ভালোবাসার শক্তির কাছে মরুভূমির উত্তপ্ত বালিও বরফে পরিণত হয়ে যায় : বৃন্দাবন দাস

সফলতা একটি চাবিকাঠির নাম। জীবনের চূড়ায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে সেই চাবি নিজের মুষ্টিবদ্ধ করাই যেন থাকে সফল মানুষদের একমাত্র ব্রত। জীবন বাস্তবতায় গভীর সমুদ্রের তলদেশ থেকে অনিশ্চিত সফলতার চাবিকাঠিকে জয় করে নেয়া একজন সফল মানুষের নাম ‘বৃন্দাবন দাস’। যিনি বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় এবং দর্শকনন্দিত নাট্যকার। আনন্দধারার আয়োজনে তার জীবনের গল্প পাঠকদের নিকট তুলে ধরেছেন...

 

পুবের আকাশের সোনালি সূর্যের আলোয় নিজের জীবনের লালিত স্বপ্নকে সফলভাবে রাঙিয়ে তোলার দৃঢ় প্রচেষ্টায় জগন্নাথ কলেজে (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) স্মাতক প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৮৬ সালে নিজ এলাকা পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে পথচলা শুরু করেন বৃন্দাবন দাস। সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পথনাটক, দিবসভিত্তিক নানা নাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে ধারাবাহিকভাবে চলত তার সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞ। পাশাপাশি নিজ জেলাতে কাজ করেছেন নাট্যজন মামুনুর রশিদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বাংলাদেশ মুক্ত নাট্যদলের হয়ে।

তারই সুবাদে ১৯৯৩ সালে যোগদান করেন আরণ্যক নাট্যদলে। এরপর থেকে শুরু হয় বুকের ভেতর লালন করা স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে তার ছুটে চলা। একের পর এক কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে পিছু হটেননি তিনি। জীবনের চলার পথকে আরও সুগম করতে স্বপ্নপিয়াসু এই মানুষটি সহযোদ্ধা হিসেবে নিজের জীবনসংগ্রামের সঙ্গী হিসেবে যুক্ত করেন শাহনাজ খুশি নামের একজন আত্মপ্রত্যয়ী সৈনিককে। একমাত্র ভালোবাসাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি, যার অনুকূলে হাতড়াতে থাকে সব বাধা। জীবন প্রতিবন্ধকতার সব বাধা-বিপত্তি পায়ে মাড়িয়ে ১৯ জানুয়ারি ১৯৯৪ সালে তিনি বিয়ে করেন সেই সৈনিককে, যিনি জীবনযুদ্ধের শুরু থেকে আজো শক্ত হাতে ধরে আছেন এই মানুষটির হাত। ভালোবাসার তারুণ্যদীপ্ত শক্তি দিয়ে সব বাধাকে পরাভূত করা এই মানুষটির  অনিশ্চিত জীবনযাত্রার সঙ্গে শাহনাজ খুশিকে সঙ্গী করে পথচলার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভালোবাসার শক্তির কাছে মরুভূমির উত্তপ্ত বালিও বরফে পরিণত হয়ে যায়। ভবিষ্যতে কী হবে তা জানা ছিল না ঠিকই, তবে ওই দু’হাতে হাত না রেখে ভবিষ্যৎ নীড় গড়ার স্বপ্ন কল্পনাতেও আসেনি কখনো। বিয়ের আগে আমাদের প্রায় নয় বছরের প্রেম ছিল। আমার মাস্টার্স পরীক্ষার শেষ দিনে খুশিকে গোপনে বিয়ে করি। পরের দিন আমার ভাইভা পরীক্ষা ছিল। সেই সময় আমার পকেটে ছিল মাত্র ১৮ টাকা!’

দাম্পত্য জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের পাশাপাশি স্বপ্ন বুননের জাল আরো বিস্তৃত করার প্রত্যয়ে ১৯৯৬ সালে প্রাচ্যনাটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে দল গঠন করেন বৃন্দাবন দাস। প্রাচ্যনাট নাট্যদলের হয়ে ‘কাঁদতে মানা’ অনুনাটক লেখার মধ্য দিয়ে নাটক রচনা শুরু করেন তিনি। এই নাটকের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে নাট্যদল প্রাচ্যনাট।

নাট্যকার হওয়ার বাইরে জীবনে অন্য কোথাও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার কথা ভাবেননি বৃন্দাবন দাস। তাই স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেও আজো সনদপত্র তোলেননি তিনি। তবুও বাস্তবতার নিরিখে জীবনযুদ্ধে দিনাতিপাত করার জন্য নামমাত্র একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। আর এই জীবনযুদ্ধের ময়দানে নেমে শত সংগ্রামের মাঝেও থেমে থাকেনি হার না মানা এই মানুষটির নাটক লেখার কাজ। সে সময় চাকরির পাশাপাশি সাইদুল আনাম টুটুল পরিচালিত ‘বন্ধুবরেষু’ নামে প্রথম টেলিভিশন নাটক রচনার মধ্য দিয়ে নিজের প্রতিভার জানান দেন এই নাট্যকার। এরপর জীবনে ঘটে যাওয়া শত বাধা-বিপত্তির সঙ্গে সন্ধি করে কেটেছে তার অনেকটা সময়। তারপর ভোরের সোনালি আলোর মতো রঙিন হয়ে সূর্য উদয় হয় তার আকাশে। ২০০৪ সালে মামুনুর রশিদের নির্দেশনায় প্রথম ধারাবাহিক নাটক রচনা শুরু করেন তিনি। এরপর কাজ করেন জনপ্রিয় নির্মাতা সালাউদ্দিন লাভলুর সঙ্গে।

সাধারণ মানুষের গল্প বলা এই নাট্যকার নাটক রচনার পাশাপাশি নিজ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে জয় করেছেন দর্শক হৃদয়। যদিও অভিনেতা হিসেবে কখনই নিজেকে চিন্তা করেন না তিনি। তবে একসময় মঞ্চে অভিনয় করলেও নিজেকে একজন মঞ্চকর্মী বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বৃন্দাবন দাস। নিজের কাজের মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে গুণী এই নাট্যকার বলেন, ‘আমার মাঝে একটা ভয় সব সময় কাজ করে যে, মনে হচ্ছে আমার কোনো কাজই হচ্ছে না। যখন পরিচালক থেকে শুরু করে সবাই আমার লেখা নাটকের প্রশংসা করে, কিন্তু তারপরও আমি আমার কাজের তৃপ্ততা পাই না। এখনো আমার কাজ দেখে মনে হয় না আমি পূর্ণতা পেয়েছি। তবে সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় যেটা, তা হচ্ছে দর্শকদের অকৃত্রিম ভালোবাসা। এখনো ভালো কাজ করার ক্ষুধা আমায় নিত্যদিন তাড়া করে বেড়ায়। দর্শকের ভালোবাসা নিয়ে এত কাজ করলেও এখনো ভালো কাজের প্রত্যাশায় নিজের প্রতি পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারি না।’

জীবনে চলার পথে সব ক্ষেত্রেই নানা প্রতিবন্ধকতায় আবদ্ধ থাকলেও সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে নিয়ে পথ চলেছেন বৃন্দাবন দাস। জীবনে চলার পথে প্রতিবন্ধকতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি এখনো এমন কিছুই হয়ে উঠতে পারিনি। তবে জীবনে চলার পথে যেসব বাধা-বিপত্তির শিকার হতে হয়েছে, সেসব প্রতিকূলতাকে আমি অনুকূলে নিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে চলেছি এবং এখনো তাই করছি। আজ পর্যন্ত কোনো প্রতিবন্ধকতাই আমায় গ্রাস করতে পারেনি।’ পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যৎ কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ এক সুতোয় গাঁথা। প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে বাস্তবতা মেনে নিয়েই একটা সময় জায়গাটা ছেড়ে দিতে হবে। এ নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। তবে ভবিষ্যতে সিনেমার জন্য পাণ্ডুলিপি লিখতে চাই আর পাশাপাশি আমার ছোটবেলায় দেখা মুক্তিযুদ্ধের ওপর উপন্যাস কিংবা স্মৃতিকথা লেখার ইচ্ছা রয়েছে।’

জীবনসংগ্রামে লড়াই করে জয় ছিনিয়ে নেয়া সফল নাট্যকার বৃন্দাবন দাস এবং অভিনেত্রী শাহনাজ খুশির সুখের ঘর জ্যোতিময় করে রেখেছে দুটি আলোকিত আলো। যে আলো দুটির নাম দিব্য জ্যোতি ও সৌম্য জ্যোতি। দিব্য ও সৌম্যকে নিয়ে ভালোবাসাময় সুখের সংসার নাট্যকার বৃন্দাবন দাস ও অভিনেত্রী শাহনাজ খুশির। তাদের জীবনের যা কিছু প্রাপ্তি এবং চাহিদা, তার সবকিছুই এখন দিব্য ও সৌম্যকে ঘিরে। একজন বাবা হিসেবে নিজ সন্তানদের সফল অবস্থানে দেখতে চান তিনি। সন্তানদের কাছে নিজের কোনো চাওয়া না থাকলেও নিজেদের সততা আর কাজের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মানুষের ভালোবাসা নিয়ে তারা যেন জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে, বাবা হিসেবে সর্বক্ষণ এই প্রত্যাশাই করেন বৃন্দাবন দাস।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।