নারীর প্রাত্যহিক রূপচর্চা

নারী যেমন ঘরে সর্বেসর্বা তেমনি বাইরেও। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একজন নারীকে কত কী সামলাতে হয় তার কোনো হিসাব নেই। যে হাতে ঘরের কাজ সেই হাতেই অফিস সামলানো। আর এতকিছুর পর একজন নারীর প্রাত্যহিক জীবনে নিজের প্রতি যত্নশীল হতে হয়। আজ এমনই প্রাত্যহিক যত্ন নিয়ে কথা বলব।

মুখ

ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস কুসুম গরম পানির সঙ্গে লেবু আর মধু মিশিয়ে খেয়ে নিন। এটা যেমন মেদ দূর করবে, তেমনি ত্বকে আনবে সজীবতা। সকালে ত্বকের ধরন বুঝে ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধোবেন, এরপর ত্বকের জন্য মানানসই কোনো ময়েশ্চারাইজার দিন। বাহিরে থেকে বাসায় ফিরে ভালোমতো মুখ পরিষ্কার করুন। মেকআপ থাকলে তা তুলে ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে নিন। গোসলে যাওয়ার আগে কোনো প্যাক লাগিয়ে নিতে পারেন।

চোখ

রাতে না ঘুমালে, দীর্ঘ সময় কম্পিউটারে কাজ করলে সাধারণত চোখের চারপাশ ফুলে ওঠে, বা চোখের চারপাশ কালো হয়ে যায়। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে শসা এবং আলুর রসের মিশ্রণ তৈরি করে কুসুম গরম করে নরম তুলার সাহায্যে চোখের পাতায় লাগিয়ে ১৫-২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। কয়েক ফোঁটা নারিকেলের তেল চোখের চারপাশে ধীরে ধীরে ম্যাসাজ করতে পারেন। এতে চোখের চারপাশের কালো দাগ দূর হবে।

হাত ও পা

প্রতি রাতে পা ধুয়ে লোশন লাগিয়ে ঘুমাতে যান। এছাড়া সপ্তাহে দু-একবার রাতে পা সাবান দিয়ে পরিষ্কার করে ২ টেবিল চামচ কুসুম গরম অলিভ অয়েল ও ১ চা-চামচ লবণের মিশ্রণ দিয়ে পা ভালো করে ম্যাসাজ করুন। এতে মৃত কোষ ঝরে গোড়ালি নরম হবে এবং ম্যাসাজে রক্ত চলাচল ভালো হবে। এরপর পা ধুয়ে লোশন লাগিয়ে শুয়ে পড়ুন। সারাদিন পর পা দুটোকে যথোপযুক্ত আরাম দিন। হাতের যত্নও নিতে পারেন একইভাবে। মুখ, হাত, পা যেকোনো ম্যাসাজই করতে হবে হালকা হাতে, আলতোভাবে। তা না হলে হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে।

চুল

যতই ক্লান্ত হন না কেন ঘুমের আগে চুলের যত্ন কিন্তু খুবই জরুরি। রাতে ঘুমানোর সময়ই অনেক চুল পড়ে যায়, চুলের আগা ভেঙে যেতে পারে, চুল পাতলা হতে পারে। এসব সমস্যা থেকে রেহাই পেতে বেশকিছু জিনিস মেনে চলতেই হবে। যাদের বড় চুল, তারা বেণি করে নিন ঘুমানোর আগে। ছোট চুল হলে খোলা রেখে শুলেও অসুবিধা নেই। তেল ম্যাসাজ করে শুলে ঘুম ভালো হবে।

আমাদের যাপিত জীবনে ব্যস্ততার জন্য, সহজ উপায়ে রূপচর্চা করতে আমরা এখন কেমিক্যাল দ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। যা আমাদের ত্বক এবং শরীরের জন্য বিরূপ প্রভাব ফেলছে। কিন্তু প্রাকৃতিক উপাদান কখনো ক্ষতিকর নয়। তাই প্রাকৃতিক উপায়ে প্রতিদিন রূপচর্চা করার উপায় আজ জেনে নেয়া যাক।

 

•             প্রতিদিন অন্তত ৮ গ্লাস পানি খেতে হবে, এতে আমাদের শরীরের সব দূষিত পদার্থ বের হয়ে ত্বক পরিষ্কার রাখবে।

•             সকালে এক গ্লাস উষ্ণ গরম পানিতে এক টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে খেতে হবে। এতে ত্বক উজ্জ্বল থাকবে।

•             গোসলের আগে, চন্দন গুঁড়োয় গোলাপ জল এবং সামান্য দুধ দিয়ে পেস্ট তৈরি করে মুখ এবং পুরো শরীরে মেখে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন।

•             রোদেলা দিনে বাইরে বের হওয়ার সময় ছাতা এবং সানগ্লাস ব্যবহার করুন।

•             বাইরে থেকে ফিরে, শসা এবং টমেটোর রস সমান পরিমাণে নিয়ে মুখ, হাত ও গলায় মেখে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এতে রোদের প্রভাবে ত্বক কালো হয়ে যাওয়া দূর হবে।

•             বাইরে থেকে ফিরে, চোখে বেশ কয়েকবার পানির ঝপটা দেবেন, এতে চোখের ভেতরে যাওয়া ধুলোবালি চলে যাবে।

•             এই তো গেল দিনের রূপচর্চার কথা, এখন হবে প্রতি রাতের রূপচর্চার কথা :

রাতের রূপচর্চা কেন জরুরি

যারা সারাদিন বাইরে কাজ করেন, তাদের ত্বকে ধুলো-ধোঁয়া ইত্যাদি জমা হয়। সন্ধ্যা বা রাতে বাড়ি ফেরার পর সারাদিনের জমে থাকা ময়লা এবং ব্যবহৃত মেকআপ ভালো করে ত্বক থেকে উঠিয়ে দেয়া জরুরি। ময়লা তুলে না ফেললে ত্বকের ছিদ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, ত্বক স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারবে না। তার ফলে ব্রণ, ব্ল্যাক হেডস, হোয়াইট হেডস বা ত্বকের অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ত্বক

সুন্দর ত্বকের মূলমন্ত্রই হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। ত্বকের ময়লা ঠিকমতো পরিষ্কার করা না হলে ব্রণ হতে পারে। ত্বক হয়ে পড়ে খসখসে, রুক্ষ, অমসৃণ। তাই রাতে ঘুমানোর আগে মুখ পরিষ্কার করে ঘুমালে সারা রাতের লম্বা সময় ত্বক একেবারে তরতাজা।

ধাপ-১

মেকআপ থাকলে মেকআপ তুলে, ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে ত্বকের সঙ্গে খাপ খায় এমন ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন। কুসুম গরম পানি দিয়ে মুখ ধুলে সবচেয়ে বেশি ভালো হয়।

ধাপ-২

ময়েশ্চারাইজার হিসেবে শুষ্ক ত্বকের অধিকারীরা ভেজা মুখে র্যা ফে ২-৩ ফোঁটা যে কোনো বেবি অয়েল মেখে নিন। তৈলাক্ত ত্বকে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার না করাই উচিত।

রাতে লাগানোর ক্রিম ভিটামিন-ই যুক্ত হলে উপকার হয়। কারণ ভিটামিন ‘ই’ ত্বকের তারুণ্য বজায় রাখে। কোলাজেন ও ইলাসটিন সমৃদ্ধ ক্রিম ব্যবহার করুণ, যা ত্বকের কোষগুলোকে নতুনভাবে কার্যকর করে তোলে।

ব্রণের জন্য

যাদের ত্বক তৈলাক্ত ও ব্রণ আছে, তারা প্যাক ধুয়ে ফেলে ময়েশ্চারাইজারের বদলে ব্যবহার করুন অ্যাসট্রিনজেন্ট। ঘরোয়া অ্যাসট্রিনজেন্ট হলো গোলাপজল ও শসার রস। এগুলো ফ্রিজে রেখে ঠাণ্ডা করে নিলে আরো ভালো। শসার রস করে বরফ জমানোর পাত্রে রেখে আইস-কিউব করে নিতে পারেন। প্রতি রাতে রস বানানোর ঝামেলায় না গিয়ে একটি কিউব মুখে ঘষে নিন।

সমপরিমাণে পুদিনা পাতা ও নিমপাতা বেটে শুধু ব্রণ ও দাগের ওপর লাগিয়ে ঘুমান। সকালে উঠে ধুয়ে ফেলুন।

চোখ

চোখের ডার্ক সার্কেল কমাতে ঘুমানোর আগে কোরানো শসা বা আলু বা ঠাণ্ডা টি-ব্যাগ চোখের ওপর দিয়ে রাখুন ১০-১৫ মিনিট।

নখ

নখ ফেটে বা ভেঙে যাওয়ার সমস্যা কমাতে ঘুমানোর আগে হাত-পায়ের নখে জলপাই তেল (অলিভ অয়েল) ম্যাসাজ করে নিন। সারা রাত নখ আর্দ্রতা পাবে।

ঠোঁট

নরম গোলাপি ঠোঁট পেতে প্রতি রাতে পেট্রোলিয়াম জেলির সঙ্গে অল্প লবণ মিশিয়ে ঠোঁটে ম্যাসাজ করে ধুয়ে নিন। এতে ঠোঁটের মৃত কোষ ঝরে উজ্জ্বলতা আসবে।

কিছু পরামর্শ-

•             কখনই মেকআপ না মুছে ঘুমাতে যাওয়া উচিত নয়। মেকআপ যখনই করুন, মুখ পরিষ্কার করতে হবে, তা না হলে ত্বকের ক্ষতি হবে।

•             কী ধরনের ক্রিম ব্যবহার করবেন সেটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কতটা ক্রিম ব্যবহার করেন। তৈলাক্ত ত্বকের জন্য কম ক্রিম ব্যবহার করতে হয়। তবে যাদের ব্রণ আছে তাদের নাইট ক্রিম ব্যবহার না করাই ভালো। শুষ্ক ত্বকের জন্য বেশি পরিমাণে ক্রিম প্রয়োজন।

•             নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করাও অত্যন্ত জরুরি। সারাদিনে ত্বক থেকে ময়েশ্চার নষ্ট হয়ে যায়, রাতে তা না হলে ত্বকে বলিরেখা পড়বে।

•             নিয়মিত পানি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। পেট পরিষ্কার রাখার জন্যও পানি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ঘুমানোর আগে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিন।

নিয়মমাফিক পরিচর্যা, সুষম খাবার, সুন্দর জীবনযাপন আপনাকে ভালো ও সুস্থ রাখবে আর সুস্থতা প্রতিফলিত হবে আপনার বাহ্যিক সৌন্দর্যে। তাই আপনার বিরামহীন কর্মব্যস্ততার মধ্যেও ঘুমের আগে এটুকু ঘরোয়া পরিচর্যায় আপনি থাকবেন একদম সুস্থ, প্রাণবন্ত, সুন্দর।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।