নিজের স্বপ্নটাকে ধরে রাখতে হবে : ফাহমিদা নবী

৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস। শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সঙ্গে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী দিনটি পালিত হয়। বহু আগেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘নারী’ কবিতায় লিখে গিয়েছিলেন- ‘সাম্যের গান গাই/আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই’। তাই মানুষ হিসেবে অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়েই একসময় শুরু হয়েছিল বিশ্ব নারী দিবস। বিশ্ব সমাজব্যবস্থায় সেই সাম্য অনেকটাই প্রতিষ্ঠা হয়েছে। নারী দিবসকে সামনে রেখে আমাদের বিশেষ আয়োজনে আনন্দধারার মুখোমুখি হন সংগীত ব্যক্তিত্ব ফাহমিদা নবী।

আমার কাছে নারীর প্রতি সহিংসতা নারীর পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা বলে মনে হয়। বিশেষ করে সে সহিংসতা নারীর প্রতি করা হয় শুধু সে নারী হয়ে জন্মেছে বলে। নারীর প্রতি এই সহিংসতা বিভিন্ন ধরনের। নারী গৃহে এবং জনপরিসরে সর্বত্রই সহিংসতার শিকার। কাঠামোগত যে সহিংসতা নারীর প্রতি রয়েছে, তার শুরু হয় গৃহেই। জনপরিসরে গিয়ে নারী সহিংসতার শিকার হবে বলে তাকে গৃহ আবদ্ধ করে রাখাও তো সহিংসতাই। নারীরা ততদিনই গৃহে নির্যাতন সহ্য করবেন, যতদিন গৃহের বাইরের জগৎটি তার জন্য নিরাপদ হয়ে উঠবে না। নির্যাতিত নারীকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য, নির্যাতক পুরুষকে কাউন্সেলিং করার জন্য কিংবা নির্যাতন থেকে বিরত রাখার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে কি? বিচ্ছেদের পর সন্তানদের ভরণ-পোষণের ব্যয় নির্বাহ করার যে দায়িত্ব অনেক দেশেই পুরুষকে নিতে হয়, বাংলাদেশে সেটিও তো নিশ্চিত করা হয়নি। নারীর প্রতি নির্যাতন বন্ধে অনেক আইন করা হয়েছে সত্য, কিন্তু এও সত্য, অনেক ক্ষেত্রে আমরা আইনের প্রয়োগ দেখি না, বিচারের ক্ষেত্রে বিচারহীনতা ও দীর্ঘসূত্রতা দেখি। নির্যাতন ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা, কিংবা মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টাও অব্যাহত আছে। নারীর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে নতুন ধরনের মাত্রা যুক্ত হয়েছে। যেখানে সহিংসতাকে ‘না’ বলার কথা, সেখানে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা সহিংসতাকে বাড়িয়ে দেয়। সহিংসতা নিরসনে যে প্রচেষ্টা দরকার তা সর্বাঙ্গীণ এবং বহুমুখী। নারীর ক্ষমতায়নে যতটুকু অর্জন হয়েছে তা ম্লান করে দেয় নারীর প্রতি সহিংসতার ক্রমবর্ধমানতা। এ থেকে বের হতে হলে সবাইকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে পুরুষদেরও অবদান রাখতে হবে। আমরা পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির যে কথা বলি আসলে কথাটি হবে ‘পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি’। নারীকে কম দেয়া যায়, নির্যাতন করা যায়, এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যেমন পুরুষ-নারী উভয়েরই থাকতে পারে, তেমনি বিভিন্ন নিয়ম-কানুন, আইন, শাস্ত্রে লিপিবদ্ধ থাকতে পারে। রাষ্ট্রপ্রধানের পদে একজন নারী থাকলেও সেই রাষ্ট্র হতে পারে পুরুষতান্ত্রিক। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা থাকা অবশ্যই প্রয়োজন, কেননা, তা নারীর নেতৃত্ব দেয়াকে স্বাভাবিকভাবে নিতে শেখায়। এই রোল মডেল অন্যদেরও উৎসাহিত করে। যা থেকে সমাজে পরিবর্তন আসতে থাকে। কিন্তু শুধু কয়েকটি পদে থাকাই তো যথেষ্ট নয়। পরিবর্তনটি তো পুরো কাঠামোতেই আনা দরকার। কাঠামো যদি বৈষম্যমূলক থাকে, অধিকাংশ নারী যদি তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকেন, নারীর প্রতি নির্যাতনকে যদি স্বাভাবিকভাবে নেয়া হয়, তবে সর্বাঙ্গীণ পরিবর্তন আসবে কোথা থেকে? পরিবার একটি সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অন্যতম। সুতরাং পরিবার প্রতিষ্ঠানটি সমাজ কাঠামোর বাইরে গিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে চিন্তা করবে, এ তো ভাবা যায় না। নারীকে অধস্তন ভাবা বা তাকে কম দেয়া যায়, কিংবা নির্যাতন করা যায়, এ সবকিছু শুধু পরিবার নয়, সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়েও প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন আমরা যদি পরিবার থেকে শিখে আসার কথা বলি, তাহলে আগেই ভাবতে হবে পরিবারকে শেখাচ্ছে কে? আইনি কাঠামো, শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম ইত্যাদি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়েই তো পরিবারও শিখছে। সুতরাং সর্বাঙ্গীণ পরিবর্তন না করে শুধু পরিবারকে সব দায়িত্ব দিয়ে দিলেই কি পরিবার তা পালন করতে পারবে?

আমি নিজের জীবনে অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছি। তবে তা আমি শক্তভাবে প্রতিরোধ করেছি। আমি আমার অবস্থানে অটুট ছিলাম বলেই আমার আত্মবিশ্বাস আমাকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে। মেয়েদের এই আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে হবে। সবার আগে নিজের লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। আর লক্ষ্য পৌঁছতে হলে শক্তভাবে নিজের স্বপ্নটাকে ধরে রাখতে হবে। তাহলে সফলতা আসবেই।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।