যে গানে মৃত্যু ডেকে আনে

সংগীত মানুষের মনে এবং অনুভুতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ইতিহাসে এমন একটি গান আছে যা তার শ্রোতাদের মধ্যে প্রায় ১০০ জনকে হত্যা করেছে। এমনকি গানের সুরকারের মৃত্যুতেও এই গানের অলৌকিক হাত রয়েছে।

‘সুইসাইড সং’ বা আত্মহত্যার গানটি এমনঃ

“বিষণ্ণ রবিবার আমি প্রতিবিম্বের সাথে সাথে ব্যয় করেছি। আমার হৃদয় এবং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি খুব শীঘ্রই সবকিছু শেষ করবো। আমি জানি চারদিকে মোমবাতি আর প্রার্থনায় শোকগাঁথা হবে।

তাদেরকে কাঁদতে দিও না। তাদেরকে জানাও যে আমি যেতে পেরে খুশি হয়েছি।

মৃত্যু কোন স্বপ্ন নয় । মৃত্যুর মাধ্যমে আমি তোমাদের সোহাগ করে যাচ্ছি।

জীবনের শেষ নিঃশ্বাস দিয়ে আমি তোমাদের আশির্বাদ করে যাব।"

১৯৩২ সালে একজন হাঙ্গেরীয় পিয়ানো বাদক এবং সুরকার রেজো সেরেস ‘গ্লুমি সানডে’ বা ‘বিষণ্ণ রবিবার’ গানটি রচনা করেছেন। তখন তিনি ৩৪ বছর বয়সী জীবনসংগ্রামী গীতিকার। এটা বলা হয় যে, তার প্রেমিকা যখন তাকে ছেড়ে চলে যায় তার পরেই সে ‘বিষণ্ণ রবিবার’’ গানটি লেখেন। কেউ কেউ বলে গানটি যুদ্ধের বর্ণনা এবং পৃথিবী চিরতরে ধ্বংসের দিনের কথা বলে। তিনি তার আত্মা এবং হৃদয় দিয়ে তার জীবনের সব দুঃখ এবং অসন্তোষের কথা এই গানে লিপিবদ্ধ করেছেন। এই গানের সুরই অনেক বেদনার এবং দুঃখের। তার সাথে যোগ হয়েছে লাসলো জেভরের লেখা যন্ত্রণার কবিতা।

এটা বলা হয়ে থাকে যে লাসলো এর আত্মহত্যাকারী প্রেমিকার অনুশোচনায় গানটি রচিত হয়েছে।

গানটি প্রথম ১৯৩৫ সালে পল কল্মার হাঙ্গেরিতে রেকর্ড করেছিল। গান অনুযায়ী, প্রেমিক আত্মহত্যা করে মৃত প্রেমিকার সাথে পুনরায় একত্রিত হতে চায়।

১৯৩৬ সালে হাল কেম্প ইংরেজিতে গানটি রেকর্ড করেন। যার ভাবানুবাদ করে স্যাম এম লুইস। সেখানে লুইস পরিষ্কার ভাবে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করে। এরপর এই গানটিকে ‘হাঙ্গেরিয়ান সুইসাইড সং’ হিসেবে ডাকা হয়। অনেকেই বলেন এই গান শুনে অনেক মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। ১৯৩০ সালের পত্র পত্রিকায় হাঙ্গেরী এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৯ জন আত্মহত্যাকারীর ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য বলে ধরে নেয়া যায়।

কারণ আত্মহত্যাকারীদের হাতে নাকি এই গানটির স্বরলিপি পাওয়া গেছে আবার কারো কারো লিখে যাওয়া সুইসাইড নোটেও এই গানের কয়েক লাইন উদ্ধৃত করা ছিল। কেউ কেউ বলে মানুষ এই গানটি বারবার শুনতে থাকে এবং এক পর্যায়ে আত্মহত্যা করেন। এমনকি এই ব্যান্ড দলের গান পরিবেশন শুনে দুইজন নিজেদের মাথায় গুলি করেন।

গানটি হাঙ্গেরীতে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ৪০ এর দশকে বিবিসি জন-মানুষকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে এই গানের লিরিক্স নিষিদ্ধ করেছিল। শুধু মাত্র যন্ত্র সঙ্গীত রেডিওতে বাজানোর অনুমতি দেয়া  হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঞ্চলেও এটা বাজানো নিষিদ্ধ ছিল আত্মহত্যায় মদদ দেয়ার অভিযোগে। বলা হয়ে থাকে ১০০ এর বেশি মানুষ এই গান শুনে আত্মহত্যা করেছেন।

অনেক আত্মহত্যার গল্প অন্তর্জালে শেয়ার করা আছে। এর মধ্যে একজন এসএস গার্ড (হিটলারের সময়ে জার্মান প্যারামিলিটারি) বেহালা বাদককে এই গানটি বাজাতে বলেন। তারপর আবার বাজাতে বলেন। তারপর আবারো। এরপর এক পর্যায়ে সে হাটতে হাটতে বেলকনির এক কোণায় যান এবং নিজেই নিজেকে গুলি করেন। আরেকজন নারী যিনি লন্ডনে এই গানটি বারবার শুনতে শুনতে অতিরিক্ত ড্রাগ নিয়ে মারা যান।

সেরেস নিজেও ১৯৬৮ সালের ১৩ই জানুয়ারীতে নিজের এপার্টমেন্ট বিল্ডিং থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে। ধারণা করা হয় ‘গ্লুমি সান্ডে’র সাফল্য থাকে বিমর্ষ করে দেয়।

সে আরেকটি অনিন্দ্য সুন্দর গান সৃষ্টি করার আশা হারিয়ে ফেলেছিলেন। তার শেষ দর্শন ছিলোঃ

“আমি এই ভয়ংকর সাফল্যের মাঝে অভিযুক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এই মারাত্মক খ্যাতি আমাকে কষ্ট দেয়। আমি আমার হৃদয়ের সকল অসন্তোষ এই গানে ব্যক্ত করেছি এবং অন্যেরা যাদের আমার মতই অনুভূতি রয়েছে তারা এই গানে নিজেদের কষ্ট খুঁজে পান।“

 

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।