নারী তুমি নিজের মতো হও : মিথিলা

৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস। শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সঙ্গে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী দিনটি পালিত হয়। বহু আগেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘নারী’ কবিতায় লিখে গিয়েছিলেন ‘সাম্যের গান গাই/আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই’। তাই মানুষ হিসেবে অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়েই এক সময় শুরু হয়েছিল বিশ্ব নারী দিবস। বিশ্ব সমাজব্যবস্থায় সেই সাম্য অনেকটাই প্রতিষ্ঠা হয়েছে। নারী দিবসকে সামনে রেখে আমাদের বিশেষ আয়োজনে মুখোমুখি হন অভিনেত্রী ও উন্নয়নকর্মী মিথিলা। 

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে আমরা অনেক এগিয়েছি। আমাদের দেশের নারীরা এখন কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে কাজ করছে। আমাদের অর্থনীতিতে নারীরা এখন প্রচুর অবদান রাখছে, যা আমাদের দেশকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবে আমাদের দেশে এখনো নারীদের প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। এর প্রধান কারণ এখানে নারীদের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা একেবারেই নড়বড়ে। আমাদের জন্য সিদ্ধান্ত নিচ্ছে আমাদের বাবা-মা, বড় ভাই বা স্বামী। যার কারণে আমাদের আত্মবিশ্বাস থাকলেও খুব সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আমি নিজেও এসবের সম্মুখীন হয়েছি। সেগুলো নিয়ে আমাকে অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছে। আমাকে বারবার ভাবতে হয়েছে কোন সিদ্ধান্ত নেব, কখন নেব। মোট কথা আমাকে প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ নিতে হয়েছে, মানসিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হয়েছে। আমি এনজিওতে চাকরি করি। সেজন্য আমাকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে গবেষণার কাজ করতে হয়েছে। এখন আমি আন্তর্জাতিক এনজিওতে কাজ করছি। আমাকে কাজের জন্য বিশে^র প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেতে হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানে যেতে হয়, আফ্রিকার প্রত্যন্ত দেশগুলোতে যেতে হয়, কাজ করতে হয়। শুরুর দিকে আমি এগুলোকে ভয় পেতাম। সবসময় ভাবতাম এ কাজগুলো কী আমি পারব? এ সঙ্কোচটা আমাদের মধ্যে সবসময় থাকে। এটা নারীদের বেড়ে ওঠার একটি অংশ। যেমন আমাদের দেশের বাবা-মায়েরা মেয়েদের নিয়ে খুব ভয়ে থাকে। তারা ভাবে, মেয়েরা ঘর থেকে বের হতে পারবে না, তারা এটা করতে পারবে না, ওটা করতে পারবে না ইত্যাদি ভয় বাবা-মায়ের মধ্যে থাকে। যে কারণে আমরাও খুব সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। কারণে ছোট থেকেই আমাদের মধ্যে এক ধরনের ভয় ঢুকিয়ে দেয়া হয়। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু একটা সময়ে এসে আমি নিজেকে নিজে কাউন্সেলিং করতাম। ভাবতাম আমি পারব, আমাকে পারতে হবে। এভাবে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে আজকের অবস্থানে আসতে পেরেছি। এজন্য আমার নিজের কাজ নিজেকে করতে হয়েছে। আমাকে সংসার সামলাতে হয়েছে, আমাকে সন্তান পালন করতে হয়েছে। মেয়েদের এ কাজগুলো নিজেদের করতে হয়। কেউ ভাগ নিতে চায় না। তবে বর্তমান সময়ে এসে অনেক ছেলেকে দেখা যায় সংসারের কাজে সাহায্য করা বা ভাগ করে নিতে। কিন্তু তা সংখ্যার হিসেবে খুবই কম। কর্মক্ষেত্রে গিয়ে নারী-পুরুষকে একই কাজ করতে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে মেয়েদের ওপর মানসিক চাপটা বেশি থাকছে। কারণ একই সঙ্গে তাকে অফিস ও সংসার সামলাতে হয়। 

নারী দিবসে আমি নারীদের বলব, আমরা অনেক সহানুভ‚তিশীল হই। খুব সহজে অন্যের সুখ ও দুঃখের ভাগ নিতে পারি। ছোটবেলা থেকেই নারীদের এটাই শেখানো হয় তোমাকে সহানুভ‚তিশীল হতে হবে। বিয়ে করে আরেকটা পরিবারে গিয়ে মানিয়ে নিতে হবে। যে কারণে আমরা সবসময় নিজের থেকে অন্যের কথা বেশি চিন্তা করি। মেয়েরা সবসময় বাবা-মায়ের কথা চিন্তা করে, স্বামীর পছন্দের কথা চিন্তা করে। এছাড়া সন্তানের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকে। কিন্তু নিজের কথা ভাবে না। নারীদের কাছে আমার দাবি, তোমরা নিজের কথা ভাব। আপনজনদের কথা ভাবতে হবে। তবে সবার আগে নিজেকে ভালোবাসতে হবে। নিজের যত্ন নিতে হবে। নিজেকে ভালো না বাসলে অন্যকে ভালোবাসা যায় না। 

আমি কখনোই চাইব না কেউ আমার মতো হোক। আমি চাই সবাই সবার মতো হোক। আমি বলব, কারো মতো হতে হবে না। তুমি নিজের মতো হও। নিজেকে ভালোবাস। নিজে কী করতে ভালোবাস সেটা করো। সবার মধ্যে সম্ভাবনা আছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। তাহলে আর অন্যের মতো হতে হবে না। 

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।