পুরুষের চোখে নারী

মেয়েদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তারা যেমন হয়েছে স্বয়ংসম্পূর্ণ, নারীর ক্ষমতায়নে নারীকে যেমন তার পরিবারে পেয়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার, তেমনি পুরুষ তাদের দেখছে ভিন্ন চোখে...

সময় এগিয়েছে, এগিয়েছে সমাজ চিন্তা। পুরুষ আজীবনই আশ্রয় খুঁজেছে নারীর আঁচলে। কখনো আবদার বা হতাশা কাটাতে মায়ের বুকে, কখনো প্রাত্যহিক জীবনে কী ঘটছে তা নিয়ে নানা খুনসুটি করেছে বোনের সঙ্গে আবার কখনো দুষ্টুমিতে মেতেছে নানী-দাদীর সঙ্গে। সেই মমতাময়ী নারীদের সান্নিধ্যে বেড়ে উঠে একটা পুরুষের নারীর প্রতি কী চিন্তা-চেতনা গড়ে ওঠে লেখাটি সে সম্পর্কেই।

সারাদিনের অফিস শেষে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে বাসার সোফায় গা এলিয়ে বউয়ের আপ্যায়নের অপেক্ষা করার দিন পার হয়ে গেছে। চিন্তা পরিবর্তন হয়েছে পুরুষেরও। একসময় বিয়ের সময় যখন পাত্রী দেখা হতো; দেখা হতো তার চুল কত লম্বা, কীভাবে হাটে, ঘরের কাজ গুছিয়ে নিতে পারে কিনা, সন্তান পালনের দায়িত্ব সামলাতে পারে কিনা এ রকম নানা খুঁটিনাটি। মেয়ের বাড়িতে মেয়েকে পার করে দেয়ার জন্য যেন বিপণি বিতান খুলে বসেছে নানা রূপ আর গুণের খবর প্রচার করে। এখন আর সেই বিপণি বিতান নেই বলা যাবে না। তবে সেই বিপণি বিতানগুলোতে বিক্রি কমে গেছে।

মেয়েদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তারা যেমন হয়েছে স্বয়ংসম্পূর্ণ, নারীর ক্ষমতায়নে নারীকে যেমন তার পরিবারে পেয়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার, তেমনি পুরুষ তাদের দেখছে ভিন্ন চোখে।

শিক্ষার বিচারে এখন যখন দুই লিঙ্গই সমানভাবে অগ্রসর হচ্ছে, তখনই সমানায়ন প্রশ্ন আরো তীব্র হচ্ছে। এখন নারীর প্রতি পুরুষের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ওপর কিছু দিক আলোচনা করছি :

বর্তমান সময়ে নারী অনেক মুক্ত, স্বাধীন। অনেক পুরুষই এখন নারীর মুক্তি চায়। নারী, যাকে কখনো মা-রূপে, কখনো বধূ-রূপে, কখনো আবার কন্যা-রূপে দেখা যায়। নারী মাতৃমূর্তি, প্রেমিকামূর্তি, কন্যামূর্তি। নারী একজন মানুষ। যার পুরুষের মতোই হাত-পা আছে, চোখ আছে, কথা বলতে পারে। তবে নারী গর্ভধারণ করতে পারে। তার পুরুষের চেয়ে শক্তি বরং বেশি। পুরুষদের থেকে নারীরা বাঁচেও বেশি। নারী-পুরুষ দু’জনই সমান শক্তিশালী। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি, প্রজাতির দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারীরা এখনো একধাপ পিছিয়ে রয়েছে। আর সমাজ ও গণমাধ্যম নারীকে পণ্য বানিয়ে বিক্রি করছে। এক্ষেত্রে সুশীল সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো খুবই প্রয়োজন।

প্রতিটি বিষয়ে নারীদের সমঅধিকার জরুরি। বর্তমানে নারীদের অনেক বিষয়েই পরিবর্তন এসেছে। এমনকি সবক্ষেত্রে নারীদের কোটা সিস্টেমও উঠিয়ে দেয়া উচিত। এতে নারীরা নিজেদের দক্ষতায় আরো বেশি উন্নতি করতে পারবে। নারীরা নিজেদের যোগ্যতায় সফল হচ্ছে। তাই তাদের কোটার মধ্যে বন্দি রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।

নারী-পুরুষ আলাদা করে দেখার কিছু নেই। পুরুষদের যে অধিকার আছে, নারীদেরও সেই অধিকার আছে। আমাদের সমাজের হীনম্মন্যতার কারণে নারীরা অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অবদান অনেক বেশি। আর প্রত্যেক নারীর মধ্যেই মাতৃত্ব রয়েছে। তাই যদি নিজের মাকে সম্মান করা যায়, তাহলে সব নারীকেই সম্মান করা সম্ভব। মা হওয়ার কষ্টের অনুভূতি একজন পুরুষ কখনোই অনুভব করতে পারবে না। যখন থেকে এই বিষয় অনুভব করতে পারবে, তখন নারীর প্রতি অন্যায়-অত্যাচার অনেকটা কমে যাবে। আগেকার দিনে পুরুষরা নারীকে বিয়ে করে আনত শুধু ঘরের কাজ করার জন্য, সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য। এখন এই ধারণা অনেকটা বদলে গেছে। যোগ্যতার দিক থেকে প্রত্যেকেই সমান। তাহলে কেন একজন ঘরে বসে থাকবে আর অন্যজন বাইরে কাজ করবে? দুজন সমানভাবে কাজ করলে অর্থনৈতিকভাবে পরিবার সচ্ছল হয়, সমাজ সচ্ছল হয়, রাষ্ট্র সচ্ছল হয়। তবে কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য একটু সহনশীল হওয়া জরুরি। তাদের মমতার দৃষ্টিতে দেখা উচিত। নারীরা অনেক কঠিন কাজ করছে। তাই তাদের অগ্রগতির জন্য আমাদের অনেক সহজ হতে হবে।

এতক্ষণ ধরে পুরুষের পরিবর্তিত ভালো দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছি। এবার সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করব, যা পুরুষতন্ত্রের সেই ভিত্তিকে নাড়া দেবে, যা দিয়ে তারা এতকাল নারীর ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে।

আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে নারীর অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখনো যৌতুকের নামে অত্যাচার হয়, প্রেমের নামে অত্যাচার হয়, যা নারীর স্বাধীনতা ও মুক্তির অন্তরায়। অনেক নারীও নারীদের মুক্তি চায় না। এখনো বিভিন্ন পরিবারে দেখা যায়, এক নারী অন্য নারীর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এখনো অনেক মা ছেলেকে বেশি দেয় আর মেয়েকে কম। মা নিজেই এ বৈষম্য তৈরি করছে। এই ধারণা পুরোপুরি না বদলাতে পারলে নারীদের মুক্তি নেই।

সাইবার বুলিংয়ের সঙ্গে আমরা পরিচিত। এর কিছু ব্যাখ্যা দেখানোর চেষ্টা করছি। আমরা সারাক্ষণ নাটক-সিনেমার নায়িকা কিংবা মডেলদের বাস্তবে, স্বপ্নে কিংবা টিভি-সিনেমার পর্দায়ই দেখতে ভালোবাসি! কিন্তু তাদের নিয়ে যখন আলোচনা শুরু হয়, তখন তাদের নিয়ে কী ধরনের আলোচনা হতে পারে, তার বহিঃপ্রকাশ আমরা বিভিন্ন নায়িকা কিংবা মডেলের ফেসবুক থেকেই অনুধাবন করতে পারি। বাংলাদেশের সম্ভবত এমন কোনো নায়িকা কিংবা মডেল নেই, যিনি ফেসবুকে বাজে এবং অশ্লীল মন্তব্য পাননি? কিন্তু কেন? যখন তাদের রূপালি পর্দায় বা টিভিতে দেখছে, তখন থেকেই তাদের প্রতি ওই বিকৃত মন-মানসিকতার পুরুষগুলোর বিকৃত জৈবিক তাড়না তৈরি হয়। যেহেতু সেই তাড়না মেটাতে পারে না, তখনই তার ভেতরে একধরনের খেদ, না পাওয়ার হতাশা পেয়ে বসে। এই হতাশা, খেদ, না পাওয়ার যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে এসব অশ্লীল মন্তব্য। ফ্রয়েডীয় মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আমাদের সহজেই এটা বুঝতে সাহায্য করে।

ফ্রয়েড বলছেন, সব ইচ্ছারই একটা করে বিপরীত ইচ্ছে আছে। যেমন- ভালোবাসা-ঘৃণা অর্থাৎ কাউকে যদি ব্যক্তির ভালো লাগে, কিন্তু তাকে যখন না পায়, তখন সে ব্যক্তি তার ভালোলাগার মানুষটির প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতে থাকে মনের ভেতরে। মনের অজান্তে কিছু মানুষ বাসনার তৃপ্তির জন্য বাস্তবতা বা সমাজকে অবজ্ঞা করে। সেক্ষেত্রে কেউ অ্যাসিড ছোড়ে, কেউ কেউ এই ডিজিটাল বাংলাদেশে তাদের চেতন কিংবা অবচেতনে সেই নারীর প্রতি যৌনতা এবং যৌন আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ ঘটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক ধরনের অশ্লীল মন্তব্য করার মধ্য দিয়ে!

প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা তথাকথিত ভদ্র শ্রেণির যারা এই মন্তব্যগুলো দেখে থাকি, কতজন এর প্রতিবাদে কিংবা সেই বিকৃত রুচির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পাল্টা মন্তব্য দেই? কেন দেই না- এর উত্তরও সম্ভবত ফ্রয়েডীয় ধারণা হতে পেতে পারি, যেখানে তিনি বলছেন, পালিয়ে বাঁচার কথা। নিজের মনের ইচ্ছা বা কথাকে সাপ্রেস করে রাখা, কোনো একটা কাজ করা বা বলার প্রয়োজন মনে না করা। ফলে এখানে চারটি দল আমরা দেখতে পাই। একপক্ষ, যারা সরাসরি নোংরা মন্তব্য লিখছে, আরেক পক্ষ আছে, যারা এসব মন্তব্য নিজে না করলেও পড়ে আত্মতুষ্টি লাভ করে, আরেক পক্ষ যারা মন্তব্য পড়ছে কিন্তু প্রতিবাদ করছে না, আর শেষ পক্ষ যারা একেবারেই সংখ্যায় নগণ্য, যারা প্রতিবাদ করছে।

রাস্তাঘাটের চলাফেরায় আমাদের নারীর প্রতি কেবল বৈষম্যমূলক আচরণের ধরন প্রসঙ্গে। একজন নারীর সেই কিশোরীকাল থেকে নিত্যদিনের পথচলায় কী পরিমাণ তির্যক মন্তব্য শুনতে হয়, তা কেবল একজন নারীই জানেন। পুরুষরা জানেন না, তা নয়! নিপীড়কশক্তি ঠিকই জানে তার নিপীড়নের মাত্রা কতটা ভয়াবহ। তাই সহজেই নিজের স্ত্রী কিংবা মেয়েকে হিজাবি বানিয়ে দেয়ার পক্ষপাতী। ধারণাটা খুব ভুল! হিজাব যারা পরেন, এমন অনেক নারীর অভিজ্ঞতার কথা শুনে আমি চমকে উঠেছি রীতিমতো! বিকৃত মানসিকতার কাপুরুষরা ঠিক ঠিক তাদের তির্যক মন্তব্য, বিশেষ অঙ্গভঙ্গি, প্রতীকী শব্দ উচ্চারণ, এমনকি শরীরে স্পর্শ করতেও দ্বিধাবোধ করে না। তাই এখনই সময় প্রত্যেকের সচেতনতার। যারা শুনছেন কোনো ‘পথচারী নারী’কে উদ্দেশ করে কেউ বাজে মন্তব্য করছে কিংবা অঙ্গভঙ্গি করছে, তার প্রতিবাদ না করে নিপাট ভদ্রলোকের মতো শুনে যাওয়াটা আসল মানুষ হিসেবে আপনার ‘পরাজয়’ ছাড়া কিছু নয়। এবার নারীর প্রতি সরাসরি সহিংসতা কিংবা নির্যাতন প্রসঙ্গে আসি। আমাদের সামাজিক দৃষ্টি কি আসলে নারী নিয়ে, তা আমরা গণমাধ্যমের কল্যাণে বুঝতে পারি। এই সমস্যা কেবল আমাদের দেশের সমস্যা তা কিন্তু নয়, পাশ্চাত্যেও এটা প্রবলভাবেই আছে।

রাশিয়ার হয়ে অলিম্পিকে সোনা জয় করা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্গারিটা মামুনকে নিয়ে অহংকারী উচ্চারণ শুনি, সেই স্বর কেন শুনি না, যখন দেখি কোনো নারী অ্যাথলেটকে কর্মকর্তাদের ‘কথামতো না চললে’ বা ‘বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব না মেনে নিলে’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খেলতে পারবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়? কোথায় থাকে তখন আমাদের বাঙালিয়ানার গর্ব আর অহংকার! গত বছরের সেপ্টেম্বরেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অভ্যন্তরে এক নারী ভারোত্তোলকের ধর্ষণের কাহিনী তো এখনো তাজা।

নিজের জন্মভূমিতে একজন মার্গারিটা তৈরির জন্য আমরা প্রস্তুত কিনা, সেটা ভেবে দেখতে হবে সবাইকে। সীমান্ত-শিলার স্বর্ণজয়ের পর কিছুদিন তাদের নিয়ে হৈচৈ, তারপর হারিয়ে যায় এই সোনাজয়ী মেয়েরা। সমাজের বিত্তবান কিছু মানুষ কি এগিয়ে আসতে পারত না তাদের আরো ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করার জন্য? পারিবারিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপের কারণে তারা হারিয়ে যায় একসময় ‘বিয়ে’ নামের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। বিয়ের পর স্বামী কিংবা স্বামীর পরিবার আর অ্যাথলেট বউ চায় না, চায় একজন নম্র-ভদ্র ঘরণী, যার সাত চড়েও রা নেই! আমরা প্রতিভাবানদের যত্ন নিতে জানি না, কেবল কিছুদিন তাদের নিজস্ব চেষ্টায় প্রাপ্ত অর্জন নিয়ে লোক দেখানো আনন্দ-উল্লাস-সভা-সেমিনার করতে জানি। কিন্তু জানি না কীভাবে প্রতিভার যত্ন করতে হয়, রক্ষা করতে হয়! এভাবে অন্যায়-অবিচার-সহিংসতা-নির্যাতন-বৈষম্যের কথা পদদলিত করে, আমরা যারা কেবল ‘অন্যে’র প্রাপ্তিকে ‘নিজের’ বলে আর্তনাদ করে শান্তি খুঁজে বেড়াই, নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে নামকাওয়াস্তে ‘নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ দিবস’ কিংবা ‘জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ পালন করি, পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শকেই আদর্শ মনে করি, সেই ভূমিতে আর যা-ই হোক, মার্গারিটা তৈরি হবে না।

[লেখাটিতে ইচ্ছাকৃতভাবে বোঝার সুবিধার্থে কিছু লিঙ্গ সংবেদনশীল শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।]

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।