মাথাটা উঁচু করে আকাশ দেখতে হবে : কুমার বিশ্বজিৎ

বাংলা গানকে যারা অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন কণ্ঠের মাধুর্যে। কথা, সুর ও গায়কীতে কখনো সমঝোতা করেননি। তেমনই একজন কণ্ঠশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ। ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’, ‘তুমি রোজ বিকেলে’, ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’, ‘চন্দনা গো’ গানের মতো অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন। এখনো গান করে যাচ্ছেন স্বমহিমায়। আনন্দধারার আয়োজনে এসে কথা বলেছেন সংগীতের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎসহ নিজের গাওয়া সবচেয়ে প্রিয় গানের কথা।

রাফি হোসেন : সংগীতে যখন যাত্রা শুরু করলেন, তখন একসঙ্গে অনেক প্রতিভাবান এসেছিলেন। তাদের অনেকেই এখনো লিড করে যাচ্ছেন। এরপর একসঙ্গে এতগুলো প্রতিভাবান মুখ আর পাইনি।

কুমার বিশ্বজিৎ : প্রতিটা দেশেই একেক সময় এমন সময় আসে। একসঙ্গে অনেক ট্যালেন্ট বের হয়। কলকাতায় যেমন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, সলিল চৌধুরী, শ্যামল মিত্রসহ একেকজনের সৃষ্টিশীলতা একেকরকম ছিল। অনেক আইকনিক শিল্পী ও সুরকার এসেছেন। আমার কাছে যেটা মনে হয়, আশির দশক, নব্বই দশক একটা প্রাইম সময় ছিল। অনেক গুণী মানুষ গানের সঙ্গে ছিলেন। সৃষ্টিশীল মানুষের জন্ম তো আর ক্ষণে ক্ষণে হয় না। আমি গুণী কিনা জানি না, আমাদের সময়টায় যারা এসেছিল তাদের আইডেন্টিটি, ভয়েজ কোয়ালিটি, তাদের সৃষ্টির মধ্যে গভীরতা ছিল। উপলব্ধির একটা ব্যাপার ছিল। এটা হয়তো এখন একটু কমে গেছে।

রাফি হোসেন : আপনাদের চট্টগ্রামের অনেক মুখ একসঙ্গে এসেছিলেন?

কুমার বিশ্বজিৎ : আমরা যখন আশির দশকে সংগীত জগতে আসি, তখন সংগীতকে ভালোবেসে এসেছিলাম। হৃদয় থেকে সৃষ্টি করার একটা মানসিকতা সবার মধ্যে বিদ্যমান ছিল। সেই কারণে তখনকার সৃষ্টির মধ্যে একটা মমতা ছিল। সৃষ্টিশীলতা অন্য কিছুর মতো না। এটা ব্যবসায়িক কোনো বিষয় না। ব্যবসায়িক বিষয় হয়ে গেলে সেটার পেছনে ছুটতে হয়। সৃষ্টিশীলতার বিষয় থাকলে ভালো কিছু করার প্রেরণা থাকে। বিশ্বায়নের যুগে সমসাময়িক করতে গিয়ে অনেক কিছু হচ্ছে গানের মধ্যে কিন্তু আমাদের শেকড়ের ঐতিহ্য ভ্যালুজ হারিয়ে ফেলছি। বাংলা গানের যে ধারাবাহিকতা, ইমোশন সেখান থেকে আমরা বোধহয় একটু সরে যাচ্ছি। মানুষ আগে পয়সা দিয়ে অডিও অ্যালবাম কিনে গান শুনতেন, এখন আপনি অনলাইনে গান ফ্রি দিচ্ছেন, ভিডিও দিচ্ছেন। পাবলিসিটি হচ্ছে, বুস্ট হচ্ছে টাকার বিনিময়ে। মানুষকে দেখানোর জন্য, তাতেও বাজার সংকুচিত। আমার মনে হচ্ছে বিষয়গুলো কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

রাফি হোসেন : আসলে আমাদের গানটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে?

কুমার বিশ্বজিৎ : মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা- সবকিছু ঠিক থাকলে তখন বিনোদনটা করে। একন অর্থনৈতিক আর সামাজিক অবস্থান এমন একটা জায়গায়, সেখানে বিনোদনটাই বিলাসিতা। অনেকের পক্ষে গান শোনার সময় হয় না। অনেককেই দুটো চাকরি করতে হচ্ছে। জীবনযাপনের জন্য খরচ অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে সেটা। আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিশ্বের সঙ্গে সমসাময়িক করতে হলে তাকে আপডেট করতে হচ্ছে। ভালো শিক্ষক, ভালো স্কুল অনেক কিছু রাখতে হচ্ছে। উপার্জনের চেয়ে খরচ অনেকগুণ বেড়েছে। তার পরও অনেকেই হয়তো গান শুনছে। আমার কাছে মনে হয় যাদের বয়স ৫২ বছর পার হয়ে গেছে, তারা খুব বেশি অনলাইন ইউজার না। একজন শ্রমিক শ্রেণির মানুষ সে আগে অ্যালবাম কিনে শুনত। তার সেই ক্ষমতা ছিল। আমার মনে হয় নির্দিষ্ট একটা শোনা হয়তো শুনছে। পাশ্চাত্যের সঙ্গে তুলনা করলে তো হবে না। আমার মা কিছুদিন আগে বলছিলেন, ‘তোর ক্যাসেট এখন বের হয় না’। আমি বললাম গান এখন অনলাইনে ইউটিউবে বের হয়। আমার মা বললেন, ইউটিউব কী? আমি বললাম গানের নাম লিখতে হবে, কোম্পানির নাম লিখতে হবে। তারপর গান শোনা যাবে। আমার মা বললেন, ‘এতকিছু পারব না আমাকে গানের ক্যাসেট এনে দে।’ আমার বোন এখন গান শোনে না। আগে ক্যাসেটে গান ছেড়ে দিয়ে সংসারের যাবতীয় কাজ করত। এখন ইউটিউব ছেড়ে বক্স দিয়ে গান শোনার ঝামেলা করতে চায় না।

রাফি হোসেন : আপনি সংগীত প্রতিযোগিতার  বিচারক ছিলেন। এখানে দেখছি অনেক ভালো কণ্ঠের শিল্পী আসছে। অনেক বড় প্লাটফর্ম পাচ্ছে কিন্তু দীর্ঘদিন টিকে থাকছে না।

কুমার বিশ্বজিৎ : আসলে কি, ওরাও কনফিউজড। তারা কি সমসাময়িক বাজারের দিকে যাবে? বিশাল জনগোষ্ঠী কী চাচ্ছে? এর মধ্যে আবার ভাগ আছে। কেউ ভালো কথা ও সুরের গান করছে। কেউ নিজের স্টুডিওতে গান করছে, ভয়েজ দিচ্ছে, মিক্সিং করছে। আর সবাই যে টেকনিক্যাল সাইডগুলো বুঝবে এমন না। একটা বিষয়, লক্ষ ঠিক রাখতে হবে। আমি রিয়েলিটি শোতে মানুষের গান গেয়ে ভোট পেয়েছি, বাহবা পেয়েছি। ঠিক আছে, কিন্তু নিজস্ব গান থাকতে হবে। নিজস্ব গান তৈরি করার ধৈর্য কম। কম সময়ে কী করা যায় এটা ভাবে। অনেকেই ভালো করছে। অনেকেই অন্যের গান করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার একটা কথা বলেছিলেন, তোমরা তো একলাফে হেলিকপ্টারে তুলে দিচ্ছো হিমালয়ের চূড়ায়।ওরা তো উড়তে জানে না। পায়ে হাঁটা আর হেলিকপ্টারের তফাৎ আছে। ওদের বুঝতে হবে কোন উচ্চতায় আছে। পথে নামলেই পথ চিনবে। যে কোনো সৃষ্টিশীল মাধ্যমে সময়কে সময় দিতে হবে। তাহলে সময় আপনাকে অবশ্যই একটা ভালো কিছু দেবে।

রাফি হোসেন : একজন শিল্পীর পছন্দের গান বলতে বললে সমস্যা। কেননা তার সব গান পছন্দ বলে করেছেন। এর মধ্য থেকে ভালোলাগা কিছু গানের কথা বলতে গেলে কোন গানগুলোর কথা বলবেন।

কুমার বিশ্বজিৎ : আমার সব গানই তো সন্তানের মতো। হয়তো কিছু গান সব মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। যেগুলো ভালোলাগার গান মানুষের খুব কাছাকাছি গেছে। ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’, ‘তুমি রোজ বিকেলে’, ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’, ‘চন্দনা গো’, ‘ডাক্তার’, ‘ছোট ছোট আশা’, ‘তুমি যদি বলো পদ্মা মেঘনা’, ‘একতারা বাজাইও না’, ‘জন্মিলে মরিতে হবে’ ও ‘দরদিয়া’।

রাফি হোসেন : কোন গানগুলো আসলে জনপ্রিয় হয়। যেমন আপনার গাওয়া ‘রোজ বিকেলে’, ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ গানগুলো জনপ্রিয়। অনেক গানই তো জনপ্রিয় হয় না।

কুমার বিশ্বজিৎ : গানের কথায় ও সুরে শাশ্বত একটা ব্যাপার থাকতে হয়। আসলে শ্রেণিবিশেষ নির্ভর করে। যেমন ‘আমি নির্বাসনে যাব না’ গানটা হয়তো যারা প্রেমে প্রত্যাখ্যান হয়েছেন, তাদের কাছে ভালো লাগবে। ‘দস্যু যেমন মুখোশ পরে’ কিংবা ‘এখন অনেক রাত’, ‘বসন্ত ছুঁয়েছে আমাকে’ গানগুলো সব শ্রেণির মানুষের কাছে ভালো লাগবে। আমিই প্রথম এদিকে গিয়েছিলাম। আগে দেখতাম বিরহের গানে হাহাকারটা খুব বেশি ছিল। ভালোবাসার উল্টোদিকে ক্ষোভ থাকে কিন্তু। ঘৃণার উল্টোদিকে আবার ভালোবাসা থাকে। যেমন ‘কিছুই নাকি দেয়নি তোমায় বলো করেছে নিঃস্ব তোমায়’ এই গানগুলো আরেকটা শ্রেণির কাছে ভালোলাগার গান। যারা অনেক বেশি বোদ্ধা শ্রোতা। ‘তোমার সাথে দেখা না হলে মীরজাফরের বংশটাকে এত কাছ থেকে দেখা হতো না’ গানগুলো। একটা ব্যতিক্রম ছিল আমার বিরহের গানগুলো। বিরহের গানে ক্ষোভটা অন্যভাবে এসেছে আমার গানে। আমার গানের সব শ্রেণির দর্শক পছন্দ করে।

রাফি হোসেন : আমাদের পুরো সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটা দোটানা ব্যাপার চলছে। এ মুহূর্তে আপনি এখন কী ধরনের গান করতে আগ্রহী?

 কুমার বিশ্বজিৎ : এখানে অনেকগুলো ব্যাপার আছে। যারা গানে অর্থলগ্নি করে তারা এখন বৈশ্বিক বাজারের মতো করে গান তৈরি করতে চায়। যারা  অর্থলগ্নি করে তাদের অধিকাংশই হলো ব্যবসায়ী। যার ফলে এখানে পছন্দমতো কাজ করা খুবই কঠিন। সৃষ্টিশীল মাধ্যম যদি শিল্পী, গীতিকার, সুরকাররা স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে সেখানে সৃষ্টি হবে না। সবারই একটা ঐতিহ্য, কৃষ্টি শেকড় থাকে। এর থেকে বের হয়ে গেলে আর কী থাকে। এখন পৃথিবী আমার কাছে খোলা। আমার কী আমাদের ভ্যালুজ, আমাদের শেকড়ের মধ্যে থাকব। নাকি অন্যদিকে যাব। এটা আসলে নির্ভর করে। আমাদের শেকড় এখনো গ্রামে। আমাদের ঐতিহ্যটা ঠিক রেখে পাশ্চাত্য থেকে, বিভিন্ন জায়গা থেকে নেবো। সংমিশ্রণ করব। সংস্কৃতি যদি আমার মা হয়। আমার মাকে অলঙ্কৃত করতে পারি কিন্তু শর্টস তো পরিয়ে দিতে পারি না। এত অত্যাধুনিক বানাতে পারব না। জাতিগতভাবে প্রত্যেকেরই একটা আইডেন্টি আছে। কালচার একটা দেশের আইডেন্টি। তিরিশ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন একটা পতাকার জন্য, সংস্কৃতির জন্য, মাটির জন্য। আমরা সেখানে এই অর্থলগ্নিকারীদের হাতে জিম্মি। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের ভবিষ্যৎ খারাপ হয়ে যাবে।

রাফি হোসেন : নতুন প্রজন্মের যারা সংগীত পরিচালনা, সুর ও গান করছেন, তাদের মধ্যে কতটা সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন?

কুমার বিশ্বজিৎ : অনেকেই কাজ করছে, অনেকের মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। মাত্র তো তাদের যাত্রা শুরু হলো। তারা সময়কে সময় দিক, তাহলে ভালো কিছু করবে। সময় বলে দেবে কার অবস্থান কতটুকু। নতুনদের মধ্যে হাবিব, ইমরান, কিশোর, অদিত এরা ভালো কাজ করছে। আমি মুহিনের সুরেও গান করেছি। আমি অনেক ভাগ্যবান, আমি সত্য সাহার সঙ্গেও কাজ করেছি, তার ছেলে ইমন সাহার সঙ্গে কাজ করছি। আজকের প্রজন্মের সর্বকনিষ্ঠ যে, তার সঙ্গেও কাজ করছি। এটা একটা অভিজ্ঞতা হচ্ছে। একটা বিষয় কি, অনেকেই বলে আগের জিনিস ভালো, এটা বলার একটা কারণ আছে। আমাদের লাইফ স্টাইলটাই পরির্বতন হয়ে গেছে। আগে যখন গ্রামে ছিলাম পুরো গ্রামটাই ছিল একটা পরিবার। আপনি যে ফ্ল্যাটে থাকেন তার পাঁচতলায় কে থাকে, হয়তো জানেন না। আমরা অনেকের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। আমার স্কুল থেকে এসে মাঠে খেলতে যেতাম। অনেক বেশি ওয়াইড ছিল আমার ভিশন। এখন আমি বিশ্ব দেখছি হাতের মুঠোয় কিন্তু আমার মাথাটা নিচু। এর থেকে দৃষ্টিটা বের করে প্রকৃতির কাছে যেতে হবে। মাথাটা উঁচু করে আকাশ দেখতে হবে।

রাফি হোসেন : এখান থেকে উত্তরণের উপায় কী?

কুমার বিশ্বজিৎ : আমার মনে হয় কি, একটা সময় সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। এখন সবকিছু দ্রুত পরিবর্তনের ফলে একটা অস্থির সময়ের মধ্যে সবকিছু যাচ্ছে আগামী দিনে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। হঠাৎ করে বিশ্বায়নের যুগ সবকিছু আপনার সামনে। সবকিছুর সঙ্গে মানাতে হলে একটু গরমিল হবেই। তারপর একটা জায়গায় এসে স্থির হবে, হতে বাধ্য।

রাফি হোসেন : আপনার গানের শ্রোতা আর পাঠকদের জন্য কিছু বলেন?

কুমার বিশ্বজিৎ : যা কিছু আমার সৃষ্টি সব আপনাদের বিনোদনের জন্য। আপনাদের অনুভূতিতে বাড়তি একটু আনন্দ দেয়ার জন্য। প্রতিটা মানুষকে চলে যেতে হয়। ভালো কাজকে অবশ্যই আপনারা পেট্রোনাইজ করবেন। ভালো গান শুনবেন, উৎসাহিত করবেন। এটা আপনার সংস্কৃতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। আমি মনে করি একটা জাতির বড় পরিচয় তার সংস্কৃতি। সবসময় চেষ্টা করবেন আপনার সংস্কৃতিকে মাথার ওপর রাখতে।

Anonymous এর ছবি
CAPTCHA
এই প্রশ্নটি আপনি একজন মানব ভিজিটর কিনা তা যাচাই করার জন্য এবং স্বয়ংক্রিয় স্প্যাম জমাগুলি প্রতিরোধ করার জন্য।