শাহনাজ রহমতউল্লাহ- দৃষ্টির সীমানা থেকে দূরে

অসংখ্য কালজয়ী গানের সংগীতশিল্পী শাহনাজ রহমতউল্লাহ। মাত্র ১১ বছর বয়সে ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান রেডিওতে গান গাইতে আরম্ভ করেন, তখন তার নাম ছিল শাহনাজ বেগম। একই বছর চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকে সূচনা করেন তিনি। ষাটের দশকে পশ্চিম পাকিস্তানে গজল সম্রাট মেহেদি হাসানের কাছে সরাসরি গান শেখেন। ১৯৬৪ সালে টেলিভিশনে প্রথম গান করেন। মেধাবী সুরকার, সংগীত পরিচালক  আনোয়ার পারভেজ, জনপ্রিয় চিত্রনায়ক জাফর ইকবাল তার ভাই। তিনজনই আর আমাদের মাঝে নেই।

স্বামী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। স্বামী মেজর (অব.) আবুল বাশার রহমতউল্লাহ। ১৯৯০ সালে ‘ছুটির ফাঁদে’ ছবির ‘সাগরের সৈকতে কে যেন ডাকে আয়’ গানটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। শাহনাজ রহমতউল্লাহ ১৯৯২ সালে একুশে পদক পান।

দেশাত্মবোধক গান গেয়েও তুমুল জনপ্রিয়তা ছিল কণ্ঠশিল্পীর। তার গাওয়া উল্লেখযোগ্য দেশের গানের মধ্যে রয়েছে ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’, ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’, ‘আমার দেশের মাটির গন্ধে’, ‘আমায় যদি প্রশ্ন করে’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বল রে আমায় বল’। বাংলাদেশের সিনেমায় অনেক জনপ্রিয় গান গেয়েছেন শাহনাজ রহমতউল্লাহ। ‘অধিকার’ ছবিতে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের কথা ও আলী হোসেনের সুরে গেয়েছিলেন ‘কোন লজ্জায় ফুল সুন্দর হলো’। বিবিসির জরিপে সর্বকালের সেরা ২০ বাংলা গানের তালিকায় শাহনাজ রহমতউল্লাহর গাওয়া গান চারটি স্থান পেয়েছে! গানগুলো হলো খান আতাউর রহমানের কথা ও সুরে ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কথা ও আনোয়ার পারভেজের সুরে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’ আর ‘একতারা তুই দেশের কথা বল রে এবার বল’। ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি তৈরি করে পরে পাঠানো হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। গানের কথা লিখেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুর করেছেন আনোয়ার পারভেজ। আর গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন শাহনাজ রহমতউল্লাহসহ আরো কয়েকজন।

 

শ্রোতাপ্রিয় কিছু গান

১. যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়

২. ফুলের কানে ভ্রমর এসে (পিচঢালা পথ)

৩. আমি সাত সাগরের ওপার হতে (কত যে মিনতি)

৪. পারি না ভুলে যেতে (সাক্ষী)

৫. ওই ঝিনুক ফোটা সাগর বেলায়

৬. যেভাবে বাঁচি

৭. বেঁচে তো আছি

৮. শোনেন শোনেন জাঁহাপনা (সাত ভাই চম্পা)

৯. ভুলে যেতে কী যে কষ্ট হয়

 ১০. কে যেন সোনার কাঠি ছোঁয়ায় প্রাণে

 ১১. আমি যে কেবল বলে তুমি (আগন্তুক)

 ১২. একটু সময় দিলে না হয় (সূর্য ওঠার আগে)

১৩. স্বপ্নের চেয়ে সুন্দর কিছু নেই

১৪. আবার কখন কবে দেখা হবে

 ১৫. যদি চোখের দৃষ্টি দিয়ে চোখ বাঁধা যায়

১৬. তোমার আগুনে পোড়ানো এ দুটি চোখে

 ১৭. তুমি কি সেই তুমি

 ১৮. ও যার চোখ নাই (তাসের ঘর)

১৯. ঘুম ঘুম ঘুম চোখে (ঘুড্ডি)

২০. আমি তো আমার গল্প বলেছি

২১. বন্ধু রে তোর মন পাইলাম না

 ২২. খোলা জানালায় চেয়ে দেখি তুমি আসছ

২৩. একটি কুসুম তুলে নিয়েছি

২৪. আমায় তুমি ডাক দিলে

২৫. ওই আকাশ ঘিরে সন্ধ্যা নামে

২৬ . আমার ছোট্ট ভাইটি মায়ায় ভরা মুখটি

 ২৭. আষাঢ় শ্রাবণ এলে নেই তো সংশয়

২৮. বারোটি বছর পরে

২৯. আরো কিছু দাও না দুঃখ আমায়

৩০. আমি ওই মনে মন দিয়েছি যখন

 ৩১. আমার সাজানো বাগানের আঙিনায়

৩২. দিগন্তজোড়া মাঠ

৩৩. তোমার আলোর বৃন্তে

৩৪. এই জীবনের মঞ্চে

 

দেশের গান

১. এক নদী রক্ত পেরিয়ে

২. জয় বাংলা বাংলার জয়

৩. একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়

৪. একতারা তুই দেশের কথা বল রে এবার বল

৫. প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ

৬. আমার দেশের মাটির গন্ধে

 

 

‘গানের জগতে প্রথম-দ্বিতীয় হওয়ার ইঁদুর দৌড়ে কখনই শামিল ছিলেন না’

কনকচাঁপা

কণ্ঠশিল্পী

কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা প্রিয় শিল্পীর স্মরণে এক দীর্ঘ স্মৃতিচারণ করেছেন ফেসবুকে। তার সেই লেখাটা আনন্দধারার পাঠকদের জন্য তুলে দেয়া হলো-

‘কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতউল্লাহ মরে গিয়ে জানিয়ে দিলেন ‘উনি ছিলেন, উনি আছেন, উনি থাকবেন এবং উনাকে ছাড়া উপমহাদেশের সংগীত জগৎ কতটা অসম্পূর্ণ। সত্যিই আমরা ভাগ্যবান যে, শাহনাজ রহমতউল্লাহ একান্তই আমাদের ছিলেন। সুরসম্রাট আলাউদ্দিন আলী এবং শাহনাজ রহমতউল্লাহ মিলে যে অনবদ্য সৃষ্টির যৌথ অধ্যায় ছিল, তা সত্যিই ভীষণ মৌলিক। তার গানের প্রক্ষেপণ, উপস্থাপন, তার কণ্ঠের ট্রিমেলো, রেজোন্যান্স, শব্দচয়ন, সর্বোপরি তার বিশেষায়িত অন্যরকম কণ্ঠ তার প্রতিটি গানকে অন্যরকম উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

বেশিরভাগ গান কবিতা থেকে গান হয়ে ওঠে। কিন্তু আমার গবেষণা বলে উনার গান প্রথমে গান হয়ে জন্ম নিয়ে তারপর কবিতা হয়ে উড়ে উড়ে সাহিত্যে ছড়িয়ে যায়। যেমন ‘সেই চেনা মুখ কতদিন দেখিনি’- এই লাইনটি দিয়ে তার সুরের মাধুরীর ওপর ভিত্তি করে একজন ঔপন্যাসিক একটি উপন্যাস লেখার প্লট পেয়ে যাবেন। সেই পরিবেশ শাহনাজ আপা তার গানের অনুরণন দিয়ে তৈরি করে দিয়ে গেছেন হেলায়-অবহেলায়। অথচ এগুলো তিনি জেনেশুনে সুনিপুণভাবে করেননি। তিনি গান গেয়েছেন অসম্ভব ভালোবেসে এবং অতিরিক্ত অপেশাদার ভঙ্গিতে। গানের জগতে প্রথম-দ্বিতীয় হওয়ার ইঁদুর দৌড়ে কখনই শামিল হননি। নিজের এই বিশেষত্বকে তিনি কখনই সিরিয়াসলি নেননি। তারপরও যা গান গেয়েছেন, একটা গানও মাটিতে পড়েনি। তা সারা দেশের গানপ্রিয় মানুষের হৃদয়ে ঢুকে স্থায়ীভাবে বসতি গেড়েছে। তার গাওয়া দেশের গানগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করার মতো স্পর্ধা আমার নেই। সে গানগুলো কোনো মানবীর গাওয়া, এ ভাবতেই গায়ে কাঁটা দেয়। তার দেশের গানগুলো শুনে আমি বোকা মেয়ে যখন-তখন কাঁদি। আর প্রেমের গান? তার গানে হয়তো আমার বাবাও প্রেমে পড়েছিলেন, আমার ছেলেও, হয়তো আমার নাতনিও একইভাবে প্রেমে পড়বে। শোনা যায় এমন শাব্দিক দীর্ঘশ্বাস না দিয়েও ভয়াবহ অন্তর্গত দীর্ঘনিঃশ্বাস তিনি অনায়াসেই গানে আনতেন, যা একজন বিরল শিল্পীর পারঙ্গম ক্ষমতা। আমি তার কণ্ঠের চেয়েও এই আন্ডার ভয়েজের কারুকার্যময় দীর্ঘনিঃশ্বাসের অন্ধভক্ত।

এজন্য যতবার আমি তাকে দেখেছি অটোমেটিক আমি কেঁদেছি। উনি তখন বলতেন এই মেয়ে, এই বোকা মেয়ে তুমি কাঁদো কেন, তুমি আমার কাছে এসো! ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অন্যান্য সচেতন সাজানো-গোছানো শিল্পীদের চেয়ে একদম আলাদা ছিলেন। স্বামী অন্তপ্রাণ মানুষটি শিশুর মতো সরল ছিলেন। গল্পে বসলে অনেক কথাই গড়গড়িয়ে বলতেন এবং আমরা হাসলে রেগে গিয়ে বলতেন এই তোমরা হাসছ কেন! এই টেকনিক্যাল হিপোক্র্যাট জগতের অনেক কিছুই তার অজানা ছিল। তার সঙ্গে শেষ দেখা আমার ডলি ইকবাল আপার বাসায়। দুপুরের খাওয়া শেষ করে একসঙ্গে আমি আর শাহনাজ আপা ডলি আপার বেডরুমে আসরের নামাজ আদায় করছিলাম। নামাজ শেষে তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘কনক, আমার কাছে আসো।’

আমি তার উদ্দেশ্য বুঝে ওনার জায়নামাজের পাশে বসতেই উনি আমার মাথায় হাত দিয়ে কন্যাসম স্নেহে দোয়া পড়ে ফুঁ দিলেন। আমি বরাবরের মতোই বোকার মতো অশ্রুসিক্ত হতেই আবার বকা, ‘এই মেয়ে, কাঁদবে না। তুমি আমার খুব আদরের জানো তো! হেসেখেলে গান ভালোবেসে যেভাবে তিনি মুকুটহীন রানীর মতো এই দুনিয়ায় ছিলেন, ঠিক তেমনি খেলাচ্ছলেই চলে গেলেন। ভাবখানা এমন যে খেলছিলেন, হঠাৎই কিছু একটা প্রয়োজনে ওপারে যাওয়ার দরকার পড়ায় মিনিট পাঁচেকের নোটিশে চলে গেলেন। যাক, যার যাওয়ার সে যাবেই। ধরে রাখার শক্তি কি আমাদের আছে! আমরা শুধু চাই আমাদের ‘মোর দ্যান নাইটিংগেল’ যেন সুখে থাকেন।

 

‘তার নাম বললে সারা পৃথিবীর মানুষ চিনতে পারত’

গাজী মাজহারুল আনোয়ার

গীতিকবি, পরিচালক

বাংলাদেশের শ্রোতাপ্রিয় গীতিকারদের একজন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। অসংখ্য কালজয়ী গানের এই স্রষ্টা একাধারে একজন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক ও গীতিকার। ২০০২ সালে বাংলাদেশের একুশে পদক লাভ করা এই গুণীর বহু গানে কণ্ঠ দেয়া সদ্য প্রয়াত শাহনাজ রহমতউল্লাহ সম্পর্কে তিনি বলেছেন।

একজন বড় মাপের শিল্পী একেকজন দূতের ভূমিকা পালন করেন। আমরা যদি ভারতের দিকে তাকাই তাহলে দেখব, লতা মুঙ্গেশকরের নাম বললে সারা পৃথিবী চেনে। পাকিস্তানের নূরজাহানের নাম বললে সারা পৃথিবী চেনে। তেমনি বাংলাদেশে কয়েকজন শিল্পী রয়েছেন, তাদের নাম বললে সারা পৃথিবীর মানুষ চিনতে পারত। যারা বাংলাদেশের সৌন্দর্যকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন দেশজুড়ে, সেখানে দেশীয়ভাবে তারা কতটা মর্যাদাসম্পন্ন হচ্ছেন কি হচ্ছেন না সেটি অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। আমি নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করি, শিল্পী নিজের তৃপ্তির জন্য শিল্পের কাজ করেন। আমি যখন চলচ্চিত্রে এলাম বা চলচ্চিত্র শুরু করলাম, তখন আমার বাবা আমাকে বলেছিলেন, তুমি তো জানো না এ ধরনের অঙ্গনে যারা বিরাজ করে শেষ পর্যন্ত তারা পয়সার অভাবে চিকিৎসাও করতে পারে না। এই সংস্কৃতি পরিবর্তনের জায়গায় আমরা এসে গেছি। আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধ করেছি, সার্বিকভাবে একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা যে দাবি করতে পারছি এর পেছনে সংগীত অঙ্গনের মানুষগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্ট। আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে যে গান দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করতাম ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’- তা আমারই লেখা। সেখানে নতুন সূর্যোদয়ের কথা বলা হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে একজন জব্বারকে, একজন শাহনাজকে নীরবে-নিভৃতে চলে যেতে হবে এটা তো ভাবতে খুব খারাপ লাগে। আমার বাবার সেই কথাটিই মনে পড়ে যায়। যা-ই হোক- দেশ আমাদের, মাটি আমাদের, মানুষ আমাদের। আমরা আমাদের কর্মটাকে ছড়িয়ে দিতে চাই সবার মাঝে। এ দেশটাকে আরো বেশি সমৃদ্ধ করতে চাই। আরো বেশি করে পরিচিত করতে চাই বিশ্বজনের কাছে।’

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।