি পড়াশোনাটাও ঠিকমতো চালিয়ে যেতে পারবেন। শিশুশিল্পী হিসেবে কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর ২০১৮ সালে ‘নূর জাহান’ চলচ্চিত্র দিয়ে তার বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে। একই বছর তিনি ব্যবসাসফল ‘পোড়ামন-২’ ও ‘দহন’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।

পূজা শিশুশিল্পী হিসেবে ২০১২ সালে ‘ভালোবাসার রঙ’, ২০১৩ সালে ‘তবুও ভালোবাসি’, ২০১৪ সালে ‘অগ্নি’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। সর্বশেষ মারাঠি ভাষার বিপুল প্রশংসিত সৈরাট-এর ছায়া অবলম্বনে নির্মিত ‘নূর জাহান’ চলচ্চিত্র দিয়ে পূজার প্রাপ্তবয়স্ক অভিনেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ হয়। ছবিটিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেন আরেক নবাগত আদৃত। তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র পোড়ামন-২। নবাগত পরিচালক রায়হান রাফী পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে তার বিপরীতে ছিলেন আরেক নবাগত সিয়াম আহমেদ। একই বছরের নভেম্বরের শেষের দিকে দহন চলচ্চিত্রে রাফী-সিয়াম-পূজা জুটিকে পুনরায় একত্রে দেখা যায়।

এছাড়াও সোনিয়া, অন্তরা, রত্নারাও বাংলা চলচ্চিত্রে মাধ্যমিকের গণ্ডিতেই থাকা অবস্থায় নায়িকা হয়েছেন।

ছবি : তুহিন হোসেন ও শাহরিয়ার কবির হিমেল

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।