মোশন সিকনেস বা যাত্রাপথে বমির কারণ ও প্রতিকার

বাস, ট্রেন, লঞ্চ ইত্যাদি যানবাহনে লম্বা সময় ধরে চড়ার সময় আমাদের অনেকেরই শরীর খারাপ হয়ে যায়, মাথা ঝিমঝিম করে, বমি হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভ্রমণের অর্ধেক মজা এই শরীর খারাপের কারণেই শেষ হয়ে যায়। এই সমস্যার কারণে অনেকে এসব যানবাহনে ভ্রমণ করতে চান না একেবারেই।

কিন্তু এই বমি হওয়ার প্রবণতা অস্বাভাবিক কিছু নয়। একে ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় মোশন সিকনেস। গতি জড়তার থেকে মস্তিস্কে সমন্বয়হীনতা অনুভব হয় সবারই, কারো কম কারো বা বেশি। সাধারাণত শিশুকালে কমবেশি সবাই মোশন সিকনেসে ভুগে থাকেন বা লম্বা জার্নিতে বমি বা শরীর খারাপ করে ফেলেন, কারণ এবয়সে শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ কম থাকে। তবে অনেকের ক্ষেত্রেই ব্যাপারটি এত অহরহ হয়ে থাকে যে তিনি ভ্রমণ করার উৎসাহই হারিয়ে ফেলেন। তাদের জন্য মোশন সিকনেসের কারণ এবং এর প্রতিকারগুলো জেনে নেওয়া জরুরী, তাহলে অনেকাংশে এই বিরক্তিকর ঘটনা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। অনেকে এ নিয়ে লজ্জাও বোধ করেন, তবে মোশন সিকনেস নিয়ে লজ্জা বোধ করার কিছুই নেই, এটা খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা।

কারণসমূহ: মোশন সিকনেস কোন রোগ নয়, যদিও এর নামে সিকনেস রয়েছে। কিছু প্রভাবক থাকে যার কারণে মোশন সিকনেস হতে পারে আমাদের।

১। যানবাহনের প্রচন্ড দুলুনি। আমাদের শহর ও গ্রামের ভাঙ্গা রাস্তায় বাস বা ট্রেন কিংবা প্রখর স্রোতে লঞ্চ, স্টিমার ইত্যাদির দুলুনিতে অনেক যাত্রীই মোশন সিকনেসে ভুগেন।

২। অস্বাস্থ্যকর এবং গুরুপাক হবে এমন খাবার যানবাহনে চড়ার আগে খেলেও বমি হতে পারে। খাবারে বাজে গন্ধ বা স্বাদ থাকলেও বমির ভাব হতে পারে। যাত্রাপথে বাস বা ট্রেন থামালে আমাদের অনেকেরই অভ্যাস থাকে রেস্তরাঁর বার্গার, পিৎজা, সিঙ্গারা, সমুচা ইত্যাদি খাওয়া, যা মোটেই ভাল নয়।

৩। কিছু অসুস্থতা থেকেও মোশন সিকনেস হতে পারে, যেমন গ্যাস্ট্রিক আলসার বা হজমের অন্যান্য সমস্যা।

৪। ক্লান্তি, যাত্রাপথে ঘুম ইত্যাদি কারণেও বমি হতে পারে।

প্রতিকার: মোশন সিকনেসের বেশ কিছু প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা রয়েছে।

১। যাত্রা শুরু করার আগে বা যাত্রাপথেও মশলাযুক্ত খাবার, ঝাল খাবার, কোল্ড ড্রিঙ্কস, চিপস, কেক ইত্যাদি খাওয়া একদমই উচিত নয়। যাত্রাপথে খালি পেটে থাকা সবচেয়ে ভাল, বিশেষ করে যদি ৪-৫ ঘন্টার বেশি না হয় জার্নি। তবে অনেক সময় ধরে হলে, মাঝপথে বা শুরুর আগে হালকা কিছু, যা দ্রুত হজম হবে এমন খাবার খাওয়া যেতে পারে। তাও পেট ভরে খাওয়া উচিত নয়। খাবারে খুব বেশি ঘ্রাণ বা ফ্লেভার থাকলে তাও খাওয়া ঠিক হবে না। পানি পান করুন বেশি করে। এছারা টক খাবার, বা লেবু, বরই, পেয়ারা ইত্যাদি ফল খাওয়া যেতে পারে।

২। সিটে উল্টো হয়ে বসবেন না কখনও। অনেকে বন্ধু বান্ধব বা পরিবারের সাথে জার্নিতে আড্ডা দেয়ার জন্য ঘুরে বসেন সিটে। কিন্তু গাড়ি যেদিকে মুখ করে আগাচ্ছে তার বিপরীত দিকে মুখ করে থাকা শুধু মোশন সিকনেসই দিবে না, তা বিপজ্জনকও অনেক। এছাড়া অনেক গাড়িতে বিপরীতমুখী সিট থাকে, আপনার যদি ঘন ঘন মোশন সিকনেস হয় তাহলে সেসব সিটে বসবেন না। এছাড়া পিছনের সিটে বসা থেকেও বিরত থাকতে হবে। যানবাহনের পিছনের অংশই বেশি ঝাঁকি খায়, তা থেকে মোশন সিকনেস হতে পারে, এছাড়া পিছনের দিকে ময়লা ও দুর্গন্ধও বেশি থাকে।  

৩। সিগারেট, পান-সুপারি ইত্যাদি ভ্রমণের আগে এড়িয়ে চলুন যতটা সম্ভব।

৪। সিটে কুঁজো হয়ে বা উবু হয়ে বসে মোবাইল চালানো বা বই পড়া থেকে বিরত থাকুন।

৫। ভ্রমণের সময় মন ভাল রাখার চেষ্টা করুন। গান শুনুন, পাশের জনের সাথে আড্ডা দিন অথবা ভ্রমণে আনন্দ করার কথা ভাবুন। মন প্রফুল্ল থাকলে শরীর খারাপ হয় না সহজে।

৬। অন্য যাত্রীকে বমি করতে দেখলে অনেকসময় নিজেরও বমি আসতে পারে। সেজন্য কেউ বমি করলে তাকিয়ে থাকবেন না, বা নিজেও খানিকটা পানি বা টক খেয়ে নিন।

৭। বমি নিরোধক ট্যাবলেট পাওয়া যায় বাজারে, যেমন অ্যাভোমিন বা জয়ট্রিপ। এগুলো যাত্রা শুরুর আগে খেয়ে নিলে মোশন সিকনেস হওয়ার সম্ভাবনা কম।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।